ঢাকা, বৃহস্পতিবার 1 February 2018, ১৯ মাঘ ১৪২৪, ১৪ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে ফেদেরার ওজনিয়াকির শ্রেষ্ঠত্ব

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : মাঝের কয়েকটা বছর সেভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি সুইজারল্যান্ডের রজার ফেদেরার। এবার যেন দিন বদলেছে। বছরের প্রথম গ্র্যান্ডস্লামেই বাজিমাত করেছেন। নিজের কুড়িতম গ্র্যান্ডস্লাম শিরোপা জিতে আরো অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অন্যদিকে মহিলা এককেও চমক দেখিয়েছেন একজন। তিনি ক্যারোলিন ওজনিয়াকি। মেয়েদের এককের ফাইনালে দু’জনের সামনেই ছিল প্রথমের হাতছানি। গ্র্যান্ডস্লাম মঞ্চে এর আগে দু’জনেই দু’বার ফাইনালে উঠে ফিরেছেন শূন্য হাতে। তৃতীয় ফাইনালে এসে সেই দুঃখ মুছে  গেল ওজনিয়াকির, আর সিমোনা হালেপ আবারও পুড়লেন স্বপ্নভঙ্গের হতাশায়। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে হালেপকে হারিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম জয়ের অমৃত স্বাদ  পেলেন ওজনিয়াকি। মেলবোর্ন পেল নতুন রানী। মেলবোর্ন পার্কের রড লেভার অ্যারেনায় ২ ঘণ্টা ৪৯ মিনিটের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে জেতেন তিনি।
৩৬ এ কুড়ির ফেড এক্সপ্রেস
বহু বছর আগেই নিজের নামের পাশে ‘ফেড এক্সপ্রেস’ খেতাব জুটিয়ে নিয়েছেন রজার ফেদেরার। বয়স এরই মাঝে পেরিয়ে গেছে ৩৬, কিন্তু সেটিকে তিনি একটি সংখ্যা হিসেবেই মেনে নিতে চাইছেন, এর বাইরে কিছুই নয়। বয়সের বাঁধা পেরিয়ে একের পর এক শিরোপা নিজের করে নিয়ে এখন কিংবদন্তীদের খাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন সুইস এ সুপারস্টার। মেলবোর্ন পার্কে বছরের প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয়ের পরে ফেদেরার নিজেই বলেছেন কতদিন পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যাবেন তা নিয়ে কোন চিন্তাই তার মধ্যে নেই। ফেদেরার ক্যারিয়ারে ৩০তম গ্র্যান্ডস্লাম ফাইনালে খেলে ২০তম শিরোপার পাশাপাশি ষষ্ঠবারের মত অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপা জিতেছেন। এর আগে ২০০৪, ২০০৬, ২০০৭, ২০১০ ও ২০১৭ সালে আসরের শিরোপা জেতেন ফেদেরার। এছাড়া ফ্রেঞ্চ ওপেনে একবার (২০০৯), উইম্বলডনে ৮বার (২০০৩-০৭, ২০০৯, ২০১২ ও ২০১৭) এবং ইউএস ওপেনে ৫ বার (২০০৪, ২০০৫, ২০০৬, ২০০৭ ও ২০০৮) চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ান মারিন সিলিচকে পাঁচ সেটের উত্তেজনাকর লড়াইয়ে ৬-২, ৬-৭ (৫/৭), ৬-৩, ৩-৬, ৬-১ গেমে পরাজিত করে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপা অক্ষুন্ন রেখেছেন। গত বছর চির প্রতিদ্বন্দ্বী রাফায়েল নাদালের বিপক্ষেও নাটকীয় পাঁচ সেটের লড়াইয়ের পরে শিরোপা জিতেছিলেন ফেদেরার। যদিও এবারের ফাইনালের পথটা বেশ কিছুটা সহজ ছিল।
ফাইনালসহ সাতটি ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতেই দুই ঘন্টারও কম সময় নিয়ে জিতেছেন। সব মিলিয়ে কোর্টে ছিলেন মাত্র ১৩ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট। নতুন মৌসুমে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী নাদাল, জোকোভিচ ও ভাভরিঙ্কা ইনজুরির কারণে নতি স্বীকার করলে ফেদেরারের জন্য ফাইনালের পথ অনেকটা সহজ হয়ে যায়। তারপরেও শক্তিশালী সিলিচের বিপক্ষে ফেদেরারের লড়াইটা অনুমেয় ছিল। এই জয়ের পরেও অবশ্য নাদালকে পিছনে ফেলে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠতে পারেননি সুইস তারকা, আছেন দুইয়েই। তবে ছয়ধাপ উপরে উঠে ক্যারিয়ার সেরা তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন সিলিচ। ১৯৭২ সালে কেন রোসওয়াল (৩৭) ও মাল এন্ডারসনের (৩৬) পরে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে ফেদেরার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে খেলেছেন।
এছাড়া মার্গারেট কোর্ট, সেরেনা উইলিয়ামস ও স্টেফি গ্রাফের পর চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে টেনিসের এককে ২০ বা ততোধিক বার গ্র্যান্ডস্লাম জিতলেন ফেদেরার। পুরুষ এককে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রাফায়েল নাদালের চেয়েও তার শিরোপা ৪টি বেশি। যে বয়সে সবাই র‌্যাকেট তুলে রাখার দিকে মন দেন সেই বয়সে এসেই যেন ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করছেন ফেদেরার। মাঝে দীর্ঘ ৫ বছরের বিরতির পর ২০১৭ সালে এই অস্ট্রেলিয়ান ওপেন দিয়েই আবার জেতেন কোন গ্র্যান্ডস্লাম শিরোপা। এরপর থেকে যেন রুপকথার ভেলার সাওয়ারী ফেদেরার। শেষ ৫ গ্র্যান্ডস্লামের তিনটিতেই হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন। ঠিক যেন নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করা। কোথায় গিয়ে থামবেন ফেদেরার সেটা হয়তো নিজেই জানেনা!
টেনিক আকড়ে বেঁচে আছেন ওজনিয়াকি
প্রথমবারের মতো কোন কোন গ্র্যান্ডস্লামের ফাইনাল জেতার পর আবেগে কেঁদে ফেলেন র‌্যাংকিংয়ের দুই নম্বরে থেকে টুর্নামেন্ট শুরু করা ডেনিস সুন্দরী। ক্যারিয়ারের ৪৩তম গ্র্যান্ডস্লামে এসে হাসলেন শেষ হাসি। এর আগে ২০০৯ ও ২০১৪ সালে ইউএস ওপেনের ফাইনালে উঠলেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল ২৭ বছর বয়সী ওজনিয়াকিকে। এবার প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে উঠেই করলেন বাজিমাত। ডেনমার্কের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে জিতলেন গ্র্যান্ডস্লাম শিরোপা। একইসঙ্গে পেলেন আরেকটি সুখবর। সর্বশেষ প্রকাশিত হতে যাওয়া নতুন র‌্যাংকিংয়ে হালেপকে হটিয়ে দীর্ঘদিন পর আবার শীর্ষে ফিরছেন ওজনিয়াকি। বিলি জিন কিংয়ের কাছ থেকে বহু আরাধ্য ট্রফিটি গ্রহণ করার সময়ও চোখ ভিজে যায় তার, ‘এভাবে কখনো পরিস্থিেিত পড়িনি আমি। আমি কখনও কাঁদি না, কিন্তু এটা ভীষণ আবেগময় একটি মুহূর্ত। আমার গলা ধরে আসছে। অনেক বছর ধরে এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে আমার স্বপ্ন পূরণ হল। সিমোনাকে অভিনন্দন জানাতে চাই। জানি, দিনটা তার জন্য কতটা কঠিন। দুঃখিত বন্ধু, কিন্তু আজ আমাকে জিততেই হতো।’ দুই দুই বার ইউএস ওপেনের ফাইনালে ওঠা। মাঝের  এবং পরের সময়টায় সবচেয়ে ভালো এবং বাজে অভিজ্ঞতার সাক্ষী হওয়া। ২০১৮ সালে এসে ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম জয়। উত্থান-পতন থাকবেই, তাই বলে পথ হারালে চলবে না। সিমোনা হালেপকে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপা উঁচিয়ে ধরে ক্যারোলিন ওজনিয়াকি আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন চিরন্তন কথাটা। মেলবোর্ন পার্কে হালেপকে ৭-৬ (৭-২), ৩-৬ ও ৬-৪ গেমে হারিয়েছেন ওজনিয়াকি।
গ্র্যান্ডস্লাম আসরের ফাইনালে তৃতীয়বারের চেষ্টায় বিজয়ীর হাসি হাসার পর আবেগ ধরে রাখতে পারছিলেন না ডেনিস তারকা। হালেপের সামনেও সুযোগ ছিল ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ডস্লামের স্বাদ নেবার। কিন্তু আবারও ব্যর্থতার ইতিহাস লিখলেন এর আগে দুইবার ফরাসি ওপেনের ফাইনালে ওঠা তারকা। কিছুটা দুঃখ থাকলেও ফাইনাল পর্যন্ত আসতে পেরেই গর্বিত ২৬ বছর বয়সী রোমানিয়ান। এর আগে নিজের জীবন দিয়ে বয়ে গেছে অনেক বড় ঝড়। ২০১৪ সালে নামি গলফার ররি ম্যাকলরয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যায়। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন ওজনিয়াকি। প্রেমে ভাঙনের প্রভাব পড়ে টেনিস কোর্টেও। একের পর এক ব্যর্থতায় ডেনমার্কের এ টেনিস তারকার অবসর নিয়েও কথা উঠেছিল। তার শেষ দেখে ফেলেছিলেন টেনিস বোদ্ধারা। কষ্টের জীবনটা কেটে যায় সাবেক এনবিএর তারকা ডেভিড লির সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার পর। পুরনো ছন্দেও ফেরেন ওজনিয়াকি। গত বছরের নভেম্বরে এনগেজমেন্ট হয়েছে তাদের। মেলবোর্ন দেখল নতুন এক ওজনিয়াকিকে। রোমানিয়ার সিমোনা হালেপকে হারিয়ে ৪৩ বারের চেষ্টায় এ ড্যানিশ সুন্দরী জিতলেন ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম। ছয় বছর পর ফিরে পেলেন বিশ্বের এক নম্বরের স্বীকৃতি। এতদিন পর বিশ্বের সেরা হয়ে ফেরার নজির আর নেই। এমন অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন ওজনিয়াকি। জীবনযুদ্ধে জিতে টেনিস ভুবনে নতুন রানী এখন তিনিই। টেনিসের সঙ্গে প্রেম ছিল বলেই এসেছে সাফল্য। এখন সেটা তিনি ধরে রাখতে চান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ