ঢাকা, বৃহস্পতিবার 1 February 2018, ১৯ মাঘ ১৪২৪, ১৪ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জননেতা শামছুল হক

ডা. সাইফুল ইসলাম স্বপ্ন : স্বাধীনতা সংগ্রামী অকুতোভয় প্রাজ্ঞ দেশপ্রেমিক রাজনীতিক দার্শনিক শামছুল হক ছিলেন অবিভক্ত ভারতের ফুলটাইম পলেটিশিয়ান। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির দিকপাল, মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম রূপকার। উপমহাদেশের এক যুগ স্রষ্টা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বাঙালির উজ্জ্বল ইতিহাসের এক কঠিন অধ্যায়ের কালজয়ী জননায়ক। বিপ্লবী শামছুল হকের জন্ম মহান ভাষা আন্দোলনের সময়। অর্থাৎ ০১ ফেব্রুয়ারি ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে। এলাসিন মাতুলয়ে জন্মদিন ছিল রমজানের রূপালি চাঁদের স্নিগ্ধ সুবহে সাদিক। নিজ গ্রাম মাইঠান টেউরিয়া। বিত্তশালী নানা মো. নছের উদ্দিন সরকার, মামা নাজেশ আলী সরকার ৮ ভাইয়ের একমাত্র বোন মোছা. শরিফুন্নেছা পুণ্যাত্মা শামছুল হকের মা। পিতা দবির উদ্দিন সরকার শিশু জন্মের পর আকিকা করলেন প্রথার বাইরে ৭টি গরু জবাই করে, ৭ গ্রামের মেহমানদারী করার মাধ্যমে রোজাদারদের প্রাণঢালা দোয়াই পরবর্তী জীবনে শামছুল হকের কর্মকে, ইসলামের বৈপ্লবিক ধারায় পরিচালিত করেছিল, তাই তিনি সুধী মহলে তথা ইসলামী মহলে স্মরণীয়-বরণীয়। পিতা দবির উদ্দিন সরকার একাধারে একজন আদর্শ কৃষক, চারণ কবি, সাত গ্রামের ন্যায়পরায়ণ ধার্মিক মাতব্বর এবং ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই শামছুল হকের পারিবারিক ইসলামী শিক্ষা জীবন শুরু হয়। পাঁচ বছর বয়সে অর্থাৎ প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় তিনি সংগ্রাম হয়ে ওঠেন।
শামছুল হকের পূর্ব পুরুষগণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দে হযরত বাবা আদম /ফকিরের সাথে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বঙ্গদেশের তৎকালীন রাজধানী বিক্রমপুর আগমন করেন। ১১৩ জন অনুসারী নিয়ে বাবা আদম ফকির বিক্রমপুরে আস্তানা তৈয়ার করেন এবং ইসলামের অমর বাণী প্রচার করতে থাকেন। রাজপুত্রগণ দাওয়াত গ্রহণ না করে উল্টো হযরত বাবা আদম ফকিরের উপর আক্রমণ করে বসেন। অলৌকিকভাবে অত্যাচারিত হিন্দু মজলুম জনতা বাবা আদম ফকিরের পক্ষাবলম্বন করেন এবং শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। গণঅভ্যুত্থানের যুদ্ধে সেনা শাসকগণ নিহত হন এবং এই অঞ্চলে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত হয়। সেনবাড়ী থেকে আধা মাইল দূরে বাবা আদম ফকির প্রথম একটি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং এই মসজিদ ও নিজ হুজরা থেকেই ইসলামের দাওয়াত সম্পন্ন করেন। দলে দলে লোক মুসলমান হতে থাকেন। মৃত্যুর পর মসজিদের পাশেই নিজ হুজরাতে বাবা আদম ফকিরের দাফন সম্পন্ন করা হয়। বংশানুক্রমে ইসলাম ধর্ম প্রচার কাজ চালিয়ে যাওয়ার দীক্ষা শামছুল হকের পূর্ব-পুরুষগণ ফয়েজ প্রাপ্ত হন হযরত বাবা আদম ফকিরের মোজেজা-ফিকির ওয়াস্তে। নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে শামছুল হকের পূর্ব-পুরুষগণ বঙ্গদেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলামী দাওয়াতের কাজ করেন প্রায় ৪০০ বছর। অবশেষে ফকির হানিফ সরকার অর্থাৎ শামছুল হকের দাদার পিতা টাঙ্গাইল আগমন করেন ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে। টাঙ্গাইলের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় তাদের বংশধর ছড়িয়ে পড়ে। শামছুল হকের দাদার নাম ওয়াদুদ সরকার। শামছুল হকের দুই চাচা রিয়াজ উদ্দিন সরকার ও আব্দুল গণি সরকার দবির উদ্দিন সরকারের মতো বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
বৃটিশ আমলে এলাসিন ছিল টাঙ্গাইলের মহকুমার বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। কারণ, আদমজী-ইস্পাহানীর পাটের আরত এলাসিন ব্রাঞ্চ, স্টিমার-লঞ্চ ঘাট, টেরিগ্রাম লাইন, বিশুদ্ধ নলকূপের ব্যবস্থা, নদীপথে কলকাতার সাথে প্রতিদিনের যোগাযোগ ব্যবস্থাও পত্র-পত্রিকার বহুল প্রাপ্তি এলাসিনকে করেছিল সমৃদ্ধ। এমন সুন্দর পরিবেশে হক সাহেবের শিশুকাল কেটেছে। হকের মামা নওজেশ আলী সরকার ছিলেন পাটকলে ব্যবসায়ী পার্টনার এবং ইংরেজ বাবুদের সাথে ছিল সখ্যতা। হক খুব কাছ থেকে প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার, মহাজন ও ইংরেজিদের শঠতা, নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা ও গণমানুষের উপর নির্যাতন সুধী-মহলের সাথে মধুর ব্যবহারও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। শৈশব শেষে যৌবনে যখন পাকিস্তান হাসিলের আন্দোলন ঢাকার নেতারা এলাসিনে নেমে নৌকায় অথবা টমটম গাড়িতে হক সাহেবের মকাইঠানের বাড়িতে, তারপর মওলানা ভাসানীর সন্তোষ, তারপর টাঙ্গাইল আসতেন, (১৯৪১, ১৯৪৪, ১৯৪৬, ১৯৪৯)। শেখ মুজিব, আতোয়ার রহমান, আবুল হাশিম সাহেব, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খন্দকার মোশতাক সবাই জনাব হক সাহেবের বাড়িতে একদিনের জন্য হলেও আপ্যায়িত হয়েছিলেন। সুতরাং অঞ্চলািট অজ্ঞাত-অখ্যাত হলে এটি সম্ভব হতো না। অনেক লেখকের ভৌগোলিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে হক সাহেবের অঞ্চলকে অজপাড়াগাঁ বলেছেন।
হাইস্কুলে পড়–য়া শামছুল হকের দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পা-িত্য দেশে স্কুলে শিক্ষকরা তটস্থ থাকতেন প্রধান শিক্ষক বৈরামী আলী তাঁর পড়াশুনা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দেখে তাকে নিজ বাড়িতে লজিং করে নেন। সাংগঠনিক ক্ষমতা আর বক্তৃতার জন্য শামছুল হক স্কুল জীবনেই ব্যাপক জনপ্রিয় ও পরিচিত বাগ্মি পুরুষ হয়ে ওঠেন। ১৯৪১ খৃস্টাব্দে শেখ মুজিব, শামছুল হকের এলাকায় সাংগঠনিক সফরে এলে শামছুল হক নিজ শিক্ষক বৈরাম আলী মাস্টারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। শেখ মুজিব নেতা শামছুল হকের শিক্ষককে সালাম করেন এবং আবেগ মেশানো কণ্ঠে বলেন, ‘আপনি আমার গুরুর  গুরু’ আমাদের জন্য দোয়া করবেন যেন আমরা দু’জন দেশের জন্য একত্রে কাজ করতে পারি। ১৯৪৯ খ্রস্টাব্দের ২৩ জুন সদ্য স্বাধীন পাাকিস্তানে বাঙালির নিজস্ব আত্মপ্রকাশের রাজনৈতিক দল আওয়ামী (মুসলিম) লীগ, মহান ভাষা আন্দোলন, মহান স্বাধীনতা আন্দোলন ৩টি সংগ্রামই মহোত্তম অর্জনের ইতিহাস।
পাকিস্তান আন্দোলন যে দুই বীর রাজনীতিক সার্থক করেছিলেন, মুসলিম লীগ সরকার তাদেরকে বহিষ্কার করলেও তাঁরা অর্থাৎ আবুল হাশিম ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৯৪২, ২৩ জুন) আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদান করলেন না। মওলানা ভাসানী প্রধানত আসামের নেতা হয়েও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণ প্রাপ্ত হলেন সভাপতির দায়িত্ব। ১৯৪৯-১৯৫৭ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত। সোহরাওয়ার্দী জিন্নাহ মুসলিম লীগ করে ১৯৫৩ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত বর্ধমান অবস্থান করেন। অবশ্য আওয়ামী মুসলিম লীগের দুই বীর সেনানী শামছুল হক ও শেখ মুজিব নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন আবুল হাশিম ও সোহরাওয়ার্দীর সাথে তেমনি ভাসানীর সাথেও। অর্থাৎ ভাসানী, শামছুল হক মুজিবের দলই আওয়ামী লীগ আর সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম ছিল প্রেরণার উৎস। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ভাষা আন্দোলনে কারামুক্ত হওয়ার পর শামছুল হক দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ হারান। ১৯৫৩ খৃস্টাব্দে নিজ হাতে গড়া আওয়ামী লীগ শামছুল হককে প্রথম কনভেনশনেই সাময়িকভাবে বহিষ্কার ও দলের সদস্য পদ বাতিল করে, একেই বলে কপাল। পরবর্তীতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দলে যোগদান করলে সদস্য পদ ফিরিয়ে দেয়া হয়। পক্ষান্তরে যুক্ত ফ্রন্ট থেকে (১৯৫৪) নমিনেশন দেয়া হয় না অথচ তাকে বিভিন্ন জনসভায় বক্তা হিসেবে ব্যবহার  করা হয়। তিনি ফ্রন্টের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন এবং যুক্তফ্রন্ট জয় যুক্ত হয়ে সরকার গঠন করে। ১৯৫২ খৃস্টাব্দের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য শামছুল হককে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের অপরাধে গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ রাখা হয় ১৯ মার্চ ১৯৫২ খৃস্টাব্দ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ পর্যন্ত। অন্যসব বন্দি নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থ-স্বাধীন জীবন-যাপন করতে সক্ষম হলেও শামছুল হকের সে ভাগ্য হয়নি। কারারুদ্ধ থাকা অবস্থাতেই সুপরিকল্পিত ত্রিমুখী চক্রান্তের মাধ্যমে তাকে জটিল মানসিক রোগীতে পরিণত করা হয়। জেলে থাকতেই তার স্ত্রী অধ্যাপিকা আফিয়া খাতুনের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করা হয়। জেলে থাকতেই তার স্ত্রী তাদের দুই কন্যাসহ পিএইচডি করার জন্য সরকারি বৃত্তির নিয়ে নিউজিল্যান্ড পাড়ি জমান। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী ও তার চোখের মণি কন্যাদ্বয়কে দেকতে না পাওয়ায় তার মানসিক রোগ আরো জটিল আকার ধারণ করে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় দেশে মুসলিম লীগ বিরোধী যে গভীর ক্ষোভ ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে, তাকে পুঁজি করেই ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট পূর্ববঙ্গের মাটি থেকে মুসলিম লীগকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়। এরপর এক পর্যায়ে শামছুল হকের নিজ হাতে গড়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তানের কেন্দ্র ও পূর্ববঙ্গ প্রদেশ উভয় স্থানে সরকার গঠিত হয়। অথচ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তানের কেন্দ্র  ও পূর্ববঙ্গ প্রদেশ উভয়স্থানেসরকার গঠিত হয়। অথচ আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সেই আনন্দঘন দিনেও শামছুল হক অনাদরে, অনাহারে, নিজ দলের অত্যাচার, মুসলিম লীগদের তিরস্কার, প্রিয়তমা স্ত্রী আফিয়া ও চোখের মণি দুই কন্যা শাহীন, শায়কাকে চোখের সামনে না পেয়ে এবং নিজ বংশধরদের সহযোগিতা না পেয়ে অভিমানে তিনি ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হন, একেই বলে বদনসিব। শামছুল হকের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। তিনি রাজনৈতিক উপেক্ষার বলি হয়েছে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মাধ্যমে। আর এ চক্রান্তের কুশিলব কায়েমী স্বার্থান্বেষী মুসলিম লীগ এবং নিজ দলের শীর্থ নেতৃত্ব। যে চক্রান্ত নিজের ভালোবাসার স্ত্রীও বুঝতে না পেরে সেই চক্রান্তেই ফেঁসে গেছেন। বৈপ্লবিক ইসলামের সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হোক সা¤্রাজ্যবাদ শক্তি চায়নি বলেই শামছুল হককে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হতে হলো।
নিজ দলের শীর্ষ নেতারা কখন ও হক সাহেবের নিরুদ্দেশের ব্যাপারে এতোটুকু উৎকণ্ঠা প্রকাশ বা খোঁজ-খবর নেয়নি। উপরন্তু তার ধর্মভীরুতার সুযোগ নিয়ে সুকৌশলে তাকে আল্লাহর ওলি বানিয়ে নিরুদ্দেশের খবরটি আড়াল করেছিল। হক সাহেবের বংশধররা ওলী আল্লাহর নিখোঁজ হওয়া তথা আফসাফ হওয়া মেনে নিলো সুদীর্ঘ ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে অর্থাঃ নিখোঁজ হওয়ার ৪২ বছর পর তার মৃত্যুর খবর ও তার কবরের সন্ধান মেলে যমুনার তীর ঘেঁষা কদিমহামজাননী কবরস্থানে। পরিবারের পক্ষে ডা. স্বপন, সাংবাদিক মহব্বত হোসেন ও সাংবাদিক মাছুম ফেরদৌসের বছরব্যাপী অনুসন্ধানে ডা. আনছার আলীর সহায়তায় বেরিয়ে আসে আমোঘ লুকায়িত সত্যটি। তাই দুঃখের সাথে বলতে হয় বাংলাদেশে সবই সম্ভব। কি নির্মম এ দেশের ল্যাং মারা আওয়ামী রাজনীতি। কালের পরিহাস শীর্ষ নেতাদেরও শেষ পরিণতি কি নির্মম।
১৯৪৭-৫২ খ্রিস্টাব্দে অনেকেই শামছুল হককে পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ চিফ মিনিস্টার বলে কল্পনা করতেন। কেননা, শামছুল হককে তখন বলা হতো বেবী জিন্নাহ। মি. জিন্নাহ তাকে অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ অর্গানাইজার পদে ভূষিত করেছিলেন। সেই নিরিখে অনেকেই মনে করেন তিনি তদানিন্তন প্রাদেশিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীনের বিষ দৃষ্টিতে পড়েন।
১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে শামছুল হক কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সাথে জড়িত হন এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকেন তখন তিনি সন্তোস জাহ্নবী হাই স্কুলের ছাত্র। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে অংশগ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং ঝঃধঃবং এর পক্ষে মত প্রকাশ করেন। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় মুসলিম লীগ কর্মী শিবিরের আঞ্চলিক প্রধান নির্বাচিত হন যখন তিনি সবেমাত্র ইতিহাসে বিএ পাস করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যুগের চাহিদা অনুযায়ী তিনি তখন একটি রাজনৈতিক গ্রন্থ রচনা করেন ‘বৈপ্লবিক দৃষ্টিতে ইসলাম’। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লী কনভেনশনে যোগদান শেষে আশাহত হন যখন ঝঃধঃবং বিতর্কে ঝঃঁঃব হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে (২৩৬ পৃ.) বলেছেন, “পাকিস্তান আন্দোলনে হক সাহেবের অবদান যারা এখন ক্ষমতায় আছেন তাদের চেয়েও অনেক বেশি ছিল। বাংলাদেশের যে কয়েকজন কর্মী সর্বস্ব দিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন তাদের মধ্যে শামছুল হক সাহেবকে সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মী বললে বোধ হয় অন্যায় হবে না। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠানকে জমিদার, নবাদের দালালের কোঠা থেকে বের করে জনগণের পর্নকুটিরে যারা নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে হক সাহেব ছিলেন অন্যতম। অথচ স্বাধীনতার ৭ দিনের মাথায় তিনি মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কৃত হলেন। একেই বলে মন্দ কপাল। শেষে তাদের কারাগারেই তাকে পাগল হতে হলো।
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি ইডেন কলেজের ইংরেজি অধ্যাপিকা আফিয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। দুই কন্যা ড. শাহীনের জন্ম হয় ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ৯ এপ্রিল আর ড. শায়কার জন্ম হয় ভাষা আন্দোলনে শামছুল হকের জেলবন্দী অবস্থায় অর্থাৎ ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর। হক সাহেব রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের উভয় পর্বের ১৯৪৮ ও ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ইতিহাসের উজ্জ্বল নক্ষত্র। পাকিস্তানের সূচনায় বৃটিশ বিরোধী, পরে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন, আওয়ামী (মুসলিম) লীগের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস তাকে বিস্মৃত হতে দেবে না যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি থাকবে।
এখন দরকার তাকে রাষ্ট্রীয় ২১ পদক প্রদানপূর্বক একজন শামছুল হকের উত্থান ও সঠিক রহস্যের উদঘাটন ইতিহাস রচনা করা। এ কাজটি করবে সমাজের সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিত্ব তথা সংগঠন যারা শামছুল হকের সুস্থ ধারার আদর্শ ও ত্যাগের গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেবে তখন দেশ হবে সন্ত্রাসমুক্ত, শোষণমুক্ত, আপামর জনগণ থাকবে সুখে-শান্তিতে, জাতি পাবে সঠিক নেতৃত্ব।
লেখক : শামছুল হক মেমোরিয়াল হসপিটাল এবং শামছুল হক ফাউন্ডেশন টাঙ্গাইল এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ