ঢাকা, সোমবার 5 February 2018, ২৩ মাঘ ১৪২৪, ১৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নানা সংকটে খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত ৯ পাটকল

খুলনা অফিস : নানামুখী সংকটে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল। আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ২১ হাজার ৪২৭ মেট্রিকটন পাটজাত পণ্য পাটকলগুলোতে পড়ে আছে। আর উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয় মূল্যও সঠিক সময়ে পাচ্ছে না তারা। আর ষাটের দশকের পুরাতন মেশিনে লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া। ফলে পুরাতন জরাজীর্ণ তাঁত ও মেশিনে টার্গেট উৎপাদন করতে পারছে না পাটকলগুলো। সার্বিক পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন মিলের শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অন্যদিকে এ অঞ্চলের ৯ পাটকলের দুই হাজার ৯৫৪ জন অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তার প্রায় ১৮৫ কোটি টাকার পিএফ ও গ্রাচ্যুইটি বকেয়া রয়েছে। এছাড়া শ্রমিকদের পাওনা রয়েছে মৃত ব্যক্তির বীমার টাকা ও ২০ শতাংশ মহার্ঘভাতা। একই সাথে চাকুরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছে বদলি হাজিরায় কর্মরত কর্মচারীরা।  সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, দৌলতপুর, খালিশপুর, দিঘলিয়ায় স্টার, আটরা শিল্পাঞ্চলে ইস্টার্ন, আলিম এবং যশোরের জেজেআই ও কার্পেটিং জুট মিল অবস্থিত। পাটকলগুলোতে স্যাকিং (মোটা বস্তা), হেশিয়ান (পাতলা চট) এবং সিবিসি (কার্পেট বেকিং ক্লথ) তৈরির পর এসব পণ্য সিরিয়া, ইরাক, ইরান, সুদান, মিসরসহ ৮-১০  দেশে রফতানি করা হয়। তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এসব পণ্য রফতানিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে।সূত্র জানিয়েছে, পাটকলগুলোর পাঁচ হাজার ১১৫টি তাঁতের মধ্যে বর্তমানে চলছে দুই হাজার ৮শ’ আর বন্ধ রয়েছে দুই হাজার ৩১৫টি। ফলে টার্গেটের বিপরীতে কমেছে উৎপাদন। আগে নয়টি পাটকলে প্রতিদিন ৩৮০ টন পাটজাত পণ্য উৎপাদন হতো। অথচ এখন ২৭২ দশমিক ১৭ মেট্রিক টন টার্গেটের বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৯০-২১০ টন। অসংখ্য তাঁত বন্ধ থাকায় বদলি শ্রমিকরা কাজ পাচ্ছেন না। পাশাপাশি এসব পাটকল শ্রমিকদের ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া থাকায় তারা বিপাকে রয়েছেন।  

এদিকে, নয়টি পাটকলের গোডাউনে ২১ হাজার ৪২৭ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ৩৪৪ মেট্রিক টন হেশিয়ান, চার হাজার ৯৩১ মেট্রিক টন সিবিসি, ১২ হাজার ৪৫১ মেট্রিক টন স্যাকিং এবং ৭৪২ মেট্রিক টন ইয়ার্ণ। যার বাজার মূল্য প্রায় দুইশ’ কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদিত এসব পণ্য সময়মতো বিক্রি করা যাচ্ছে না। 

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. খলিলুর রহমান বলেন, নানামুখী কারণে পাটকলগুলো লাভের মুখ দেখছে না। এর মধ্যে পুরাতন মেশিনের এফিসিয়েন্সি কম থাকায় ঠিকমত উৎপাদন হচ্ছে না। এছাড়া সময়মত কাঁচা পাট ক্রয় করা হয় না, ফলে পরবর্তীতে অধিক মূলে পাট কিনতে হয়। আর নতুন বাজার সৃষ্টি না করতে পারায় পাটপণ্য মজুদ থাকছে, ফলে আর্থিক সংকট দেখা দিচ্ছে। অথচ নতুন বাজার সৃষ্টির নামে বিজেএমসির কর্মকর্তারা বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত রয়েছেন।  তিনি বলেন, শ্রমিকদের পাওনা নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে না। প্লাটিনাম জুট মিলে আট সপ্তাহের মজুরির মধ্যে মাত্র তিন সপ্তাহের পরিশোধ করা হয়েছে, বাকী রয়েছে পাঁচ সপ্তাহের। এছাড়া ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা প্রদানের কোন খোঁজ নেই। শ্রমিকরা নিয়মিত মজুরি না পেয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। 

প্লাটিনাম জুট মিলের প্রকল্প প্রধান মো. শাহজাহান বলেন, উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বিক্রি করতে না পারায় আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে। সুদানে বিক্রিত পণ্যের প্রথম ধাপের কিছু টাকা পাওয়া গেছে। সেই টাকা দিয়ে শ্রমিকদের আংশিক মজুরি প্রদান করা হয়েছে। গেল সপ্তাহে শ্রমিকদের তিন সপ্তাহের মজুরি প্রদান করা হয়েছে। এই সপ্তাহে তাদের ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতার বকেয়া পাওনা পরিশোধের চেষ্টা চলছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেএমসির এক কর্মকর্তা বলেন, এক মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদনে যে ব্যয় হয় তার চেয়ে বিক্রয় মূল্য ১৫-২০ হাজার টাকা কম। ফলে পাটকলগুলো লাভের মুখ দেখছে না। এই মূল্যের পার্থক্য কমিয়ে আনতে পারলে লোকসান কমে আসবে। একই সাথে বিশ্বে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে উৎপাদিত পণ্যগুলোর আর পাটকলে অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে থাকবে না। এ জন্য নীতিনির্ধারক মহলকে তৎপর হতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ