ঢাকা, বৃহস্পতিবার 1 February 2018, ১৯ মাঘ ১৪২৪, ১৪ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আলোর নিশানার সন্ধান পাকিস্তানের

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ওয়ানডে সিরিজে ৫-০তে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা ভুলে টি-২০তে ঘুরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল পাকিস্তান। সফরকারী অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ এমনটাই বলেছেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ওয়ানডে সিরিজে ভাল করতে পারিনি আমরা। যেভাবে এই কন্ডিশনে খেলার দরকার ছিল, দল সেভাবে খেলতে পারেনি। ব্যাটসম্যানরা বড় রান করতে পারেনি। বোলাররা সময়মতো উইকেট নিতে পারেনি। পুরো সিরিজই আমাদের জন্য খারাপ কেটেছে। তবে টি-২০তে ভাল করতে চাই, ওয়ানডে সিরিজের দুঃখ ভুলে যেতে চাই। ছোট্ট ফরমেটে সিরিজ জেতাই লক্ষ্য।’ ওয়েলিংটনে বাংলাদেশ সময় সকাল নয়টায় শুরু হয় তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম টি২০। ছোট্ট ফরমেটের র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে কেন উইলিয়ামসনের নিউজিল্যান্ড, দ্বিতীয় স্থানে পাকিস্তান। ২০০৭-২০১৬ পর্যন্ত মুখোমুখি ১৫ ম্যাচের ৮টিতে জয় পাকিদের, কিউদের সাফল্য ৭ বার। তবে পাকিস্তান তাদেও কথা রেখেছে। কারণ এছাড়া তাদেও যে কোন রাস্তা ছিলনা। ওয়ানডেতে লজ্জার ভয়াবহতা ঢাকতে াতদেও টেস্টে সিরিজ জয় দরকার ছিল। যদিও প্রথমটিতে হার দিয়ে মুরু কওে পাকিস্তান। পরের দু’টিতে জয় তুলে নিয়ে সিরিজ নিজেদেও কওে নেয় সফরকারীরা। র‌্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান, মুখোমুখি লড়াই সববিচারেই সেয়ানে-সেয়ানে লড়াইয়ের ইঙ্গিত থাকলেও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে পাকিস্তানের অতীত রেকর্ড ভাল নয়। এখানে খেলা দুই সিরিজের দুটিতেই হেরেছে সফরকারীরা। দুবারই ২-১এ জিতেছে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড। অতীত রেকর্ড ধরে রাখার পাশাপাশি ওয়ানডের মতো পারফর্মেন্স করতে চেয়েছিল কিউইরা। সিরিজ শুরুর আগে অধিনায়ক উইলিয়ামসন বলেন, ‘আমরা দারুণ ফর্মে রয়েছি। পুরো ওয়ানডে সিরিজেই দল সেরা পারফর্মেন্স করেছে। শতভাগ সাফল্য নিয়ে এবার টি২০ লড়াই শুরু করব। এই সিরিজেও ভাল করতে আমরা দারুণ আত্মবিশ্বাসী। অতীতেও এখানে পাকিস্তান সুবিধা করতে পারেনি। এবারও আমরা তাদের কোন সুযোগ দেব না। দল হিসেবে খেলে সিরিজ জেতাটাই একমাত্র লক্ষ্য।’ সফরে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে নিউজিল্যান্ডের কাছে হোয়াইটওয়াশ হয় আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিজয়ী পাকিস্তান। দুঃস্মৃতি নিয়ে তিন ম্যাচের টি২০ শুরু করে সরফরাজের দল। ওয়ানডেতে ৫-০তে সিরিজ হারের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া ছিল তারা। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর টানা ৯ জয়ের স্মৃতি সঙ্গী করে এখানে পাড়ি জমিয়েছিল পাকিস্তানীরা। শেষ ১২ ম্যাচের মাত্র একটিতে হেরেছিল তারা। সেখানে হোয়াইটওয়াশের পথে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টানা ৮টি ওয়ানডে হারল পাকিস্তান। আগের সফরগুলো ধরলে টানা হারের সংখ্যা ১০। পাকিস্তান ৫-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ খুব বেশিবার হয়নি। এর আগে মাত্র দুবার এমন লজ্জায় পড়েছিল তারা। সর্বশেষ ৮ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। কমপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজ বিবেচনায় নিলেও পাকিরা তাদের ক্রিকেট ইতিহাসে খুব বেশিবার কিন্তু এমন লজ্জায় পড়েনি। হোয়াইটওয়াশের শিকার এর আগে হয়েছে ৯ বার। ২ ম্যাচ সিরিজকে বিবেচনায় নিলেও সংখ্যাটি সবমিলিয়ে ১৫ বার। সর্বশেষ চারবারের তিনবারই পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা দিয়েছে কিন্তু এই নিউজিল্যান্ডই। অথচ ২০১৫ সালের আগে কিউদের বিপক্ষে একবারও হোয়াইটওয়াশ হয়নি পাকিস্তান। এর মধ্যে পাকিস্তানকে বাংলাওয়াশ করেছিল বাংলাদেশও। ওয়ানডেতে পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি হোয়াইটওয়াশ হয়েছে ইংল্যান্ডের কাছে, চারবার। এরপর নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া তিনবার করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে তারা দুবার। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের কাছে একবার করে। ওয়ানডেতে এমন ধাক্কা সামলে টি-২০তে ঘুরে দাঁড়ানোটা সরফরাজদের জন্য সত্যি কঠিন ছিল।
পাকিস্তান সত্যি আনপ্রেডিক্টেবল। টানা ৯ ম্যাচ জিতে নিউজিল্যান্ডে পা রাখা সরফরাজ আহমেদের দল ওয়ানডে সিরিজে ‘হোয়াইটওয়াশ’ হয় ৫-০ ব্যবধানে! প্রথম টি২০তে ভরাডুবির পর ছোট্ট ফরমেটেও অনেকে হয়তো তাদের লজ্জা দেখছিলেন। কিন্তু ওই যে পাকিস্তান। টানা দুই জয়ে সরফরাজরা কেবল সিরিজই নিশ্চিত করেনি উঠে এসেছে টি-২০ র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে। মাউন্ট ম্যাঙ্গানিউয়ে তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে কিউইদের ১৮ রানে হারিয়েছে সফরকারীরা। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ১৮১ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়ে টস জিতে ব্যাটিং নেয়া পাকিস্তান। জবাবে সমান উইকেটে ১৬৩তে থামে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ। মাত্র ১৯ রানের বিনিময়ে ২ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন লেগস্পিনার শাদাব খান। আর ঘুরে দাঁড়ানো দ্বিতীয় ম্যাচে দু’টিসহ মোট তিন শিকারে সিরিজ সেরা তারকা পেসার মোহাম্মদ আমির।
ব্যাট হাতে এদিন পাকিস্তানকে ভাল শুরু এনে দেন ফখর জামান। আহমেদ শেহজাদের সঙ্গে ৩০, বাবর আজমের সঙ্গে ৩৬ আর সরফরাজের সঙ্গে তার ৪০ রানের তিনটি জুটিতে বড় সংগ্রহের ভিত পায় অতিথিরা। ৩৬ বলে ৪৬ রান করা ফখরকে বিদায় করেন মিচেল স্যান্টনার। বাঁহাতি স্পিনারের আরেক শিকার ২১ বলে ২৯ রান করা সরফরাজ। সোধির এক ওভারে তিন ছক্কা হাঁকানো উমর আমিন ফিরেন ৭ বলে ২১ রান করে। সোধির হাতে একবার জীবন পাওয়া হারিস সোহাইল অপরাজিত থাকেন ২০ রানে। শেষ দুই বলে ছক্কা-চার হাঁকানো আমির ইয়ামিন করেন অপরাজিত ১৫ রান। তাদের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে শেষ ৪ ওভারে ৫৮ রান তুলে লড়াইয়ের পুঁজি গড়ে পাকিস্তান। কিউইদের হয়ে বোলিংয়ে একাই লড়াই করেন স্যান্টনার। এরপর রান তাড়ায় দলকে কক্ষপথে রাখতে একাই লড়েন মার্টিন গাপটিল। অন্য ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে খুব একটা সহায়তা পাননি এই ওপেনার। মাত্র ৯ রান করে সাজ ঘরে ফেরেন অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন। আবার কিচেনের সঙ্গে দলকে ১ উইকেটে ৮৪ রানে নিয়ে যান গাপটিল। সেখান থেকে ম্যাচ পাকিস্তানের দিকে ঘুরিয়ে দেন শাদাব। ৫ বলের মধ্যে কিচেন ও গাপটিলকে ফেরান তরুণ এই লেগস্পিনার। ৪৩ বলে ৪টি ছক্কা ও দুটি চারে ৫৯ রান করে আউট হন গাপটিল।। দ্রুত কলিন ডি গ্র্যান্ডহোমকে ফিরিয়ে কিউইদের আরও বাড়িয়ে দেন আমির ইয়ামিন। তিনটি ছক্কায় শুরু করেছিলেন রস টেইলর। তবে রিভিউ নিয়ে অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখেন মোহাম্মদ আমির। শেষ দিকে স্যান্টনারের ১২ বলে অপরাজিত ২৪ রান নিউজিল্যান্ডের হারের ব্যবধান কামিয়েছে মাত্র।
নিউজিল্যান্ড সফর বিভীষিকাময় হয়ে উঠছিল আর যন্ত্রণাটা দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছিল পাকিস্তান ক্রিকেট দলের। ওয়ানডে সিরিজে ৫-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পর তারা ৩ ম্যাচের প্রথম টি২০ সিরিজেও ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয়েছিল। তবে সেই কষ্টের কালো মেঘ কাটিয়ে অবশেষে আলোর নিশানার সন্ধান পায় পাকিস্তান। অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টি২০ ম্যাচে তারা ৪৮ রানের দারুণ এক জয় তুলে নিয়েছে। ৪ উইকেটে ২০১ রান করা পাকিস্তানকে জবাব দিতে নেমে কিউইরা ১৮.৩ ওভারে ১৫৩ রানে গুটিয়ে যায়। ফলে ৩ ম্যাচের সিরিজে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ সমতা এনে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন দেখতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়েছে।  তবে নিউজিল্যান্ড সফরে লজ্জাজনকভাবে ৫-০’ তে ওয়ানডে সিরিজ হারা পাকিস্তান প্রথম টি২০তেও পাত্তা পায়নি। ছোট্ট ফরমেটের শুরুতেই ৭ উইকেটের ব্যবধানে হেরে গেছে সফরফরাজ আহমেদের দল। ফের ব্যাটিং ব্যর্থতাই সফরকারীদের ডুবিয়েছে। ওয়েলিংটনে ১৯.৪ ওভারে মাত্র ১০৫ রানে অলআউট হয় পাকিস্তান। জবাবে ১৫.৫ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় টিম সাউদির নেতৃত্বাধীন নিউজিল্যান্ড। ৪৩ বলে অপরাজিত ৪৯ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচসেরা হয়েছেন কলিন মুনরো। টানা তিন হারে ওয়ানডে সিরিজ খোয়ানোর পরই পাকিস্তান ব্যাটিং কোচ গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার বলেছিলেন, প্রথম দশ ওভারে ব্যাটিং ব্যর্থতাই তাদের ডুবিয়েছে। ঘুরে দাঁড়াতে হলে অবশ্যই এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শুরুতে প্রতিপক্ষের পেসারদের সামলানোর উপায় বের করতে হবে। শেষ ওয়ানডেতে কিছুটা ভাল করলেও ৫-০ তে হারের লজ্জা এড়াতে পারেনি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির চ্যাম্পিয়নরা। অকল্যান্ডে প্রথম টি২০’র উইকেট কিন্তু মোটেই খারাপ ছিল না। কিন্তু আবারও সেই ব্যাটিং ব্যর্থতা। নির্দিষ্ট করে বললে দুই নতুন বলের বোলার সেথ রেন্স ও টিম সাউদি মিলে সফরকারী টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানদের দাঁড়াতেই দেননি। সাউদি তুলে নেন মোহাম্মদ নওয়াজ (৭) ও ফখর জামানকে (৩), রেন্স ফেরান উমর আমিনকে (০)। ১৫ রানে ৩ উইকেট হারানো পাকিস্তান আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি। বিপদের মধ্যে ইজ্জত রক্ষার দায়িত্ব নেন বাবর আজম। পাশাপাশি বলতেই হচ্ছে ‘বোলার’ হাসান আলীর কথা। বাবরের ৪১, আর নয় নম্বরে নামা হাসানের ২৩ রানে আরও বড় লজ্জার শঙ্কায় থাকা পাকিরা নিজেদের সংগ্রহ ১০০ পার করতে সমর্থ হয়। আর কেউই দুই অঙ্ক ছুঁতে পারেননি। অধিনায়ক সরফরাজ ফিরেছেন ৯ রান করে। কেন উইলিয়ামসনের জায়গায় কিউইদের নেতৃত্বে দিয়েছেন টিম সাউদি। দিনটাকে তিনি স্মরণীয় করে রেখেছেন দুর্দান্ত বোলিং পারফরম্যান্স দিয়ে। আগেই বলা হয়েছে সাউদি তরুণ রেন্সকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানকে শুরুর ধাক্কাটা দিয়েছেন। দুজনেই সমান ভাগ করে নিয়েছেন প্রতিপক্ষের ৬ উইকেট। স্পিনার মিচেল স্যান্টনার পেয়েছেন ২ উইকেট। জবাবে নিউজিল্যান্ডের শুরুটাও ভাল ছিল না। ৫৭ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে বসেছিল তারা। পাকিস্তানী বোলাররা লড়াইয়ের আভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু মুনরো ও রস টেলরের ৪৯ রানের জুটিতে শুরুর ধাক্কা সামলে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় কিউরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ