ঢাকা, বৃহস্পতিবার 1 February 2018, ১৯ মাঘ ১৪২৪, ১৪ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আইপিএল নিলামের সাত-সতেরো

নাজমুল ইসলাম জুয়েল : ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ (আইপিএল) নিয়ে সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের মতো খেলোয়াড়দেরও আগ্রহ থাকে। বিশ্বের সেরা সেরা খেলোয়াড়রা খেলে থাকেন বলে নিজেকে সেখানে শামিল করতে চান অনেকেই। তবে সবার ভাগ্যে সেই সুযোগ ঘটেনা। বাদ থেকে যান অনেক সেরা খেলোয়াড়রাও। আবার অখ্যাত কারো কারো সুযোগও ঘটে থাকে। এই যেমন টোয়েন্টি-২০’র নাম্বার ওয়ান বোলার ইষ্ট  সোধিকে কেউ কেনেনি। কোনো দলে ঠাঁই হয়নি টোয়েন্টি-২০’তে চার হাজারের উপরে রান করা হাশিম আমলার। গেইলের মতো টোয়েন্টি-২০ বিশেষজ্ঞশষ মুহূর্তে বিক্রি হয়েছেন দুই কোটিতে! এমন অবিশ্বাস্য আর বিরল কা-ই ঘটে গেল ২০১৮ সালের আইপিএল’র নিলামে। বাংলাদেশ থেকে দল পেয়েছেন কেবল দুইজন। দুই কোটি রুপিতে সাকিব আল হাসানকে নিয়েছে হায়দরাবাদ। দুই কোটি ২০ লাখে মুম্বইতে মোস্তাফিজুর রহমান। হাশিম আমলার ভিত্তি মূল্য ছিল দেড় কোটি রুপি। গত বছর টোয়েন্টি-২০ ৪৩ ম্যাচে তার রান ১২৭৭। লেগস্পিনার ইষ্ট সোধি এই মুহূর্তে টোয়েন্টি-২০’র শীর্ষ বোলার। ২০১৭-১৮ আন্তর্জাতিক মৌসুমে ওভার প্রতি সাত ইকোনমি রেটে ১৮ উইকেট নিয়েছেন। নিউজিল্যান্ডের ঘরোয়া টোয়েন্টি-২০ টুর্নামেন্টে ১০ উইকেট ছিল তার। রশিদ খান, যুবেন্দ্র চাহাল, অমিত মিশ্রর মতো লেগস্পিনার দল পেলেও শেষদিন পর্যন্ত তিনি অবিক্রীত। দল পাননি বিগহিটার মার্টিন গাপটিলও। তার ভিত্তি মূল্য ছিল ৭৫ লাখ রুপি। অথচ কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব এবং মুম্বইয়ের হয়ে তার ভালো খেলার রেকর্ড আছে। সময়ের অন্যতম সেরা ইংলিশ ক্রিকেটারজা রুটকেও কেউ নেয়নি। তার ভিত্তি মূল্য ছিল দেড় কোটি। দল পাননি শন মার্শ, ইয়ন মর্গান, অ্যালেক্সহলসের মতো শক্তিশালী ক্রিকেটাররাও। চোখ কপালে ওঠার আরও কিছু কারণ আছে। যাদের কাতারে ছিলেন বাংলাদেশের তামিম ইকবালও। জয়দেব উনাদকাটের মতো নবীন ক্রিকেটার ১১ কোটি রুপিতে রাজস্থান রয়্যালসে বিক্রি হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া ভারতীয় তিনি। ভারতের হয়ে এখন পর্যন্ত একটি টেস্ট ও সাতটি ওয়ানডে খেলেছেন এই ফাস্টবালার। বিদেশীদের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি দাম বেন স্টোকসের। ১২.৫  কোটি রুপিতে তাকেও নিয়েছে রাজস্থান রয়্যালস। আরো বেশি আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, নেপালের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এবার আইপিএল-এ দল পেয়েছেন ১৭ বছরের সন্দীপ লামিচেন। দ্বিতীয়দিন তাকে ২০ লাখ রুপিতে দলে নিয়েছে দিল্লি ডেয়ার ডেভিলস। দুইদিনে আট দলে মোট ১৬৯ জন বিক্রি হয়েছেন। যারা বিক্রি হননি তাদের আর নিলামে ওঠার সুযোগ নেই। দলগুলো আলাদা-আলাদাভাবে কাউকে নিলে তবেই অবিক্রীতরা খেলতে পারবেন।
সাকিবের চেয়ে বেশি দামে বিকালেন মোস্তাফিজ
টানা সাতবছর খেলার পর এবার কলকাতা নাইট রাইডার্স ছেড়ে দেয় বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে। সাকিবও খুব বেশি চিন্তিত ছিলেন না বিষয়টি নিয়ে। এবার ঠিকই দল পেয়েছেন এই বাঁহাতি অলরাউন্ডার। দু’দিনব্যাপী সেই নিলামের প্রথমদিনেই তাকে দুই কোটি রুপিতে কিনে নিয়েছে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। একই দিনে বিক্রি হয়েছেন নিলামে ওঠা আরেক তারকা  মোস্তাফিজুর রহমানও। সাকিবের চেয়ে ২০ লাখ রুপি বেশিতে (২ কোটি ২০ লাখ রুপি) কাটার মাস্টারকে কিনেছে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। আইপিএল-এ ২০১১ সাল  থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কলকাতার হয়ে খেলেছেন সাকিব। দলের হয়ে শিরোপা জেতার স্বাদ পেয়েছেন দু’বার, সেটা ২০১২ এবং ২০১৪ সালে। ওই মৌসুম দু’টিতে দারুণ ভূমিকাও ছিল টাইগার এই অলরাউন্ডারের। ৪৩ ম্যাচে করেছেন ৪৯৮ রান এবং বল হাতে নিয়েছেন ৪৩টি উইকেট। তবে এবার তাকে  ছেড়ে দেয় কলকাতা। তাই নিলামে উঠে তার নাম, যেখানে সাকিবের ভিত্তি মূল্য ধরা হয়েছিল ২ কোটি রুপি। নিলামের প্রথমদিনে ওই মূল্যেই সাকিবকে দলে ভেড়ায় সানরাইজার্স। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত সানরাইজার্স। ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃপক্ষের মতে, সাকিবের মতো খেলোয়াড়ের উপস্থিতিতে তাদের দলের মান অনেক উঁচুতে থাকবে। প্রথমদিনের নিলামে মাঝামাঝি সময়ে এক কোটি ভিত্তি মূল্যের  পেসার মোস্তাফিজকে দুই কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে টানে মুম্বই। বাঁহাতি পেসার আইপিএল’র অভিষেকেই তাক লাগিয়ে দেন। সাকিবের নতুন দল হায়দরাবাদকে চ্যাম্পিয়ন করার পথে বড় ভূমিকা রাখেন। পরেরবার চোট পুনর্বাসনের পর গিয়ে ভালো করতে পারেননি। একাদশে সুযোগ পান মাত্র একটি ম্যাচে।
পারিশ্রমিকে সবাইকে ছাড়িয়ে কোহলি
নিলাম নিয়ে নাটকীয়তা কম হয়নি। টানা দু’দিন বেশ অর্থের ঝনঝনানি শোনা গেল। আইপিএল’র মঞ্চে ওঠানো হলো ক্রিকেটারদের। সশরীরে না হলেও তাঁদের নাম বলে হাতুড়ির আঘাততা অন্ততবদিতে পড়েছিল। আটটি দল গত দুইদিন নিজ নিজ স্কোয়াড সাজাতে লড়াইয়ে নেমেছিল। আরেকটি মৌসুমের জন্য আইপিএল’র অংশ হয়ে গেলেন ১৮৭ জন ক্রিকেটার। এবার প্রতিটি দলকে ৮০ কোটি রুপির বাজেট ধরিয়েদওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালের তুলনায় যা ১৪ কোটি বেশি। বাড়তি বাজেট পেয়ে দলগুলোও নেমেছিল উৎসবে। স্কোয়াড পূরণ করার জন্য ২০ লাখ রুপিতে রকনা ক্রিকেটারের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু যাঁরা মুহূর্তেই  খেলা বদলে দিতে পারেন, যাঁদের বোলিং বা ব্যাটিং হয়ে উঠতে পারে শিরোপার অন্য নাম, তাঁদের জন্য লড়েছে সবাই। তবে ১৮৭ জনের সবাই হাতুড়ির নিচে যাননি। আটটি দল ১৮ জন খেলোয়াড়কে আগেই ধরে  রেখেছিল। নিলামের মাধ্যমে দলে টেনেছে ১৬৯ জন ক্রিকেটারকে। বাকি ৪০৯ ক্রিকেটারকে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। নিলামে কেনা খেলোয়াড়দের জন্য সর্বমোট খরচ? ‘মাত্র’ ৪৩১ কোটি ৭০ লাখ রুপি। নিলামে দলগুলোর কাছে সবচেয়ে লোভনীয় মনে হয়েছে ফাস্টবালার কিংবা অলরাউন্ডারকে। চাইলে ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারেন, ইচ্ছা হলেই মারতে পারেন ছক্কা,  বেন স্টোকসকে পেতে টানাটানি তো হবেই! তাই দাম হাঁকানোর  খেলাতে সবচেয়ে বেশি দাম উঠেছে এই ইংলিশ অলরাউন্ডারের। আইপিএল-এ প্রত্যাবর্তন-পর্ব ১২ কোটি ৫০ লাখ রুপির স্টোকসকে দিয়েই উদ্যাপন করল রাজস্থান রয়্যালস। নিলামে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচও এই দলের। বাঁহাতি পেসার জয়দের উনাদকাতকে পেতে ১১ কোটি ৫০ লাখ খরচ করেছে রয়্যালসরা। নিলামের শীর্ষ ১০ দামি ক্রিকেটারের সর্বশেষজনও স্টোকসদের সতীর্থ।
সবচেয়ে দামী উদানকাতকে নিয়ে যত আলোচনা
ভারতীয় দলের বড় তারকা এখনো হয়নি, কিন্তু আইপিএল নিলামে নিজেকে আলাদা করে স্থান করে দিতে পেরেছেন। নিলামের শেষদিন সাড়ে এগারো কোটি ভারতীয় রুপিতে উনাদকাতকে দলে ভিড়িয়েছে দুই বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ফেরা রাজস্থান রয়্যালস। আগেরদিন আইপিএল-এ নিলামে ১১ কোটি ভারতীয় রুপিতে বিক্রি হয়েছিলেন লোকেল রাহুল ও মনিশ পান্ডে। প্রথম দিনে দল পাননি ক্রিস গেইল, লাসিথ মালিঙ্গার মতো বিশ্ব তারকা। তাই এদিন কোনোভাবেই নিলাম নিয়ে অনাগ্রহ ছিল না সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের। নিলামে উনাদকাটের ন্যূনতম মূল্য ছিল দেড় কোটি ভারতীয় রুপি। রাইজং পুনে সুপারস্টারের হয়ে ২০১৭ আইপিএলে মাতানো তারকাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে চেন্নাই সুপার কিংস ও কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব। তবে তাদের হতাশ করে সর্বোচ্চ দাম হাঁকিয়ে রাজস্থান নিজেদের করে নেয় উনাদকাটকে। ২৬ বছর বয়সী উনাদকাট বেশ অভিজ্ঞ একজন ক্রিকেটার। ২০১০ সালেই ভারতীয় টেস্ট দলে অভিষেক তার। যদিও ১টির  বেশি টেস্ট খেলা হয়নি। ৭টি ওয়ানডে ও ৪টি টোয়েন্টি-২০ খেলেছেন তিনি ভারতীয় দলের হয়ে। সর্বশেষ শ্রীলঙ্কা সফরে ভারতীয় দলে ছিলেন। ম্যান অব দ্য সিরিজ হয়েছিলেন তিনিই। এবার জায়গা করে নিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আসন্ন টোয়েন্টি-২০ সিরিজের দলেও। বাঁ-হাতিপসার উনাদকাট আইপিএলে ৪৭টি ম্যাচ খেলেছেন। ২৩.২৫ গড়ে তার উইকেট সংখ্যা ৫৬। ২০১৭ সালে পুনের হয়ে ১২ ম্যাচে ২৪ উইকেট নিয়েছিলেন উনাদকাট। একটুর জন্য সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হতে পারেননি। ভুবনেশ্বর কুমার ২৬ উইকেট নিয়ে পেছনে ফেলেছিলেন তাকে। এবারের আইপিএলে তাই উনাদকাটের ওপরচাখ থাকবে আরো বেশি।
বাজিমাত করলেন আফগানরা
এবার আলাদা করে বলতে হবে আফগানদের কথা। নব্য টেস্ট খেলুড়ে দেশটির ক্রিকেটারদের নিয়ে আলাদা নজর ছিল। নিলালে অপ্রত্যাশিত দাম পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কয়েকজন ক্রিকেটার। যেখানে ডেল স্টেইন, মরনে মরকেল, টাইমাল মিলসের মতো বোলাররা দল পাননি সেখানে সাড়ে ১১ কোটি রুপিতে বিক্রি হয়েছেন জয়দেব উনাদকাট। ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই এখন সবচেয়ে দামি। তবে আফগান বাজার ছিলবশ রমরমা। ১১তম আইপিএল-এ আফগানিস্তানের চার-চারজন ক্রিকেটার দল পেয়েছেন। প্রথমদিনের পর দ্বিতীয় দিনে বড়সড় চমকই দেখালেন আফগানিস্তানের স্পিনার মুজিব জাদরান। চার কোটি রুপিতে তাকে দলে নিল কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব। সর্বশেষ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে খেলছেন মুজিব। যেখানে বল হাতে আলো ছড়িয়ে লাইমলাইটে আসেন এই আফগান। ২০১৭ সালে অভিষেক ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৪ উইকেট পেয়েছিলেন মুজিব। এ ছাড়া অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপেও ঝলমলে পারফরম্যান্স করেন তিনি। মালয়েশিয়ার কুয়ালামপুরে অনুষ্ঠিত ওই টুর্নামেন্টে ২০ উইকেট নিয়ে ক্রিকেটের রথী-মহারথীদের নজরে আসেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় ইয়ুথ ওয়ানডে সিরিজে ১৭ উইকেট শিকার করেছিলেন মুজিব। নিলামের প্রথম দিন ৯কাটি রুপিতে স্পিন জাদুকর রশিদ খানকে ধরে রাখে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। একই দলের হয়েখলবেনমাহাম্মদ নবি। এক কোটিতে অলরাউন্ডার নবীকে দলে নেয় হায়দরাবাদ। এরপর চতুর্থ আফগান হিসেবে দল পান জাহির খান পাকটিন। ৬০ লাখ রুপিতে তাকে দলে ভেড়ায় রাজস্থান রয়্যালস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ