ঢাকা, শুক্রবার 26 January 2018, ১৩ মাঘ ১৪২৪, ৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হুমকির মুখে সুন্দরবনের বাঘ স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৫১ বাঘের মৃত্যু

 

খুলনা অফিস : স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত নানা কারণে ১৫১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। প্রকৃতি ও মানুষের নিষ্ঠুর আচরণসহ নানা কারণে কমতে শুরু করেছে বাঘের সংখ্যা। বিলুপ্তির ধারাবাহিকতায় বর্তমানে মহা বিপন্নতার মুখে পড়েছে এ প্রাণিটি। দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি বাঘ বিশেষজ্ঞদের।

সেভ দ্যা সুন্দরবন ও বাঘ বিশেষজ্ঞদের দেয়া তথ্য মতে, ১৯৯৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঘের ৮ উপ-প্রজাতির সংখ্যা ছিল সাত হাজার ৬শ’টি, আর ২০১০ সালে এ সংখ্য কমে দাঁড়ায় তিন হাজার ২শ’টিতে। নির্বিচারে বাঘ হত্যা আর চোরা শিকারীদের বাঘ মেরে চামড়া পাচারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২২ সালের পরে বাঘ প্রজাতি পুরোপুরি বিলুপ্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুন্দরবনের বাঘের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য শঙ্কাসহ বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইলে বাঘ বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মনিরুল হাসান খান সাংবাদিকদের জানান, যে বাঘকে নিয়ে আমাদের গর্ব সেই সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আজ করুণ দশা। তাদের একমাত্র আবাসস্থল সুন্দরবনে এখন আর নেই সেই আগের মতো বাঘের আধিক্য। বন বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৭৯টি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। আর গত মঙ্গলবার সকাল ৬টার দিকে শরণখোলার গুইলশাখালী এলাকা থেকে লোকালয়ে আসা আরো একটি বাঘকে হত্যা করা হলো।

বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের এক মুখ্যপাত্র জানান, ১৯৬৩ সালে বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ গাই মাউন্ট ফোর্ট ধারণা করেন সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১০০টি। ১৯৭৫ সালে বিশেষজ্ঞ হেনডিক্স ধারণা করেন বনে সাড়ে তিনশ’ বাঘ থাকতে পারে আর ১৯৮০ সালে বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ পিটিনেস বলেন, ৪৬০টি বাঘের আবাসস্থল সুন্দরবন। ১৯৮২ সালে বন বিভাগের জরীপ অনুযায়ী ৪৫৩টি, ১৯৯৩ সালে তামাং নামক বিশেষজ্ঞের ধারণা ৩৬২টি বাঘ থাকতে পারে সুন্দরবনে আর গ্লোবাল টাইগার পপুলেশন ট্রেন্ড অনুযায়ী ১৯৯৩ সালে ৩শ’ থেকে ৪শ’ ৭৯টি। 

জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল ইউএনডিপি ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও-এর বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯৪ সালের শুমারী অনুযায়ী রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ৩৬৯টি। ১৯৯৬ সালে ৩শ’ থেকে ৪৬০টি, ১৯৯৮ সালের জরীপে ৩শ’ ৬২টি বাঘ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। ২০০৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি-৩মার্চ পর্যন্ত বাঘ শুমারী অনুযায়ী সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাচ্চাসহ রয়্যাল বেঙ্গলের সংখ্যা মিলেছে ৪শ’ ৪০টি। তবে ২০১৩ সালে শুরু হওয়া বাঘ শুমারীতে পাওয়া যায় বনে বাঘ রয়েছে মাত্র ১০৬টি।

সেভ দ্যা সুন্দরবন এর চেয়ারম্যান ড. লায়ন ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের পানিতে ও মাটিতে লবণাক্ততার ভাগ বেড়ে যাওয়া এবং সুন্দরী গাছ কমে যাওয়ার পাশাপাশি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের স্বাভাবিক জীবন চক্র পাল্টে যাচ্ছে। বাড়ছে বাঘের মানুষ খাওয়ার প্রবণতা। তার মতে, প্রাণি বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় বনের যে অংশের মাটিতে নুনের ভাগ কম, সে অংশে যেমন বাংলাদেশের দক্ষিণ দিকের সুন্দরবনে আশ্রয় নিচ্ছে বাঘ। আর সুন্দরবনের পশ্চিমবঙ্গের অংশে যে বাঘ রয়েছে তাদের মাংস খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তিনি আরও জানায়, বিশেষজ্ঞদের অভিমত মানুষ আর কুকুরের গোশত মিষ্টি। সে কারণেই বাঘ মাঝে মাঝে লোকালয়ে আসছে। 

সুন্দরবনে বাঘের আচরণ নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তারা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যেভাবে সুন্দরবনে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বদলাচ্ছে, তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের স্বভাব পাল্টাতে বাধ্য। যারা তা পারেনি তারা মারা পড়ছে নানা কারনে। বাঘ খাদ্যের সন্ধানে ঢুকে পড়েছে লোকালয়ে। বন বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৭ সালের এ পর্যন্ত ৭৯টি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। সুন্দরবনের শরণখোলা চাঁদপাই খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে কমবেশী বাঘ হত্যা হয়। তবে বাঘ হত্যার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চাঁদপাই রেঞ্জ। সংশ্লিষ্ট বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বেশীর ভাগ বাঘের মৃত্যু হয়েছে জনতার গণপিটুনীতে। তার মধ্যে গত মঙ্গলবার সকালে আরো একটি বাঘ হত্যা যোগ হলো। বন্যপ্রাণি ও ট্যুরিজম বিভাগের ডিএফও’র ভাষ্য অনুযায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় বন্যায় এবং শিকারীদের হাতে বাঘ মারা পড়ছে। বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করলে আত্মরক্ষার্থে জনগণ পিটিয়ে হত্যা করে। বয়োবৃদ্ধ জনিত কারণে বাঘের মৃত্যু হচ্ছে বলেও তিনি জানান।  তবে বাঘ বিশেষেজ্ঞদের মতে, প্রাণি জগতের মধ্যে বাঘ সবচেয়ে অরক্ষিত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাঘ খাপ খাইয়ে নিতে না পারায় এর সংখ্যা ক্রমেই কমছে। ২০১০ সালের পর বাঘ বিলুপ্তির সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।  লায়ন ড. ফরিদুল ইসলাম, মার্কিন বাঘ বিশেষজ্ঞ ম্যাক ইন্টার’র বরাত দিয়ে বলেছেন, পাঁচটি কারণে সুন্দরবনে হিং¯্র বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করছে। কারণগুলো হচ্ছে প্রথমত, বনে বাঘের প্রয়োজনীয় খাদ্যের অভাব, দ্বিতীয়ত, সুন্দরবনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী ও খাল ভরাট হওয়ায় বাঘ সহজেই লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে, তৃতীয়ত, বয়োবৃদ্ধ বাঘ শিকারের সক্ষমতা হারিয়ে লোকালয়ে আসে, চতুর্থত, সুন্দরবন লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং পঞ্চমত, অবৈধ শিকারীদের হামলায় প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে লোকালয়ে ঢুকছে। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের সূত্র জানান, স্বাধীনতাত্তোর কাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত নানা কারণে ১৫১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছরই বাগেরহাটের শরণখোলা, মংলা এবং সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করে। গত ১৫ দিনে জয় মনির বৈদ্যমারী ও বড়ইতলা এলাকা থেকে তিনটি গরু ও বেশ কয়েকটি কুকুর বাঘের আক্রমণে মারা গেছে। এ বাঘ প্রায় সময় কুকুর, ছাগল, গরু হত্যা করে। এ কারণেই আতঙ্কগ্রস্ত সাধারণ মানুষ গণপিটুনি দিয়ে বাঘ হত্যা করে। এ মওসুমে প্রায় সময় বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় স্থানীয় অধিবাসীরা যেমন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে অপরদিকে বন বিভাগও কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েছে।

বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত টাইগার এ্যাকশন প্লানের খসড়ায় বলা হয়, বনে রয়্যাল বেঙ্গলের সংখ্যা কমছে না বাড়ছে এর সঠিক হিসেব নেই। এক জরিপের সাথে অন্য জরিপের কোন মিল নেই। তবে রাশিয়ার সেন্টপিটার্সবার্গ শহরে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে ২০২২ সালের মধ্যে যেখানে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, সেখানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমেই চলেছে। এ অবস্থার মধ্যে গত বছরগুলো সুন্দরবন সন্নিহিত জেলাগুলোসহ সরকারি ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন সভা, সমাবেশ, র‌্যালিসহ নানান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাঘ রক্ষা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনে চোরাশিকারীদের তৎপরতা ছাড়াও বাঘ ও মানুষের সংঘাতে প্রতিবছর গড়ে তিনটি বাঘ মারা পড়ছে। এ ছাড়া প্রকৃতির নানা বৈরি আচরণেও প্রাণ হারাচ্ছে বাঘ। তবে সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষায় এখনই জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী বলে মনে করেন বাঘ বিশেষজ্ঞরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ