ঢাকা, মঙ্গলবার 6 February 2018, ২৪ মাঘ ১৪২৪, ১৯ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘আমার  নেত্রী আমার মা, বন্দী হতে  দেবো না’

#  যাত্রাপথে ব্যাপক ধরপাকড়

# সংঘর্ষ, কাদানে গ্যাস নিক্ষেপ, আটক অর্ধশত 

 মোহাম্মদ জাফর ইকবাল ও কবির আহমেদ, সিলেট থেকে: বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে দলের নেতাকর্মীদের উপর ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। যাত্রাপথের বিভিন্নস্থানে নেতাকর্মীদের উপর কাদানে গ্যাস নিক্ষেপের পাশাপাশি লাঠিচার্জ করেছে। পুলিশের মারমুখো আচরনে সড়ক পথের অধিকাংশ জায়গায়ই  নেতা-কর্মীরা দাড়াতে পারেনি। তারপরও নেতাকর্মীরা অলিগলিতে অবস্থান নিয়ে তাদের প্রিয় নেত্রীকে স্বাগত জানিেিয়ছে। বিএনপির অভিযোগ, খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানাতে আসা অন্তত অধশত নেতাকর্মীকে আইনশঙ্খলা বাহিনী আটক করেছে। নরসিংদীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। নৌকার পক্ষে শ্লোগান দেয়। এসময় তাদের মারমুখী অবস্থায় দেখা গেছে। এরকম একটি ভীতিকর অবস্থার মধ্যেই নেতা-কর্মীরা যখন যেখানে পেরেছেন, প্রিয় নেত্রীকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের কন্ঠে ছিল ক্ষুব্দ শ্লোগান-'আমার নেত্রী আমার মা, বন্দী হতে দেবো না'।

গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় হযরত শাহ জালাল ও হযরত শাহ পরানের মাজার জিয়ারতের উদ্দেশে সড়কপথে সিলেটে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। সন্ধ্যা পৌনে ৬ টায় প্রথমে শাহজালাল, পরে শাহপরানের মাজার জিয়ারত করেন তিনি। আগামী ৮ ফেব্রুআরি বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়। এ রায়ের তারিখ নির্ধারনের পর থেকে নানামুখী সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবেই সিলেটে এসে মাজার জিয়ারত করলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। রায়ের দিন বিএনপি রাজধানীসহ সারাদেশে শান্তিপূর্ণ গণজমায়েতের ঢাকা দিয়েছে। সরকারও রয়েছে কঠোর অবস্থানে। গত ৩০ জানুয়ারি থেকে চলছে গ্রেফতার অভিযান। গতকাল এরই উত্তাপ লক্ষ্য করা গেছে সিলেট অভিমুখে খালেদা জিয়ার যাত্রাপথে।

সাধারণত খালেদা জিয়ার এ ধরনের সফরে জনস্রোত নামে। কিন্তু গতকাল পুলিশ ঢাকা থেকে হবিগঞ্জ পর্যন্ত বিএনপির কর্মীদের ধরপাকড়ের মধ্যে রাখে। রাজধানী থেকে বের হওয়ার পথে কোন নেতাকর্মীকে দেখা যায়নি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেয় পুলিশ। আশপাশের দোকানপাট, হোটেল রেস্তোরা বন্ধ করে রাখা হয়। নারায়নগঞ্জে পুলিশ বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে। সকাল ১১টা ২০ মিনিটের দিকে নরসিংদীর বেলানগরে পুলিশির সামনেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। যুুবদল নেতা মাহবুবুল হাসান পিঙ্কুর একটি গাড়ি এসময় ভাংচুরের চেষ্টা করা হলে পুলিশ বাধা দেয়।

নরসিংদীর শিবপুরে খালেদা জিয়া মিনিটখানেকের মতো গাড়ি থামান। কারাবন্দী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের নেতা-কর্মীরা সেখানে জড়ো হন। তিনি সেখানে তার স্বজনদের সাথে গাড়ির ভেতর থেকে হাত নেড়ে শভেচ্ছা জানান। এসময় বেশ কিছু মহিলা ও সাধারণ জনতা বেগম জিয়াকে দেখার জন্য জড়ো হন। বেগম জিয়াও সেখানে কিছু সময় অবস্থান করেন।

নরসিংদীর বিভিন্নস্থানে পুলিশ ধরপাকড় চালিয়েছে। পুলিশের নজর এড়িয়ে অনেককে শোডাউন দিতে দেখা গেছে। কিশোরগঞ্জের ভৈরবে পুলিশের সাথে কর্মীদের মারামারি হয়েছে। এখান থেকে জেলা বিএনপির সেক্রেটারিসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে পুলিশ নেতা-কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাদানে গ্যাস ছোড়ে। এখান থেকে বেশ কয়েকজনতে আটক করা হয় বলে জানা গেছে। সিলেট শহরেও ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। সার্কিট হাউজ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কিছু নেতা-কর্মী আটক করা হয়।

সামনের সীটে খালেদা জিয়া: এই প্রথম কোনো সফরে গাড়ির সামনের সীটে বসলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এর আেেগ যত সফর করেছেন তিনি পেছনের সীটে বসেছিলেন। তার পাশে মহিলা দল ও পরিবারের কোনো মহিলা সদস্য উপস্থিত থাকতেন। কিন্তু এবার বেগম জিয়াকে ভিন্নভাবে দেখা গেল। বেগম জিয়া সিলেট সফরের পুরোটা সময়েই সামনের আসনে বসেছেন। পিছনে বসেছেন তার ব্যক্তিগত সহকারী শিমুল বিশ্বাস। বেগম জিয়াকে এই সফরে কুবই উতফুল্ল দেখা গেছে। তিনি হাত রেড়ে পুরো রাস্তায় নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনতাকে হাত নেড়ে শূভেচ্ছা জানান।

মাজার জিয়ারত : সিলেট পৌঁছেই সন্ধ্যায় হযরত শাহ জালাল(রহ.) মাজার জিয়ারত করেন খালেদা জিয়া। এরপর যান শহর থেকে ৭ কিলো মিটার দূরে খাদিমনগরে হযরত শাহ পরান (রহ.) এর মাজারে। সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন হাজার হাজার মানুষের স্রোত ডিঙিয়ে হযরত শাহজালালের মাজারে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত কক্ষে মাগরিবেরর নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি ফাতেহা পাঠ করে কিছুক্ষণ মোনাজাত করেন। পরে যান শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে খাদিম নগরে হযরত শাহ পরানের মাজারে এবং সেখানে ফাতেহা পাঠ করে জিয়ারত করেন।

খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওপর, বরকতউল্লাহ বুলু, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ নেতৃবৃন্দও মাজার জিয়ারত করেন।

সার্কিট হাউজ থেকে মাজার পর্য্ন্ত সড়কের দুই পাশে হাজার হাজার নারী-পুরুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাদের নেত্রীকে মুহুর্মুহুর করতালি দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। বন্দর বাজার ও জিন্দাবাজার, আম্বর খানা সড়কের দুই পাশের উঁচু উঁচু দালানেও একনজর খালেদা জিয়াকে দেখতে মানুষের উপস্থিতি ছিলো ব্যাপক।

বিএনপি চেয়ারপারসনকে অভ্যর্থনা জানাতে আসা হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি একরকম জনসমুদ্রে রূপ নেয়। নেতা-কর্মীরা ‘আমার নেত্রী আমার মা, বন্দী হতে দেবো না’ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ধানের শীষের মালিক তুই আল্লাহ’, ‘খালেদা জিয়ার আগমন, লাল গোলাপ শুভেচ্ছা’ ‘খালেদা জিয়া এসেছে রাজপথ কেঁপেছে’ ইত্যাদি শ্লোগান দেয়।

এই ভিড় ডিঙিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসনের গাড়ি মাজার পর্যন্ত নিয়ে যেতে নিরাপত্তা রক্ষীদের চরম বেগ পেতে হয়।

এর আগে বিকাল সাড়ে ৪টায় বিএনপি চেয়ারপারসন সড়ক পথে ঢাকা থেকে সিলেট সার্কিট হাউজে এসে পৌঁছান। সেখানে দুপুরের খাবার শেষে মাজার জিয়ারতে বের হন।

সার্কিট হাউজে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মোত্তালিব, সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন জীবন, সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, মহানগর সভাপতি নাসিম হোসেইন, সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, জেলা সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সাধারণ সম্পাদক আলী আহমেদ, কেন্দ্রীয় নেতা কলিমউদ্দিন মিলন, দিলদার হোসেন সেলিম, জিকে গউস, এম নাসের রহমান, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ বিএনপি চেয়ারপারসনকে অভ্যর্থনা জানান।

হযরত শাহ জালাল মাজারে পৌঁছালে খালেদা জিয়াকে অভ্যর্থনা জানান দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানসহ নেতৃবৃন্দ।

যাত্রা শুরুর আগে খালেদা জিয়ার বাসার সামনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, তার এই সফর শুধুমাত্র জিয়ারতের উদ্দেশ্যে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক প্রচারণা করতে সিলেট যাচ্ছেন না ।

তিনি বলেন, এক বছর আগে নির্বাচনী প্রচারণার কোনো সুযোগ নেই। যেখানে এখন পর্যন্ত লেভেল প্ল্যায়িং ফিল্ড সৃষ্টি করা হয়নি সেখানে নির্বাচনী প্রচারণা কিভাবে হবে?

আমীর খসরু অভিযোগ করেন ‘ক্ষমতাসীন দল ও তাদের শরিকরা এককভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে। এখনো সব দলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা হয়নি।’

ঢাকা থেকে খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গি ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর, বরকতউল্লাহ বুলু ও যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, আবু নাসের রহমাতুল্লাহসহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে ছিলেন।

খালেদা জিয়া খালেদা জিয়া সর্বশেষ সিলেট গিয়েছিলেন দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ৪ অক্টোবর। সে সময় আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ২০ দলীয় জোটের জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসন, যদিও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোট বর্জন করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ