ঢাকা, সোমবার 12 February 2018, ৩০ মাঘ ১৪২৪, ২৫ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চিতই পিঠার দোকান থেকেও আচরণ শিখার আছে

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী : গোপাল ভাঁড়ের কাজ ছিলো প্রতিদিন রাজাকে হাসানো। একদিন দেখলো তার ঝুলিতে আর কিছু নেই তাই সে বুদ্ধি করে একটি ঝাঁকার মধ্যে বসে অন্য একজনকে বললো আমাকে মাথায় করে রাজার দরবারে নিয়ে যাও। তাই করা হলো। রাজার সামনে তাকে নামানোর পর রাজা জিজ্ঞেস করলেন- গোপাল একী? তখন গোপাল বললো ‘জাঁহাপনা আজ আর ঝুলিতে কিছু নেই”- অমনি রাজা হেঁসে দিলো। এটাই গোপালের সার্থকতা রাজা আজও হাসলো। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদগণ দলীয় প্রধানকে হাসানোর জন্য কতই না কোশেশ করে যাচ্ছে। এ সব করতে গিয়ে তাদের শিষ্টাচারে এতটাই ধস নামে যা একজন চিতই পিঠা বিক্রেতার আচরণ থেকে নিচে নেমে যায়। তাই দু’জন চিতই পিঠা বিক্রেতা বৃদ্ধা নারীর আচরণ তুলে ধরা হলো।
আমার বন্ধু ইঞ্জিনিয়ার আহমদ আলী সুমন একটি চিতই পিঠার দোকানে নিয়ে পিঠা খাওয়ালো। পরের দিন আবার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব মশিউর রহমান শাহীনকে নিয়ে ঐ দোকানে পিঠা খেতে গেলাম। গিয়ে বললাম খালা দু’টো পিঠা দেন। বৃদ্ধ মহিলা বললেন “দেরী হবে” জিজ্ঞেস করলাম কত দেরী, সে বললো আধাঘণ্টা। বললাম আমাদেরকে দু’টি পিঠা দিয়ে দেন। মহিলা রাগ করে বললো তার ময়মনসিংহের ভাষায়Ñ “হুনইন আপনি খাবাইন একদিন আর হেইলারা খাবো সব সময়” পিঠা আর খাওয়া হল না। অন্যদিন টঙ্গী ‘ল’ কলেজের প্রধান এডভোকেট মনির হোসাইনকে নিয়ে একটি পিঠার দোকানে গেলাম। বললাম খালা। সে বৃদ্ধা উত্তর ‘দিলো কি বাবা’ তার কাছ থেকে পিঠা খেলাম এবং তার আচরণে মুগ্ধ হলাম। টঙ্গী ‘ল’ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ এডভোকেট মনির হোসাইনকে এ পিঠা বিক্রেতা এবং পূর্বের পিঠা বিক্রেতার কথা তুলে ধরলে তিনি বলেন, মানুষের আচরণটাই মূল পুঁজি, আচরণের কারণে কারো ব্যবসা উন্নতি লাভ করে আবার কেউ ধ্বংস হয়ে যায়। উদার মনের এ মনির সাহেবের নিকট আওয়ামী লীগ বিএনপি কিংবা জামায়াত বলে কোন কথা নেই। সকলকেই তিনি আপন করে নেয়ার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের অধিকারী। আর হবেনই না কেন গাজীপুরের এ বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এডভোকেট আজমত উল্লাহ খানের যোগ্য শীর্ষ তিনি। আমি হেঁসে বললাম স্যার এ পিঠা বিক্রেতা বৃদ্ধার কথায় আমরা কত শান্তি পেলাম অথচ আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ আর টকশোতে উপস্থিত হওয়া ব্যক্তিদের কথা আর ঝগড়া কী যে কষ্ট দেয়, তাদের প্রতি কেমন যেন শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয়ে যায়। সাথে থাকা দু’জন ছাত্র জাকির হোসাইন ও মো. জিল্লুর রহমান বলে উঠলেন “স্যার এ বিষয়টি নিয়ে আপনি একটা কলাম লিখেন।” মনির স্যার বললেন হ্যাঁ লিখতে পারেন তো। তাকে বলেছিলাম লিখলেতো আপনার ওবায়দুল কাদের সাহেব এর কথাই আগে লিখতে হয়। তিনি বললেন লিখবেন অসুবিধা কি? প্রিয় পাঠক লিখতে পারলেই লিখতে হবে আর কারো বিরোধিতা করতে হবে- এমন মানসিকতা ঠিক নয়, তবে যদি কোন সম্মানিত ব্যক্তি বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন সব কথা বলে বেড়ায় যা তার সম্মান ও দায়িত্ব দু’টোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে, তখন কিছু লিখা। এতে কি লাভ হলো বা হলো না এত চিন্তার সময় কোথায় কেবল লাভের চিন্তা করেই কি ব্যবসায় নামা যায়? আমি কেন ওবায়দুল কাদের সাহেবের কথাই বলি? বলি এজন্য যে, ক্ষমতাশীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হওয়ার পূর্বে তার কথা বার্তা দলবল নির্বিশেষে সকলেই পছন্দ করতেন। কারণ চাটুকারিতারও একটা সীমা থাকে যেমন- ইনু সাহেবের না থাকলেও মেনন সাহেবের কিছুটা আছে। কামরুলের না থাকলেও মায়া ভাইয়ের আছে। তবে ওয়াবদুল কাদের সাহেব সব সময়ই আওয়ামী লীগ এর প্রতিনিধি হয়ে বিএনপিকে সাইজ করে থাকেন, এটা করাই তার কাজ। বিএনপি জামায়াত জোট যখন ক্ষমতায় ছিলো তখন সরকার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে, পল্টন ময়দানে এক ভাষণে জনাব ওবায়দুল কাদের সাহেব বলেছিলেন- “প্রয়োজনে বঙ্গ ভবনের অক্সিজেন বন্ধ করে দেবো।” অতএব ওবায়দুল কাদের সাহেব রোমান্টিক আজ নতুন নয়। সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পূর্বে তাকে যখন মানুষ ফাটা কেষ্ট বলতো তখনও তিনি বলেছেন “আমাকে ফাটা কেষ্ট বলবেন না।”  কারণ সে জানতো ফাটা কেষ্ট হলো ভারতের একটি ছবির মাস্তান নায়ক। সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর থেকে কাদের সাহেবের বক্তব্য শুনে মনে হয় এটাই ছিলো তার জীবনের শেষ লক্ষ্য তিনি আওয়ামী লীগ এর মতো একটি দলের সাধারণ সম্পাদক হবেন। তার কতাবার্তা আর কামরুল ইসলামের কথাবার্তা আমরা এক ওজনে মাপতে পারি না। কামরুল সাহেব বলেন- “বিএনপি’র আন্দোলন করার মুরোদ নেই” যখন বিএনপি বিশাল জনসভা করলো তখন ওবায়দুল কাদের সাহেব আবার বললেন “জনসভায় লোক হয়নি।” ১২ নভেম্বর বিএনপি’র জনসভা ছিলো সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে। এ বিষয় একদিন আগেই অর্থাৎ ১১ নভেম্বর রাতেই একটি শিরোনাম লিখেছিলাম- “জনসভায় লোক হয়নি।” সেখানে বলেছিলাম আগামী কাল জনাব ওবায়দুল কাদের বলবেন “জনসভায় লোক হয়নি।” ঠিক তিনি তাই বলেছেন। পিঠা খেয়ে বাসায় আসার পর টিভি খুলেই দেখি ওবায়দুল কাদের সাহেব বলছেন “বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ার জন্য পাঁয়তারা করছে আমরা আশা করেছিলাম জনাব ওয়ায়দুল কাদের সাহেবের মতো লোক আওয়ামী লীগ এর মতো একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক হলে রাজনীতির ময়দানে কিছুটা হলেও গুণগত পরিবর্তন আসবে। কিন্তু কই কার কাছে কী আশা করলাম। আমরা কি পারি না আরো সহনশীল হতে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি বলেন “এই মহিলার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নকল।” যদি বলেন এই মহিলা পাগল। তবে আর কার কাছে কি আশা করতে পারি? হাসানুল হক ইনুরা জীবনভর আল্লাহ্র অস্তিত্ব স্বীকার করেননি। তারা হেফাজতের নেতা মাওলানা আহমদ শফীকে “তেঁতুল হুজুর বলতে পারেন, তার মুখে এটাই শোভনীয় যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই তেঁতুল হুজুরকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমাদের রাজনীতিবিদগণকে আরো সহনশীল, শালীন ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। মহান আল্লাহ্ বলেন- “তোমরা মানুষের সাথে সুন্দর করে কথা বলো।” আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেন- তোমায় নিকট কিছু চেয়ে যেনো কেউ খালি হাতে ফিরে না যায় কথা দিয়ে হলেও তাকে উপকার করো।” আর আমরা এমন সব কথা বলে থাকি যা মানুষের উপকার তো নয়ই বরং মানুষের হৃদয় মাঝে রক্তক্ষরণ হয়। বিজ্ঞ লোকদের কাছ থেকে দেশের নেতৃত্বদানকারী লোকদের নিকট থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার থাকার কথা। যদি তা শিখতে না পারি তবে তা হয় বড়ই বেদনার বিষয়। কিসের এত অভাব কিসের চাওয়া পাওয়া। এক সময়ের সেনাপ্রধান, এরপর রাষ্ট্রপ্রধান জনাব আলহাজ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। কি আছে তার জীবনে আর বাকি। এক সময় তিনি কবিতাও লিখেছেন নিঃসন্তান ছিলেন মহান আল্লাহ্ তাকে একটি পুত্রসন্তান দান করেছেন, সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান, বিরোধীদলীয় প্রধান ও কবি সবদিকে যার পরিপূর্ণতা তার আর কি থাকতে পারে জীবনের জন্য চাওয়া পাওয়ার। অথচ তিনিও বলছেন- “শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে যাবো।” যদি জিজ্ঞেস করা হয় জনাব এরশাদ সাহেব আপনার নূর হোসেন জীবন দিলো কি জন্য? কিসের জন্য জীবন দিলো ডা. মিলন। নূর হোসেন পিঠে আর বুকে লিখেছিলেন ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক।” তার পিঠ আর বুক বুলেটের গুলি দিয়ে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিল গণতন্ত্রের দুশমনরা। আজ সেই গণতন্ত্র যারা গলা টিপে হত্যা করতে চায় তাদের পক্ষেই গান গাইছেন জনাব এরশাদ। একেই বলে বহুরূপী এরশাদ। তাই আসুন এসব রাজনীতিবিদ থেকে আর কী-ই বা শিখার আছে। আমরা যারা সাধারণ মানুষ আমাদের আর উপায় কি? রাজনীতিবিদরা যদি দেশটা অশান্ত করে রাখেন এজন্য দেশের জনগণের কাছে তাদের একদিন অবশ্যই জবাব দিতে হবে। এখন আমরা মনের সান্ত্বনার জন্য আপাতত: পিঠা বিক্রেতা বৃদ্ধ মহিলার কথা শুনেই শান্তি অনুভব করি- ‘বাবা একটু বন।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ