ঢাকা, সোমবার 5 February 2018, ২৩ মাঘ ১৪২৪, ১৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান

 

স্টাফ রিপোর্টার : স্বাধীকার আন্দোলনের ভিত্তি, ভাষার মাস  ফেব্রুয়ারির পঞ্চম দিন আজ সোমবার । নিরন্তর আগ্রহোদ্দীপক এ মাসটি এলেই ‘অমর একুশে’, ‘ভাষা-শহীদ’, ‘ভাষা-সন্তান’, ‘ভাষা-পুত্র’, ‘রক্তাক্ত অ আ ক খ’ ইত্যাকার শব্দমালা প্রতিটি বাংলাদেশীর দেহ ও মনে দ্যোতনার সৃষ্টি করে। আবেগে উচ্ছ্বাসিত হয় প্রাণ। কিন্তু নতুন প্রজন্ম কি জানে, ভাষা আন্দোলন শুধু বায়ান্নতেই সীমাবদ্ধ নয়। সুদীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর এ জাতি পেয়েছে বাংলা ভাষা আপন করে। শাশ্বত ভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকারটুকু প্রতিষ্ঠা করে সংকট লড়াইয়ের অগ্রজ সেনানীরা আমাদের ঋণের দায়ে আবদ্ধ করে গেছেন। আর ইতিহাসের পাতায় পাতায় তারা হয়ে আছে আপন মহিমায় ভাস্বর, জ্যোতির্ময়। ইতিহাস বিকৃত করতে একটি কূটচক্র সবসময়ই তৎপর থাকে। ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এ ধরনের মতলববাজদের দূরভিসন্ধিমূলক কর্মকা- অব্যাহত রয়েছে। যারা কি-না এখনও বিশিষ্ট জনদের বাংলা ভাষার দাবি আন্দোলনকে কৌশলে অস্বীকার করতে চায়।

খুরশীদ আলম সাগর তার ‘পলাশী প্রান্তর থেকে বাংলাদেশ ১৭৫৭, ১৯৭১ ও আমাদের স্বাধীনতা’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন, “একটি জাতির চিরন্তন সম্পদ হলো তার ভাষা, ভাব-প্রকাশের সর্বোত্তম বাহন। পাকিস্তান নামক শিশু রাষ্ট্রটি ভূমিষ্ঠ হবার পূর্ব থেকেই এর রাষ্ট্রীয় ভাষা কি হবে তা নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। সম্প্রসারণবাদী শোষক বৃটিশকে তাড়িয়ে পূর্ব বাংলা, সিন্ধু, খন্ডিত পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে সৃষ্টি হয় পাকিস্তান। ‘পূর্ব বাংলা’ পূর্ব পাকিস্তান নামে এবং সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে পরিচিতি লাভ করে পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্র। ‘সিন্ধি’, ‘বেলুচ’, ‘পাঞ্জাবী’, ‘পোস্তু’ ইত্যাদি ভাষাভাষী মানুষ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। অন্যদিকে ‘বাংলা’, ‘চাংমা’ ইত্যাদি ভাষাভাষী মানুষ বাস করে পূর্ব পাকিস্তানে। চাংমা বা অন্যান্য ছোট ছোট জাতিসত্তার ভাষাভাষী লোক অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে অল-পাকিস্তানে অর্ধেকের বেশি লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষা হচ্ছে অন্যতম। তাই সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার জন্য। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ থেকে শুরু করে প্রায় সকল নেতাই একমাত্র উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার কথা জোর দিয়ে বলতে থাকেন।”

ভাষা সৈনিক, ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক এম আর মাহবুব তার ‘বাঙালা কী করে রাষ্ট্রভাষা হলো’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, “অধ্যাপক (পরবর্তীতে প্রিন্সিপাল) আবুল কাসেম বহু চেষ্টা করেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসকমন্ডলীকে এ ব্যাপারে কোনোরূপ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাতে সক্ষম হননি। ফলে সর্বস্তরে বাংলা চালু ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ব্যবহার একটি বাকসর্বস্ব বক্তব্যে পরিণত হয়। এমনকি যুক্তফ্রন্টের ১৯৫৪ সালের নির্বাচনোত্তর ক্ষমতাসীন হলেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অধ্যাপক আবুল কাসেম পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে সর্বস্তরে বাংলা চালুর জন্য বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৬২ সালে (রাজধানীর মিরপুরে) বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সর্বস্তরে বাংলা চালু ও ভাষা-আন্দোলনের চেতনা ও বহুমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।”

 বাংলা সাহিত্যের যাত্রা শুরু হয় ৬৫০ ইংরেজি সালে, এর পর অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে বাংলা ভাষা আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ট ভাষাগুলোর অন্যতম। ইংরেজি ১৮০০ সালে ইংরেজরা ক্ষমতা নিলে মুসলিমরা কোনঠাসা হয়ে পরে, বাংলা ভাষা চর্চা থেমে যায়, শুরু হয় ইংরের্জি চর্চা।

“বাংলাভাষা বাঙালি মুসলিমদের মাতৃভাষা। এ ভাষা আমাদের জাতীয় ভাষা।”- এ কথা সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর পূর্বে কোনো অভিজাত মুসলিম এমন দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেননি। প্রকৃতপক্ষে তিনিই উপমহাদেশে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার প্রথম প্রস্তাবক। সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯১১ সালে রংপুরে মুসলিম প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মেলনে তখনকার রক্ষণশীল পরিবেশেও বাংলা ভাষার পক্ষে বলিষ্ঠ বক্তব্য রাখেন। তিনি যুক্তি সহকারে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার জোর সুপারিশ করেন। তবে বাঙলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে প্রথম মত প্রকাশ করে এক বৃটিশ নাগরিক ন্যাথেলিয়ান ব্রাথি হেডলেট। ১৭৭৮ সালে “অ্যা গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ” নামে বাঙলা বইতে তিনি প্রথম দাবি করেন ফার্সির পরবর্তীতে বাঙলা ভাষাকে সরকারি কাজে ব্যবহার করার জন্য।

কুড়ি শতকের গোড়ার দিকে ভারতবর্ষের একটি সাধারণ ভাষার প্রশ্ন প্রবল হয়ে দেখা দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে সর্বভারতীয় নেতৃবৃন্দ ভারতে রাষ্ট্রভাষা রূপে হিন্দির পক্ষে দাবি তোলেন। বাংলার বাইরের অন্যান্য প্রদেশের মুসলিমদের রায় ছিল উর্দুর পক্ষে। কিন্তু বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে থেকেই এ সময় বাংলার পক্ষে আওয়াজ উঠে। ১৯১৮ সালে ‘‘বিশ্বভারতীতে” অনুষ্ঠিত এক সভায় ভারতের সাধারণ ভাষা হিসেবে রবীন্দ্রনাথের হিন্দি সম্পর্কিত প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ভাষাবিদ-শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এক প্রবন্ধের মাধ্যমে বাংলাভাষার দাবি পেশ করেন। সে সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সারা ভারতের ভাষাতত্ত্ববিদ ও পন্ডিতগণ সে সভায় উপস্থিত হন এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। বিশ্বভারতীয় সভায় ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর প্রবন্ধটি পাঠ শেষ হলে সভাস্থলে তুমুল হইচই পড়ে যায়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রবন্ধটি সমকালীন “মোসলেম ভারত” পত্রিকায় (১ম বর্ষ, ১ম খন্ড, বৈশাখ, ১৩২৭/১৯২০ ইংরেজি) প্রকাশিত হয়।

১৯২১ সালে তৎকালীন বৃটিশ সরকারের কাছে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য লিখিতভাবে দাবি উত্থাপন করেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। দাবি নামায় তিনি লিখেন : ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলাকে।

১৯৩৭ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, ‘দৈনিক আজাদ’-এ প্রকাশিত এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলেন, “সাহিত্যের মধ্যে বাংলা সমস্ত প্রাদেশিক ভাষার মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বাংলা ভাষায় বিবিধভাব প্রকাশের উপযোগী শব্দের সংখ্যাই বেশি। অতএব বাংলা ভাষা সব দিক দিয়াই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হইবার দাবি করিতে পারে। মহাত্মাগান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করিবার প্রস্তাব করিয়াছে বটে, কিন্তু এ বিষয়ে বাংলা ভাষার চেয়ে হিন্দির যোগ্যতা কোনো দিক দিয়েই বেশি নহে।”

এদিকে, ভাষা আন্দোলনের সংগঠক গাজিউল হক ঢাকা ডাইজেস্ট (জুন/৭৮)-এ সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন, “ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা চলছে এবং তা দুদিক থেকে। এক দিকে কিছু নতুন দাবিদারকে প্রতিষ্ঠাকরার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে ও অন্যদিকে কারো কারো নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারার কাঠামোতে ফেলার জন্য এ মহান আন্দোলনের ইতিহাস কে ভিন্নরূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন অনেকে।” 

১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সাধারণ ছাত্র-জনতা কর্তৃক, সে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন মুহাম্মদ সুলতান। ঢাকা ডাইজেষ্ট (জুন/৭৯) এর এক সাক্ষাৎকারে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ এনে তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে টিভি সাক্ষাৎকারে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আলাপ করছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও কে জি মোস্তফা। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করেন- তোমার মনে নেই মোস্তফা ’৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমি ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার নির্দেশ দিয়েছিলাম- এমনি অনেক ধরনের কথা। মোস্তফা কখনো মাথা নেড়ে, কথা বলে বঙ্গবন্ধুর কথার সমর্থন দিচ্ছিলেন, অথচ বঙ্গবন্ধু তখন জেলে।” কিন্তু ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত কে জি মোস্তফার ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ বইতে লিখেছেন, “ শেখ মুজিব তখন জেলে, ১৯৪৯ সালের মার্চ থেকেই তিনি জেল খাটছিলেন”।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ