ঢাকা, বুধবার 7 February 2018, ২৫ মাঘ ১৪২৪, ২০ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জানুয়ারি মাসে রাজনৈতিক সন্ত্রাস

মুহাম্মদ ওয়াছিয়ার রহমান : জানুয়ারি মাসের প্রথমদিকে রাজনৈতিক মাঠে লক্ষণীয় ছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন, পরে আদালতের আদেশে তা স্থগিত হয়ে যায়। এ মাসে বিএনপি-আওয়ামী লীগ আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক মিডিয়া গরম করার মত কেবলমাত্র বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে সরব থাকে। তবে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে বিএনপি তাদের নেতা-কর্মীদের নিয়ে মাঠ গরম রাখতে সক্ষম হয়। জানুয়ারি মাসে ১৩৩টি রাজনৈতিক ঘটনার তথ্যে নিহতের সংখ্যা ১১। এই ১১ জনের ৩ জনই খুন হয় আওয়ামী লীগের হাতে, ছাত্রলীগের হাতে ২, যুবলীগের হাতে ৪, ছাত্রদলের হাতে ১ এবং ইউপিডিএফ-এর হাতে ১ জন। এ মাসে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় প্রাপ্ত তথ্যে আহত হয় ৬৩৩ জন এবং গ্রেফতার অনেক বেশী হলেও ২০৮ জনের তথ্য পাওয়া গেছে বাকীদের পরিচয় প্রকাশিত হয়নি, গ্রেফতারকৃতরা অধিকাংশই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং দন্ডপ্রাপ্ত ৩০ জন, এই ৩০ জনের আওয়ামী লীগের ১২, ছাত্রলীগের ১৬ এবং যুবলীগের ২জন। প্রাপ্ত তথ্যে জানুয়ারি মাসে যারা নিহত হয়- (১) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলে এক লাখ টাকার বিনিময়ে খুন হয় স্বপ্না আক্তার নামে এক নেত্রী, (২) যশোরের ঝিকরগাছায় দলীয় কোন্দলে আওয়ামী লীগ কর্মী আব্বাস আলী খুন ও (৩) মুন্সীগঞ্জ সদরে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে মানিক কাজী নামে এক কর্মী নিহত, (৪) সিলেট মহানগরীতে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হামলায় দলীয় কর্মী তানিম খান খুন হয় ও (৫) চট্টগ্রামের চকবাজারে দলীয় কোন্দলে ছাত্রলীগ কর্মী ও চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ৯ম শ্রেণীর ছাত্র আদনান ইসফার খুন হয়, (৬) চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পিবিআই তদন্তে জানার যায় যুবলীগ নেতা এনাম খুন হয় দলীয় ক্যাডারদের হাতে, (৭) নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে যুবলীগের দলীয় কোন্দলে শাকিল নামে এক কর্মী খুন হয়, (৮) ফেনীর দাগনভূঁঞায় যুবলীগের হাতে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ফখরুল ইসলাম চৌধুরী খুন ও (৯) নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যুবলীগকর্মী জাকির হোসেন খুন হয়, (১০) সিলেট মহানগরী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী শোভাযাত্রায় ধাক্কাধাক্কির জেরে ছুরিকাহত হয়ে আবুল হাসানাত শিমু খুন হয় এবং (১১) খাগড়াছড়ি সদরে ইউপিডিএফ-এর দলীয় কোন্দলে জেলা সংগঠক মিঠুন চাকমাকে হত্যা করা হয়।
আওয়ামী লীগ: ২২ নবেম্বর ২০১৭ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে খুন হয় দলীয় নেত্রী স্বপ্না আক্তার। আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসেনের পরিকল্পনায় উপজেলা ছাত্রলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদ সরকার এই হত্যা মিশন বাস্তবায়ন করে। গত ৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসেন ঢাকায় গ্রেফতার হয়ে আদালতে স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দী দেয়। গত ২০ নবেম্বর ২০১৭ ঢাকায় এমপি ফয়জুর রহমান বাদলের অফিসে আনোয়ার হোসেন ও স্বপ্নার মধ্যে বাদানুবাদ হয় এবং ছাত্রলীগ নেতা নাহিদ সরকারকে বিভিন্ন মামলায় স্বপ্না আক্তার হয়রানী করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিলম্বে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ হওয়ায় এ মাসের কলামে প্রকাশ হলো। ৩ জানুয়রি মুন্সীগঞ্জ সদরে আমঘাটা ও কংশুপুরা এলাকায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের পৃথক পৃথক সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ, বাড়ী-ঘরে হামলা ও ভাংচুর করা হয়। সদর থানা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও মোল্লাকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান মহসীনা আক্তার কল্পনা এবং থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক রিপন পাটোয়ারী গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আহতরা হলো- লিজা, মীম, খালেদা আক্তার, রতন, জনি, মরিয়ম বেগম, শাহরিয়ার, ফাইজুল দেওয়ান, সজল হোসেন, ফালান ও স্বপন মোল্লা। পুলিশ আহাদুল্লাহ মীরকে আটক করে। ফরিদপুরের নগরকান্দায় রাধানগর গ্রামে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১৫ জন। নগরকান্দর থানা আওয়ামী লীগে সভাপতি আয়মন আকবর চৌধূরী বাবলু ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জামাল হোসেন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে নান্নু মাতুব্বর, চুন্নু মাতুব্বর, আব্দুস সামাদ মোল্লা ও নূর উদ্দিন মুন্সীসহ আহত ১৫ জন। যশোরের ঝিকরগাছায় দোস্তপুরে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলে আব্বাস আলী নামে এক কর্মী খুন হয়। আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও এমপি মনিরুল ইসলাম সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্বে এই খুনের ঘটনা ঘটে। পালসার বাবু নেতৃত্বে ২০-২২ জনের বোমা হামলা ও ছুরি মেরে আব্বাসকে হত্যা করে। মুন্সীগঞ্জ সদরে মোল্লাকান্দি ইউপি আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে মানিক কাজী নামে এক কর্মী খুন হয়। পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত মর্মে রিফাত হোসেন খান, আয়নাল হক ও আল-আমিন শেখকে আটক করে।
৪ জানুয়ারি মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের সুপার ডাঃ মিজানুর রহমানকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম খোকন, এমপি ফরহাদ হোসেনের ভাই জেলা যুবলীগ যুগ্ম-আহ্বায়ক সরফরাজ হোসেন মৃদুল, আওয়ামী লীগ কর্মী দেবাশীষ কুমার বাগচি ও ইলিয়াস হোসেন। ৫ জানুয়ারি শরীয়তপুরের পালং থানার গয়াতলা বাজার, চরেরকান্দি ও মাহমুদ বাজারে জাতীয় পরিচয় পত্রের স্মার্ট কার্ড বিতরণ কালে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলে দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৩০ জন। আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নান মাদবর ও সাঈদ শেখ গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আতা ছৈয়াল, মাহবুব শেখ, তোফাজ্জল ছৈয়াল, তাইজুল ইসলাম, সজীব মাদবর, আবু আলম মাদবর, একাব্বার মাদবর, শাকিল ফকির, মোনাছ ফকির, চান মিয়া মাদবর, জয়নাল খা, হারুন মারদবর, হামিদুর রহমান, শের জামাল মাদবর, সুজন মোল্লা, আব্দুল হান্নান মোল্লা, রেজাউল মাদবর, আজিজুল খা, ছমেদ আকন, নূর ইসলাম আকন ও আব্দুল হালিম ছৈয়ালসহ উভয় পক্ষে ৩০ জন আহত হয়। ৭ জানুয়ারি যশোর জেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক এস.এম আফজাল হোসেন এবং সদর উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক শাহরুল ইসলামকে দলীয় নেতা মোশররফ হোসেন ও সদর উপজেলা ছাত্রলীগ আহবায়ক রিপন হোসেন দাদা হত্যা মামলায় জড়িত মর্মে সাময়িক ভাবে বহিষ্কার করা হয়। ৮ জানুয়ারি যশোর শহরের অভিজাত হোটেল সিটি প্লাজা থেকে এক নারী পুলিশ এএসআইসহ আওয়ামী লীগ নেতা ও এমপি স্বপন ভট্টাচার্যের ছেলে শুভকে আটক করে পুলিশ। ৯ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে সরকারী জমি দখল করা মামলায় বইলর ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মুস্তাফিজুর রহমান আদালতে হাজির হলে আদালত তাকে জেল হাজতে পাঠায়।
১১ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় ২০০ পিস ইয়াবাসহ সলঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক নাসির উদ্দিনকে দাদনপুর গ্রামে নিজ বাড়ী থেকে আটক করে র‌্যাব-১২। ১৩ জানুয়ারি বরিশালের উজিরপুরে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত উন্নয়ন মেলায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১০ জন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও এমপি তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস এবং উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা হাফিজুর রহমান ইকবাল সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষ হয়। ১৪ জানুয়ারি নড়াইল সদরের ভদ্রবিলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাবেক সভাপতি সুভাষ রায় হানু হত্যা মামলায় অপর আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান সাহিদুর রহমান মিনা, ইলিয়াস মিনা, আশিকুর রহমান মিনা, রাসেল মিনা, রবিউল মোল্লা, এনায়েত মোল্লা, ইয়াসিন মোল্লা ও মামুন মিনাসহ ৯ জনকে ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত। ঢাকার লালমটিয়ায় এম এইচ শমরিতা হাসপাতালে বিভিন্ন দাবীতে আন্দোলনরত ছাত্রদের মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি মকবুল হোসেন। ১৫ জানুয়ারি বরিশালের আগৈলঝাড়ায় আওয়ামী লীগ নেত্রী ও এমপি পিয়ারা বেগমের স্বামী ফারুক বখতিয়ারের মটর সাইকেলের সাথে বাগধা ইউপি চেয়ারম্যান ও সাবেক যুবলীগ নেতা আমিনুল আসলাম বাবুল ভাট্টির গাড়ীর সাথে ধাক্কা লাগায় এমপির দুই ছেলে মিঠু বখতিয়ার ও রিন্টু বখতিয়ার চেয়ারম্যান বাবুলকে লাঞ্ছিত করে। পুলিশ মিঠু বখতিয়ার ও রিন্টু বখতিয়ারকে আটক করে। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে নবাবপুর ইউপির ১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি লুৎফর রহমানকে ইয়াবাসহ আটক করে র‌্যাব-৮। পরে আওয়ামী লীগ লুৎফরকে সংগঠন থেকে সাময়িক ভাবে বহিস্কার করে। নাটোরের গুরুদাসপুরে নাজিরপুর হাই স্কুলের অফিস সহকারী ফরিদুল ইসলামকে মারধর করে আওয়ামী লীগ নেতা ও নাজিরপুর ইউপি চেয়ারম্যান শওকত রানা লাবুর চাচাতো ভাই সুরুজ আলীর নেতৃত্বে এক দল সন্ত্রাসী। ১৬ জানুয়ারি নারায়নগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৫০ জন। নাসিক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেত্রী সেলিনা হায়াত আইভি এবং আওয়ামী লীগ নেতা ও এমপি শামীম ওসমান গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় এমপি শামীম ওসমানের ক্যাডার যুবলীগ সাবেক জেলা যুগ্ম-সম্পাদক নিয়াজুলের হাতে পিস্তল দেখা গেছে।
১৯ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নগরপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ওয়াজ মাহফিল নিয়ে আওয়ামী লীগ দু’গ্রুপের উত্তেজনা দেয়া যায়। আওয়ামী লীগ নেতা জাহেদ আলী গ্রুপ ও রফিকুল ইসলাম গ্রুপের মধ্যে এই উত্তেজনা দেখা দেয়। ফলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। নোয়খালীর কোম্পানীগঞ্জে বিরাহীমপুর গ্রামে মসজিদের কমিটি গঠন নিয়ে আওয়ামী লীগ দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ২০ জন। আওয়ামী লীগ জিয়াউল হক-মাষ্টার নজরুল ইসলাম গ্রুপ এবং হাজী রুহুল আমীন-সাঈদ খোকন গ্রুপের মধ্যে এই সংঘর্ষ হয়। ২০ জানুয়ারি ফরিদপুরের শালথায় মাঝারদিয়া ও রামকান্তপুর এলাকায় বিগত দু’দিন ধরে আওয়ামী লীগ দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১৫০ জন। মাঝারদিয়া ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি হাবিবুর রহমান হামিদ ও মাঝারদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম মাতুব্বর গ্রুপের মধ্যে এবং রামকান্তপুর এলাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধূরী সাব্বির আলী ও রামকান্তপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আলতাফ মোল্লার সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষ, বাড়ী-ঘর ও দোকানপাট ভাংচুর করা হয়। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ