ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 February 2018, ২৬ মাঘ ১৪২৪, ২১ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রসঙ্গ নবজাতকের মৃত্যু

নবজাতকসহ শিশুদের মৃত্যু প্রসঙ্গে এমন কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো অত্যন্ত আশংকাজনক। গত বুধবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশে প্রতি বছর গড়ে ৬২ হাজার নবজাতকের মৃত্যু হচ্ছে। প্রসব-পূর্ব, প্রসবকালীন এবং প্রসব-পরবর্তী যথাযথ সেবা ও চিকিৎসার অভাবই এই বিপুলসংখ্যক নবজাতকের মৃত্যুর কারণ। তাদের ৮৮ শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে ইনফেকশন বা সংক্রমণ, শ্বাসজনিত সমস্যা এবং অপরিণত অবস্থায় জন্মের কারণে। এ সংক্রান্ত সবচেয়ে ভীতিকর তথ্য হলো, প্রসবের সময়ই প্রায় ৬০ শতাংশ নবজাতকের মৃত্যু হচ্ছে আর জন্মের পর মাত্র একদিনের মধ্যেই মারা যাচ্ছে প্রায় ৫০ শতাংশ নবজাতক। মাতৃমৃত্যুর পরিসংখ্যানও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ও উদ্বেগজনক। সন্তান প্রসব করার সময় দেশে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেড়ে চলেছে এবং প্রতি এক লাখ শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হচ্ছে ১৯৬ জন মায়ের।  এখানেই শেষ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতাল বা কমিউনিটি ক্লিনিকে নেয়ার পরিবর্তে বাসাবাড়িতে প্রসব করানোর কারণে ৫৫ শতাংশ মাতৃমৃত্যু এবং ৭৩ শতাংশ নবজাতকের মৃত্যু ঘটছে।
সন্তান প্রসবকারী মা ও নবজাতকের মৃত্যু প্রতিরোধের উপায় নিয়ে অনুষ্ঠিত বুধবারের ওই সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সামান্য ও সাধারণ কিছু বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন এবং মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করা গেলেই এত বিপুল সংখ্যক মা ও শিশুকে বাঁচানো সম্ভব। প্রথম পন্থা হিসেবে অদক্ষ দাইদের দিয়ে বাসাবাড়িতে প্রসব করানোর পরিবর্তে সন্তানসম্ভবা মায়েদের হাসপাতাল, মাতৃসদন ও সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিকে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা সেই সাথে নবজাতকের শরীর দ্রুত মুছে দেয়ার এবং দেরিতে গোসল করানোর বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বলেছেন, বাঁচাতে হলে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। তাছাড়া নবজাতক যদি অপরিণত ও স্বল্প ওজনের হয় তাহলে তাকে মায়ের দুই স্তনের মাঝখানে ত্বকের সঙ্গে লাগিয়ে শুইয়ে রাখতে হবে। মায়ের হাত অবশ্যই ধুযে পরিষ্কার করতে হবে। কিশোরী মায়েদের ব্যাপারেও বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার, যাতে কিশোরীদের সন্তান ধারণ করতে এবং সন্তান প্রসব করতে না হয়।
এ ধরনের আরো কিছু বিষয়েরও উল্লেখ করেছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বাসাবাড়িতে প্রসব না করানোর ব্যাপারে। এই অভিমত বা পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই, কিন্তু কতটা বাস্তবসম্মত সেটাও ভেবে দেখা দরকার। কারণ, মাত্র কিছুদিন আগে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সরকারি হাসপাতাল ও মাতৃসদন ধরনের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া সম্ভব নয় বললেই চলে। ফলে প্রতি পাঁচজন গর্ভবতী মায়ের মধ্যে একজন প্রসবের আগে, প্রসবকালে এবং প্রসব-পরবর্তী সময়ে কোনো রকম স্বাস্থ্যসেবাই পান না। ৫০ শতাংশ গর্ভবতী নারী দক্ষ স্বাস্থ্য কর্মী বা ধাত্রীর সেবা পাওয়া থেকেও বঞ্চিত থাকেন।
ব্যাপকভাবে আলোচিত ওই রিপোর্টে আশংকাজনক আরো অনেক তথ্য-পরিসংখ্যানেরও উল্লেখ করা হয়েছিল। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য হলো, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩১ লাখ শিশুর জন্ম হয় কিন্তু ১০ লাখেরই জন্ম হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গেও রয়েছে বিস্ময়কর কিছু তথ্য। যেমন অর্ধেকের বেশি ক্ষেত্রে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর জন্ম দেয়া হয়। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় জানা গেছে, প্রসবের সময় খুব বেশি হলে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ গর্ভবতী মায়ের জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়তে পারে। বাকি প্রায় ৮৫ শতাংশেরই স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব করার কথা। অন্যদিকে বাংলাদেশে অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে ঢালাওভাবে।
একই কারণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয়া তথা সিজারিয়ান শিশুর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। ২০০১ সালে মাত্র তিন শতাংশ শিশুকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মায়ের গর্ভ থেকে বের করা হয়েছে। ২০১০ সালে এই শিশুদের হার ছিল ১২ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে তিনজনেরও বেশি শিশুর জন্ম দেয়া হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। অস্ত্রোপচারের ব্যাপারেও কথা রয়েছে। বেশিরভাগ অস্ত্রোপচারই করা হয় প্রাইভেট বা বেসরকারি ক্লিনিকে এবং সেখানে চিকিৎসার চাইতে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যই প্রধান হয়ে থাকে। সে কারণে সন্তান সম্ভবা ও প্রসবকারী মায়েদের মৃত্যু ঘটে আশংকাজনক হারে। এসব বিষয়ে অতি সাম্প্রতিককালেও বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। রায় দিতে গিয়ে হাই কোর্টের মাননীয় বিচারপতিরা পর্যন্ত বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ না করে পারেননি।
এমন অবস্থার কারণ পর্যালোচনায় দেখা যাবে, মূলত সরকারি হাসপাতালে সুযোগ পাওয়া যায় না বলেই একদিকে বাসাবাড়িতে অদক্ষ দাইদের দিয়ে সন্তান প্রসব করানো হয়, অন্যদিকে চিকিৎসার নামে এক শ্রেণীর অর্থলোভী মানুষ ব্যবসা করে থাকে। সরকারি হাসপাতালের অনেক চিকিৎসকও নিজেদের দায়িত্বে ফাঁকি দিয়ে অর্থলোভী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যুক্ত হন। একই কারণে সাধারণ মানুষ শুধু চিকিৎসা সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না, মৃত্যু ঘটছে হাজার হাজার নবজাতকের। তাদের মায়েরাও মারা যাচ্ছে অসহায়ভাবে। সুতরাং মা ও নবজাতকের মৃত্যু প্রতিরোধ করতে হলে সরকারি হাসপাতাল, মাতৃসদন ও কমিউনটি ক্লিনিকের সংখ্যা যেমন বাড়াতে হবে তেমনি নিশ্চিত করতে হবে চিকিৎসা সেবাও। এ ব্যাপারে যতো দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে ততো দ্রুতই নবজাতক ও মাতৃমৃত্যু কমে আসবে বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ