ঢাকা, সোমবার 5 February 2018, ২৩ মাঘ ১৪২৪, ১৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাসায়নিক বর্জ্যে খুলনার নদ-নদীর পানি দূষিত হচ্ছে

খুলনা : রূপসা নদীর পানি বর্জ্যে বিবর্ণ হয়ে গেছে

খুলনা অফিস: খুলনা মহানগরী সংলগ্ন ভৈরব নদ, রূপসা, কাজীবাছা ও ময়ুর নদীর দুই তীরে ৫৩টি বড় শিল্প গড়ে উঠেছে। এ সব শিল্প কারখানা থেকে রাসায়নিক বর্জ্য, অসংখ্য ঝুলন্ত পায়খানা, তেলবাহী ট্যাংকার থেকে ট্যাংকার ধোয়া পানি নদীতে নিস্কাশন, কসাইখানার বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণে নদীগুলোতে মারাত্মক দুষণ সৃষ্টি হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ভৈরব নদ ও রূপসা নদীর পানি ব্যবহারে অযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ দুটি নদীর পানিতে অক্সিজেন সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে জলজ প্রাণী-উদ্ভিদের বাঁচার সম্ভাবনা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, পাটকল, হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, তেলের ডিপো, জাহাজ শিল্প ধোয়া মোছার তেল-মবিল, লবণ শিল্পের বর্জ্যসহ বিভিন্ন কারখানার রাসায়নিক দ্রব্য প্রতিনিয়ত পড়ে নদ-নদীর এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই দু’টি নদীর পানি ব্যবহার করা হলে চর্মরোগ, হার্ট, কিডনি নষ্টসহ মানব দেহে নানা জটিল রোগ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। খুলনা শহরের উৎপত্তির ১৩২ বছর পর এই নদী দু’টির পানি ব্যবহারের অযোগ্য হল।
ঐতিহাসিকদের মতে, অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্রিটিশ লর্ড রিপনের শাসনামলে ১৮৮৪ সালের ১ জুলাই ১০টি গ্রাম নিয়ে খুলনা মিউনিসিপ্যালিটির যাত্রা শুরু হয়। তখন শহরের পরিধি ছিল ৪ দশমিক ৬৪ বর্গ কিলোমিটার। মিউনিপ্যালিটি এলাকায় বসবাসকারী ৬০ হাজার মানুষ পুকুর এবং রূপসা নদী ও ভৈরব নদের পানি পান করতো। স্বাধীনতার পরপর বিদ্যুৎকেন্দ্র, লবণ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং সত্তরের দশকে হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পর বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই নদীতে ফেলতে থাকে। পীর খানজাহান আলী (র.) সেতু নির্মাণের আগে এ দু’টি নদী তীব্র খরস্রোত হওয়ায় বর্জ্য দ্রুত সমুদ্রমুখী হতো। ২০০৫ সালে সেতু নির্মাণের পর নদী দু’টি খরস্রোত অনেকটা কমে যায়। বর্জ্য দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় পর্যায়ক্রমে দূষণ ছড়িয়ে পড়ে।
ভৈরব নদটি ১৯১২ সালে খুবই খরস্রোতা ছিল। কীর্তিনাশা পদ্মার উত্তরে যে স্থানে মহানন্দা নদী মিশেছে, তার দক্ষিণ থেকে এ নদীটির উৎপত্তি। দৈর্ঘ্য ৯৫ কিলোমিটার ও প্রস্থ ১৫০ গজ। যশোর হয়ে ফুলতলা ভায়া খুলনা সীমানায় নদীটি প্রবেশ করেছে। নদীর নওয়াপাড়া ঘাট ও ফুলতলার চরেরহাট স্থানের পানির নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, পানির ডিও, বিওডি গ্রহণযোগ্য মাত্রার (গ্রহণযোগ্য মান ৬ মি.গ্রা./লি. বা তার নিচে) মধ্যে রয়েছে। তবে এর লবণাক্ততার মান অনেক ওপরে। বিশেষ করে শুকনা মওসুমে এপ্রিল-জুন পর্যন্ত মানমাত্রা ১৪ পিপিটি পর্যন্ত। রূপসা নদীর ১৮৬৮ সালে নাম ছিল রূপসাহ। বৃটিশ জামানায় লবণ ব্যবসার জন্য কৃত্রিম খাল খনন করা হয়। পশুর ও কাজিবাছা নদীর সাথে যোগাযোগ রক্ষার্থেই এর সৃষ্টি। নদীটির দৈর্ঘ্য ৮ মাইল ও প্রস্থ ৩৫০ গজ।
লবণচরা ও রূপসা ঘাট থেকে নমুনা পানি পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৬ মাস ডিও মান পরিমিত মাত্রার নীচে ছিল। তবে বিওডি (গ্রহণযোগ্য মান ৬ মি.গ্রা./লি. বা তার নিচে) মান মাত্রা ভাল ছিল। কিন্তু লবণাক্ততা মান মার্চ  থেকে বৃদ্ধি পেতে পেতে মে-জুন মাসে ১৮ পিপিটি-তে উন্নীত হয়। অবশ্য, বর্ষা মওসুমে সহনশীল মাত্রায় নেমে আসে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, রূপসা ও ভৈরবের দুই তীরে গড়ে ওঠা ৫৩টি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে ৪০টি প্রতিষ্ঠানের। এসব প্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক বর্জ্য প্রতিনিয়ত নদীর পানিতে মিশছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া কারখানার বর্জ্য শোধন করে রূপসা নদীতে ফেলার নিয়ম থাকলেও খরচ বাঁচাতে অনেক প্রতিষ্ঠানই সে নিয়ম মানছে না। নগরীর দৌলতপুর-খালিশপুর এলাকায় অবস্থিত পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নামে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের ( বি.পি.সি) তিনটি তেলের ডিপো প্রতিদিন ধোয়া-মোছার পর সেই তেলযুক্ত পানি ড্রেনের মাধ্যমে সরাসরি চলে যাচ্ছে ভৈরব নদে। পরিবেশবিদদের মতে ভেসে থাকা তেলের কারণে সূর্যের আলো নদীর পানির নিচের স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে মাছ ও জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক বেঁচে থাকার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি মাছের পোনার নার্সারি গ্রাউন্ড ধ্বংস হচ্ছে। এছাড়া ভৈরব ও রূপসা নদীর দুই তীরে রয়েছে ১০টি পাটকল। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যও মিশে যাচ্ছে নদীর পানিতে। বিদ্য্ ুউৎপাদন কেন্দ্রের রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ