ঢাকা, শুক্রবার 2 February 2018, ২০ মাঘ ১৪২৪, ১৫ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

টিফিনের ফাঁকে একদিন

সিয়াম বিন আহমাদ : আমি ক্লাস থ্রীতে উঠেছি। অনেকগুলো বই। বইগুলো নিয়ে স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। আমার সঙ্গে বুবুও যায় সময় পেলে। কত শত কাজ করতে হয় বুবুর; এজন্য ইচ্ছে থাকলেও নিয়মিত আমার পথসঙ্গী হতে পারে না। বুবুকে আমি মাঝেমধ্যেই বলি তুমিও আমার সঙ্গে ভর্তি হয়ে যাওনা; দেখবে তোমার এতোসব কাজ করতে হবে না। তুমি দেখো না, আমাকে বাড়ির কোন কাজ করতে হয় না। আমরা স্কুলে গিয়ে দু’জনে পাশাপাশি বসবো, একসঙ্গে ে  খেলবো। খুব মজা হবে। বুবু আমার কথা শুনে শুভ্র আঁচলে মুখ লুকায়, হেসে কুটি কুটি হয়।

প্রতিদিন বাড়িতে ফিরে বুবুকে স্কুলের গল্প বলি। আমার রুটিন এটা। বুবুও মনোযোগ দিয়ে শুনেন সব। আবার খুঁটিয়ে নাটিয়ে প্রশ্নও করেন। ঝগড়াটে  মেয়ে তনুর কথাই বেশি বলি। সেদিনও তনু আমার নতুন কলমটা নিয়ে গিয়েছিলো। ভাগ্যিস আমি দেখে ফেলেছিলাম। তা নাহলে ওই কলমটা আজ ওরই হয়ে যেতো। এমনসব উদ্ভট কা- নিয়মিতই ঘটায়। তনু একটা বদের হাড্ডি।

সেদিন যখন স্কুল থেকে আসি বুবু তখন উঠোনে বসে ছিলেন। আমাকে ওই দূর থেকে দেখেই মিটিমিটি হাসলো। আমি এই হাসির অর্থটা বুঝলাম না। কোমরে হাত ঠেসে বুবুর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বুবু এবার মুচকি হেসে ‘আজ আবার তনু কী করেছে শুনি?’ বুবুর কথাটা শুনে খুব রাগ পেলো আমার। তনু আজও আমায় সুমি ম্যাডামের হাতে মার খাইয়েছে। পাক্কা দুইটা বেতের বাড়ি। খুব জোরে জোরে। এখনো হাতটা লাল হয়ে আছে। তবুও কিচ্ছু বলবো না বুবুকে। এটা আমার আড়ি! রাতে আমি পড়ছি; বুবু আমার রুমে এলো। আড়চোখে দেখেও না দেখার ভণিতা মাখলাম। বুবু এসে পাশে বসলেন। তারপর ‘খুব রাগ করে আছিস আমার সঙ্গে, তাই না? আরে তখন তো ওসব আমি মজা করে বলেছি। এই কান ধরছি; আর কখনো এমনটা হবে না।’ 

আমি আরো শক্ত হলাম। বুবু তখন আমার হাতটা ধরলেন। অব্যবহিত চমকে গেলেন;

‘তোর হাতে এ কী হয়েছে?'

আমি লুকোতে চাইলাম। পারলাম না, বুবু বুঝতে পারলো বেতের বাড়ির আঘাত। ‘এতটুকুন বাচ্চা, এত জোরে বাড়ি দিতে হয়? কী করেছিলিরে তুই?’ একটু কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন বুবু। আমি চুপ; ভাবছি তনুর কোন কথাই আর বুবুকে বলবো না। বুবুও ফের নীরবতা টানলো। কিছুক্ষণ পর  ‘অনেক পড়েছিস চল এখন খাবি।’

খাবার শেষ করে আমি বুবুর ঘরে শুয়ে পড়লাম। খানিক পরে বুবুও আসলো।

এসেই সুমিষ্ট কণ্ঠে; ‘তুই ঘুমিয়ে পড়েছিস?’

আমার রাগ তখনো অল্পসল্প আছে। এটা বুঝানোর জন্য কথা বলছি না।

‘অনেক হয়েছে; এখন গল্প আরম্ভ করবি নাকি আমি ঘুমিয়ে পড়বো?’ বুবু এভাবেই বললো কথাটা। আমার বড্ড মায়া হলো। কিন্তু কী গল্প বলবো আমি! ভাবছি ওই তনুটার কথা আর একদম মুখে আনবো না। ওকে শিখা চিমটি কাটুক, ইভা খাতা ছিঁড়ে ফেলুক। আমি কিছুই বলবো না। হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমাদের ক্লাসের ইমির কথা। ইমির তো ইংরেজি খাতাই নেই। আচ্ছা, আজ বুবুকে ওর গল্পই শুনাই। আরম্ভ করে দিলাম ইমির গল্পÍ 

ইমি। আমাদের ক্লাসেই পড়ে। নিয়মিত আমার পাশে বসবে। আমার পৌঁছাতে  দেরী হলে জায়গাও রাখে। স্কুলসার্টে খুব ময়লা থাকে। কোনদিন ধোঁয়া হয় না এমন মনে হয়। আর টিফিন আনে না ইমি। লেখা পড়ায় কিন্তু খুবই ভালো। আমি মাঝেমধ্যে কোনটা না বুঝলে ইমির থেকে বুঝে নিই। ও খুব সুন্দর করে আমাকে বুঝিয়ে বলে। কিছু বুঝতে চাইলে ইমি খুব খুশি হয়। কেউ তো আর ওর সাথে তেমন কথা বলে না; এজন্যই হয়তো। ক্লাসে ওর কোন বন্ধু নেই। ইমি খুব একা। বারোটায় আমাদের টিফিন দেন। বিশ মিনিট সময়। আমরা সবাই দৌঁড়ে পুকুর ঘাটে যাই। সিঁড়িতে বসে সবাই একসঙ্গে টিফিন করি। ইমিকে ওখানে কোনদিনও যেতে দেখিনি।

‘ইমি এই সময়টা কী করে আর ও টিফিন খায় না কেন?’ বুবু এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিলেন। 

‘আমি তো সেটা জানিনা। তবে

ওকে তো কোনদিন টিফিন আনতেই দেখিনি আমি। টিফিন শেষে যায় দিনই ক্লাসে গিয়ে দেখেছি বেঞ্চে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকতে।’

‘কোনদিন কিছু জানতে চাওনি তুমি, কেন মন খারাপ রাখো, টিফিন আনো না কেন এইসব?’ 

‘নাতো আমি কেন এইসব জানতে চাইবো?’ বুবু আমার জাওয়াব শুনে একদম চুপ। মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম; খুব রেগে গেছেন। কিছুক্ষণ পর একটু মুখ খুললেনÍ প্রতিদিনই তো গল্প তো করিস। এমন গল্প তো আগে কোনদিন শুনিনি।  হঠাৎ বুবুর মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। জানতে চাইলাম

‘বুবু তোমার কী হয়েছে বলোতো?’ 

‘কিচ্ছু হয়নি আমার। অনেক রাত হয়েছে।  এখন ঘুমিয়ে পড় তুই। আবার ভোরে উঠে স্কুলে যেতে হবে।’ আমি তখনই ঘুমিয়ে পড়লাম।  ব্যাগভর্তি বই। আম্মু আমার কাঁধে ঝুলিয়ে দিলেন। স্কুলপথে রওনা হলাম। আমার সঙ্গে বুবুও চললো আজ। আমি তো আনন্দে আত্মহারা! টিফিন বক্সটা আমার হাত থেকে বুবু নিয়ে নিলেন। হাঁটতে হাঁটতে আমরা স্কুলে পৌঁছালাম। ক্লাসের ঘণ্টাও পড়ে গেলো। আমি ক্লাসে ঢুকলাম। দুটো ঘণ্টা আজ শেষ হচ্ছে না। বাইরে বুবু দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ একসময় টিফিন ঘণ্টা বাজলো। সবাই চড়ুই পাখির মত ফুরুৎ ফুরুৎ বেরুচ্ছে। 

আমিও দৌঁড়ে গিয়ে বুবুর হাত ধরলাম। বুবু আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। মুখটা আমার কানের কাছে এনে বললো  ‘এই ইমি’টাকে দেখাবি আমায়? ’ আমি হাতটা টেনে বুবুকে ভেতরে নিয়ে গেলাম। দেখি ইমি চুপটি করে সেখানেই বসে আছে। বুবু তো আদরমাখিয়ে ওর সাথে গল্প শুরু করে দিল। আমি শুধু নিশ্চুপ শুনে যাচ্ছি। আমার বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে এতক্ষণে। আমরা আর পুকুরঘাটে গেলাম না। ইমি আর আমাকে পাশে বসিয়ে বুবু পেটপুরে খাওয়ালেন। ইমির কচি ঠোঁটের হাসিতে কমলা রঙে যেন জ্যোৎস্না নামলো। বুবু নির্মিশেষ তাকিয়ে আছে ইমির নিষ্পাপ মুখখানিতে। অনেকক্ষণ। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা আর অপেক্ষা করলো না। ওদিকে টিফিন শেষের ঘণ্টাটা বেজে উঠলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ