ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 February 2018, ২৬ মাঘ ১৪২৪, ২১ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়

খুলনা অফিস : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ঘোষণাকে সামনে রেখে খুলনা মহানগর বিএনপি আগাম কর্মসূচি ঘোষণা না করলেও নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ঢাকার আদালতে রায় ঘোষণা করা হবে। এ মামলায় তিনি দোষী প্রমাণ হলে তাকে কারাগারে যেতে হবে। এ রায় ঘোষণাকে সামনে রেখে গত কয়েক দিন ধরে খুলনা শহর এবং জেলায় পুলিশের ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে শহরের অর্ধশত নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে বলে নেতারা জানিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বুধবার সকাল থেকে যাতায়াত পথে, নগরীর প্রবেশদ্বারে ও খুলনার স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে তল্লাশী চৌকি ও ভ্রাম্যমাণ টীমে তল্লাশী জোরদার করেছে পুলিশ। শহরের অভিজাত এলাকা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তল্লাশী পরিচালিত হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগও উঠেছে। আর আতঙ্কে রয়েছেন বিরোধী দল-মতের নেতাকর্মীরা। গা ঢাকা দিয়ে পরিবারের সাথে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন করেছেন অনেকেই। এ অবস্থায় গভীর রাতে পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের নারী সদস্যদের সাথে দুর্ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। আবার কোন কারণ ছাড়াই নেতাকর্মীদের আত্মীয়-স্বজনদেরও হয়রানি করা হচ্ছে। কতিপয় অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেবারও অভিযোগ উঠেছে। শহরের চেয়ে উপজেলায় পর্যায়ে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
গত সোমবার খুলনা মহানগর বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির জরুরি সভার পর প্রকাশ্যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। তবে রায় ঘোষণার দিন নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতি নিয়ে রাজপথে থাকতে বলা হয়েছে।
রায় ঘোষণা দিন মহানগর আওয়ামী লীগও কোনো কর্মসূচি রাখেনি। ওই দিন শহরে জনসভা করার কথা থাকলেও পরে তা বাতিল করা হয়। তবে দলের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতিপক্ষের যে কোনো হামলা মোকাবেলায় তারা প্রস্তুত থাকবে বলে নেতারা জানিয়েছেন।
এদিকে নাশকতা প্রতিরোধে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে পুলিশ মাঠে নেমেছে। বুধবার থেকে মহানগরীর রূপসা ঘাট, জেলখানা ঘাট, পথের বাজার, গল্লামারী, রয়্যাল মোড়, শিববাড়ি মোড়, ডাকবাংলো মোড়সহ ১৬টি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। সাদা পোশাকে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের সঙ্গে সঙ্গে নগরীতে নিñিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
খুলনা মেট্রোপলিট্রন পুলিশের পক্ষ থেকে বুধবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার মধ্যরাত পর্যন্ত নগরীতে সব ধরনের লাঠি, ছড়ি, আগ্নেয়াস্ত্র বহন এবং জনসাধারণের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৭ ফেব্রুয়ারি বুধবার থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার পর্যন্ত মহানগরীতে সব ধরনের (বৈধ) আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
খুলনা মহানগর বিএনপি সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, রায় ঘোষণার পরপরই তাদের কর্মসূচি শুরু হবে। কর্মসূচি ‘কী’ হবে- সেটা তখনই নির্ধারণ করা হবে। তবে সব কিছু হবে শান্তিপূর্ণভাবে। 
বৃহস্পতিবার নগরীর হাদিস পার্কে পূর্ব-নির্ধারিত জনসভা বাতিল করেছে আওয়ামী লীগ। দলীয় কার্যালয়ে বসে নেতা-কর্মীরা সময় কাটাবে।
খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজান মনে করেন, সব কিছুই স্বাভাবিক থাকবে। ওই দিন কিছুই হবে না। অযথা উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, রায়কে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার জন্য বলা হয়েছে। তাদের নেতা-কর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে থাকবে। তারা কোনো বিবাদে জড়াবে না। তিনি বলেন, ‘‘আইন সবার জন্য সমান। বর্তমান সরকার মানুষের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মনিরা সুলতানা বলেন, খুলনা শহরজুড়ে নিñিদ্র নিরাপত্তা গড়ে তোলা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের সঙ্গে র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে কাজ করছে। নগরীর জেলখানা ঘাট, রূপসা ঘাট, পথের বাজার, গল্লামারী, রয়েল মোড়, শিববাড়ি মোড়, ডাকবাংলো মোড়সহ ১৬টি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং সাদা পোশাকে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে বিজিবিও মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, বৃহস্পতিবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১২ শ’ থেকে ১৫ শ’ সদস্য দায়িত্ব পালন করবে।  তিনি জানান, মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১০ জন বিএনপি নেতাকর্মী ও একজন জামায়াত নেতাকে আটক করেছে।
কেএমপি কমিশনার মো. হুমায়ুন কবির বলেছেন, ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মহানগরীতে সকল প্রকার (বৈধ) আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সংঘবদ্ধভাবে জমায়েত করা যাবে না। কোন সভা-সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি কাউকেই। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নগরীর প্রবেশদ্বারে তল্লাশী জোরদার করা হয়েছে। তবুও শান্তিপূর্ণ নগরবাসীর সহযোগিতা চাইছেন তিনি।
এদিকে খুলনায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে বিএনপি-জামায়াতের ১৫ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত খুলনা জেলা ও মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এদিকে সোমবার রাতে পুলিশ মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক খোরশেদ জাহান রানা, ২৬নং ওয়ার্ড বিএনপি’র যুগ্ম-সম্পাদক আব্দুর রহমান এবং দৌলতপুর থানা যুবদল নেতা মিলটনকে গ্রেফতার করেছে বলে দাবি করেছে নগর বিএনপি।
অন্যদিকে, জেলা ডিএসবি’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সিএ হালিম জানান, গত সোমবার রাতে অভিযান চালিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের ৮ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বটিয়াঘাটা উপজেলার মজিদঘাটা এলাকায় বিশ্বাস বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পেট্রোল বোমা, জিহাদী বই ও লিফলেটসহ জামাতের তিন নেতা-কর্মীকে আটক করেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, নাশকতার পরিকল্পনা করার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আসামীদের আটক করা হয়। আটককৃতরা হলেন, বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি ও টালিয়ামারা গ্রামের মৃত সামাদ বিশ্বাসের ছেলে আব্দুল হাই বিশ্বাস (৩৫), কাতিয়ানাংলা গ্রামের মৃত খালেক লস্করের  ছেলে খানজাহান লস্কর (৩০), হাদিরাবাদ গ্রামের মজিদ শেখের ছেলে আতিয়ার রহমান শেখ (৪০)। এ ব্যাপারে বটিয়াঘাটা থানায় নাশকতার অপরাধে অজ্ঞাতনামা ১৫ জনসহ ৫ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে (নং-৩)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ