ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 February 2018, ২৬ মাঘ ১৪২৪, ২১ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশীয় ফুটবলে দক্ষ স্কোরারের অভাব

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : ঘরোয়া ফুটবলের ক্লাবগুলো এখন অনেকটা বাধ্য হয়ে বিদেশী খেলোয়াড়দের পেছনে ছুটে থাকে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, দক্ষ স্কোরারের অভাব। কোনভাবেই যেন গোলখরা কাটাতে পারছেনা দেশী খেলোয়াড়রা। কিছুদিন পূর্বে শেষ হওয়া ঘরোয়া ফুটবলের বড় আসরেও কাটেনি সেই খরা। যতটা প্রত্যাশা ছিল তার খুববেশি পূরণ করতে পারেনি খেলোয়াড়রা। ছোট করে বললে গত ১৩ জানুয়ারী শেষ হওয়া বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) ফুটবলে গোল করে আলো ছড়াতে পারেনি দেশীয় খেলোয়াড়রা। প্রথম লেগে ভাল করলেও দ্বিতীয় লেগে আর সেভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি তৌহিদুল আলম সবুজ, জাফর ইকবাল, জাভেদ খানরা। আর শেষের দু’টি রাউন্ড তো পাতানো ম্যাচের অভিযোগ রীতিমতো তোলপাড় হয়েছে ঘরোয়া ফুটবল অঙ্গনে। জমজমাট লিগের আড়ালে তাই কালো আঁচড় কেটে দিয়েছে ম্যাচ গড়াপেটার বিষয়টি। তাতে বড় দুই দল হিসেবে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব লিমিটেড, সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের পাশাপাশি ছোট দল রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি ও ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের নাম এসেছে। তাতে একমাত্র ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়েছে ফরাশগঞ্জের। অবনমিত হয়ে দলটিকে আগামী মৌসুমে খেলতে হবে চাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশীপ লিগে (বিসিএল)। তবে ২০১৫-১৬ মৌসুমের মতো এতটা জমজমাট আসর এবার হয়নি বললে খুববেশি ভুলও বলা হবেনা। কারণ সেবার চট্টগ্রাম আবাহনী ও ঢাকা আবাহনীর মধ্যে শিরোপা লড়াই নিম্প্রতি হয়েছিল একেবারে শেষ রাউন্ডে এসে। এবার শিরোপা নিস্প্রত্তি হয়ে গেছে কয়েক রাউন্ড বাকি থাকতেই। এবারের আসর নিয়ে শেষ হয়ে গেলো পেশাদার লিগের ১০টি আসর। শুধু চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াই হয়নি, রেলিগেশন অঞ্চলেও ছিল সমান প্রতিদ্বন্ধিতা। শেষ পর্যন্ত ফরাশগঞ্জকে বিদায় করে পড়শি রহমতগঞ্জ টিকে গেছে। যদিও লীগে বারবারই ছেদ পড়েছে। এত কিছুর পরেও ঠিকই ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এবারই একাদশে দুই বিদেশি নামিয়ে ক্লাবগুলো স্থানীয়দের সুযোগ করে দেয়। এতে করে দলগুলোর মধ্যে কিছুটা শক্তির তারতম্য ছিল। যে কারণে স্থানীয়দের সুযোগ করে দেওয়া এবং এর কতটুকু সঠিক ব্যবহার হয়েছে, এসব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। গোলদাতার দিকে তাকালেই সেটা পরিষ্কার। আগের মতোই বিদেশি খেলোয়াড়রা শীর্ষ গোলদাতার আসনে। মাঝারি মানের খেলোয়াড়দের নিয়ে চমক দেখিয়েছে শেখ জামাল, রানার্সআপ হয়েছে। তবে শেখ জামাল-ফরাশগঞ্জের মধ্যকার ম্যাচ নিয়ে তদন্ত করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। দেখা যাক কতটা শাস্তি পায় অভিযুক্তরা।
পাতানো ম্যাচ হলো ফুটবলের জন্য বিষফোঁড়া। এটি একটি দেশের ফুটবলকে ধ্বংস করে দিতে যথেষ্ট। বিপিএল ফুটবলে শুরুর মতো শেষটা হলো না এবার। পাতানো ম্যাচ দিয়েই শেষ হয়েছে এবারের আসর, এমনটাই অভিযোগ ফুটবল সংশ্লিষ্টদের। এই যেমন লিগের দ্বিতীয় ম্যাচেই ফরাশগঞ্জের কাছে হেরে বসে ঢাকা আবাহনী। এই ম্যাচটিই যদি লীগের শেষদিকে হতো তাহলেই একে পাতানো হিসেবে ধরে নিতেন অনেকেই। তবে একেবারে শেষদিকে রেলিগেশন বাচাঁনোর লড়াই রীতিমতো উত্তাপ ছড়িয়েছিল। সাইফ স্পোর্টিং-রহমতগঞ্জ এবং শেখ জামাল-ফরাশগঞ্জের ম্যাচটি নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই এবার। নিজেদের শেষ ম্যাচে শেখ জামালের বিরুদ্ধে প্রশ্নবোধক জয় পেয়ে অবনমনের শঙ্কা কমিয়েছিল ফরাশগঞ্জ; কিন্তু তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। লীগের শেষ ম্যাচে রহমতগঞ্জ সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবকে ২-০ গোলে হারানোয় ফরাশগঞ্জ আবার প্রিমিয়ার লিগ থেকে নেমে গেল বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লীগে। যদিও সাইফ ও রহমতগঞ্জের ম্যাচের ফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রহমতগঞ্জের কোচ কামাল আহমেদ বাবু সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের যুব দলেরও কোচ। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে যাওয়ায় অনেকের সন্দেহ এ দুই দলের ম্যাচ নিয়েও। এই ম্যাচে তিন বিদেশির একজনকেও খেলায়নি সাইফ। রহমতগঞ্জ শেষ ম্যাচ জেতায় টিকে যায় প্রিমিয়ার লীগে। এর আগে বিজেএমসির সঙ্গে ড্র করে অবনমন ঠেকিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র। প্রিমিয়ার লীগের অষ্টম আসরে বাইলজ উপেক্ষা করে শেখ রাসেল ক্রীড়া বিপক্ষে বিরুদ্ধে ম্যাচের মাঝপথে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে মাঠ থেকে চলে যাওয়ায় বহিষ্কার হয়েছিল ফরাশগঞ্জ। কিন্তু সব নিয়ম উপেক্ষা করে দশম আসরে দলটিকে আবার খেলার সুযোগ দেয় বাফুফে। তবে বাফুফের বিশেষ সুবিধা পেয়ে প্রিমিয়ারে ফিরলেও আবার নেমে যেতে হলো তাদের। 
যেহেতু পাতানো ম্যাচের অভিযোগ উঠেছে সেহেতু তা তদন্ত করে শেষ করতে চাইছে বাফুফে। বিপিএলে নিজেদের আরেক মৌসুমের জন্য টিকিয়ে রাখতে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের বিপক্ষে জিততেই হতো ফরাশগঞ্জকে। ম্যাচটা জিতলেও ফরাশগঞ্জের শেষ রক্ষা হয়নি। রহমতগঞ্জও নিজেদের শেষ ম্যাচ জিতে রেলিগেশন এড়িয়েছে। সে কারণেই শেখ জামাল-ফরাশগঞ্জ ম্যাচ নিয়ে তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাফুফে। গত ১১ জানুয়ারি ফরাশগঞ্জের ৩-১ গোলে জয় পাওয়া ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সেদিন বিজয়ী দল গোল করেছে প্রায় বিনা বাধায়। তাই পাতানো খেলার গুঞ্জন ফুটবলাঙ্গনে। ম্যাচটি এখন পাতানো ম্যাচ শনাক্তকরণ কমিটির কাছে। তারাই  ম্যাচটি খতিয়ে দেখবে। এ বিষয়ে বাফুফে সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগ বলেন, ‘অভিযোগ এসেছে এবং তার ভিত্তিতে শেখ জামাল-ফরাশগঞ্জ ম্যাচটি আমরা পাতানো ম্যাচ শনাক্তকরণ কমিটির কাছে দিয়েছি। ম্যাচটির রিপোর্ট ও ফুটেজ দেওয়া হয়েছে। লিগের শেষ দিনে সাইফ স্পোর্টিং-রহমতগঞ্জ ম্যাচ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই ম্যাচ নিয়েও আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।’
এখন বিপিএল ফুটবল নিয়ে নতুন করেই ভাবছে বাফুফের পেশাদার লীগ কমিটি। দীর্ঘ লীগ নিয়ে অভিযোগের কোন অন্ত ছিলনা খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারন ফুটবলপ্রেমীদের। বিশেষ করে সর্বশেষ আসরটি বর্ষা মৌসুমে হওয়ায় অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। এবার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে বাফুফের পেশাদার লীগ কমিটি। ঘরোয়া ফুটবল মৌসুমের পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্ষাকাল এড়িয়ে ফুটবল ফিরিয়ে আনা হচ্ছে শীত মৌসুমে। লীগের আগামী একাদশ আসর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শুরুর পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সেক্ষেত্রে নতুন মৌসুমের দলবদল কার্যক্রম শুরু হতে পারে আগস্টে। ক্লাবগুলোর দাবির প্রেক্ষিতে আবারো বাড়নো হতে পারে বিদেশিদের কোটা। এছাড়া বাধ্যতামূলক হচ্ছে ক্লাব লাইসেন্সিং। ২০০৭ সালে পেশাদার লিগ চালু হলেও দীর্ঘ ১০ বছরে ঘরোয়া মৌসুম নির্ধারণ করতে পারেনি বাফুফে। একেক মৌসুমে লিগ শুরু হয়েছে একেক মাসে। বছরের ১২ মাসের ৮ মাসেই লীগ শুরুর ’বাজে’ নজিরও স্থাপন করেছে বাফুফে। নয় মৌসুম শেষে গত বছর মার্চে লীগ কমিটি ঘোষণা করেছিল ঘরোয়া ফুটবল মৌসুম বলতে বোঝাবে ২০শে মার্চ থেকে পরের বছর ১৯শে মার্চ পর্যন্ত। সেসব নিয়ম ও কথা ভেঙে ভরা বর্ষায় খেলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের মাঠ হয়েছিল অনেকটা ধান ক্ষেতের মতো। এসব বিষয় নিয়ে এবার আগেই ভাবনা চিন্তা করছে বাফুফে।
একটি ক্লাব ইচ্ছে করলে একজন খেলোয়াড়কে বরখাস্ত করতে পারেন না যেভাবে পারেন একজন কোচকে ছাটাই করতে। এবার যেন কোচ বরখাস্তের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। সর্বশেষ মৌসুমে ক্লাবগুলোর মধ্যে কোচ বদলের প্রতিযোতিা চলেছে। অনেকটা ইউরোপিয়ান স্টাইলে কোচ বদল করেছে ক্লাবগুলো। ২০১৭ সালে দেশের শীর্ষ সব ক্লাবেই দেশি-বিদেশি কোচ বদল হয়েছে। আবাহনী, মোহামেডান, সাইফ স্পোর্টিং, শেখ জামালের মতো দলগুলো ইচ্ছে করে কিংবা অনেকটা বাধ্য হয়েই এমনটি করেছে। শীর্ষ দলের মধ্যে বাদ ছিল কেবল গত আসরের লিগ রানার্সআপ চট্টগ্রাম আবাহনী। এই দলটিও তাদের কোচ সাইফুল বারী টিটুকে বরখাস্ত করার মধ্য দিয়ে কোচ বদলের মৌসুমে নাম লেখায়। গত মৌসুম আরামবাগের কোচ ছিলেন টিটু। সর্বশেষ মৌসুমে চট্টগ্রাম আবাহনীতে যোগ দেন। টিটুর অধীনে ফেডারেশন কাপে ফাইনালে ওঠেও শিরোপা জেতা হয়নি। প্রিমিয়ার লিগের প্রথম লেগ শীর্ষ থেকে শেষ করে তারা। কিন্তু দ্বিতীয় লেগে সেভাবে ফলাফল করতে না পারায় পুরো তোপটা এসে পড়ে টিটুর উপর। লিগের শেষ তিন ম্যাচে বাজে ফল করে শিরোপা রেস থেকে ছিটকে যায় ঢাকার বাইরের একমাত্র প্রতিনিধি দলটি। এর আগে মোহামেডানের কোচ সৈয়দ নঈমুদ্দিন নিজ দেশে চলে গিয়ে আর আসেননি। লিগের মাঝপথে আবাহনীর কোচ দ্রাগো মামিচ চলে গেছেন অন্য দেশে। আর জামাল কোচ জোসেফ আফুসি চলে গেছেন কোন কিছু না বলেই।
শক্তি আর সামর্থ্যে বিদেশীদের সাথে পেরে ওঠার কথা নয়। যার ব্যতিক্রম হয়নি এবারেও। পুরো আসর মিলিয়ে এবার ৩০২ গোল হয়েছে বিপিএল ফুটবলে। যেখানে যথারীতি এগিয়ে বিদেশিরা। নিয়মের কিছুটা পরিবর্তণ এনে তিন বিদেশি নিবন্ধন করালেও মাঠে খেলেছেন দুইজন। তবুও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি স্থানীয় স্ট্রাইকাররা। প্রথম লেগে ১৩৮ গোলের মধ্যে স্থানীয়রা করেছেন ৬০টি, বিদেশিরা ৭০টি; আর বাকি ৮টি আত্মঘাতী। স্ট্রাইকারদের গোলও হাতেগোনা; ফিরতি পর্বে ১২ দলই বিদেশি স্ট্রাইকার খেলিয়েছে, স্থানীয়দের মধ্যে প্রথম লেগে যারা ভালো খেলেছেন তাদের পজিশন বদল করায় কিছুটা সমস্যা হয়েছে। দলও উপকৃত হয়নি আর তাদের পা থেকে আসেনি গোলও। গোলদাতা তালিকার শীর্ষ দশে স্থানীয় স্বীকৃত স্ট্রাইকার কেবল তৌহিদুল আলম সবুজ। চট্টগ্রাম আবাহনীর জার্সিতে গোল করেছেন ৮টি। যার মধ্যে প্রথম লেগেই করেছেন ৫টি গোল। মূলত স্ট্রাইকার হলেও ঘরোয়া লীগে রক্ষণে খেলা চ্যাম্পিয়ন আবাহনীর নাসির চৌধুরীও ৬টি গোল করে ছিলেন আলোচনায়। ২০০৭ থেকে ২০১৬-১৭ এই দশটি প্রিমিয়ার লীগের ৯টিতে বিদেশিরা শীর্ষ গোলদাতা। পেশাদার যুগের শুরুতে বিদেশিদের আধিপত্যের মধ্যেও স্থানীয় স্ট্রাইকারদের নৈপুণ্য ছিল লক্ষণীয়। ২০০৯-১০ লিগে এনামুল হক ২১ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। সে মৌসুমে ম্যাচ খেলেছিলেন ২৪ টি। এখন দেশের ফুটবলে যা স্বপ্নের মতো মনে হয়। কারণ জায়গার সবটুকুই দখল করে নিয়েছেন বিদেশীরা। আগে আলফাজ আহমেদ, জাহিদ হাসান এমিলি, মিঠুন চৌধুরী, জাহিদ হোসেন, শাখাওয়াত হোসেন রনিরা টেক্কা দিতে পারলেও নতুনরা এখন আর পারছেন না। গোল করার যে ক্ষুধা লাগে সেটাই নাকি মরে গেছে তাদের? এ বিষয়ে একসময়কার দেশসেরা ষ্ট্রাইকার, বর্তমানে বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘একজন ষ্ট্রাইকারকে সব সময় গোল করার জন্য সুযোগ খুজতে হয়। ম্যাচে সুযোগ তৈরি করতে হয়। বাঘের মতো প্রতিপক্ষের সীমানায় হামলে পড়তে হয়। এখনকার ষ্ট্রাইকাররা তো তার কিছুই করতে পারছেন না। এভাবে ভাল স্ট্রাইকার হওয়া যায়না। আমরাও বিদেশীদের সাথে পাল্লা দিয়ে গোল করেছি’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ