ঢাকা, শুক্রবার 9 February 2018, ২৭ মাঘ ১৪২৪, ২২ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজকুমারী  ও চোর

 

মাখরাজ খান : লোকটি ছিল দক্ষ রাজমিস্ত্রি। সাধারণত সে রাজ-রাজাদের কাজকর্মই করতো। এজন্য তার অভাব ছিল না, কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সে খুব আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়ে গেলো আর কষ্ট করতে করতে কটিন ব্যাধিতে তাকে পেয়ে বসলো। রাজমিস্ত্রির দুই জোয়ান ছেলে ছিল, তারা কোনো কাজকর্ম করতো না। এ কারণে ছেলেদের সঙ্গে তার খুব একটা কথাবার্তাও হতো না। লোকটি যখন দারুণভাবে কাতর তখন দুই ছেলেকে তার কাছে ডেকে বললোÑ

দেখো বাছারা। জীবনভর আমি রাজা-জমিদারদের দালানকোঠা বানিয়েছি। এর মধ্যে অনেক গুপ্ত ধনাগারও তৈরি করেছি। আমার যৌবন বয়সে সোনাপুর রাজবাড়ীতে যে গুপ্ত ভা-ার তৈরি করেছিলাম এর দেয়ালের বাইরে একটি পাথর আছে যা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না।

এই পাথরটি এত বিরাট যে, এটাকে বাইরে তেকে দেখলে এটা দেয়ালের অংশ বলে মনে হয়। যদি কেউ এটাকে পাথর চিহ্নিত করতে পারে তবু এই পাথরটি সরাতে দশটা হাতি লাগবে। অথচ এই পাথরের মধ্যে এমন একটা জায়গা আছেÑ যেখানে দু’আঙ্গুল ঢুকিয়ে ধাক্কা দিলে পাথরটি ফাঁক হয়ে যাবে এবং দু’জন লোক অনায়াসে পাথরটি সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারবে। মূলত বিপরীতমুখী বিরাট দুটি চুম্বক দিয়েঢ পাথরটি দেয়ালের সঙ্গে আটকে রাখা হয়েছে। পাথরটি ফাঁক হলেই একটি দরজার পথ দেখা যায় এবং এটা দিয়েই ভেতরে ঢোকা সম্ভব।

দু’ছেলে বাবার কথা শুনতে শুনতে অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছিল, তাই এরপর বাপ আর কিছু বলার সুযোগ পেলো নাÑ কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ রাজমিস্ত্রি মারা গেলো।

ছেলেরা চোখের পানি ছেঁড়ে কাঁদতে লাগলো। তখন তাদের বড় অনটনÑ বাপ মরার পর অভাব আরো বেড়ে গেলো। শেষে অনেক চিন্তাভাবনা করে দুই ভাই মিলে সেই গুপ্ত ভা-ার থেকে ধনরতœ চুরি করার সংকল্প করলো। পাথরের কাছে গিয়ে মোমবাতি জ্বেলে দেখলো পাথরটিতে শ্যাওলা পড়ে গেছে। তারা পুরনো কাপড় দিয়ে মুছতে মুছতে তার পিতার কথিত চিহ্নিত স্থানটি পেয়ে গেলো। এর পর দু’ভাই মিলে ধাক্কা দেয়ার পরই একটা কর্কশ আওয়াজ করে পাথরটি সরে গেলো। তখন দুই ভাই সেই গুপ্ত সুড়ঙ্গপথে গুপ্তভা-ারে প্রবেশ করলো। গুপ্তভা-ারটি রাজপ্রাসাদ থেকে বেশ দূরে, এখানে কোনো প্রহরী নেই। রাজপ্রাসাদের সঙ্গে গুপ্তভা-ারটির একটা সুড়ঙ্গপথ আছে যে পথে রাজা এখানে এসে গুপ্তভা-ার দেখে যেতেন।

পরদিন রাজা যথারীতি গুপ্তভা-ারে এসে দেখলেন তিনি আসার আগেই কেউ গুপ্তভা-ারে প্রবেশ করেছে এবং বেশ কিছু ধনরতœ নিয়ে গেছে। এরপর তিনি নিশ্চিত হওয়ার জন্য দ্বিতীয় দিনের অপেক্ষায় রইলেন।

তার অনুমান পুরোপুরি সঠিক। চোর প্রবেশ করেছিল গুপ্তভা-ারেÑ কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? গুপ্তভা-ারের সুড়ঙ্গপথের কথা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না, আর যে রাজমিস্ত্রি এটা তৈরি করেছিল সেও মারা গেছেÑ তাহলে চোর প্রবেশ করলো কি করে?

রাজা গুপ্তভা-ারে ফাঁদ পেতে রাখলেন। পরদিন গুপ্তভা-ার থেকে ধনরতœ নিয়ে এলে একজন লোহার জালে আটকা পড়ে গেলো। তার সমস্ত শরীর এমনভাবে লোহার জালে আটকা পড়ে গেলো যে, সে আর কোনোভাবেই নিজেকে লোহার জাল থেকে মুক্ত করতে পারলো না। শেষে বড় ভাইকে সে অনুরোধ করলো তার মাথা কেটে নিতে, যাতে সকালে এসে রাজা তার মস্তকবিহীন দেহ দেখে চিনতে না পারে। বড় ভাইও ছোট ভাইকে লোহার জাল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করলোÑ শেষে নিরূপায় হয়ে সে ছোট ভাইয়ের মাথা কেটে বাড়ি ফিরে এলো। পরদিন রাজা এসে মস্তকবিহীন দেহ দেখে রেগে প্রহরীদের দেহটি রাজপ্রাসাদের সামনে টাঙিয়ে রাখতে বললো আর এই দেহের কাছে এসে কেউ বিলাপ করলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেফতার করার জন্য হুকুম দিলো।

একদিকে রাজমিস্ত্রির ছেলে বাড়িতে কাটা মস্তকটি আনার পরই সবাই কান্নাকাটি জুড়ে দিলো। তার মা তো বিলাপ করতে করতে বড় ছেলেকে বলেই ফেললো ছোট ছেলের দেহ এনে সৎকার না করলে সে রাজার কাছে যাবে এবং মস্তকবিহীন দেহটি যে তার ছোট ছেলের এ কথা বলে দেবে।

বড় ছেলেটি তখন ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলো। সে মাকে বললো কান্নাকাটি বন্ধ করো, আগামীকালের মধ্যেই আমি রাজপ্রাসাদের সামনে থেকে যে কোনোভাবেই হোক আমার ভাইয়ের দেহটি নিয়ে আসবো।

বৃদ্ধা কান্না থামিয়ে বললো ঠিক আছে তবে কাল সূর্যাস্তেরর আগেই তোমাকে এ কাজটি করতে হবে।

পরদিন বড় ছেলে বাজার থেকে কয়েকটি গাধা কিনে এগুলোর ওপর মশকভর্তি মদ নিয়ে রাজপ্রাসাদের দিয়ে রওনা হলো। তার মাথায় পাগড়ি, গায়ে জরির পোশাক দেখলেই মনে হয় কোনো বড় সওদাগর যাচ্ছে। রাজপ্রসাদের কাছাকাছি এসে সে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলো, তারপর গাধার ওপর দিকে একটি মশক রাস্তায় ফেলে দিলো। মশক থেকে সব মদ ছড়িয়ে পড়লো রাস্তার ওপর। লোকটা হায়! হায়! করতে লাগলো।

মাথায় আঘাত করে সে বললো এখন আমার কি হবে! আমার সব তো শেষ হয়ে গেলো। প্রহরীরা ছুটে এলো ক্রন্দনরত লোকটিকে ধরার জন্য, তখন তাদের পা মদে চুবচুবে হয়ে গেছে। গাধার মালিক তখন কাঁদছে। একজন প্রহরী বললো আরে ভাই কাঁদছ কেন, এখন তো তোমার বাকি গাধাগুলোর পিঠে মদের মশক রয়েছে!

লোকটি বললোÑ দরকার নেই আমার এসবের।

আমার সবচেয়ে দামী মদের মশকটি নষ্ট হয়ে গেছে, আমি ফতুর হয়ে গেছি।

আরে ভাই আবার বাণিজ্য কর! তোমার লোকসান পুষিয়ে যাবে।

না ভাই আমি আর বাণিজ্যও করবো না। বাড়িও যাবো না।

এই বলে সে কোমর থেকে একটা খঞ্জর বের করে গাধার দিকে এগিয়ে গেলো।

শাস্ত্রীরা বললো, আরে করো কি? পাগল হলে নাকি?

আমি পাগলই হয়েছি। আমি সব মদ এখানে ফেলে দেব।

সিপাহীদের একজন বললো,

ফেলে দেবে কেন ভাই আমাদের দিয়ে দাও আমরা প্রাণভরে পান করি।

করো ভাই আমি খুশি মনে তোমাদের এগুলো দিয়ে দিলাম।

প্রহরীরা একে একে মশকগুলো খুলে মধ্যপানে রত হলো। তারা মদ পান করতে করতে বেহুঁশ হয়ে গেলো। তারা যখন রাজপ্রাসাদের সামনে সবাই মরার মতো পড়ে আছে এই সুযোগে রাজমিস্ত্রির ছেলে তার ভাইয়ের ঝুলানো মস্তকবিহীন দেহটি গাধার পিঠে করে বাড়িতে নিয়ে এলো।

রাজা এসে প্রহরীদের বেঁহুশ অবস্থা আর চোরের চাতুরী দেখে বিস্মিত হলো। রাজা ভাবলো চোরকে এভাবে ধরা যাবে না, অন্য পথ অবলম্বন করতে হবে। তাই রাজ্যে ঢোল পিটিয়ে দেয়া হলো যে নিজে করেছে, এ ধরনের কোনো চাতুরীপূর্ণ বা বিস্ময়কর ঘটনা রাজকুমারীকে শুনিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারবে, তার কাছেই রাজকুমারীকে বিয়ে দেয়া হবে।

চোর রাজার ফন্দি বুঝতে পারা সত্ত্বেও রাজাকে বললোÑ পর্দার আড়াল থেকে রাজকুমারীকে বিস্ময়কর ঘটনা শোনাতে হবে। আশপাশে কেউ থাকবে নাÑ শুধু বর্ণনাকারী আর রাজকুমারী। রাজকুমারীর পছন্দ হলে সে বর্ণনাকারীর হাত ধেরে ফেলবে এবং পরে প্রকাশ্য রাজদরবারে তাদের বিয়ে হবে। যাই হোক, চোরটির গায়ে ছিল দামী চাদর আর চাদরের নিচে ছিল মৃত ভাইয়ের কর্তিত হতো। এই হাতটি সে বিশেষ ব্যবস্থায় এমন করে রেখেছিলযে, যাতে গন্ধ না ছড়ায়।

সে রাজকুমারীকে রাজার রতœভা-ারে চুরি, ভাইযের মস্তক কর্তন এবং মদ্যপান করিয়ে প্রহরীদের কাছ থেকে ভাইয়ের ঝুলানো দেহ লুটের কথা বলতেই রাজকুমারী তার হাতটি ধরে ফেললো আর চোর কর্তিত হাতটি রাজকুমারীর হাতে রেখে পালিয়ে এলো। চিৎকার করে উঠলো রাজকুমারী। রাজা রাজকুমারীর কক্ষে দৌড়ে এলো। কর্তিত হাত দেখে রাজা ভয়ে এবং বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। রাজা বললেন, মা এ চোর হলেও সাধারণ চোর নয়Ñ এর বুদ্ধি এবং সাহস অসীম।

রাজা এবার নতুন করে ঢোল পিটিয়ে দিলো যে রাজার গুপ্ত রতœভা-ার থেকে চুরি করেছে, তাকে ক্ষমা করে দেয়া হলো। আর ওই চোরের সঙ্গেই রাজকুমারীকে বিয়ে দেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ