ঢাকা, বুধবার 7 February 2018, ২৫ মাঘ ১৪২৪, ২০ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গণহারে গ্রেফতার প্রসঙ্গে

সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেফতারের অভিযান চালানোর অভিযোগ উঠেছে। বিএনপি বলেছে, সোমবার পর্যন্ত সারাদেশে দলটির এক হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ এবং অন্য নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সদস্যরা সাদা পোশাকেও অনেক নেতা-কর্মীকে ধরে নিয়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবারও গ্রেফতারের শিকার হয়েছেন অনেকে। বিএনপি অভিযোগ তুলে বলেছে, সরকার দলটির বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে ক্র্যাকডাউন করছে।
নতুন পর্যায়ে গ্রেফতারের এই অভিযান শুরু হয়েছে গত ৩০ জানুয়ারি থেকে। সেদিন একটি পুলিশ ভ্যান থেকে বিএনপির কয়েকজন আটক নেতা-কর্মীকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছিল। পুলিশের ওপর আক্রমণও চালানো হয়েছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ বিষয়টি সরকারের সাজানো নাটক বলে আখ্যা দেয়া হলেও পুলিশ ভ্যান ও পুলিশের ওপর চালানো প্রশ্নসাপেক্ষ আক্রমণের এ ঘটনাটিকেই সরকার নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করার কারণ ও অজুহাত হিসেবে সামনে এনেছে। ক্ষমতাসীন দলের অন্য নেতাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, পুলিশ নাকি ভিডিও ফুটেজের ছবি দেখে এবং সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেই এমন নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করছে, যারা পুলিশ ভ্যানে আক্রমণ চালানোর ঘটনায় জড়িত ছিলেন।
অন্যদিকে ঢালাও গ্রেফতার অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যুক্তি ও বক্তব্য কিন্তু গ্রহণযোগ্য হতে পারেনি। কারণ, রাজধানীর পাশাপাশি গ্রেফতার করা হচ্ছে এমনকি উপজেলায় এবং গ্রামাঞ্চলেও। যেমন গত শনিবার খিলক্ষেত এলাকার একটি হোটেলে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভা শুরু হওয়ার আগে এবং সভা শেষ হওয়ার পরে অন্তত পঞ্চাশজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের প্রায় সকলেই এসেছিলেন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেÑ যারা পুলিশ ভ্যান ও পুলিশের ওপর চালানো আক্রমণে জড়িত ছিলেন না। এর পরপর গত সোমবার বেগম খালেদা জিয়া সিলেট গিয়েছিলেন দুই আউলিয়ার মাজার জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেদিনও পুলিশ যথেচ্ছভাবে বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করেছে। সিলেটে তো বটেই, নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সিলেট জেলার আশপাশের বহু এলাকা থেকেও শত শত নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অথচ তাদের কেউই পুলিশ ভ্যানে আক্রমণ চালাননি। তারা বরং তাদের নেত্রীকে এক নজর দেখার এবং সংবর্ধনা জানানোর জন্য সিলেটের দিকে যাচ্ছিলেন। ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কের প্রতিটি এলাকায় হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ করানোর মাধ্যমেও সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। বুঝতে বাকি থাকেনি যে, একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি যাতে বাধাহীনভাবে কোনো কার্যক্রম চালাতে না পারে সে উদ্দেশ্যেই আসলে দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারের অভিযান চালানো হচ্ছে।
বিএনপির পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপারেও সরকারের একই মনোভাবের প্রকাশ ঘটে চলেছে। বিশেষ করে ২০ দলীয় জোটের দ্বিতীয় প্রধান শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে। অনেক আগে থেকে চলমান জামায়াতবিরোধী কর্মকান্ডের সর্বশেষ শিকার হয়েছেন নোয়াখালী জেলা শাখার আমীর মাওলানা আলাউদ্দিন, লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলা শাখার আমীর ড. নূরুদ্দিন মাহমুদ এবং রামগঞ্জ পৌরসভা শাখার সেক্রেটারি নাজমুল হাসান পাটওয়ারিসহ ১১ জন নেতা-কর্মী। তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে গত ৪ ফেব্রুয়ারি। এই ১১ জনেরও আগে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জামায়াতের আরো অনেক নেতা-কর্মীকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বস্তুত বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জামায়াতে ইসলামীকে নির্মূল করার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এই অভিযানে দলটির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। একযোগে গ্রামাঞ্চলে পর্যন্ত এমনভাবে গ্রেফতারের অভিযান চালানো হচ্ছে, যাতে দলটির অস্তিত্বই না থাকতে পারে। ঢালাও গ্রেফতার এবং মিথ্যা মামলার ফলে জামায়াতের গ্রাম পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও নিজেদের বাসাবাড়িতে বসবাস করতে পারছেন না। সভা-সমাবেশের মতো গণতন্ত্রসম্মত কার্যক্রম চালানোও তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
বলা যায়, সব মিলিয়েই সরকার দেশে বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করার ভয়ংকর অভিযানে নিয়োজিত রয়েছে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এক বিবৃতিতে বলেছেন, গণবিচ্ছিন্ন সরকার তার কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত করার হীন উদ্দেশ্যে সারাদেশে ব্যাপক গ্রেফতার অভিযান শুরু করেছে। জামায়াতসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-নির্যাতন চালানোর মাধ্যমে সরকার দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ জানিয়ে তিনি বলেছেন, নিজেরা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করার পাশাপাশি বিরোধী দলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারের অভিযান থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, এই সরকার অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সকল দলের অংশগ্রহণে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য কোনো জাতীয় নির্বাচন চায় না। সরকার বরং একতরফা ও প্রহসনমূলক নির্বাচনের নাটক করে ক্ষমতায় টিকে থাকার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
বলা দরকার, জামায়াতে ইসলামী শুধু নয়, বিএনপিসহ অন্য দলগুলোও তাদের মূলকথায় সরকারের বিরুদ্ধে একতরফা ও প্রহসনমূলক নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়ার একই অভিযোগ তুলেছে। বলেছে, সে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্যই সরকার গণহারে গ্রেফতার শুরু করেছে। আমরা এই গ্রেফতার অভিযানের নিন্দা জানাই এবং মনে করি, সরকারের উচিত অবিলম্বে গ্রেফতার ও দমন-নির্যাতন বন্ধ করে দেশে গণতন্ত্রসম্মত পরিবেশ ফিরিয়ে আনাÑ যাতে সব দলই আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে সমান সুযোগ পায়। সেটাই গণতন্ত্রের নির্দেশনা। এভাবেই সম্ভব সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়া। গণতন্ত্রসম্মত সে পথে যাওয়ার পরিবর্তে সরকার যদি বিরোধী দলের ওপর দমন-নির্যাতন চালানোর মাধ্যমে আবারও কোনো একতরফা নির্বাচন আয়োজন করার এবং অবৈধ পন্থায় ক্ষমতায় টিকে থাকার অপচেষ্টা চালায় তাহলে তা ভালো ফল দেবে না দেশের জন্য। আমরা আশা করতে চাই, ক্ষমতাসীনরা শুভবুদ্ধির পরিচয় দিতে ভুল করবেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ