ঢাকা, মঙ্গলবার 6 February 2018, ২৪ মাঘ ১৪২৪, ১৯ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঘুরে এলাম আল্লাহর দেশে

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী : শিরোনামটি শোনা বা দেখার সাথে সাথেই চমকে উঠবেন, আল্লাহর দেশ আবার কোনটা? সবইতো আল্লাহর দেশ। হ্যাঁ, কেবল বাংলাদেশ নয়, কেবল পৃথিবী নয়, চন্দ্র সূর্য নক্ষত্ররাজি কোনটাই আল্লাহর রাজ্য বা আল্লাহর দেশের বাইরে নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ইসলামে প্রবেশ করো পরিপূর্ণভাবে। আর আমার বিধান যদি ভালো না লাগে তবে আমার রাজ্য ছেড়ে চলে যাও। যাবে কোথায়? সেটাওতো আমার রাজ্য’। প্রিয় পাঠক দেশের অর্থাৎ বাংলাদেশের সাগর আর পাহাড়বেষ্টিত জেলা কক্সবাজার, বান্দরবান ঘুরে দেখতে গিয়েছিলাম কয়েকজন দেশপ্রেমিক ভ্রমণপাগল লোকের সাথে। গাজীপুর ফ্রেন্ডস্ ক্লাব, গাজীপুর নগর উন্নয়ন ফোরাম ও কনশার্স সিটি জোন এসোসিয়েশন টঙ্গীর কতিপয় কর্মকর্তা ভ্রমণে যান চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান। তাদের মাঝে ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ, যাকে উল্লেখিত ক্লাবসমুহের লোকেরা আসন্ন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। নগর উন্নয়ন ফোরামের প্রধান পৃষ্ঠপোষক জনাব খাইরুল হাসান স্নেহ আর ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে আমার মত একজন সাধারণ ব্যক্তিকেও তাদের খেদমত করার জন্য নিয়ে যান। বলাবাহুল্য দেশের প্রায় সবগুলো জেলায় যাতায়াত হলেও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোয় ইতিপূর্বে আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। এবার এ সুযোগটা হওয়ায় আনন্দের যেন শেষ নেই। ২৪ জানুয়ারী গাজীপুর ছেড়ে ২৫ জানুয়ারী’১৭ কক্সবাজার পৌঁছার পরই হোটেল সী পয়েন্টে উঠি। সবাই হোটেলে লাগেজপত্র রেখেই দৌড়ে চলে যায় সমুদ্র সৈকতে। দুপুরে যে খেতে হবে তা যেন ভুলে গেছে। আমি সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে মহান আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে ভাবছিলাম, আর চিন্তা করলাম, এ সফর নিয়ে কিছু লিখব। পরের দিন বান্দরবান যাওয়ার পর সেখানকার দৃশ্য দেখে আর না লিখে পারলাম না। কয়েক বছর পূর্বে সুন্দরবন সফরে গিয়েছিলাম। সে সময় সাথে ছিলেন প্রয়াত কবি মতিউর রহমান মল্লিক। সুন্দরবনের দৃশ্য দেখে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মনে চায় আমি এই বনে হারিয়ে যাই।’ মল্লিক ভাইয়ের কথা মনে পরে বান্দরবান যাওয়ার সময়। সেখানে রাস্তার দু’পাশে যে সুন্দর পাহাড় তা দেখে আমারই মন চেয়েছে এখানে হারিয়ে যাই। কবি মল্লিক থাকলে কি বলতেন জানি না, তবে তিনি যে সুন্দরভাবে এ সফর বা ভ্রমণ কাহিনী তুলে ধরতে পারতেন তাতে সন্দেহ নেই, যা আমি পারছি না। ভ্রমণের অন্য সদস্য কনসার্শ সিটিজেন এসোসিয়েশন টঙ্গীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক জনাব নজরুল ইসলাম আমাকে লিখার জন্য উৎসাহিত করেন। আবার পেশাজীবী ফোরামের উপদেষ্টা মাওলানা নূরুল আমিন আমার এ শিরোনাম দেখে বলেন, ‘আল্লাহর দেশ আবার কোনটা? সবইতো আল্লাহর দেশ।’ তাকে বলেছিলাম, আমি অত কঠিন কথা বুঝি না। আমি ঐ সাধারণ ব্যক্তির মতই সহজ সরল, যে ব্যক্তি আর্থিকভাবে সংকটে পড়ার পর কোন মানুষের কাছে সাহায্য না চেয়ে একেবারে সরাসরি আল্লাহর নিকট চিঠি লিখেছে এই বলে, ‘আল্লাহ আমি খুব সমস্যায় আছি, তুমি আমার জন্য একশত টাকা পাঠিয়ে দাও।’ তার এ চিঠি বাছাই করার সময় পোস্ট মাস্টার দেখল যে, প্রতি আল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর ঠিকানায় চিঠি লিখেছে। এ চিঠি বিলি করবে কোথায়? পোস্ট মাস্টার ভাবলো, আল্লাহর প্রতি যেহেতু এতটাই বিশ্বাস, তার জন্য কিছু টাকা পাঠিয়ে দেই। অমনি তার পকেটে ছিল ৯৫ টাকা, সে তা ঐ ব্যক্তির নিকট পাঠিয়ে দিল। ভাগ্যের কি পরিহাস। ঐ ব্যক্তি ৯৫ টাকা পেয়ে রাগ করে আরেকটি চিঠি লিখে বলে দিল, ‘আল্লাহ আগামীতে টাকা-পয়সা পাঠালে সরাসরি পাঠাইও, পোস্টমাস্টার ৫ টাকা কম দিয়েছে।’ প্রিয় পাঠক, গল্পটা এ জন্য বললাম যে, জনাব নূরুল আমীন সাহেবের মনের মত শিরোনাম হলো কিনা এটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো, সারা জাহান যেহেতু মহান আল্লাহর, তাই বাংলাদেশও মহান আল্লাহর। আর বান্দরবানও আল্লাহর দেশেরই অংশ। সঙ্গত কারণেই আমার লেখার শিরোনাম ‘ঘুরে এলাম আল্লাহর দেশ’। প্রসঙ্গক্রমে একটি ঘটনা তুলে ধরতে ইচ্ছে হয়, যখন পার্বত্য জেলাসমূহ নিয়ে চুক্তি হয়, এ চুক্তির বিরোধীতা করেছিল জামায়াতে ইসলামী। আর এ দলের তৎকালীন আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম তার দলের নেতাদেরকে আন্দোলনে প্রেরণা যোগানোর জন্য থানা আমীরদের গ্রুপ করে এ পার্বত্য জেলায় সফর করান। তৎকালীন সাতক্ষীরা জেলা আমীর অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ বলেন, ‘আমীরে জামায়াত আমাদেরকে প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য জেলাসমুহে কি পরিমাণ সম্পদ আছে তা দেখানোর জন্যই এ সফরের আয়োজন করেন। আমরা পাহাড়ের উপর যে লক্ষ লক্ষ কলাগাছ দেখেছি সে সম্পদের কথাই চিন্তা করে শেষ করতে পারিনি। এ কলাগাছ এক দিকে কলার চাহিদা পূরণ করে অন্যদিকে পাহাড়ে থাকা হাতির খাদ্য হিসেবে কাজ করে। মহান আল্লাহ তার সৃষ্টি হাতি পাহাড়ে কি খাবে সে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এমন সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাবে, দেশের ক্ষতি হবে, এমনটি ভেবেই দেশপ্রেমের মহান ব্রতে নিজেকে সম্পৃক্ত করার জন্য এবং অন্যদেরকে শরীক করার জন্যই এ মহান নেতা এ সফরের ব্যবস্থা করেন।’
অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহর কথা দীর্ঘদিন পরে মনে পড়ল আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে চান্দের গাড়িতে করে উপরের দিকে উঠার সময়। যে গাড়িতে করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হয় তার নাম চান্দের গাড়ি। মনে হলো যেন চান্দের দেশেই যাচ্ছিলাম। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে বিশ টাকা হালি কলা আর ত্রিশ টাকা দিয়ে একটি পাহাড়ী পেঁপে খেলাম। কলা খাওয়ার সময় তার স্বাদ আর মিষ্টি দেখে মনে পড়ে গেল জামায়াতের প্রথম আমীর মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদীর (র.) একটি উক্তি। তিনি পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসলে নাস্তার সাথে কলা খাওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘বেহেশতের হালুয়া বেহেশতের চিজ’। বিজ্ঞ লোকদের কথার অর্থই ভিন্ন, আমরা জীবনভর কলা খেলাম অথচ এটা যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্যাকেট করা হালুয়া এভাবে চিন্তা করিনি। সবকিছু বিবেচনা করে সফর থেকে যে শিক্ষা গ্রহণ করলাম তা হলো গাজীপুর ফ্রেন্ডস ক্লাব, সচেতন নাগরিক ফোরাম, নগর উন্নয়ন ফোরাম, ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ব্যবসায়ী ফোরাম ও পরিবহন মালিক সবাই মিলে কেন এ সফরের ব্যবস্থা করলো? আর সেখানে উদীয়মান সব যুবক এবং ক্রিকেট টুর্নামেন্ট বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান চেংড়া ছেলে মহিউদ্দিনও আছে। সেই সফরের মধ্যমণি কেন, প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, প্রথিতযশা আলেম গবেষক ও চিন্তাবিদ প্রিন্সিপাল মাওলানা এসএম সানাহউল্লাহ। কেমন যেন প্রশ্নবিদ্ধ মনে হচ্ছিল। এরই মধ্যে দেখা গেল কাপাসিয়ার এক যুবক সিফাউল হক খুবই মাতুব্বরী করে চলছে, তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে, এই সানাহ উল্লাহ সাহেব যে গাজীপুর কাপাসিয়ার সর্বস্তরের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন ব্যক্তি তা আমাদেরকে বুঝানোর জন্যই হয়তো এ ব্যবস্থা। আর বুদ্ধিজীবী এ সানাহ উল্লাহ সাহেবও হয়তো বা মাওলানা মওদূদী আর অধ্যাপক গোলাম আযমের কলার স্বাদ আর কলার গাছ দেখানোর জন্যই এ গহীন বনবেষ্টিত উঁচু পাহাড় দেখাতে নিয়ে এসেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জমিনকে আমি বিছিয়ে দিয়েছি আকাশটাকে করেছি ছাদ, পাহাড়গুলোকে গ্রাফী বানিয়ে দিয়েছি। অতএব, আমার কোন সৃষ্টিকে তুমি মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে।’ আল্লাহ তার সৃষ্টি সম্পর্কে যা বলেছেন, তা নিজ চোখে দেখলাম চিম্বুক পাহাড়ের চূড়ায় উঠে। সে পাহাড় থেকে নিচে অবস্থিত পাহাড়গুলোকে মেঘে ঢেকে রেখেছে। তাকিয়ে রইলাম অবাক চোখে। আল্লাহ কত সুন্দর করে বলেছেন, ‘ইচ্ছায় হউক আর অনিচ্ছায় হউক সকল সৃষ্টিই তার রবের তাসবিহ পাঠ করছে।’ তাই মনে হলো পাহাড়গুলোকে মেঘে ঢেকে রেখেছে আর পাহাড়গুলো নীরবভাবে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করছে। কৌতুহলী হয়ে জানার চেষ্টা করলাম, এ ভ্রমণের উদ্দেশ্য কি? কিন্তু কাকে জিজ্ঞেস করবো, এত বড় মাপের নেতা জনাব সানাহ উল্লাহ সাহেব। তাকে জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি। চেংড়া পোলা, ক্রিকেটার মহিউদ্দিন, তার পিছনে কতক্ষণ ঘুরলাম। সে কেবল এদিক ওদিক দৌড়াচ্ছে, মনে হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি দেখে সে পাগল। এর পর ধরলাম কনশার্স সিটিজেন এসোসিয়েশনের প্রধান জনাব নজরুল ইসলামকে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এ সফরের কারণ কি? তিনি মুচকি হেসে বলেন, বুঝেন না, সকল পেশার লোকেরা জনাব সানাহ উল্লাহ সাহেবের জন্য পাগল। তাই তারা নিজেদের উদ্যোগে এ যোগ্য নেতার পরশ পাওয়ার জন্য এ সফরের আয়োজন করে। প্রকৃতপক্ষে মেয়র প্রার্থী হিসেবে তাকে সামনের দিকে অগ্রসর করাই এ ভ্রমণের মূল লক্ষ্য।’ এরপর উঠলাম নীলগিরি পাহাড়। সেখান থেকে চতুর্দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাকি পাহাড়গুলো যেন এর কাছে বড়ই অসহায়। ফেরার পথে আমাদের গাড়িতে আসলেন একজন সেনা সদস্য। তিনি পাহাড়ে জুমচাষ ও পাহাড়িদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন সম্পর্কে চমৎকার বর্ণনা দিলেন। তিনি বলেন, ‘আরো পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনা করলে এসব পাহাড় অঞ্চল থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব।’ এ সফর থেকে বুঝতে পেরেছি, আমাদের সম্পদের অভাব নেই, আসল অভাব সততার। তাই আজ দরকার দেশপ্রেমিক ও সৎ যোগ্য নেতৃত্বের। রড ছাড়া বিল্ডিং, পোড়া মবিলের রাস্তা এবং রাস্তা তৈরির সাথে সাথেই ভেঙে যাওয়া এটা রোধ করা কোনদিনই সৎ নেতৃত্ব ছাড়া সম্ভব নয়।
তাই সফরের মধ্যমণি জনাব সানাহ উল্লাহ সাহেবদের মত নেতৃত্বের আজ খুবই প্রয়োজন। বান্দরবান থেকে চট্টগ্রাম হয়ে গাজীপুর চলে এলাম। আসার পথে টঙ্গীর মানব সেবা ফাউন্ডেশনের প্রধান জনাব আফজাল হোসাইনের কণ্ঠে সুন্দর সুন্দর গান শুনতে শুনতে গন্তব্যে চলে আসি। পেছনে পড়ে রইল স্মৃতির পাতায় আল্লাহর দেশ। আমি ব্যর্থ বইটি  পারলামনা সুন্দর করে লিখতে, না পারলাম, কবি মল্লিকের মত গাইতে।’ “তোমার সৃষ্টি যদি হয় এত সুন্দর, না জানি তাহলে তুমি কত সুন্দর খোদা, কত সুন্দর”।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ