ঢাকা, শনিবার 10 February 2018, ২৮ মাঘ ১৪২৪, ২৩ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পোলিশকার লালনের দায়িত্ববোধ

লালন দীর্ঘ ২১ বছর ধরে কমলাপুর রেল স্টেশনে জুতা পোলিশের কাজ করে। সেদিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের মেধাবী ছাত্রী রুবিনার ট্রেনের চাকায় বিচ্ছিন্ন হওয়া দু’পা-সহ তাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি করায় এই লালন। রুবিনা পা দু’টো হারালেও প্রাণে বেঁচে গেছেন। সরকারি এবং বেসরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছেন। চিকিৎসাখরচসহ অনুদানও পাচ্ছেন রুবিনা। সুস্থ হবার পর হয়তো কর্মসংস্থানের একটা ব্যবস্থাও হয়ে যাবে তার। পঙ্গুত্বের নির্মম স্মৃতি নিয়ে হলেও বেঁচে থাকবেন দুর্ঘটনা কবলিত পঞ্চগড়ের হতভাগ্য মেয়েটি। আমরা তার শুভ কামনা করি। কিন্তু রুবিনার দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে নিজের রুজিরোজগারের কাজ ফেলে কোনওকিছু না ভেবে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন দু’টো পা জড়িয়ে নিয়ে যে লালন রুবিনাকে হাসপাতালে পৌঁছালো, রুবিনার জীবন বাঁচানোর সহযোগিতা করলো সেই লালনের ভাগ্যাকাশে একফালি চাঁদ কি উঁকি দেবে কোনওদিন? হয়তো কখনও কোনওকিছু পাবার আশায় এ মহান কাজটি করেনি লালন। কিন্তু তার আকস্মিক দায়িত্ববোধ অনেককেই চপেটাঘাত করেছে যারা অদূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহত মেয়েটির অসহায়ত্ব প্রত্যক্ষ করছিলেন। সেদিন ঘটনাস্থলে অনেকেই ছিলেন। রেলওয়ের লোকেরাও ছিলেন। কিন্তু লালন যা করেছে তা আর কেউ করেননি। রেলওয়ে পুলিশও ছিল কমলাপুর রেল স্টেশনে। তাদের কারুর মাথায় কি ঢোকেনি যে আহত মেয়েটিকে আগে হাসপাতালে নেয়া দরকার?
যাই হোক, অন্যরা যা করেননি, সামান্য জুতা পোলিশকার লালন তা করেছে। লালনের ভেতরের যে মনুষত্ব ও মানবতা জেগে উঠেছিল তা থেকেই সে রুবিনার পাশে দাঁড়িয়েছে। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করিয়েছে। লালনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার জন্য কিছু সহায়তার ইচ্ছে জানালে প্রথমে সে সংকোচে পড়ে যায়। পরে জানায়, তার একটি বাইসাইকেলের খুব প্রয়োজন। অনলাইনে লালনের কথা জানাজানি হলে অনেকেই তাকে সাহায্য করবার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। রুবিনার সঙ্গে সঙ্গে যারা লালনকেও আর্থিক সাহায্য করেন তাদের মধ্যে পঞ্চগড়ের শিক্ষিকা তাজমী, দেবীগঞ্জের রবিউল ইসলাম স্বপন, রওশন মনি এবং আফজাল হোসেন হারেশ। হয়তো এই সামান্য অর্থ লালনের জন্য তেমন বড় কোনও কাজে আসবে না, মিটবে না দারিদ্র্যের চাহিদাও। লালনের জুতাকালির কাজ থেকে অন্য কোনও সুবিধাজনক কাজেও হয়তো সে ফিরতে পারবে না। আবার সে ফিরে যাবে সেই রেলওয়ে প্লাটফর্মের কোণে খোলা আকাশের নিচে। বাকি জীবন কালির ব্রাশ হাতে নিয়েই মানুষের নোংরাময়লা জুতার শরীরে আঁকবে বাবুয়ানার চকচকে কোনও স্বপ্নময় ছবি আর সারাদিনের সামান্য রোজগারের টাকায় হিসেব কষবে লবণ-মরিচ-তেল-চাল আর ডালসহ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনবার।
দু’পা-হারানো রুবিনা আর জগন্নাথে ক্লাস করতে পারবেন কিনা জানি না। তার পড়াশোনা সম্পন্ন হবে কিনা তাও অনিশ্চিত। রুবিনার শিক্ষক ও সহপাঠীরা অনেকেই তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। এরপরও মেয়েটির সামনের দিনগুলো কেমন কাটবে তা বলা মুশকিল। তবে অনেকই হয়তো জুতা পোলিশকার লালনকে মনে রাখবেন কিছুদিন। কোনও দুর্ঘটনার কথা শুনলেই এই লালনের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের কথা মনে করবেন কেউ কেউ। আমরাও সাধুবাদ জানাই লালনকে। এমন দায়িত্বশীলতা আমাদের সবার মধ্যে জাগ্রত হওয়া জরুরি। আমরা পারবোতো লালনের মতো বিপন্ন রুবিনাদের পাশে দাঁড়াতে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ