ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 February 2018, ২৬ মাঘ ১৪২৪, ২১ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশজুড়ে ব্যাপক তল্লাশী ধরপাকড় হয়রানি

* পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি মোতায়েন

* ঢাকায় ঢোকার পথে পথে তল্লাশি, কড়া নজরদারি

* সচিবালয়, কারাগার, আদালতে নিরাপত্তার তোড়জোড়

* শাহজালালে বাড়তি নিরাপত্তা, দর্শনার্থী প্রবেশ নিষেধ

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার রায় ঘিরে দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদারের নামে পুলিশ-র‌্যাবসহ আইনশৃংখলাবাহিনীর ব্যাপক তল্লাশীর মুখে পড়ে চরম হয়রানির শিকার হয়েছে সাধারণ জনগণ। রাজধানীসহ দেশের সব ক‘টি জেলা-উপজেলায় চলছে পাইকারীহারে ধরপাকড়। এ ধরপাকড়ের মধ্যে দেশজুড়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠার সৃষ্টি হয়েছে জনমনে। বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, মেসবাড়ি, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাটে তল্লাশীর নামে অস্বস্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে আইনশৃংখলাবাহিনী। রায় ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশির পাশাপাশি মহাসড়কে কড়া নজরদারি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

এদিকে, সারাদেশে বাড়তি পুলিশ-র‌্যাব মোতায়েনের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবিও মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের নিরাপত্তা টহল জনমনে ভীতির সঞ্চার করেছে। আজ কি হবে-এ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বাড়ছেই। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি-ঘরের বাইরে কাউকেই গতকাল দুপুরের পর থেকে বাইরে বের হতে দেখা যায় নি। রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কগুলোতে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা কমতে শুরু করে প্রায় একই সময় থেকেই। যার কারণে ঢাকার সাথে দূরপাল্লার যানবাহনের যোগাযোগ কমে যাওয়ায় রাঝধানী কার্যত; বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার রায় বিপক্ষে গেলে বিএনপি সমর্থকরা ঢাকায় জড়ো হয়ে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহনে ব্যাপক তল্লাশির পাশাপাশি রাজধানীতে নিরাপত্তা চৌকির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। 

ঢাকা মহানগরী এলাকায় গতকাল ভোর থেকে সব ধরনের মিছিল জমায়েত নিষিদ্ধ করার কথা মঙ্গলবারই জানিয়েছিল পুলিশ।

চট্টগ্রামের পুলিশও একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। গতকাল ভোর থেকে বন্দরনগরীতে সব ধরনের দেশীয় অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রামের সিমেন্ট ক্রসিং থেকে পতেঙ্গার ১১ নম্বর ঘাট পর্যন্ত সড়কে বুধবার বিকাল ৪টা থেকে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

গাজীপুর ও নরায়ণগঞ্জেও বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে পুলিশ, সন্দেহ হলেই যানবাহনে চালানো হচ্ছে তল্লাশি। 

ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে আজ বৃহস্পতিবার জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার তারিখ রয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সাজা হতে পারে।

বিএনপির অভিযোগ, সরকার বিএনপি নেত্রীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই ‘মিথ্যা’ এই মামলাকে রায় পর্যন্ত টেনে এনেছে। রায় বিপক্ষে গেলে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারিও তারা দিয়ে রেখেছে।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও রায়ের দিন মাঠে থাকার ঘোষণা দেওয়ায় তৈরি হয়েছে উত্তেজনা।

এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে দুই প্রধান দলের নেতাদের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চলছে সাধারণ মানুষের মনে।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “রায়কে কেন্দ্র করে আমরা সতর্ক রয়েছি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই আমরা নেব।”

পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী মঙ্গলবারই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

র‌্যাবও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে তল্লাশি অভিযান, টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে বলে এ বাহিনীর মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষের স্বস্তি যাতে নষ্ট না হয়, তাদের মধ্যে যেন আতঙ্ক তৈরি হতে না পারে, সে চেষ্টা আমরা করছি।”

পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সরকারসমর্থক সংগঠনগুলো যে কোনো পরিস্থিতিতে মাঠে থাকার ঘোষণা দিলেও সাধারণ চালকরা বলছেন, রাস্তায় ঝামেলা হলে যানবাহনেরই ক্ষতি হয় বেশি। ফলে আজ গাড়ি বের করা নিয়ে অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন।

আর বিএনপির কর্মসূচি ঠেকাতে অতীতে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বিশেষ বিশেষ দিনে বাস চলাচল বন্ধ রাখতে বলার কথাও মনে করিয়ে দেন কয়েকজন চালক। 

বঙ্গবন্ধু সেতু বা আরিচা হয়ে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের যেসব বাস ঢাকার পথে আসে, সেগুলোর বেশিরভাগই রাজধানীতে ঢোকে গাবতলী হয়ে।

দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান বলেন, রায় ঘিরে তারা গাবতলী এলাকায় বাড়তি জনবল নিয়োজিত করেছেন। সন্দেহ হলে যে কোনো বাস, ট্রাক বা পথচারীদের তল্লাশি করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইল, গাজীপুর থেকে ময়মনসিংহ রোড হয়ে রাজধানীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ পথ উত্তরা। সেখানেও কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে বলে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মো. আলী হোসেন খান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আবদুল্লাহপুর এলাকার দুটি চেকপোস্টে জনবল বৃদ্ধি ছাড়াও পুলিশ সদস্যদের সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।

একই ধরনের কথা বলেছেন ডেমরা থানার ওসি এস এম কাওছার। নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হয়ে রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ পথ ওই এলাকা। 

র‌্যাব-১১ এর মুন্সিগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মো. নাহিদ হাসান জনি জানান, তারা রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের নিরাপত্তা জোরদার করেছেন। চেক পোস্টে তল্লাশির পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে টহল।

রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোতে আবাসিক হোটেল, বোর্ডিং হাউস আর মেস বাড়িগুলোর দিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। 

সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস বলেন, “যে সব এলাকায় সিসি ক্যামেরা রয়েছে সেগুলোকে সচল রাখার পাশপাশি সব বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশপাশি আবাসিক হোটেলগুলোতে নিয়মিত তল্লাশি চালাতে বলা হয়েছে।”

গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, তার এলাকায় আজ সব ধরনের সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাঁচজনের বেশি একসঙ্গে চলাফেরা না করতে বলা হয়েছে। এছাড়া যানবাহনেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

রায়কে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খখলা ঠেকাতে প্রস্তুত থাকার কথা বলেছেন নরায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ মতিয়ার রহমানও।

রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান জানান, তারা সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ না করলেও সর্তক রয়েছেন এবং সময় বুঝে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

ভিডিও কন্ফারেন্স পুলিশ প্রধান কী কী নির্দেশনা দিয়েছেন জানতে চাইলে বরিশালের পুলিশ কমিশনার রুহুল আমীন সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে চাননি। তিনি বলেন, নির্দেশনার বিষয়টি ‘গোপনীয়’। তা বলা ‘ঠিক হবে না’।

তবে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন রেঞ্জের ডিআইজি, প্রত্যেক জেলার পুলিশ সুপার এবং মহানগর পুলিশ কমিশনারদের কাছে যে নির্দেশনার চিঠি গত সপ্তাহে গেছে, সেখানে রায় ঘিরে ‘অস্থিতিশীল পরিবেশ’ সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা, গণপরিবহনে হামলা-অগ্নিসংযোগ, সরকারি- বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রেলপথেও হামলার বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে পুলিশ বাহিনীকে।

আদালতে নিরাপত্তার তোড়জোড়

আদালত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তোড়জোড় চলছে। রায় ঘোষণার আগের দিন গতকাল বুধবার দুপুরে বকশীবাজারে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে গিয়ে র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের ব্যাপক তৎপরতা চোখে পড়ে।

র‌্যাব- ১০ এর কর্মকর্তা এএসপি মাসুদ রানা বলেন, অস্থায়ী এই আদালত ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তারা ঘনঘন টহল দিচ্ছেন এবং সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করছেন। টহল শেষ করে কর্মকর্তারা আদালত চত্বরে ঢুকে দায়িত্বর পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের পরবর্তী নির্দেশনাও দিচ্ছেন।

কারা অধিদপ্তরের মাঠ সংলগ্ন এই আদালত প্রাঙ্গণের বিভিন্ন অংশে সিসি ক্যামেরা লাগাতে দেখা যায় র‌্যাব সদস্যদের। গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যদেরও পৃথকভাবে সিসি ক্যামেরা লাগাতে দেখা যায়।

এদিকে সকাল থেকেই আদালত এলাকায় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের তৎপরতা দেখা যায়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আদালতগুলোর আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা প্রস্তুতির তদারকি করেন।

শুধু পুলিশ নয়, রাজধানীতে আজ থেকে মাঠে থাকবে সব সংস্থা

যেকোনও ধরনের নাশকতা এড়াতে গতকাল বুধবার থেকে আগামী তিনদিন পুলিশের পাশাপাশি মাঠে থাকবে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্র - এই তিনদিনকে বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় নিয়েছে রাষ্ট্রের অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। তাদের সঙ্গে সক্রিয় থাকবে গোয়েন্দারাও।

বিশেষ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় কর্মরত সব সংস্থার সদস্যদের ছুটি গতকাল থেকে বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে বলে জানা গেছে। 

ওই সূত্রের দাবি, রায় পরবর্তী সহিংসতা হতে পারে এমনটি বিবেচনায় রেখে সম্ভাব্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যেসব জায়গায় সহিংসতা হতে পারে সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কারা এগুলো ঘটাতে পারে তাদেরও একটি সম্ভাব্য তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। 

সূত্র জানায়, নাশকতা হতে পারে এমন সম্ভাব্য স্পটগুলোতে আগে থেকেই পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত থাকবেন। তারা গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। রাজধানী ঘিরে নেয়া হয়েছে নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

কেন্দ্রীয় কারাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার

ঢাকার কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। 

গতকাল বুধবার ঢাকা-মাওয়া সড়কের পাশে কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় দেখা যায়, বাইরে অসংখ্য কারারক্ষী টহল দিচ্ছে। কারাগারের প্রবেশমুখে বসানো হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা চেকপোস্ট। প্রবেশের সময় প্রত্যেক দর্শনার্থীর শরীর ও তাদের সঙ্গে থাকা ব্যাগ তল্লাশি করা হচ্ছে।

কারাগারের তথ্য কেন্দ্রে দায়িত্বরত সুবেদার আলী হোসেন বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য আমরা সবসময় অ্যালার্ট থাকি। কারাগার চত্বরে এসবি, ডিএসবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল চোখে পড়ার মতো।’

নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুব আলম ও সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর আলমের মোবাইলে একাধিকবার কল দিয়েও তাদের পাওয়া যায়নি।

কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় বাড়ানো হয়েছে পুলিশের টহল এদিকে একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রাজনৈতিক বন্দিদের কাশিমপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হচ্ছে। অন্যদিকে, কেরানীগঞ্জ মডেল ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার রাজধানীর প্রবেশমুখসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশের টহল ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি শাকের মোহাম্মদ যুবায়ের জানান, বছিলা সেতুর প্রবেশমুখে ঘাটারচর, জনি টাওয়ার, কদমতলীতে দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর প্রবেশমুখসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশের টহল ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলাম জানান, রায়কে কেন্দ্র করে কেউ যেন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটাতে পারে সেজন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিশেষ নজরদারি

সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বিশেষ নজরদারিতে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরমধ্যে জাতীয় সংসদ ভবন, সচিবালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, ফায়ার সার্ভিস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের করা এই মামলার রায়কে ঘিরে কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা বা যেকোনও ধরনের নাশকতা থেকে এসব স্থাপনাকে মুক্ত রাখতেই সরকারের পক্ষ থেকে এই বিশেষ সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। 

বাংলাদেশ সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত একাধিক সংস্থার কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সচিবালয়ের নিরাপত্তা বিধানে সব সময়ই নজরদারি থাকে। তবে ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে জনমনে কিছুটা আতঙ্ক থাকায় বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ওইদিন বা তার আগে থেকে সচিবালয়সহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বিশেষ নজরদারিতে থাকবে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের চারপাশসহ অভ্যন্তরীণভাবে বসানো সিসিটিভিগুলো সচল রয়েছে। এখন সেগুলোর কার্যক্রম কঠোর মনিটরিং হচ্ছে। চারপাশে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

শীতকালীন অধিবেশন চলার কারণে এমনিতেই জাতীয় সংসদ ভবনের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কড়াকড়ি করা হয়েছে। এর ওপর বাড়তি নজরদারি রয়েছে খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে যেন এখানে কোনও ধরনের নাশকতার ঘটনা না ঘটে। তবে জাতীয় সংসদ ভবনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়টি অতীতের চেয়ে বাড়বে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস দফতরের একজন কর্মকর্তা।

শাহজালালে বাড়তি নিরাপত্তা, দর্শনার্থী প্রবেশ নিষেধ

বাড়তি নিরাপত্তার জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমন ও বহির্গমন হলে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুর থেকে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে নিশ্চিত করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সূত্র।

বিজিবি নেমেছে রাজপথে

বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় রাজপথে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এ বাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মহসীন রেজা বলেন, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ঢাকায় ২০ প্লাটুন বিজিবি নেমেছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় সন্ধ্যা পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৭০ থেকে ৮০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে মহসীন রেজা জানান।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের প্রতিটি প্লাটুন গঠন করা হয় ২০ থেকে ৩০ জন সদস্য নিয়ে। ফলে ঠিক কতজন বিজিবি সদস্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে থাকবেন, তা জানাতে পারেননি মহসীন। তিনি বলেন, “এখনও বিভিন্ন জেলা থেকে বিজিবি চেয়ে আবেদন আসছে। সব হিসাব করে আমি আপনাদের জানাতে পারব।”

আমাদের রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, সেখানে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বিকাল থেকেই। তারা বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে পুলিশের সঙ্গে তল্লাশি কার্যক্রম তদারকি করছে।

রাজশাহীর ১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামীম মাসুদ আল ইফতেখায়ের বলেন, “জানমালের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। জননিরাপত্তা দিতে নগরীতে চার প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।” 

চলছে গণগ্রেফতার

সারা দেশে গণ-গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে পুলিশ ও র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত এক সপ্তাহে অন্তত দুই হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর বাসাবো এলাকা থেকে স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা দক্ষিনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বজনরা। টঙ্গীতে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান উদ্দিন সরকারেসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ৬ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার মাগরিবের নামাজের পর তাকে আটক করা হয়। হাসান উদ্দিন সরকার গাজীপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও গাজীপুর পৌরসভার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া, টঙ্গী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম শুক্কুরের বাড়ি তছনছ করেছে সাদা পোশাকদারী একদল পুলিশ। রোববার রাতে এ তল্লাশি চালায় পুলিশ। অপরদিকে, সিরাজগঞ্জে বিএনপি-জামায়াতের ৫ নেতাকর্মী, চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি-জামায়াতের ৩৯ জন, সুনামগঞ্জে বিএনপির ২১ নেতাকর্মী, পাবনায় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ গ্রেফতার ৫ জন, বাগেরহাটে বিএনপির ৭ নেতাকর্মী, রংপুরে জামায়াতের ৩ নেতা, মাদারীপুরে বিএনপি ও জামায়াতের সেক্রেটারিসহ ৯ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এদিকে যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মুহাদ্দিস আবু সাঈদ মোঃ শাহাদৎ হুসাইন আটক হয়েছেন। মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে গ্রেফতার করা হয়। কিশোরগঞ্জের ভৈরবে বিএনপির ৮ নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের পর আদালতের নির্দেশে তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সোমবার বিকেলে গ্রেফতারের পর রাত ১১টার পরে তাদের কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। চাঁদপুরে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানসহ বিএনপি’র ২০ নেতাকর্মী আটক করেছে জেলার বিভিন্ন থানা পুলিশ। এর মধ্যে সোমবার রাতেই বেশ কয়েক জনকে আটক করেছে সদর থানা, হাজীগঞ্জ ও ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশ। নাশকতার আশঙ্কায় নোয়াখালী জেলা পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে সোমবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আলাউদ্দিনসহ ১১ নেতাকর্মীকে আটক করেছে। 

এদিকে, সোমবার খালেদা জিয়ার সিলেট সফর উপলক্ষে পোস্টার লাগাতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ মুশফিক আহমেদ। ঝিনাইদহের ৬ উপজেলায় অভিযান চালিয়ে ছাত্রদলের কেসি কলেজ শাখার সভাপতি আব্দুস সালামসহ বিএনপি ও জামায়াতের ৬৯ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানাতে এসে সোমবার পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনিপর সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন ও নজরুল ইসলাম আজাদসহ ৬ বিএনপি নেতা। এর আগে, শনিবার দিবাগত রাতে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চন পৌরসভার মেয়র ও বিএনপি নেতা আবুল বাশার বাদশাসহ বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের ১১ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। পরের দিন রোববার নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজীবকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার বিকেল ৫টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের মিশনপাড়ার বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

সাতক্ষীরায় বিএনপি জামায়াতের ১০ নেতাসহ ৩৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতদের মধ্যে তালা ইসলামকাটি ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি শাহিন মোড়ল(৩৫), দেবহাটা বয়েরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শহিদুর ইসলাম (৫২) রয়েছেন। যশোর বিমানবন্দর থেকে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আটক ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলা উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এড এম এ মজিদকে রোববার রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাত সোয়া ৮টার দিকে যশোর বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার, মুন্সীগঞ্জ শহরের থানারপুল এলাকা থেকে বিএনপির ৩ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। গত রোববার সদর থানার পুলিশ তাদের আটক করেছে।

নড়াইল পৌরসভার সাবেক মেয়র জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি জুলফিকার আলী মন্ডলকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার গভীর রাতে নড়াইলের আলাদাৎপুর এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি-জামায়াতসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িতে তল্লাশি ও হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেই সাথে বিএনপি নেতাকর্মীরা গ্রেফতার এড়াতে দলীয় কার্যালয়ে তালা দিয়ে রেখেছেন। অনেকে রাতে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র থাকছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ