ঢাকা, সোমবার 5 February 2018, ২৩ মাঘ ১৪২৪, ১৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সাম্প্রদায়িক রূপ নিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হানাহানিতে বীরভূম জেলায় সম্প্রতি আরও একজন নিহত হয়েছেন, কাছেই আর একটি গ্রামে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও একজন।
ওই জেলার পাড়ুই এলাকায় বিজেপি ও ক্ষমতাসীন তৃণমূলের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ চলছে গত বেশ কিছুদিন ধরেই - এবং এই ধরনের সংঘর্ষ ঘটছে রাজ্যের আরও নানা জায়গাতেই।
গত মে মাসে লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই রাজ্যে এই ধরনের সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে, এবং প্রায় সব দলই মানছে এই হিংসার চরিত্রও বেশ আলাদা।
২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গ যে তীব্র রাজনৈতিক হিংসা আর সংঘাত দেখেছিল, অনেকটা সেই ছবিই যেন আবার ফিরে এসেছে সাড়ে তিন বছর পর।
তবে সংঘর্ষটা বেশির ভাগ জায়গাতেই আর তৃণমূল বনাম সিপিএম নয়, ইদানীং তৃণমূলের লড়াই বিজেপি’র সঙ্গেই, লোকসভা নির্বাচনে দেশব্যাপী সাফল্যের পর যারা বিপুল উৎসাহে পশ্চিমবঙ্গেও শক্তি বাড়াতে চাইছে।
সম্প্রতি উপ-নির্বাচনে জিতে আসা রাজ্যের একমাত্র বিজেপি এমএলএ শমীক ভট্টাচার্য বলছিলেন, “রাজ্যে যেহেতু সিপিএম এখন আর দৃশ্যমান নয়, তাই দলে দলে মানুষ বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন এবং একটা উদীয়মান শক্তি হিসেবে বিজেপিকেই সমর্থন করছেন।”
তার দাবি, কাগজে-কলমে রাজ্যে সিপিএম প্রধান বিরোধী দল হতে পারে, কিন্তু গলি থেকে রাজপথ, শিক্ষাঙ্গনের ক্যাম্পাস থেকে চায়ের দোকান সর্বত্রই বিজেপি’কে নিয়ে আলোচনা এবং রাজ্যে তারাই আসল বিরোধী দল।
রাজ্যের মানুষ যে বিজেপিতে ভিড়ছেন, সে কথা মানছেন তৃণমূলের ডাকসাইটে এমপি শুভেন্দু অধিকারীও। কিন্তু তার মতে এরা যাচ্ছেন সিপিএম থেকেই, আর এদের জন্যই রাজ্যের কোনও কোনও জায়গায় রাজনৈতিক হিংসা মাথাচাড়া দিচ্ছে।
তিনি বলছিলেন, “এককালে সিপিএম’র যে হার্মাদরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এলাকা দখলের রাজনীতি করত তারাই এখন বিজেপি’র পতাকা নিয়ে হামলা চালাচ্ছে - অর্থাৎ এরা ঠিক বিজেপি নয়, পুরনো সিপিএম।”
টানা সাড়ে তিন দশক রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা সিপিএম রাজ্যের সাম্প্রতিক উপ-নির্বাচনগুলোতে তিন বা চার নম্বরে শেষ করেছে, রাজ্যে তাদের জনসমর্থনে যে ধস নেমেছে তা মানছেন দলের নেতারাও।
তবে রাজ্য থেকে লোকসভায় দলের মাত্র দু’জন এমপি’র একজন মহম্মদ সেলিমের দাবি, বিজেপি’র যে নব্য সমর্থকদের সঙ্গে তৃণমূলের সংঘর্ষ হচ্ছে। এরা আসলে তৃণমূলেই বিক্ষুব্ধ অংশ।
মি. সেলিম বিবিসি’কে বলছিলেন, “তৃণমূল ভেবেছিল পশ্চিমবঙ্গকে সিপিএম-শূন্য করে দিলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে। কিন্তু এখন বীরভূম থেকে শুরু করে রাজ্যের সর্বত্র তৃণমূলের ভেতরই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মাথা চাড়া দিচ্ছে; যারা মমতা ব্যানার্জির ছবি নিয়ে আন্দোলন করছিলেন তাদেরই একটা দল কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভাবছেন এখন নরেন্দ্র মোদীর ছবি নিয়ে লড়াই করলে বেশি জোর পাওয়া যাবে।”
তিনি আরও আশঙ্কা করছেন, এই সংঘাত তৃণমূল-বিজেপিতেই থেমে থাকবে না, ধীরে ধীরে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষেরও রূপ নেবে।
কারণ, “বামপন্থাকে নিকেশ করে এখানে যে রাজনীতির জন্ম দেওয়া হয়েছে তাতে ধর্ম আর ধর্মীয় জিগিরকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আর সেটা আরএসএসের রাজনীতিতেও আছে, মমতা ব্যানার্জির ডিএনএ-তেও আছে,” বলছিলেন মি. সেলিম।
পশ্চিমবঙ্গে ইদানীংকার রাজনৈতিক হিংসাগুলোতে যে সাম্প্রদায়িক রং লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে, সেই অভিযোগ করছে ক্ষমতাসীন তৃণমূলও।
তবে শুভেন্দু অধিকারীর ধারণা এই চেষ্টা ব্যর্থ হবে, কারণ “এ রাজ্যের ইতিহাস বলে হিন্দু মহাসভা বা মুসলিম লীগ কেউই প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এখন বিজেপি বা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীদের মুসলিম সংগঠনও পারবে না।”
বিজেপি অবশ্য দাবি করছে, মুসলিমরাও দলে দলে তাদের দিকে ভিড়ছেন এবং বিশেষ করে বীরভূমে তাদের যে সমর্থকরা হতাহত হয়েছেন তারা প্রায় সবাই মুসলিম।
কিন্তু সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপে নতুন চেহারায় যে সহিংসতা জেঁকে বসছে, কোনও দলই তা অস্বীকার করছে না।
২য় রাজনৈতিক শক্তি হচ্ছে বিজেপি
ভারতের রাজস্থানে সদ্য সমাপ্ত তিনটি উপ-নির্বাচনে বিজেপি পরাজিত হেয়েছে- এ নিয়ে সে দেশের জাতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলিতে যথেষ্ট চর্চা হচ্ছে। হওয়ার কথাও, কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি শাসিত ওই রাজ্যে এ বছই রয়েছে বিধান সভার নির্বাচন। কিন্তু বৃহস্পতিবার, একই সঙ্গে ফল ঘোষিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের দু’টি উপ-নির্বাচনেরও। বিজেপি সেখানেও হেরেছে, কিন্তু দ্বিতীয় স্থান দখল করতে সমর্থ হয়েছে।
হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়াতে লোকসভা আর উত্তর চব্বিশ পরগণার নোয়াপাড়ায় বিধানসভা উপ-নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে শাসক বা বিরোধী দল - কেউই খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। আশা করাই গিয়েছিল যে দু’টি ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসই জিতে যাবে- হয়েছেও তাই।
কিন্তু ভোটের বিস্তারিত ফলাফল সামনে আসার পরে যেটা অনেকের কপালে ভাঁজ ফেলেছে, অথবা অন্য কারও মুখে হাসি- সেটা হল ভারতীয় জনতা পার্টির ভোট শেয়ার বৃদ্ধি।
দু’টি আসনেই তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে অনেকটা পিছিয়ে- তবুও উলুবেড়িয়াতে তারা ২৩% আর নোয়াপাড়ায় ২০% ভোট পেয়েছে।
আগের নির্বাচনের থেকে যথাক্রমে ১১.৫ আর সাত শতাংশ ভোট বেড়েছে বিজেপি’র। ভোট বেড়েছে তৃণমূল কংগ্রেসেরও।
কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে যেভাবে প্রতিটা নির্বাচনেই বিজেপি তাদের ভোট বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে, আর মোটামুটি ভাবে দ্বিতীয় স্থানটা ধরে রাখতে পারছে, তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটা নতুন ঘটনা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিমল শঙ্কর নন্দ বলছিলেন, “দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে বিজেপি থাকতে পারছে কী না, সেটা আমার কাছে একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেটা গুরুত্বের, তা হল, দলটা কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ভোট বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে। বিগত বেশ কয়েকটা নির্বাচনের ফল দেখলেই সেটা স্পষ্ট হবে।”
উলুবেড়িয়া আর নোয়াপাড়ার আগেও কাথি উপনির্বাচন বা গতবছরের পৌরসভাগুলির নির্বাচনেও আসন সংখ্যার দিক থেকে না হলেও বিজেপি’র ভোটের শেয়ার বৃদ্ধি হয়েই চলেছে। উল্টোদিকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের ঠিক পরেই বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে যে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস ছিল তাদের ক্ষয় অব্যাহত রয়েছে।
প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার শুভাশীষ মৈত্র ব্যাখ্যা করছিলেন, “২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে যতগুলো ভোট হয়েছে রাজ্যে সবক্ষেত্রেই বিজেপি দ্বিতীয় স্থানটা ধরে রাখছে। কোথাও তৃতীয় হলেও সেটাও খুব কম মার্জিনে। কথা হল বিজেপি-র দিকে ভোটটা আসছে কোথা থেকে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট তো কমছে না, উল্টে বাড়ছে। আবার প্রতিষ্ঠিত দুটি রাজনৈতিক শক্তি ছিল - বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস, তাদের যতটা ভোট কমছে, সেই ভোটই বিজেপির দিকে যাচ্ছে। তাই কংগ্রেস আর বামেদের ভোটই যে মোটামুটি ভাবে বিজেপি পাচ্ছে, এটা বলা যায়।”
নিজেদের দিকে ভোট কীভাবে টানতে পারছে বিজেপি?
বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ব্যাখ্যা দেয় যে ভোটারদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটিয়ে ভোট বাড়াচ্ছে বিজেপি তথা হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি জায়গায় ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরী হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি কোথাও পেশীশক্তি প্রদর্শনের জন্য মিছিলও করেছে।
কিন্তু শুভাশীষ মৈত্রর মতে অন্যান্য রাজ্যের মতো সম্পূর্ণ ধর্মীয় মেরুকরণ পশ্চিমবঙ্গ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলছিলেন, “কিছুটা মেরুকরণ তো হয়েইছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা, কিছু মিছিল - এসব দেখেই সেটা বোঝা যায়। কিন্তু এই ভোটে মেরুকরণের ছাপ আমি দেখতে পাচ্ছি না খুব একটা। আর আমার মতে, এটা তো রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের দেশ- এখানে অন্য রাজ্যের মতো ধর্মীয় মেরুকরণ সম্ভবও নয়”
“আবার বীরভূম বা কোচবিহারের মতো কয়েকটি জেলা থেকে খবর পেয়েছি যে সেখানে মুসলমানদের একটা অংশ - যারা কোনও কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের ঘোরতর বিরোধী, তারাও কিন্তু বিজেপি-র দিকে গেছেন। যদিও এটা রাজ্যের সার্বিক চিত্র নয় এবং ওই সব অঞ্চলে মুসলমানদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় কিছু ইস্যুই মূলত কাজ করেছে” বলছিলেন মি. মৈত্র।
অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলছিলেন, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জড় পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই থেকেছে, কিন্তু বামপন্থীদের প্রভাবে সেটা এতদিন সামনে আসতে পারে নি।
তাঁর কথায়, “সেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকেই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদকে ব্যবহার করার হয়েছে পশ্চিমবঙ্গেই। তাই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দিকে একটা সমর্থন ছিলই। কিন্তু জনসংঘের ব্যর্থতা হল স্বাধীনতার পরে তারা এটাকে কাজে লাগাতে পারেনি - বিশেষত দেশভাগ, উদ্বাস্তুদের সমস্যা - এইসব ইস্যুকে তারা সামনে নিয়ে আসতে পারে নি। যে কাজটা করেছিল কমিউনিস্টরা। মানুষের একটা বিরাট অংশের সমর্থন তাই কমিউনিস্টদের দিকে চলে গিয়েছিল।”
“কিন্তু ২০১১ সালে যখন কমিউনিস্টরা বিদায় নিল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে, ওই যে মানুষরা বিরোধী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম খুঁজছিলেন, তারা বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়লেন,” বলছিলেন অধ্যাপক নন্দ।
মূলত তারফলেই ক্রমাগত বিজেপি-র ভোট বেড়ে চলেছে বলে মনে করেন তিনি।
একদিকে বাম ও কংগ্রেসের শক্তিক্ষয়, অন্যদিকে বিজেপি’র দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে সামনে উঠে আসা - এটাকেই বিশ্লেষকরা এখন পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক ট্রেন্ড বলে মনে করছেন। -বিবিসি

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ