ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 February 2018, ২৬ মাঘ ১৪২৪, ২১ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ মামলার রায় আজ

 

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : আজ ৮ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার। আদালতের সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত থাকলে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হবে আজ।  ঢাকার বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের বিশেষ আদালত -৫ এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। রায়কে ঘিরে দেশব্যাপী ব্যাপক উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। চলছে গণগ্রেফতার, তল্লাশিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা তৎপরতা। সেই সাথে ক্ষমতাসীন দল-আওয়ামী লীগের হুশিয়ারি ও রাজপথ দখলে রাখার ঘোষণায় উদ্বিগ্ন পুরো জাতি। চেয়ারপার্সনের প্রেস উইং কর্মকর্তা শামসুদ্দিন দিদার জানান, বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ রাজধানীর বকশী বাজার আলীয়া মাদ্রাসায় স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতে যাবেন। আদালতের উদ্দেশ্যে সকাল ১০টায় তার গুলশানের বাসভবন থেকে রওয়ানা হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে সব ধরনের সভা-সমাবেশ, অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোটা বহন নিষিদ্ধ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরের পর থেকে বিএনপির নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে রেখেছে পোশাকধারী পুলিশসহ সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, রাজধানীতে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ ২০ দলীয় জোট নেতাকর্মীদের বাসা-বাড়িতে ব্যাপক তল্লাশি ও পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করছে পুলিশ। রায়কে ঘিরে এরই মধ্যে ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় নেতা গয়েশ্বও চন্দ্র রায়, আমান উল্লাহ আমান, নাজিমুদ্দিন আলম, হাসান মামুন, এবিএম মোশাররফ হোসেনসহ সারা দেশে দুই সহস্রাধিক বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেককে সাদা পোশাকের লোকজন ধরে নিয়ে গেছে। তাদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছেনা।

এদিকে, ঢাকায় প্রবেশদ্বার- যাত্রাবাড়ী, আবদুল্লাহপুর, সদরঘাট, গাবতলীসহ সব পথে ব্যাপক তল্লাশি অভিযানসহ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে রাজধানীর প্রবেশপথে পুলিশের এ কড়াকড়ি আরোপ করা হয় বলে প্রত্যাক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে প্রবেশ পথে একাধিক চেকপোস্ট বাসনো হয়েছে। 

মামলার এজহার: মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় একটি মামলা করে দুদক। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপ-পরিচালক হারুন-অর-রশীদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়। মামলায় খালেদা জিয়া ছাড়া বাকি আসামীরা হলেন- বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

রায় নিয়ে নানা প্রশ্ন: এ রায় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন-আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে। বিএনপি বলছে, সরকার আদালতকে ব্যবহার করে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় একটি রায় দিতে চাইছে। যাতে কওে তাকে আগামী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা যায়। এই রায় নির্ধারিত। এটা রাজনৈতিক মামলা। এই 

 

মামলায় সাক্ষী প্রমাণই নেই। যেসব কাগজপত্র আদালতে দেখানো হয়েছে সেগুলো ঘষা-মাজা। নতুন করে কাগজপত্র তৈরী করা হয়েছে। গতকাল এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপার্সন আবারো বলেছেন, তার বিুরদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলোর সবই মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেছেন, সঠিক রায় হলে তিনি বেখসুর খালাস পাবেন। একইসাথে যারা এই মামলা দায়ের করেছেন তাদেও বিুরদ্ধে আদালত ব্যবস্থা নেবেন বলেও তিনি মনে করেন। 

আর সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা কেন এই রায়, কেন এই মামলা। সরকারি দল বলছে, এই মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হবে। সরকারের এ্যাটনী জেনারেলসহ মন্ত্রীরা বলছেন, কারাগারে গিয়েই বেগম জিয়াকে জামিনের আবেদন করতে হবে। যুক্তিতর্ক উপস্থানের সময় সরকারি দলের কেউ বলছেন, ১৫ দিনের মধ্যে সাজার রায় হবে। মানুষের প্রশ্ন, আদালতে বিচারাধীন একটি মামলা নিয়ে দায়িত্বশীলরা কিভাবে এসব মন্তব্য করেন। শাস্তি হবে কিনা তা নিয়ে সরকারের মন্ত্রীরা এমনকি আইনের সাথে জড়িতরা কিভাবে আগাম মন্তব্য করছেন। আইন যদি সবার জন্য সমান হয় তাহলে, তাদের বিরুদ্ধে কেন কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? 

বিএনপির প্রতিক্রিয়া: জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান মামলায় সাক্ষ্য দেয়া ৩১ জনের কেউবা প্রমাণ করতে পারেননি যে এই মামলাগুলোর সাথে খালেদা জিয়ার সম্পৃক্ততা রয়েছে। শুধু তাই নয়, যে নথির উপর ভিত্তি করে মামলা পরিচালনা হচ্ছে সেটিও জাল। নথিতে কোথাও খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর নেই। মূলত খালেদা জিয়াকে কোনভাবে মামলার মাধ্যমে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই এমন টার্গেট করেছে সরকার।

বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলছেন, জিয়া অরফানেজ মামলার কার্যক্রম ও রায় ঘোষণা সরকারের নির্দেশেই হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার সাজা হলে ‘দেশে আগুন জ্বলবে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। আর স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় বলেছেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নেতিবাচক রায় ঘোষণা হলে তা হবে সরকার পতনের ভিত্তি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যেন শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি হচ্ছে একদিক থেকে ফয়সালার দিন। এই দিনে বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গায়ে যদি ফুলের আঁচড়ও পড়ে বাংলাদেশের মানুষ গর্জে উঠবে।

এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, সারাদেশের মানুষ মনে করে রায় সম্পর্কে শুধু বিচারক জানার কথা। কিন্তু তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও মশিউর রহমান রাঙ্গা খালেদা জিয়াকে নিয়ে রায় সম্পর্কে যেসকল কথা বলেছেন- এটা তারা কীভাবে জানেন? দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, চেয়ারপার্সনকে সাজা দেয়ার বিষয়টি সরকার ‘আগেই ঠিক করে রেখেছে’। শেখ হাসিনা যে রায় চাইবেন, সে রায়ই হবে বলেও এর আগে মন্তব্য করেছেন তিনি।

যা বলেছেন আইনজীবীরা: খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, রাষ্ট্রপক্ষ কোনো অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি। প্রসিকিউশনের কোনো এভিডেন্সেই মামলাটি প্রমাণিত হয়নি। সর্বোপরি মামলায় খালেদা জিয়ার ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হয়নি। তারা আশা করছেন- আদালত সাক্ষ্য, কাগজপত্র, তথ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিলে এ মামলায় খালেদা জিয়া বেকসুর খালাস পাবেন। আইনজীবীরা জানান, ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী হিসেবে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় এবং দ-বিধির ৪০৯ ধারায় অভিযোগ গঠন হয়েছে। ফলে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদ্- বা জরিমানা হিসেবে অর্থদ-ও হতে পারে। এই ধারায় আদালত কারাদন্ড না দিয়ে শুধু জরিমানা দ-ও করতে পারেন। কেননা এই ধারায় সাত বছরের কারাদ- বা জরিমানা শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

বিএনপির আইনজীবীরা জানান, রায় ঘোষণায় সাজা হলেও তাৎক্ষণিক উচ্চ আদালতে জামিন চেয়ে আবেদন করার পরিকল্পনা অনেক আগেই নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে যাতে নিম্ন আদালতে সাজা হলেও আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আইনগত কোনো বাধা না থাকে।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ  খালেদা জিয়ার পক্ষে ১০ম দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাটি প্রথম দিনেই খারিজ করে দেওয়া উচিত ছিল। অথচ দীর্ঘদিন ধরে মামলাটি চলছে, এটাই অস্বাভাবিক ঘটনা। তিনি বলেন, মামলাটি আইনানুগভাবে হয়নি। এটি রাজনৈতিক মামলা। এ রকম মামলা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও ছিল। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে বিচার প্রার্থী হিসেবে আপনার সামনে দাঁড়াতে হয়েছে। আর এ মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।

সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার খালেদার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের যে টাকা এসেছে তার এক টাকাও আত্মসাত করেননি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আইনানুযায়ী মামলা থেকে খালাস পাবার হকদার তিনি। তিনি আরও বলেন, যুক্তি উপস্থাপনে আমরা তা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। নথিতে খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর নেই, তিনি কোনো সইও দেননি, এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে তিনি টাকা পাঠাননি। খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য এ মামলাটি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যে নথি দুদক উপস্থাপন করেছে তার কোনো মূল নথি নেই। খালেদা জিয়ার মামলার নথিগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। সেজন্য তারা ছায়ানথি সৃজন করেছেন। সাক্ষ্য আইনে তা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাতজন সাক্ষী বলেছেন, মূল নথিগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদি মূল নথি খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে ধরে নেয়া যায়- হয় কোনো নথি ছিল না, না হয় খালেদা জিয়ার পক্ষে যাবে বলে নথিগুলো লুকিয়েছে।

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি, সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতে বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মামলাটি রাজনৈতিক গন্ধ ও কালিমাযুক্ত। এ ধরনের মামলা রাজনৈতিক অশুভ ইঙ্গিত ছাড়া হতে পারে না। অ্যাকাউন্ট ফরম থেকে শুরু করে কোথাও বেগম জিয়ার কোনো স্বাক্ষর নেই। আছে শুধু ঘষামাজা। আর ঘষামাজার উপর নির্ভর করে কোনো ক্রিমিনাল মামলায় সাজা দেওয়া যায় না। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মামলাটি রাজনৈতিক গন্ধ ও কালিমাযুক্ত। এ ধরনের মামলা রাজনৈতিক অশুভ ইঙ্গিত ছাড়া হতে পারে না। অ্যাকাউন্ট ফরম থেকে শুরু করে কোথাও খালেদা জিয়ার কোনো স্বাক্ষর নেই। আছে শুধু ঘষামাজা। আর ঘষামাজার উপর নির্ভর করে কোনো ক্রিমিনাল মামলায় সাজা দেওয়া যায় না। খন্দকার মাহবুব হোসেন আরও বলেন, জিয়াউর রহমান আরাফাত ময়দানে নিম গাছ লাগিয়েছেন। তার আত্মার মাগফেরাতের জন্য বিদেশ থেকে এ টাকা পাঠানো হয়েছে। আর এ টাকায় কোনো শর্ত ছিল না। বিদেশ থেকে যে টাকা পাঠিয়েছেন তার কোনো হুদিস নেই।

সিনিয়র আইনজীবী আব্দুর রেজাক খান খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানীতে বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সনের জীবনে এটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এ মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছেন। তাই এ মামলা থেকে তার খালাস চাই। খালেদা জিয়া কুয়েতের টাকা রাখার জন্য অ্যাকাউন্ট খুলেছেন, এ অভিযোগ প্রমাণশূন্য। শুধু তাই নয়, তার (খালেদা জিয়া) বিরুদ্ধে লিখিত ও মৌখিক কোনো প্রমাণও নেই। তিনি আরও বলেন, বিচারে যেন কোনো রকম বিভ্রান্তি না হয়। বেগম খালেদা জিয়া যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন। মামলাটির সঠিকভাবে চার্জ গঠন হয়নি। মামলার এজাহারের সঙ্গে চার্জ গঠনের কোনো মিল নেই। কোনো সাক্ষী বলে নাই খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং বিদেশ থেকে তার একাউন্টে টাকা এসেছে। যুক্তি উপস্থাপনে আদালতে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া কুয়েতের টাকা রাখার জন্য অ্যাকাউন্ট খুলেছেন তার প্রমাণশূন্য। শুধু তাই নয়, তার (খালেদা জিয়া) বিরুদ্ধে লিখিত ও মৌখিক কোনো প্রমাণও নেই।

বাদী পক্ষের বক্তব্য: বাদী পক্ষের দাবি অনুযায়ী, বিচারক যদি মনে করেন অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তাহলে এ মামলায় খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদ- দিতে পারেন। কম দ- দেয়ারও ক্ষমতা আছে বিচারকের। আর আসামি পক্ষ দাবি করছে, অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি বাদী পক্ষ। তাই এ মামলায় খালাস পাবেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

বিশ্লেষকরা যা ভাবছেন: রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একথা অনস্বীকার্য যে, বেগম খালেদা জিয়া এদেশের ১৬ কোটি মানুষের আশা-ভরসা স্থল, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের একমাত্র প্রতীক। যিনি গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের জন্য ছিলেন আপোষহীন। অন্যায়ের কাছে যিনি কখনোই মাথানত করেননি। ওয়ান ইলেভেনের সরকার তাকে দেশ ছাড়া করতে তার পরিবার, সন্তানদেও উপর অনেক নির্যাতন করেছিল। কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তে ছিলেন অবিচল। তিনি বলেছেন, দেশের বাইওে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এদশই আমার সব। জনগণই আমার সব কিছু। এই দেশনেতার উপরে সমস্ত বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে। কিন্তু সরকার তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চায়। দেশবাসী কী সেটা করতে দেবে?  তারা বলছেন, খালেদা জিয়া উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। তিনি দীর্ঘ ৯ বছর রাজপথে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, বিরোধী দলের নেত্রী হয়েছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতির সহধর্মিনী। তাই উনার সঙ্গে এ ধরনের আচরণের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারকে জাতি কোনোদিন ক্ষমা করবে না। বাংলাদেশের মানুষ কোনদিনই এ ধরনের অন্যায় বরদাশত করেনি। ভবিষ্যতেও করবেনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাসক দলের দ্বারা বিরোধী রাজনীতিকরা সব সময় নির্যাতিত হয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে শুরু করে অনেক নামি দামি ব্যক্তিরাও জেল খেটেছেন। 

তড়িগড়ি রায়ে প্রশ্ন: কেনো তড়িঘড়ি করে খালেদা জিয়ার মামলার রায় দেয়া হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেণ আইনজ্ঞরা। তারা বলছেন, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নজিরবিহীনভাবে তাড়াহুড়া করে এই মামলাটি শেষ করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এমন কী শেষ দিন যখন আইনজীবী চাচ্ছেন যে, তিনি আরো কথা বলবেন, কিউসিসরা আছেন তাদের কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে, সিনিয়র আইনজীবীদের গিলোটিন করে তাদের বক্তব্য শেষ করা হয়েছে এবং মামলার রায় দেয়ার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। কেনো এই তাড়াহুড়া? কেনো এই জোর করে অতিদ্রুত আইনের স্বাভাবিক যে গতি, মামলার যে গতি থাকে তাকে বন্ধ করে দিয়ে অতিদ্রুততার সঙ্গে কেনো এই রায় দেয়ার চেষ্টা? একটাই কারণ- বিএনপি ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে। এমনটি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার বিুরদ্ধে দায়ের করা মামলা যে শুধুই রাজনৈতিক তা মামলার দীর্ঘ শুনানীতেই প্রমাণিত হয়েছে।

আ’লীগের হুঁশিয়ারি: অপরদিকে আওয়ামী লীগ বলছে, খালেদা জিয়ার রায়কে ঘিরে দেশে সন্ত্রাসের কার্যকলাপ করা হলে জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ‘রায় ঘিরে কেউ ‘বিশৃঙ্খলা বা ধংসাত্মক কার্যকলাপের’ চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেবে। কঠোর হস্তে পরিস্থিতি দমন করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইন সবার জন্য সমান। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। কারণ তারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। পেশাদার এবং জনগণের বন্ধু। সুতরাং জনগণের ক্ষতি হলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেছেন, খালেদা জিয়ার মামলার রায় নিয়ে দেশে আবার কোনো জ্বালাও-পোড়াও হলে তাতে বিএনপিই পুড়ে ‘ছারখার হয়ে যাবে’।  একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন সরকারি দলের আরও অনেকে।

এমন পরিস্থিতিতে, এই রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হওয়ার আতঙ্ক বিরাজ করছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ফের রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। রায়ের পরে কী ঘটতে যাচ্ছে- সেটা অজনা থাকলেও সরকার ও বিরোধী শিবরর হুমকি আর পাল্টা হুমকিতে জনমনে ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ