ঢাকা, শুক্রবার 9 February 2018, ২৭ মাঘ ১৪২৪, ২২ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়া কারাগারে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদ- দিয়েছেন আদালত। দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা আর টান টান উত্তেজনার মধ্যে পুরান বকশীবাজারে জনাকীর্ণ আদালতে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর বিকেল ৩ টার দিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে পুরান কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রো ঘ-১১৭০৪৪ সাদা রঙের গাড়িতে নাজিম উদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে তাকে নেয়া হয়। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে কারাগারের অফিস ভবনে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে গতকাল বিকেলে বেগম জিয়াকে কারাগারের ভেতরে ডে-কেয়ার সেন্টারে ভিআইপি মর্যাদায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখার উদ্দিন। 

একই মামলায় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের হয়েছে দশ বছর করে কারাদ-। সেই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছেন বিচারক। 

এদিকে এই রায়ের প্রতিবাদে আজ শুক্র ও কাল শনিবার সারাদেশে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রায়ের সার্টিফাইড কপি পাওয়ার পরই উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরোধিতা একইসাথে জামিনের জন্য আপিল করা হবে। এরই মধ্যে সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন করা হয়েছে। রায় ঘোষণার পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী এবং বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই রায় সাজানো। এটি মূলত খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা এবং দেশে বিদেশে হেয় করার জন্যই দেয়ানো হয়েছে। 

এর আগে রায় শুনতে দুপুর ১১টা ৪০ মিনিটে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ থেকে রওনা হন খালেদা জিয়া। মগবাজার এলাকায় পৌঁছলে হঠাৎ করেই হাজারো নেতাকর্মী গাড়িবহরের দখল নেয়। পথে পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এরপর দুপুর একটা ৫২ মিনিটের দিকে খালেদা জিয়া আদালত কক্ষে প্রবেশ করেন। তার পরনে ছিল অফ-হোয়াইট কালারের শাড়ি। দুপুর দুইটা ১১ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।  খালেদা জিয়ার সাথে আদালতে প্রবেশ করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মেজর (অব.) এম. হাফিজ উদ্দিন ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

আদালত জানিয়েছে, মহান স্বাধীনতার ঘোষক, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী ৭২ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার সাজার এই রায় এসেছে ফৌজদারি দ-বিধির ৪০৯ ধারায়, ক্ষমতায় থেকে অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে ‘অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের’ কারণে। আদালত বলেছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলেও খালেদা জিয়ার সাজা অন্য আসামীদের তুলনায় কম হয়েছে তার ‘বয়স ও সামাজিক মর্যাদা’ বিবেচনা করে। বিচারক বলেন, এ মামলার প্রধান আসামী খালেদা জিয়ার বয়স বিবেচনায়  তাকে সাজা কম দেওয়া হলো। তিনি আরো বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়েছি। সেগুলো হলো ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে হিসাব খুলেছিল কি না। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে  চার কোটি ৪৪ লাখ টাকা জমা হয়েছে কি না, এ ট্রাস্টের নামে টাকা আনা হয়েছে কি না। প্রাইম ব্যাংকের মাধ্যমে আত্মসাতের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে কি না। বিচারক আরো বলেন, আসামী শরফুদ্দিন আহমেদ ও কাজী সলিমুল হক কামাল এফডিআরের মাধ্যমে এসব টাকা উত্তোলন করেছেন কি না। এসব বিবেচনায় নেওয়ার পর আদালত দেখেছেন আসামীপক্ষ তাদের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে পারেনি। অপরপক্ষে, প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) তাদের অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছে। আদালত অপরাধ হিসেবে আমলে দ-বিধির ৪০৯ ধারা অনুযায়ী পাঁচ বছর সশ্রম কারাদ-, তারেক রহমানসহ পাঁচজনকে ১০ বছর করে কারাদ- দিয়েছেন।

আসামীদের মধ্যে তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করছেন। কামাল সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমানও পলাতক। কারাগারে থাকা সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিনকে রায়ের জন্য গতকাল সকালে আদালতে হাজির করা হয়েছিল। সাজা ঘোষণার পর আবারও তাদের কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

জামিনে থাকা খালেদা জিয়া গতকাল দুপুরে আদালতে পৌঁছানোর পথে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী তার গাড়ি ঘিরে মিছিল শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে। এসময় শতাধিক বিএনপি কর্মীকে গ্রেফতার করে বলে অভিযোগে প্রকাশ। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপি নেতাকর্মীদের দমনে টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। 

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া আদালতে পৌঁছানোর পর বিচারক রায় পড়া শুরু করেন। তার পুরা রায় ৬৩২ পৃষ্ঠার হলেও এর সংক্ষিপ্তসার ও সাজা ঘোষণার জন্য তিনি সময় নেন ১৫ মিনিটের মত। রায়ের পরপরই কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে খালেদা জিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয় নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগার ভবনে। ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা খালেদা জিয়া এই রায়ের ফলে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের ‘অযোগ্য’ হলেও হাই কোর্টে আপিল করলে সাজা স্থগিত হলে অথবা আপিল নিষ্পত্তি না হলে, সেক্ষেত্রে তার ভোটে দাঁড়াতে আইনি বাধা থাকবে না বলে আইনজীবীরা জানান।

বিএনপির অভিযোগ, ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে জরুরি অবস্থার সময় দায়ের করা এই ‘মিথ্যা’ মামলাকে রায় পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তাদের মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে খালেদা জিয়াকে ‘সরাতে তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার নীলনকশা’ বাস্তবায়ন করা। রায়ের আগের দিন বুধবার গুলশানে নিজের কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনেও খালেদা জিয়া ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে নেতাকর্মীদের ‘শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক’ আন্দোলনের নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, দেশবাসীর প্রতি আমার আবেদন, আমাকে আপনাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হলেও বিশ্বাস করবেন, আমি আপনাদের সঙ্গেই আছি। আপনারা গণতন্ত্রের জন্য, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য, জনগণের সরকার কায়েমের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। জরুরি অবস্থার সময় ২০০৭ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর খালেদা জিয়া এক বছর সাত দিন কারাগারে থাকার সময় দুদক এ মামলা দায়ের করে। 

এ মামলার বিচার শেষ করতে মোট ২৬১ কার্যদিবস আদালত বসেছে। এর মধ্যে ২৩৬ কার্য দিবসে রাষ্ট্রপক্ষে ৩২ জন সাক্ষ্য দেন। আসামীরা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেন ২৮ কার্য দিবস। বিচারের শেষ ভাগে দুই পক্ষ মোট ১৬ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টে এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় এই মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ অগাস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ। অভিযোগে বলা হয়, এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এ মামলার আসামীরা। মামলা হওয়ার পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ বাসুদেব রায় ছয় আসামীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি দ-বিধির ৪০৯ এবং দুদক আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করে খালেদা জিয়াসহ ছয় আসামীর বিচার শুরু করেন। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য ও জেরা শেষে খালেদা জিয়া এ মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে ছয় দিন বক্তব্য দেন। পরে ১৯ ডিসেম্বর জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু হলে প্রথম দিন দুদকের পক্ষে মোশাররফ হোসেন কাজল যুক্তি উপস্থাপন করেন। এরপর দশ কার্যদিবসে খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মাদ আলী, সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুর রেজাক খান, সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। উভয় পক্ষের বক্তব্য শেষে বিচারক এতিমখানা দুর্নীতি মামলার রায়ের জন্য ৮ ফেব্রুয়ারি দিন ঠিক করে দেন।

পুরান কেন্দ্রীয় কারাগারে খালেদা জিয়া: বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের অফিস ভবনে। মূল ফটক দিয়ে ঢুকে বাম পাশেই সিনিয়র জেল সুপারের অফিস কক্ষ ছিল এটি। সেখানেই তাকে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বৃহস্পতিবার দুপুরে পাঁচ বছরের সাজা দেওয়ার পর তাকে সেখানে নেওয়া হয়।

কারা অধিদফতর সূত্র জানায়, পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটকের ভেতরে বামপাশে যে দোতলা ভবনটি রয়েছে, তার নিচতলায় খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে। সেখানে একসময় সিনিয়র জেল সুপারের অফিস কক্ষ ছিল। দোতলায় জেলারের বাসা ছিল। বর্তমানে সেখানে কোনও এয়ার কন্ডিশন নেই। তবে খাটসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র রয়েছে। কাউকে থাকতে হলে যা যা দরকার সবই আছে সেখানে। এর আগে জানা গিয়েছিল তাকে এই কারাগারের ভেতরে নারী সেল এলাকার তিন তলা ভবনের ডে কেয়ার সেন্টারে রাখা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে পুরনো কারাগারের অফিস ভবনেই রাখা হয়েছে।

কারা অধিদফতরের ঢাকা বিভাগের ডিআইজি (প্রিজন্স) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে কারাগারের মূল ফটকের ভেতরে যে অফিস ভবন রয়েছে, সেখানেই রাখা হয়েছে। একজন প্রথম শ্রেণির বন্দীর যেসব সুবিধা পাওয়ার কথা, সব সুবিধাই তাকে সেখানে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী ফাতেমাকে তার সঙ্গে কারাগারে থাকার অনুমতি দিয়েছেন আদালত।  

অভিযোগপত্রে যা বলা হয়েছে: অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামীরা অসৎ উদ্দেশ্যে অন্যায়ভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। সরকারি এতিম তহবিলের আর্থিক দায়িত্ববান বা জিম্মাদার হয়ে বা তহবিল পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করে পরস্পর যোগসাজশে দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা দ-বিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারার অপরাধ।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ১২.৫৫ লাখ মার্কিন ডলার আসে যা বাংলাদেশি টাকায় তৎকালীন ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ১৯৯১ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অর্থ দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে অস্তিত্ববিহীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠন করেন। অথচ কোনো নীতিমালা তিনি তৈরি করেননি, করেননি কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থাও। অথচ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা অস্তিত্ববিহীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে পাঠান। পরে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন যার জন্য তিনি দায়ী। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে বলেন, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থেকে নিজের পদমর্যাদা বলে সরকারি এতিম তহবিলের আর্থিক দায়িত্ববান বা জিম্মাদার হয়ে বা তহবিল পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করে দ-বিধির ৪০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অপরাধ করেছেন।

খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তিনি তার মায়ের সহায়তায় ৬ মইনুল হোসেন রোডের ঠিকানা ব্যবহার করে অস্তিত্ববিহীন ট্রাস্ট গঠন করেন। প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা গ্রহণ করে ওই ট্রাস্টের নামে সোনালী ব্যাংকের গুলশান নিউনর্থ সার্কেল শাখায় এসটিডি হিসাব খুলে জমা রাখেন। দীর্ঘ দিনে কিছু জমি কেনা ছাড়া ট্রাস্টের নামে কোনো স্থাপনা করেননি। ডিড অব ট্রাস্টের শর্ত ভঙ্গ করে এতিম ও দুস্থদের জন্য কোনো টাকা তিনি ব্যয় করেননি। অথচ ২০০৬ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ২০০৬ সালের ৪ জুলাই পর্যন্ত অসৎ উদ্দেশ্যে ৫টি চেকের মাধ্যমে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কহীন ব্যবসায়ী কাজী সলিমুল হককে দেন। যার মধ্যে দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করেন যা দ-বিধির ৪০৯ ধারার অপরাধ।

সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী সম্পর্কে বলা হয়, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সচিবের দায়িত্বে ভারপ্রাপ্ত হয়ে এতিম তহবিল গঠন ও পরিচালনার দায়িত্ববান হন। অথচ কোনো নীতিমালা তৈরি না করে কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থা গ্রহণ না করে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অনুমোদন নেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের দিয়ে গঠিত অস্তিত্ববিহীন ট্রাস্টে টাকা পাঠান। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনকৃত মূল নথি নিজের দায়িত্বে রেখে বা নিচের স্তরের কাউকে না দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি উধাও করে খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের সরকারি টাকা আত্মসাতের কাজে সহায়তা করেছেন।

অভিযোগপত্রে জিয়াউর রহমানের ভাগনে মমিনুর রহমান সম্পর্কে বলা হয়, তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন।

এই প্রথম মিথ্যা মামলায় বন্দী খালেদা জিয়া: এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বন্দী হয়েছেন কয়েক দফায়, বছরের বেশি কারাগারে থাকতে হয়েছে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলেও; কিন্তু এবার আদালতের সাজা নিয়ে কারাগারে যেতে হল খালেদা জিয়াকে। রায় দেওয়ার পর খালেদা জিয়াকে নিয়ে যাওয়া হল পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন সড়কের পুরনো কারাগারে।

তিন যুগের রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে খালেদা জিয়া এবারই সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় পড়েছেন বলে বিএনপি নেতারাও মনে করছেন। রায়ের আগের দিন তারা বলছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ‘সাজানো’ এই রায়ের মাধ্যমে সরকার আসলে বিএনপি চেয়ারপার্সনকে ভোট থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যই বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। খালেদা জিয়াও বলেছেন, আমাকে রাজনীতি ও নির্বাচনের ময়দান থেকে দূরে রাখতে আদালতকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত শতকের ৮০ এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ে ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেপ্তার হতে হয় খালেদা জিয়াকে। তখন তাকে সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাড়িটিতে গৃহবন্দী রাখা হয়েছিল। সর্বশেষ জরুরি অবস্থার সময় ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া। প্রায় ১ বছর ৭ দিন সংসদ ভবনের একটি বাড়িতে বন্দী রাখা হয়েছিল তাকে। পাশের বাড়িতে বন্দী ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় খালেদা জিয়ার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পান। তারেক রহমান ও কোকো জামিনে মুক্তি নিয়ে বিদেশে যান চিকিৎসার জন্য। মুদ্রা পাচারে এক মামলায় দ- নিয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অবস্থায় ২০১৫ সালে মারা যান কোকো। বর্তমানে আদালতের অনুমতি নিয়ে চিকিৎসা জন্য সপরিবারে লন্ডনে রয়েছেন তারেক রহমান।

স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে ব্যর্থ এক সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের চাপের মুখেই রাজনীতির জটিল পথে নামতে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। প্রথমে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হন তিনি, এক বছর পর ১৯৮৪ সালে নেন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব; তারপর ৩৪ বছর ধরে একই দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। বুধবার সাংবাদিক সম্মেলনে জিয়াপতœী বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের দাবিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনীতির বিপদসঙ্কুল পথে আমি পা বাড়িয়েছি। আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও নিস্তরঙ্গ জীবন বিসর্জন দিয়েছি। রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখার পর দুই সন্তান ও পরিবারকে সেভাবে সময় দিতে না পারার কথাও বলেন তিনি।

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালে ইস্কান্দর মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে। ফেনীর বাসিন্দা ইস্কান্দর ঠিকানা নিয়েছিলেন দিনাজপুরে। খালেদা জিয়াসহ তার তিন মেয়ে ও দুই ছেলের বেড়ে ওঠা সেখানেই। খালেদা খানম পুতুলের সঙ্গে ১৯৬০ সালে বিয়ে হয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের। স্বামীর সূত্রে তারপর রাজনীতিতে নেমে তিনি খালেদা জিয়া হিসেবেই পরিচিতি পান। স্বামীর মৃত্যুর পর আনাড়ি হাতে বিএনপির দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে রাজনীতিতে নিজের আসন পোক্ত করেন খালেদা জিয়া, হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী । রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, বিএনপির জনভিত্তি তৈরি হয় খালেদা জিয়ার হাত দিয়েই।

দুই নেত্রীর যৌথ নেতৃত্বের আন্দোলনে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯১ সাল থেকে পরবর্তী নির্বাচনগুলোর যে কয়টিতে যতটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, ততবার ততটিতেই জয়ী হয়েছেন। কোনো বার হারের স্বাদ নিতে হয়নি তাকে। পাঁচ বছর দেশ শাসনের পর বিরোধী জোটের একটি দাবি পূরণে ১৯৯৬ সালে একটি নির্বাচন করতে হয় তাকে। সেখানে তিনি আবার দেশের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন। পাঁচ বছর বিরোধীদলীয় নেতা থাকার পর ২০০১ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় আসে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। ফের প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।

সেই শুরুতে দায়িত্ব নেওয়ারকালে একটি ভাঙনের পর ২০০৬ সালের জরুরি অবস্থার সময় বিএনপিতে ফের ভাঙন মোকাবেলা করে এগিয়ে চলেন খালেদা জিয়া। জরুরি অবস্থার অবসানের পর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর খালেদা জিয়া বসেন বিরোধী দলের আসনে। এরপর ২০১০ সালে শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে উৎখাত হওয়ার পর শেখ হাসিনার সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করার পর  দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করেন তিনি। গত এক বছরে এভাবে আদালতে যেতে হয়েছে অনেকবার। ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘোষণা দিলে তিন মাস কার্যালয়ে কার্যত বন্দী থাকতে হয় তাকে। এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দায়ের করা মামলাগুলো এগিয়ে চলতে থাকে। বিএনপির ভাষায় ‘সরকারের হস্তক্ষেপে এগুলো বুলেট গতি’ পায়।

জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় রায় হয়েছে, চলছে জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলাও। আরও কয়েকটি দুর্নীতির মামলা রয়েছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সেগুলোরও পরিণতি দেওয়া হতে পারে বলে বিএনপির সন্দেহ। খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও একইসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মাহবুবউদ্দিন খোকনের ভাষায়, তার নেত্রী এখন রাজনৈতিক জীবনের ‘তৃতীয় মহাবিপদে’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ