ঢাকা, সোমবার 5 February 2018, ২৩ মাঘ ১৪২৪, ১৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কিশোর গ্যাং সম্পর্কে ভাবুন

মানুষের সমাজেতো নৃশংসতা থাকার কথা নয়। নৃশংসতার জন্যতো মানুষ সমাজবদ্ধ হয়নি। বরং সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিয়ে মানবিক জীবন যাপনের লক্ষ্যেই তো মানুষ সমাজবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজের আজ এমন দুর্দশা কেন? ছেলেকে হারানোর পর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কবীর হোসেন। ছেলে আদনান কবীর এক বছর আগে উত্তরায় সমবয়সী ও দু’এক ক্লাস ওপরে পড়া ছাত্রদের হাতে খুন হয়েছিল। খুনী চক্রের অব্যাহত হুমকির মুখে সপরিবারে কবীর হোসেন এখন উদ্বাস্তু। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হত্যাকা-টি ঘটেছিল গত বছরের ৬ জানুয়ারি উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের কাছে। ওইদিন সন্ধ্যায় উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্র আদনানকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকা-ের পর গ্রেফতার ২২ আসামির ১৫ জন জামিনে বেরিয়ে আসে। আদনানের অন্য দুই ভাইকে বাঁচাতে হলে মামলা তুলে নিতে হবে, আসামিরা আদনানদের বাসায় গিয়ে এমন হুমকি দেয়। ফলে এলাকা ছাড়েন কবীর হোসেন। অথচ তিনি ১৯৯২ সাল থেকে উত্তরার বাসিন্দা।
উল্লেখ্য যে, শুধু আদনান কবীরের পরিবার নয়, এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন অন্যরাও। গত বৃহস্পতিবার ছুরিকাহত হয়ে উত্তরার স্থানীয় একটি স্কুলের ছাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। উত্তরার বেসরকারি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে আহত আর এক ছাত্র। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে অস্থির স্থানীয় নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও। উত্তরা ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বশির আহমদ ভূঁইয়া জানান, তিনি অতিষ্ঠ। প্রায়ই সন্তানদের অসুবিধার কথা জানিয়ে অভিভাবকরা তাকে অভিযোগ জানাচ্ছেন। কলেজের প্রাক্তন এক ছাত্র হোস্টেলে থাকা দুই শতাধিক ছাত্রের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে। সন্ধ্যার সময় হোস্টেলে থাকা ছাত্রদের ক্যাম্পাসে এনে পড়াতো স্কুল কর্তৃপক্ষ। বখাটেদের অত্যাচারে এই উদ্যোগ বাদ দিতে হয়েছে। আদনান খুন হওয়ার পর উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এক ডজন কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে শুধু উত্তরাতেই পাঁচটি গ্যাং খুঁজে পায় তারা। ডিসকো বয়েজ, নাইন স্টার ক্লাব, নাইন এমএস এবং বিগ বস নামে এই গ্যাংগুলোর সঙ্গে উত্তরায় নানা অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়।
উত্তরার গ্যাংগুলোর ফেসবুকে হত্যা, খুনসহ নৃশংস বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। সেই সঙ্গে দল বেঁধে চাঁদা আদায়, ছিনতাই ও মারধর করছে। এক গ্যাংয়ের ওয়াল থেকে অন্য গ্যাংকে হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এদের কারণে উত্তরার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংলগ্ন এলাকায় এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। সমাজ বিশ্লেষকরা এমন পরিস্থিতির জন্য সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির কথা উল্লেখ করছেন। পরিবারগুলো বৈষয়িক উন্নতির জন্য এতটাই ব্যস্ত যে, সন্তানদের দেখভাল ও নৈতিক উন্নয়নের দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। আর শিক্ষা ব্যবস্থায়ও নৈতিক চেতনার ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হওয়ার তেমন কোন আয়োজন নেই। ফলে কিশোররা অপসংস্কৃতির প্রভাবে অবক্ষয়ের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। এমন অবস্থায় তাদের রক্ষায় পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারের করণীয় আছে। সময়ের দায়িত্ব তো তাদের পালন করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ