ঢাকা, শনিবার 3 February 2018, ২১ মাঘ ১৪২৪, ১৬ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নারীর সুরক্ষায় হিজাব

মোঃ আবু তাহের : স্রষ্টার সৃষ্টিকুলের মধ্যে বোধসম্পন্ন দৃশ্যমান কেবলমাত্র মানবজাতি। মানবসৃষ্টির আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)  এবং দ্বিতীয় মানবী হযরত হাওয়া (আঃ)। সেখান থেকেই পুরুষ ও নারী একে অপরের পরিপুরক। পুরুষ-নারী সমন্বয়ে মানবজাতি হলেও স্রষ্টার সৃষ্টিগত ভিন্নতার কারণে পুরুষ ও নারীর মধ্যে দূরত্ব, মতপার্থক্য, বিতর্ক বিদ্যমান। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বহুমত, পথ, মতাদর্শ এবং অনুসারী হয়েছে অসংখ্য ধর্মের।
আমাদের সমাজের কতিপয় লোকের ইসলাম সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে ইসলামের নামে অনেক অপবাদ আরোপ করে থাকেন। নারীর হিজাব হলো তার মধ্যে অন্যতম। কেউ কেউ বলে থাকেন, ইসলাম নারীকে চার দেয়ালের ভিতরে বন্দি করে রাখায় বিশ^াসী, ইসলাম নারীকে ঠকিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ প্রতিটি ধর্মেই নারীকে হিজাব মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। এমনকি অন্য ধর্মগুলো ইসলামের চেয়ে অনেক বেশি কঠোরতা আরোপ করেছে। এখন আমরা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধর্মগ্রন্থের সাহায্যে হিজাবের বিধানগুলো জানার চেষ্টা করবো।
ইহুদী ধর্ম : প্রথমে ইহুদীদের বিষয়ে আলোচনা করা যাক। ইয়েশিভা বিশ^বিদ্যালয়ের বাইবেল শিক্ষা বিভাগের প্রফেসর ড. মিনাখিম এম. ব্রায়ার তার গ্রন্থ “ইহুদীদের আইনে ইহুদী মহিলা”তে লিখেছেনঃ “ইহুদী মহিলারা মাথা ঢেকে বাহিরে যেতেন। মাঝে মাঝে তা একটি চক্ষু ছাড়া তাদের পূর্ণাঙ্গ চেহারা ঢেকে ফেলতো।”
তিনি তার কথার প্রমাণ দিতে গিয়ে পূর্ববর্তী বিখ্যাত ইহুদী পন্ডিতদের কথা নিয়ে এসেছেন। তন্মধ্যে- “ইয়াকুব (আঃ) এর কন্যাগণ মাথা খোলা রেখে রাস্তায় বের হতেন না। ঐ পুরুষের উপর লা’নত (অভিশাপ) যে তার স্ত্রীকে খোলা মাথায় রাস্তায় ছেড়ে দেয়। কোন মহিলা সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্য মাথার চুল ছেড়ে দিলে তা দারিদ্র্যতার কারণ হয়।”
ইহুদী পন্ডিতদের আইন অনুযায়ী বিবাহিত মহিলার উপস্থিতিতে যে তার চুল অনাবৃত রেখে দিয়েছে নামাজের ভিতরে বা বাইরে ধর্মগ্রন্থ আবৃত্তি করা নিষিদ্ধ। মাথা অনাবৃত্ত রাখাকে উলংগ হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রফেসর ড. মিনাখিম এম. ব্রায়ার আরো বলেন- “টান্নাইটিক যুগে যে সমস্ত ইহুদী মহিলা মাথা অনাবৃত রাখতো তাদেরকে বেহায়া হিসেবে গণ্য করে ৪০০ দিরহাম করে জরিমানা করা হতো।”
হিজাব ভদ্রতার পরিচায়ক হওয়ার কারণে পুরাতন ইহুদী সমাজে ব্যাভিচারী মহিলাদের হিজাব পরিধানের অনুমতি ছিল না। তাই নিজেদেরকে সতী প্রমাণ করতে তারা বিশেষ ধরনের স্কার্ফ ব্যবহার করতো।
ইহাতে প্রমাণিত যে, ইহুদী ধর্মেও পর্দার বিধান রয়েছে।
খ্রীষ্ট ধর্ম : এবার আমরা খ্রীষ্টান ধর্মের হিজাব নিয়ে আলোচনা করবো। এটা প্রসিদ্ধ যে, ক্যাথলিক খ্রীষ্টান যাজক মহিলাগণ শত শত বছর ধরে পর্দা বিধান মেনে চলছেন।
খ্রীষ্ট ধর্মের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র বাইবেলের নতুন নিয়মে (ঘবি ঞবংঃধসবহঃ) বলা হয়েছে- “আমি তোমাদের প্রশংসা করিতেছি যে, তোমরা সকল বিষয়ে আমাকে স্মরণ করিয়া থাক এবং তোমাদের কাছে শিক্ষামালা যেরূপ সমর্পণ করিয়াছি, সেইরূপই তাহা ধরিয়া আছ। কিন্তু আমার ইচ্ছা এই, যেন তোমরা জান যে, প্রত্যেক পুরুষের মস্তকস্বরূপ খ্রীষ্ট এবং স্ত্রীর মস্তকস্বরূপ পুরুষ, আর খ্রীষ্টের মস্তকস্বরূপ ইশ^র। যে কোন পুরুষ মস্তক আবৃত রাখিয়া প্রার্থনা করে, কিংবা ভাববাণী বলে, সে আপন মস্তকের অপমান করে। কিন্তু যে কোন স্ত্রী অনাবৃত মস্তকে প্রার্থনা করে, কিংবা ভাববাণী বলে, সে আপন মস্তকের অপমান করে; কারণ সে নির্বিশেষে মু-িতের সমান হইয়া পড়ে। ভাল, স্ত্রী যদি মস্তক আবৃত না রাখে, সে চুলও কাটিয়া ফেলুক; কিন্তু চুল কাটিয়া ফেলা কি মস্তক মু-ন করা যদি স্ত্রীর লজ্জার বিষয় হয়, তবে মস্তক আবৃত রাখুক। বাস্তবিক মস্তক আবরণ করা পুরুষের উচিত নয়, কেন না সে ইশ^রের প্রতিমূর্তি ও গৌরব; কিন্তু স্ত্রী পুরুষের গৌরব। কারণ পুরুষ স্ত্রীলোক হইতে নয়, বরং স্ত্রীলোক পুরুষ হইতে। আর স্ত্রীর নিমিত্ত পুরুষের সৃষ্ট হয় নাই, কিন্তু পুরুষের নিমিত্ত স্ত্রীর। এই কারণে স্ত্রীর মস্তকে কর্তৃত্বের চিহ্ন রাখা কর্তব্য- দূতগণের জন্য। তথাপি প্রভুতে স্ত্রীও পুরুষ ছাড়া নয়, আবার পুরুষও স্ত্রী ছাড়া নয়। কারণ যেমন পুরুষ হইতে স্ত্রী, তেমনি আবার স্ত্রী দিয়া পুরুষ হইয়াছে, কিন্তু সকলই ইশ^র হইতে। তোমরা আপনাদের মধ্যে বিচার কর, অনাবৃত মস্তকে ইশ^রের কাছে প্রার্থনা করা কি স্ত্রীর উপযুক্ত?” (১, করিন্থিয়ঃ ১১/২-১৪)
 দেখুন, খ্রীষ্টান ধর্মে হিজাবের বিষয়ে কত কঠিন কথা বলা হয়েছে! হিজাব না করা নারীর মাথার চুল কামিয়ে দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে!
হিন্দু ধর্ম : অনেকেই হয়তো শুনে অবাক হবেন যে, হিন্দু ধর্মেও নারীদের পর্দার কথা বলা হয়েছে।
যেমন- “যেহেতু ব্রহ্মা তোমাদের নারী করেছেন তাই দৃষ্টিকে অবনত রাখবে, উপরে নয়। নিজের পা সামলে রাখো। এমন পোশাক পড়ো যাতে কেউ তোমার দেহ দেখতে না পায়।” (ঋকবেদ- ৮/৩৩/১৯)
আরো বলা হয়েছে, “মহিলা পুরুষের মতো পোশাক পড়বে না এবং পুরুষরাও স্ত্রী লোকদের মতো পোশাক পরবে না।” (ঋকবেদঃ অনুচ্ছেদ-৮৫, পরিচ্ছেদ-৩০)
 বেদে আরও বলা হয়েছে- “মহান ঈশ্বর তোমাদের নারী বানিয়েছেন। তোমাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে। পর্দার আড়ালে থাকবে।” (ঋকবেদঃ অনুচ্ছেদ-৩৩, পরিচ্ছেদ-১৯)
আরও কঠিন কথা বলা হয়েছে মহাভারতে- “ন চন্দ্রসূর্যৌ ন তরুং পুন্নো যা নিরীক্ষতে/ ভর্তৃবর্জং বরারোহা সা ভবেদ্ধর্মচারিণী।” (মহাভারতঃ ১২/১৪৬/৮৮)
অর্থাৎ যে নারী স্বামী ব্যতীত কোন পুংলিঙ্গান্ত (নামের বস্তু), চন্দ্র, সূর্য, বৃক্ষও দর্শন করে না সেই ধর্মচারিণী।
উপরে উল্লেখিত বিষয়ে স্পষ্ট যে, হিন্দু ধর্মেও হিজাব তথা পর্দার গুরুত্ব অনেক!
ইসলাম ধর্ম : উপরে উল্লেখিত প্রমাণাদি দ্বারা স্পষ্টত বুঝা যায় যে, পর্দা ইসলাম কর্তৃক নির্দেশিত নতুন কোন বিধান নয়। বরং ইসলাম শুধু পর্দার বিধান পালনের জন্যে তাগিদ দিয়েছে।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ বলেন : “হে নবী! মু’মিন পুরুষদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনমিত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটা তাদের জন্য পবিত্রতা স্বরূপ। নিশ্চয় তাদের কর্মকান্ড সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা সম্যক অবগত। আর মু’মিনা মহিলাদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনমিত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে আর তাদের সাজসজ্জা না দেখায়, যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল দিয়ে তাদের বুক ঢেকে রাখে। তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তবে নিম্নোক্তদের সামনে ছাড়া- স্বামী, পিতা, স্বামীর পিতা, নিজের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজের মেলামেশার মেয়েদের, নিজের মালিকানাধীনদের, অধীনস্থ পুরুষদের যাদের অন্য কোন রকম উদ্দেশ্য নাই এবং এমন শিশুদের সামনে ছাড়া যারা মেয়েদের গোপন বিষয় সম্পর্কে এখনো অজ্ঞ। তারা যেন নিজেদের যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দেবার উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মু’মিনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।” (সূরা আন নূর- ৩০-৩১)
অন্য সূরায় আল্লাহ বলেছেন- “হে নবী! আপনার স্ত্রী, কন্যা এবং ঈমানদার নারীগণকে বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদরের অংশ বিশেষ তাদের নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আহযাব- ৫৯)
বয়স্ক মহিলাদের ব্যাপারে কিছুটা ছাড় দেয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন- “আর যেসব যৌবন অতিক্রান্ত মহিলা বিয়ের আশা রাখে না, তারা যদি নিজেদের চাদর নামিয়ে রেখে দেয় তাহলে তাদের কোন গোনাহ নাই, তবে শর্ত হচ্ছে তারা সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী হবে না। তবু তারাও যদি লজ্জাশীলতা অবলম্বন করে তাহলে তা তাদের জন্য ভালো এবং আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন।” (সূরা আন নূর-৬০)
উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ইসলাম শুধু নারীদের উপরেই পর্দার বিধান করেনি বরং পুরুষদেরকেও পর্দা করার কথা বলেছে। বরং পুরুষের উপরেই প্রথম পর্দা ফরজ করা হয়েছে। তবে দৈহিক বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতিগত কারণেই পর্দার ক্ষেত্রটা পুরুষের তুলনায় নারীদের কিছুটা বেশি।
আমরা যদি আমাদের সমাজকে নিষ্কলুষ করতে বা রাখতে চাই তাহলে আমাদেরকে আমাদের অধীনস্ত মা-বোন-স্ত্রীদেরকে তাদের নিরাপত্তা, সুরক্ষার জন্য হিজাব বাধ্যতামূলোক মনে করতে হবে। সামাজিক শৃঙ্খলা, পারিবারিক শ্রদ্ধাবোধ সংসারের সমৃদ্ধি, স্বামী-স্ত্রীর প্রতি প্রেম-ভালোবাসা দৃঢ় করতে হিজাবের বিকল্প নাই। যার যার ধর্মগ্রন্থ মতে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী হিসেবে মুসলমানদেরকে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। (সংক্ষেপিত)
তথ্য সূত্রঃ
১.    আল কুরআন
২.    পবিত্র বাইবেল (নতুন নিয়ম)
৩.    ইসলামে নারী বনাম পুস্তক ও বাস্তবতায় ইহুদী ও খৃষ্টান ধর্মে নারী- ড. শরীফ আব্দুল আজীম
৪.    সনাতন ধর্মের দৃষ্টিতে নারী- অনন্ত বিজয় দাশ (মুক্তমনা ব্লগ)
৫.    ডা. জাকির নায়েকের আলোচনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ