ঢাকা, শনিবার 3 February 2018, ২১ মাঘ ১৪২৪, ১৬ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ : ॥ ষষ্ঠ পর্ব ॥
আরাকানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের প্রসার -৪
আরাকানের রাজা মিং ফালং ওরফে সিকান্দার শাহ কর্তৃক ত্রিপুরার রাজার সাথে উপরোক্ত যুদ্ধের বিবরণের মধ্য দিয়ে বুঝা গেল যে, সিকান্দার শাহ সিংহাসনে আরোহনের পূর্ব থেকেই চট্টগ্রাম অঞ্চল আরাকানের অধীনে ছিল। কেননা ত্রিপুরা বাহিনী যখন দিয়াঙ্গ ও উড়িয়া আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল ঠিক তখনই তার প্রতিরোধে আরাকানী বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালায়। এতে বুঝা যায় যে, দিয়াঙ্গ ও উড়িয়া অঞ্চল আরাকানের অধীনেই ছিল। সেইসাথে রামুর শাসক আদম শাহ এবং চট্টগ্রামের শাসক জালাল শাহও ছিল আরাকানের সামন্ত শাসক। সুতরাং এ অঞ্চলও আরাকানের অধীনে ছিল। তাদের অমর মানিক্যের পক্ষ নেয়ার বিষয়টি সিকান্দার শাহ সম্পর্কে খানিকটা খারাপ ধারণার জন্ম দেয়। হয়তো তিনি ব্যাপকভাবে মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন। কিন্তু তার আমলের নোয়াখালীর আলমদিয়ায় দুটি সংরক্ষিত দূর্গ নির্মাণ করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিলেন এবং অসংখ্য রণতরী নিয়োজিত করে চট্টগ্রামকে রক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করেছিলেন তাতে অনেক মুসলমান সৈনিক ছিল। তবে বেশী সুযোগ সুবিধা পাবার আশায় কিংবা আরাকানী রাজাকে দূর্বল ভেবেও পরাক্রমশালী ত্রিপুরা রাজাকে তারা সহযোগিতা করেছিলেন এটাও হতে পারে। যা হোক, ত্রিপুরা রাজার সাথে আরাকানের বিজয় মূলত পর্তুগিজদেরই বেশী কল্যাণ বয়ে এনেছে।
সিকান্দার শাহ ১৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে মারা গেলে স্বীয় পুত্র মিন রাজাগ্যী সেলিম শাহ নাম ধারণ করে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। চট্টগ্রাম টাকশাল থেকে ১৬০১ খ্রিস্টাব্দে তার যে মুদ্রা অংকিত হয়েছিল তাতে আরবি, দেব নাগরি ও বর্মি অক্ষরে উৎকীর্ণ নামের শেষে তাঁকে আরাকান ও বাংলার রাজা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রামসহ ঢাকা পর্যন্ত আরাকানীদের প্রভাব বলয় বিস্তারের ফলেই সম্ভবত তাকে আরাকান ও বাংলার সুলতান বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। তৎকালীন সময়ে বার্মার অন্তর্গত পেগুর তেলেইং বংশীয় রাজা ন্যানডা বায়েনিং চারটি শ্বেত হস্তীর মালিক ছিলেন। আরাকান রাজা মিনরাজিগ্যি শ্বেত হস্তীর লোভে পেগুরাজ্য আক্রমণ করেন। অভিযানে সফল হয়ে ৪টি শ্বেতহস্তী, রাজকন্যা সিনডোনং, রাজপুত্র মেং শোয়েপ্রু ও তার ছোট ভাই এবং কয়েক হাজার তেলেইং সৈন্য বন্দী করে ম্রোহংয়ে নিয়ে আসেন। পেগু থেকে বিজয়ী বেশে ম্রোহংয়ে আসার পর তিনি আরাকানী নাম ও মুসলিম নামের সাথে শ্বেত গজেশ্বর উপাধি গ্রহণ করেন।
পর্তুগিজরা যেমন জলদস্যুতায় কুখ্যাত ছিল তেমনই ছিল শ্রেষ্ট নাবিক ও নৌযোদ্ধা। মিনবিন বা জেবুকশাহ (১৫৩১-১৫৫৩ খৃ.) আরাকানী নৌবাহিনীর প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি আদায় করে পর্তুগিজদেরকে চট্টগ্রামে বাণিজ্য ও বসতি গড়ার অনুমতি দেন। এমনকি মিনবিন তাদেরকে সাদরে গ্রহণপূর্বক বসবাসের উপযোগি জমি দান করে সীমান্ত রক্ষার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। সেইসাথে আরাকানের রাজধানী ম্রাউক-উ’তে পর্তুগিজদের দ্বারা রাজার দেহরক্ষী একটি সৈন্যদলও গঠিত হয়েছিল। অতঃপর রাজা মিন রাজাগ্যি বা সেলিম শাহ (১৫৯৩-১৬১২ খৃ.) তাদেরকে চট্টগ্রামের দেয়াঙ্গ, সন্দীপ ও আরাকানের সিরিয়ামে উপনিবেশ স্থাপনের অনুমতি প্রদান করেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই তারা স্বরূপ উন্মোচন করে দক্ষিণ ও পূর্ব-বাংলার সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় ডাকাতি ও মানুষ চুরির মাধ্যমে দাস ব্যবসা শুরু করে। মেঘনা নদীর মোহনা থেকে শুরু করে পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত এলাকায় নিষ্ঠুর জলদস্যুতার তা-ব চালায়। তাদের অত্যাচারে এসব অঞ্চল জনবসতিহীন হয়ে গভীর জংগলে পরিণত হয়।
পর্তুগিজ জলদস্যুদের সফলতায় মগেরাও জল দস্যুতায় নেমে পড়ে। মগ ও ফিরিঙ্গিদের সমন্বয়ে গঠিত জলদস্যু বাহিনী জলপথে এসে বারবার বাংলায় লুন্ঠনকার্য পরিচালনা করত। তারা হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে ধরে নিয়ে যেত। বন্দিদের হাতের তালু ছেঁদন করে পাতলা বেত চালিয়ে জাহাজের ডেকের নিচে পশুর মত বেঁধে রাখত এবং খাঁচাবদ্ধ মুরগির মত যৎকিঞ্চিৎ কাঁচা চাউল উপর হতে বন্দীদের উদ্দেশ্য ছুড়ে দিত তা খুটে খুটে খেয়ে জীবন বাঁচাতে হতো। এত কষ্ট ও অত্যাচারে যে ক’টা শক্ত প্রাণ বেঁচে থাকতো তাদের মধ্যে কাউকে ভূমি কর্ষণ ও অন্যান্য হীন কার্যে নিযুক্ত করত আর কাউকে দাক্ষিণাত্যের বন্দরসমূহে ওলন্দাজ, ইংরেজ ও ফরাসী বণিকদের নিকট বিক্রি করত। কখনো কখনো তাদেরকে উড়িষ্যায় নিয়ে যাওয়া হতো। অনেক সময় সমুদ্রোপকূল হতে কিছু দুরে নোংগর ফেলে তারা লোক মারফৎ সরকারি কর্মচারীদের নিকট সংবাদ প্রেরণ করে মুক্তিপণের মাধ্যমে বন্দীদের ছেড়ে দিত। সম্ভ্রান্ত সৈয়দ বংশের অসংখ্য লোক থেকে শুরু করে সতী-সাধ্বী সৈয়দজাদীও তাদের দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ হয়ে যৌন উম্মাদনার বস্তু হিসেবে পরিগণিত হতো। দেশে যেখানে সেখানে তারা অগ্নিসংযোগ, গৃহদাহ, জাতি বিধ্বংসী কাজ করে বাংলার শান্তিপ্রিয় মানুষের জীবনে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে ছিল। মগদের অবাধ অত্যাচারে যেমন ‘মগের মুলুক’ তেমনি ফিরিঙ্গীদের কৃতকৃর্মের সাক্ষী হিসেবে ‘ফিরিঙ্গী খালি’ ‘ফিরিঙ্গীর দেয়ানীয়া’ ‘ফিরিঙ্গী ফাড়ি’ ‘ফিরিঙ্গী বাজার’ প্রভৃতি জায়গায় তাদের অত্যাচারের করুণ কাহিনী জড়িয়ে আছে।
মানুষ চুরি ও দাস ব্যবসার সাথে আরাকানী রাজাদের যোগসাজস থাকলেও পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ তাদের যুদ্ধ হয়েছে। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আরাকানরাজ চট্টগ্রাম থেকে পর্তুগিজদের উৎখাত করার উদ্দেশ্যে বাকলা রাজের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ দেয়াঙ্গের পর্তুগিজ উপনিবেশ আক্রমণ করে তাদের নৌ সেনাপতিকে আহত, অসংখ্য লোককে হত্যা ও বন্দী করে পর্তুগিজ বাণিজ্য কুঠি, দূর্গ এবং গির্জা ধ্বংস করেছিলেন। এ সংবাদ পেয়ে সন্দ্বীপের পর্তুগিজ উপনিবেশের অধিনায়ক কার্ডালো চট্টগ্রামের আরাকানী শাসনকর্তা সেনাবাদীকে হত্যা ও বন্দরের ১৪৯ আরাকানী রনতরী ধ্বংস করে চট্টগ্রামকে দখলে এনে নগরবাসীর উপর চরম অত্যাচার, নরহত্যা এবং জ্বালাও পোড়াও অভিযানে মেতে উঠে। আরাকানরাজ সিরিয়ামের পর্তুগিজ উপনিবেশের উপরও হামলা করেছিলেন। এ সময় মোগল নৌসেনাপতি ফতে খাঁ পর্তুগিজদের বিতাড়িত  করে সন্দীপ দখল করেন। পর্তুগিজ জলদস্যুদের সাথে আরাকানরাজের বহুবার যুদ্ধ হয়েছে এবং পর্তুগিজ বোম্বেট সিবাসটিয়ান গঞ্জালিশ ও গাভিনহারের নৌসেনাসহ অনেক রণতরীও ধ্বংস করেছিলেন।
আরাকানের রাজা মিনরাজাগ্যীর দুই পুত্র যথাক্রমে মিংখা মৌং ও অনাপুরামের মধ্যে সদ্ভাব ছিলনা। নিজের মৃত্যুর পর দুই পুত্রের মধ্যে গৃহ বিবাদ অনিবার্য ভেবে তিনি কনিষ্ঠ পুত্র অনাপুরামকে আরাকান থেকে সরিয়ে চট্টগ্রামের গভর্ণর নিযুক্ত করে পাঠান। অনাপুরাম বুঝতে পারেন যে, পিতার মৃত্যুর পর বড় ভাই মিংখা মৌং রাজা হয়ে তার উপর প্রতিশোধ নিবেন। তাই অনাপুরাম চট্টগ্রাম এসেই বড় ভাইয়ের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এ শর্তে তিনি সন্দীপের পর্তুগিজ শাসনকর্তা গঞ্জালিশের সাথে মিত্রতা স্থাপন করেন। কিন্তু পর্তুগিজরা এ সুযোগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের পথ অনুসন্ধান শুরু করে।
মিন রাজাগ্যি ওরফে সেলিম শাহের মৃত্যুর পর ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে তার বড় ছেলে মিংখা মৌং হুসাইন শাহ নাম ধারণ করে আরাকানের সিংহাসনে বসেন। প্রকৃত পক্ষে তিনি অনাপুরামের মত স্বার্থান্ধ ছিলেন না। তিনি যুবরাজ অবস্থায় ডি ব্রিটো নামক এক জলদস্যুর হাতে কিছুদিন বন্দী ছিলেন। বন্দি অবস্থায়ও নিরীহ মানুষকে অন্যায়ভাবে লুণ্ঠন ও হত্যা করার বিভিন্ন প্রক্রিয়াগুলো তিনি স্বচক্ষে অবলোকন করেন। সেইসাথে সম্ভ্রান্ত, নিরপরাধী, নিরীহ বণিক ও সাধারণ মানুষকে বন্দি করে যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হতে। তার তিনি জীবন্ত সাক্ষী ছিলেন। ফলে তিনি পর্তুগিজদের খুব ঘৃনা করতেন। আরাকানের সিংহাসনে আরোহন করে তিনি পর্তুগিজদেরকে সুনজরে দেখেননি। তাছাড়া পর্তুগিজরাও যুবরাজকে বন্দি রাখার অপরাধে নিজেরাও মিংখা মৌং এর কাছে প্রিয় পাত্র হবার কোন সুযোগ গ্রহণের পথ পায়নি। ফলে তারা কায়মনে আরাকানরাজ মিংখা মৌং এর পতন কামনা করতে থাকে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা অনাপুরাম পর্তুগিজদের সহযোগিতা কামনা করায় পর্তুগিজরা তার সহযোগিতার মধ্য দিয়ে মিংখা মৌং এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের সুযোগ পায়। মূলত অনাপুরামও এ ধরণেরই সুযোগ অনুসন্ধান করছিলেন।
মিং খা মৌং ওরফে হুসাইন শাহ (১৬১২-১৬২২ খ্রি.) আরাকানের সিংহাসনে আরোহন করেই দেখলেন যে, তাঁর ছোট ভাই চট্টগ্রামের শাসনকর্তা অনাপুরাম পর্তুগিজদের সাথে ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব গড়ে  তুলেছে। তার সৈন্য বাহিনীতে পর্তুগিজদের অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়। সেইসাথে তার দেহরক্ষী হিসেবে চারশো পর্তুগিজ সৈন্য মোতায়েন থাকে। অনাপুরাম শক্তি সঞ্চয় করে আরাকান আক্রমণ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন এ বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে হুসাইন শাহ অনাপুরামকে শায়েস্তা করার জন্য চট্টগ্রাম আক্রমণ করেন। পর্তুগিজদের সাহায্য নিয়ে অনাপুরাম আরাকানী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পরাজিত ও আহত হয়ে স্বপরিবারে সন্দ্বীপের পর্তুগিজ শাসক গঞ্জালিশের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন। গঞ্জালিশ দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনাপুরামকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তার বোনকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করে বিয়ে করেন এবং ধনরতেœর লোভে কিছুদিন পর বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে অনাপুরামকে হত্যা করেন। অতঃপর গঞ্জালিশ অনাপুরামের বিধবা স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করেন এবং স্বীয় ভাই এন্টনির সঙ্গে অনাপুরামের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে দেবার চেষ্টা করলে তিনি (অনাপুরামের স্ত্রী) তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। অনাপুরামের হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে সমগ্র চট্টগ্রাম আরাকানের শাসনাধীনে অক্ষুন্ন থাকে।
মূলত গঞ্জালিশ ছিল পর্তুগিজ জলদস্যুদের নেতা। হুসাইন শাহ পর্তুগিজদের ঘৃণা করলেও গঞ্জালিশ হুসাইন শাহের প্রধানতম শত্রু মোগলদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে এবং অপর গৃহশত্রু আপন ভাই অনাপুরামকে হত্যা করার কারণে সাময়িকভাবে গঞ্জালিশ আরাকান রাজ হুসাইন শাহের শত্রুর শত্রু হওয়ায় খানিকটা মিত্র হিসেবে দেখা দেয়। সে মিত্রতার সুবাদে ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ হুসাইন শাহ সন্দ্বীপের পর্তুগিজ শাসক গঞ্জালিশের সঙ্গে আঁতাত করে মোগল অধিকৃত ভুলুয়া আক্রমণ করেন। এ অভিযানে গঞ্জালিশের পক্ষ থেকে ক্যাপ্টেন কার্ডালোর নেতৃত্বে দেড়শত রণপোত, পঞ্চাশটি বড় রণতরী ও চার হাজার পর্তুগিজ সৈন্য যোগদান করে। এ অভিযানে আরাকানরাজ হুসাইন শাহ মোগলদের পরাজিত করেন এবং ভুলুয়ায় ব্যাপক লুণ্ঠন চালান। কিন্তু সেবাষ্টিয়ান গঞ্জালিশের মহাবিশ্বাস ঘাতকতার  কারণে বিজয়ী আরাকানের রাজা অকস্মাৎ মোগলদের নিকট পরাজিত হন।
আরাকানের রাজা হুসাইন শাহ ও পর্তুগিজ নেতা গঞ্জালিশ পরস্পর বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে গঞ্জালিশ ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে আরাকান আক্রমণ করেন। কিন্তু এ অভিযানে গঞ্জালিশ আরাকান রাজার কাছে পরাজিত হন এবং তাঁর সেনাপতি নিহত হন। এভাবে গঞ্জালিশের ক্ষমতা খর্ব করে সন্দ্বীপ স্বীয় দখলে এলেও আরাকান ও মোগলদের দ্বন্দ্ব থেমে থাকেনি।
মোগলদের সাথে পরাজয়ের প্রতিশোধকল্পে হুসাইন শাহ তার চিরশত্রু বার্মার রাজা অনংগ পেতলূম (১৬০৫-১৬২৮ খ্রি.) এর সাথে বিরোধ মিটিয়ে ফেলেন। সেইসাথে বাংলার সরহদ খান (শয়খ আব্দুল ওয়াহিদ) যুদ্ধের জন্য অপ্রস্তুত রয়েছেন বলে সংবাদ পেয়ে পুনরায় ১৬১৫ অথবা ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে ভুলুয়া আক্রমণ করেন। যুদ্ধে বাংলার সুবেদার কাসেম খানের সহযোগিতায় আরাকানরাজ আবারও পরাজিত হন। পরের বছর ১৬১৬ কিংবা ১৬১৭ খ্রিস্টাব্দের শীত মৌসুমে বাংলার সুবেদার কাশিম খান আরাকান আক্রমণ করলে আরাকানের রাজা বিজয়ী হয়। অদক্ষতার অভিযোগে ১৬১৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ এপ্রিল মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর (১৬০৫-২৭ খ্রি.) কাশিম খানকে পদচ্যুত করে ইবরাহীম খান ফতেহ জঙ্গকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করেন।
সম্রাজ্ঞী নুরজাহানের ভাই ইবরাহীম খান ফতেহ জঙ্গ বাংলা শাসনে উদারনীতি গ্রহণ করলেও ১৬২০ খ্রিস্টাব্দের বর্ষা মওসুমে আরাকানের রাজা হুসাইন শাহের সাথে যুদ্ধ বাঁধে। ইবরাহীম খান কর্তৃক আরাকানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেবার সংবাদ শুনে হুসাইন শাহ ম্রোহং থেকে বাংলা আক্রমণ করেন এবং ভুলুয়া অতিক্রম করে মেঘনা নদী দিয়ে ফরিদপুর অভিমুখে অনেক দূর অগ্রসর হন। মূলত তার লক্ষ্যস্থল ছিল ঢাকা। ইবরাহীম খান আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ ও সৈন্য নিয়ে ঢাকা থেকে বের হয়ে বিক্রমপুর অতিক্রম করে ফরিদপুরের দিকে যান এবং আড়িয়াল খাঁ নদী পথে আরাকানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। সুবাদারের সৈন্য, নৌবল ও অবিচল সংকল্প দেখে আরাকান বাহিনী ঘাবড়ে যায় এবং যুদ্ধ না করে আরাকানে প্রত্যাবর্তন করে। ফলে আরাকানের রাজা ভুলুয়া অধিকার করে নিলেও ইবরাহিম খান আরও দুই ক্রোশ সম্মুখে গিয়ে থানা স্থাপন করেন।
আরাকানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের প্রসার -৫
আরাকানের রাজা মিং খা মৌং ওরফে হুসাইন শাহ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী ও সাহসী শাসক। তার সাহসিকতা ও স্বদেশ প্রেমের কারণে আরাকানী জনগণ অদ্যাবধি তাঁকে জাতীয় বীর হিসেবে শ্রদ্ধা করে থাকে। জবৌক শাহের মাধ্যমে যে পর্তুগিজরা আরাকানে স্বীয় অবস্থান তৈরী করেছিল এবং সময়ের ব্যবধানে মিনরাজাগ্যি বা সেলিম শাহের সময় তারা সুদৃঢ় অবস্থান তৈরী করে নিয়েছিল। রাজ্যের শৃংখলা বিধানের স্বার্থে কয়েক পর্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও তার সময় মুসলিম বিদ্বেষমূলক কোন সংঘাত হয়নি। চট্টগ্রামে নিয়োজিত আরাকানী মুসলিম সামন্ত শাসকদের ব্যাপারেও তার কোন বিদ্বেষমূলক আচরণ লক্ষ্য করা যায়নি। সুতরাং মুসলমানগণ স্বাধীনভাবেই ইসলাম চর্চার সুযোগ লাভ করেছিল। হুসাইন শাহের মৃত্যুর পর ১৬২২ খ্রিস্টাব্দে স্বীয় পুত্র থিরি থু ধম্মা সেলিম শাহ (দ্বিতীয়) নাম ধারণ করে আরাকানের সিংহাসনে বসেন। ইংরেজ মুদ্রাতত্ত্ববিদগণ থিরি থু ধম্মার মুসলমানী নাম দু®প্রাপ্য বলে অভিমত প্রকাশ করলেও পর্তুগিজ ইতিহাসবিদগণ তার মুসলমানী নাম সেলিম শাহ (দ্বিতীয়) বলে উল্লেখ করেছেন। থিরি থু ধম্মার রাজত্বকালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরাকানী সামন্ত দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করা হত। কথিত আছে যে, বাংলার সুবেদারের প্ররোচনায় ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে আরাকান অধিকৃত চট্টগ্রামের বার জন সামন্ত শাসক একযোগে থিরি থু ধম্মার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তিনি কঠোর হস্তে তা দমন করে লক্ষ্য করলেন যে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে স্বীয় পুত্র যুবরাজ শাহজাহানের বিদ্রোহের কারণে বাংলায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরী হয়েছে। এ সুযোগে তিনি এক অভিযান প্রেরণ করে ঢাকা নগরে প্রবেশ করেন। আরাকান বাহিনীর আগমনে আতঙ্কিত হয়ে মোগল প্রতিরক্ষা বাহিনীর দুই সেনাপতি মোল্লা মুরশীদ ও হামিদ হায়দার ঢাকা শহর ছেড়ে পলায়ন করেন। আরাকানী বাহিনী তিনদিন ধরে লুটতরাজ চালিয়ে বিপুল পরিমান ধনসম্পদ নিয়ে যায়। এ বিবরণীতে বাংলার সাথে আরাকানের সংঘর্ষময় পরিস্থিতিতে বাংলার চেয়ে আরাকানকেই শক্তিশালী মনে হয়। অন্যদিকে আরাকানের রাজা থিরি থু ধম্মা কর্তৃক যুবরাজ শাহজাহানের সমীপে নাজরানা প্রেরণের তথ্যও পাওয়া যায়। ১৬২৪ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে যুবরাজ শাহজাহান বিদ্রোহ করে বাংলার সুবেদার ইবরাহীম খান ফতেহ জঙ্গকে পরাজিত ও নিহত করেন। এতে থিরি থু ধম্মা এক প্রতিনিধির মাধ্যমে এক লক্ষ টাকার বহুমূল্যবান দ্রব্য নজরানা হিসেবে শাহজাহানের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দেন। যুবরাজ শাহজাহান (খুররম) আরাকানের রাজার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্য বহু মূল্যবান পোষাক, মূল্যবান অন্যান্য দ্রব্য ‘খেলাত’ স্বরূপ পাঠান এবং এক ফরমান দ্বারা তার রাজ্যের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেন। এ বিবরণীর  মীর্জা নাথান ছাড়া আর অন্য কোন সূত্র নেই। যদি এ তথ্যকে সঠিক ধরে নেয়া যায়, তবে একদিক থেকে আরাকানের রাজা থিরি থু ধম্মাকে একজন দক্ষ কুটনৈতিক হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়; ভীতু, দূর্বল এবং নতজানু হিসেবে নয়। কেননা যুবরাজের ভবিষ্যত রাজনৈতিক অবস্থানের কথা চিন্তা করেই হয়তো তিনি নজরানা পেশ করেছিলেন। এ ছাড়া রাজা থিরি থু ধম্মা ওরফে সেলিম শাহ দ্বিতীয় একজন মুসলিম অনুরাগী শাসক হিসেবেও পরিচিত। তার সময় আশরাফ খান নামক জনৈক মুসলিম ব্যক্তি লস্কর উজির বা সমর মন্ত্রীর পদ লাভ করে রাজ্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তার সময় প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলিম রীতিনীতি প্রতিষ্ঠিত ছিল। বিশেষত আশরাফ খানকে মন্ত্রীত্ব দিয়ে রাজ্যের মৌলিক কার্যক্রম তার হাতেই সমার্পন করেছিলেন বলে মুসলিম সংস্কৃতির বহুমূখী চর্চা এবং মুসলিম সভ্যতার   বিস্তার ঘটে।
সেলিম শাহ দ্বিতীয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আরাকানের শাসন কার্য পরিচালনা করলেও স্বীয় রানী নাৎসিনম এবং মন্ত্রী নরপতিগ্যীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। তার কোন যোগ্য উত্তরসূরী না থাকায় তার শিশুপুত্র মিনসানীকে রানীর অভিভাকত্বে আরাকানের শাসন ক্ষমতায় বসানো হয়। কিন্তু মাত্র ২৮ দিনের মাথায় মন্ত্রী নরপদিগ্যী শিশু রাজা মিনসানীকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন। নরপদিগ্যী ছিলেন আরাকানের পূর্বতন রাজা থাটাজা (১৫২৫-১৫৩১ খ্রি.) এর প্রপৌত্র। নরপদিগ্যীর মুদ্রায় মুসলমানী নামটি দুস্পাঠ্য হবার কারণে জানা যায়নি। অন্যায়ভাবে শিশু রাজা মিনসানীকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করার কারণে আরাকান অধিকৃত চট্টগ্রামের শাসনকর্তাগণ এবং নিহত রাজার পিতৃব্য মেংগ্রী বাংলার মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁর সহযোগিতায় বিদ্রোহী হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কিন্তু নরপদিগ্যীর নৌ শক্তির মজবুতির কারণে তারা সফল হতে পারেনি। মেংগ্রী পরাজিত হয়ে দলবলসহ নোয়াখালীর জুগিদিয়া মোগল ঘাঁটিতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ সময় আরাকানে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয় এবং এ ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বাংলা থেকে অপহৃত বিভিন্ন জেলার প্রায় দশ হাজার লোক আরাকানী ও মগ  পর্তুগিজদের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নিজ বাসভূমি বাংলায় ফিরে আসে। সুবেদার ইসলাম খান মেংগ্রী ও তার অধিনস্ত আশ্রিত ব্যক্তিদেরকে ঢাকায় পুনর্বাসন করেন। রাজা নরপদিগ্যী এর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য বিশাল নৌ বাহিনী নিয়ে বাংলা আক্রমণ করেন। কিন্তু মোগলদের কামানের গোলার মুখে টিকতে না পেরে তারা আরাকানে ফিরে যায়।
রাজা নরপতিগ্যীর মুসলিম নাম উদ্ধার করা না গেলেও তিনি যে ইসলামের প্রতি অনুরাগী ছিলেন এতে কোন সন্দেহ নাই। কেননা সেলিম শাহের (দ্বিতীয়) মত বড় ঠাকুর উপাধিতে ভূষিত একজন মুসলমানকে তিনি লস্কর উজির বা সমর মন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেছেন। বড় ঠাকুরের সরাসরি তত্ত্বাবধান ও নরপদিগ্যীর সহযোগিতায় আরাকানে মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ আরো ত্বরান্বিত হয়।
রাজা নরপদিগ্যী ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করলে স্বীয় ভ্রাতুস্পুত্র থদো আরাকানের রাজা হন। তিনি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে মুসলমানী নাম গ্রহণ রীতি বর্জন করেন এবং নরপদিগ্যীর কন্যাকে বিয়ে করেন। তার সাত বছরের (১৬৪৫-১৬৫২ খ্রি.) শাসনকালে তেমন কোন বিদ্রোহ দেখা দেয়নি। ১৬৫২ খ্রিস্টাব্দে থদোর মৃত্যুর পর স্বীয় পুত্র সান্দা থু ধম্মা আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনি মোট ৩২ বছর (১৬৫২-৮৪ খ্রি.) আরাকান শাসন করেন। সিংহাসনে আরোহনকালে তিনি পূর্ববর্তী আরাকানী রাজাদের সমস্ত উপাধি বাতিল করে ‘সূবর্ণ প্রাসাদের অধীশ্বর’ উপাধি গ্রহণ করেন।
শাহাজাদা মুহাম্মদ সুজার আরাকান আশ্রয়কে কেন্দ্র করে ইতিহাসের আরেক অধ্যায়ের সূচনা হয়। মোগল সম্রাট শাহজাহানের (১৬২৭-১৬৫৮ খ্রি.) অসুস্থতার সংবাদ শুনে বাংলার সুবেদার শাহজাদা মুহাম্মদ সুজা (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রি.) রাজমহলে ১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে সিংহাসনের দাবি ঘোষণা করে দিল্লীর মসনদ অধিকারের উদ্দেশ্যে প্রায় ৪০ হাজার অশ্বারোহী সৈন্যসহ বাংলা হতে দিল্লীর দিকে অগ্রসর হন। আওরঙ্গজেব ও মুরাদ যথাক্রমে দাক্ষিণাত্য ও গুজরাট থেকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা দিয়ে স্বসৈন্যে দিল্লী অভিমুখে রওনা হন। ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধের এক পর্যায়ে সেনাপতি মীর জুমলার সহায়তায় ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারি খাজওয়ার যুদ্ধে সুজাকে পরাজিত করলে তিনি বাংলার দিকে অগ্রসর হন। বিক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর পতন অবশ্যম্ভাবী মনে করে শাহ সুজা ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল ঢাকায় আগমন করেন। অতঃপর আরাকানরাজ সান্দা থু ধম্মার সাথে যোগাযোগ করে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে পরিবার পরিজন ও দেহরক্ষী ছাড়া পাঁচ শতাধিক অতি বিশ্বস্ত সেনাপতি ও সেনানায়কদের নিয়ে ৬ মে ঢাকা থেকে ভুলুয়ায় যান এবং ৬ দিন পরে ১২ মে আরাকানের রাজার পাঠানো জাহাজে তিনি ৩ জুন কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে দেয়াং পৌঁছেন এবং সেখান থেকে সড়ক পথে যাত্রা করে ২৬ আগষ্ট আরাকানের রাজধানী ম্রোহং পৌঁছেন। মূলত শাহ সুজা আরাকান থেকে মক্কা অথবা তুরস্কে যাবার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বর্ষাকালে যাত্রা বিপদ সংকুল হেতু শীতকালে তিনি মক্কা যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং আরাকানরাজও তাঁকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনুচরসহ তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেন। আরাকানরাজের সাথে কিছু দিন ভাল সম্পর্ক থাকলেও আরাকানরাজ শাহ সুজার মূল্যবান সম্পদ ও অপূর্ব সুন্দরী কন্যা আমেনা বেগমকে দেখে তার মক্কা পাঠানোর অঙ্গীকার ভুলে আমেনাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। মুহাম্মদ সুজা এ প্রস্তাব অস্বীকার করলে আরাকানরাজ বিশ্বাস ভংগ করে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ফেব্রুয়ারি শাহ সুজা ও পরবর্তীতে তাঁর পরিবার পরিজনকে হত্যা করে। অতঃপর তাঁর অনুচরসহ ম্রোহংয়ে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর অমানষিক নির্যাতন নেমে আসে; অনেককে হত্যা করে এবং অনেককে কারাগারে নিক্ষেপ করে; কবি আলাওলও এসময় কারা বরণ করেছিলেন।
বাণিজ্য তরীর নাবিকের মাধ্যমে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ আগষ্ট মীর জুমলা সুজা হত্যার খবর সংগ্রহ করে আওরঙ্গজেব এর নিকট পৌঁছান। তিনি ভ্রাতৃহত্যার খবর শুনে প্রতিশোধ গ্রহণ কল্পে বাংলার সুবেদার শায়েস্তাখাঁকে আদেশ করেন। তিনি ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি আরাকানী বাহিনী ও জলদস্যুদের বিতাড়িত করে চট্টগ্রাম দখল করেন। এভাবে ম্রাউক-উ-বংশের শাসনকালের সূচনা থেকে শাহ সুজার হত্যাকা-ের সময় পর্যন্ত বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও বর্ণের লোক আরাকানে পাড়ি জমায়।
পুত্র সান্দা থু ধম্মার সময়ে শাহজাদা সুজা স্বপরিবারে নিহত হবার পর তার হতাবশিষ্ট দেহরক্ষীগণ কামানঞ্চি নামে খ্যাত হয়। আরাকানরাজ তাদের শান্তনা দেবার জন্য তাদেরকে তার দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ দেয়। কিন্তু তারা এতেও শান্ত থাকেনি। ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে সান্দা থু ধর্ম্মার মৃত্যুর পর তারা এতটা উগ্র ও অস্থির হয়ে পরে যে, তারা সেখানে শরহম সধশবৎ এর ভূমিকা পালন করে। তারা মাত্র ২০ বছরে ১০ জন রাজাকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন এবং পদচ্যুত অথবা হত্যা করেছে। সান্দা থু ধম্মার মৃত্যুর পর আরাকানে আর শান্তি ফিরে আসেনি। পরবর্তী একশ বছর (১৬৮৪-১৭৮৪ খ্রি.) পর্যন্ত আরাকানে অস্থিতিশীল পরিবেশের মধ্য দিয়ে মোট ২৫জন রাজা আরাকান শাসন করেছেন। তারমধ্যে রাজা থিরি থুরিয়া, ওয়ারা ধম্মা রাজা, মুনি থু ধম্মা রাজা এবং সান্দা থুরিয়া ধম্মা কামানচিদের বেতনভাতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দানে ব্যর্থ হবার কারণে পদচ্যুত ও নিহত হন। তারা দাবী দাওয়া আদায়ের জন্য রাজকোষ লুন্ঠন, রাজ প্রাসাদে অগ্নিসংযোগ এবং রাজাদের পদচ্যুতি ও হত্যার মধ্য দিয়ে দুই যুগের অধিককাল (১৬৮৪-১৭১০ খ্রি.) পর্যন্ত আরাকানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রাখে। কামানচি বাহিনীকে দমন করার জন্য মহাদন্ডায়ু নামক এক দুঃসাহসী সামন্ত যুবক আরাকানের যুব সম্প্রদায়কে সংঘবদ্ধ করে। সংগঠিত যুবকদের সমন্বয়ে কামানচি বাহিনীকে তিনি সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করে দেন এবং তাদেরকে আরাকানের বিভিন্ন পাহাড়িয়া এলাকায় নির্বাসিত করেন। কামানচিদের দমনের পর মহাদন্ডায়ু সান্দা উইজ্যা নাম ধারণ করে ১৭১০ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনি আরাকানের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করেন এবং ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ব্যর্থ হন। অবশেষে পর্তুগিজ জলদস্যুদের দ্বারা বাংলায় লুন্ঠন চালানোর ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন। আরাকানের রাজা সান্দা উইজ্যার প্রচেষ্টায় তেমন কোন ফল হয়নি। আরাকানের বিধ্বস্ত প্রশাসন আর শৃংখলার দিকে ফিরে আনা সম্ভব হয়নি। বরং এক পর্যায়ে সামন্তদের নেতৃত্বে গোটা আরাকান ছয়টি কেন্দ্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কোন সামন্ত শক্তি সঞ্চয় করে রাজধানী ম্রোহং এর ক্ষমতা দখলে উদ্যোগী হলে অন্য সামন্তগণ জোট বেঁধে সে উদ্যোগ ব্যর্থ করে দেয়।  সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা এত চরমে ওঠে যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কোন্দলের কারণে ইংরেজ কালেক্টর নাথিয়াল বেইটম্যানের আমলে (১৭৭৫-৭৭ খ্রি.) আরাকান থেকে ২,০০০ (দু’হাজর) শরণার্থী চট্টগ্রাম জেলার বারপালং এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করে। কালেক্টর বেইটম্যান তাদেরকে পরগণা, আনন্দপুর, মৌজাচম্বল, পুঁইছড়ি, সোনাছড়ি, লালকোটা ও মানিকপুরে বসতি স্থাপন করার সুযোগ দেন। এ সকল শরণার্থীর মধ্যে ছিলেন তাজ মোহাম্মদ, আতিকুল্লাহ, ঠাকুর চাঁদ, সাদুলাহ, আজিজুলাহ, ফকির মোহাম্মদ ও রৌশন প্রমুখ। তাঁরা নিজেদেরকে আরাকান রাজ্যের জমিদার ও তালুকদার বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। বেইটম্যান তাঁদেরকে চট্টগ্রাম শহরে ডেকে কোম্পানির এলাকায় আশ্রয় গ্রহণের কারণ জিজ্ঞাসা করলে প্রত্যুত্তরে তাঁরা বলেন, আরাকানে রাজনৈতিক গোলযোগ শুরু হবার কারণে অনুচরদের নিয়ে কোম্পানির রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছেন এবং কোম্পানির এলাকায় জমি আবাদ করে বসবাস করতে ইচ্ছুক। বেইটম্যান তাঁদেরকে কোম্পানির রাজ্যে বসবাস করার অনুমতি দেন এবং নির্দেশ দেন যে, তারা জয়নগর মহালের অধস্তন জমিদাররূপে পরিগণিত হবে। কালেক্টরের এ নির্দেশ তাঁদের মনপুত হয়নি, কেননা তাঁরা গোড়াতেই বলেছিলেন যে, আরাকানে তাঁদের যে পদমর্যাদা ছিল কোম্পানির এলাকায় অধস্তন ভূমিকা গ্রহণ করে তা ক্ষূন্ন করতে তারা প্রস্তত নন। এ সময় সদর আদালতের প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পে চট্টগ্রাম ভ্রমণে এসেছিলেন। তাজ মোহাম্মদ ও অন্যান্য শরণার্থীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি তৎকালীন ফ্রান্সিস ল’কে একখানি দলীল দিয়ে তাঁদের অধিকার সংরক্ষনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। কিন্তু অচিরেই তাঁদের অনেকেই মৃত্যু মুখে পতিত হয় এবং তাজ মোহাম্মদ ব্যতিত অন্য সবাই আরাকানে প্রত্যাবর্তন করেন। এমন কি কিছুদিন পর তাজ মোহাম্মদও আরাকানে ফিরে যেতে বাধ্য হন। জমি আবাদে আরাকানীদের এ ব্যর্থতা সম্পর্কে কালেক্টর পাইরাডের ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ ডিসেম্বর এক রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়; মাটি এরূপ জঙ্গলাবৃত শক্ত ঘাসে আচ্ছাদিত ছিল যে, আবাদ করা ছিল খুব কঠিন এবং আরাকানীদের পক্ষে স্থানীয় অধিবাসীদের সাহায্য পাওয়া ছিল খুবই কষ্টকর। (চলবে)
(লেখক : প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, mrakhanda@gmail.com)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ