ঢাকা, মঙ্গলবার 13 February 2018, ১ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৬ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফিলিপাইন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা এর সাথে জড়িত -বাংলাদেশ ব্যাংক ॥ বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে অপরাধ সংঘটিত হয় -ফিলিপাইন ব্যাংক

এইচ এম আকতার : ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্ট থেকে চুরি হওয়া ৮১০ কোটি টাকা ফেরত আনতে এখনও আইনি জটিলতায় আটকে আছে। টাকা ফেরত আনতে ফেডারেল ব্যাংক এবং ফিলিপাইন সহায়তা না করায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশ। এ টাকার সমাধান খুঁজতে এবার পাল্টাপাল্টি মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ এবং ফিলিপাইন সরকার। এতে করে টাকা উদ্ধার আরও জটিলতায় পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে, অনিশ্চিত হয়ে আছে সে দেশে খোয়া যাওয়া ৬৫ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার বিষয়টি।
জানা গেছে, চলতি মাসের ৭ তারিখ ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ খবরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ফিলিপিন্সের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন (আরসিবিসি)।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আরসিবিসি ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দেয়ার পর এক বিবৃতিতে এ ঘোষণা দেয় আরসিবিসি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
বিবৃতিতে জানানো হয়, যেকোনো ধরনের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রস্তুত আরসিবিসি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আরসিবিসি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আরো বলে, এ অপরাধ বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে সংগঠিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের এখন অভ্যন্তরীণভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত বলেও জানানো হয় বিবৃতিতে।
তাদের অভিযোগ বাংলাদেশ সরকার নিজের অপরাধ ঢাকতেই আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ঘটনার জন্য ফিলিপাইনের যারা জড়িত তাদের বিচার আমরা করেছি। কিন্তু বাংলাদেশের কারা এ ঘটনার সাথে জড়িত তাদের নাম প্রকাশ না করে উল্টো ফিলিপাইনের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে। মূলত তারা আসল অপরাধীদের আড়াল করতে ফিলিপাইনের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তারা আরও বলেন, টাকা উদ্ধারে আমরা নানাভাবে সহায়তা করলেও বাংলাদেশ তাদের অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আমরা বার বার তদন্ত রিপোর্ট চাইলেও বাংলাদেশ তা দেয়নি। তাহলে কেন আমরা তাদের সহায়তা করবো। আমরা মামলার জবাব মামলা দিয়েই দিবো।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে ফিলিপিন্সের আরসিবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে ক্যাসিনোয় চলে যায়। এর মধ্যে মাত্র দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
 এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী দুই থেকে তিন  মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এই মামলা করা হতে পারে।
 বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির  বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে মামলা করার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফিলিপাইনের সরকার মামলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা করবে।
পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান সাংবাদিক সম্মেলন করে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি ফিলিপাইন সফর করে এসেছেন। যে প্রতিবেদন তারা দিয়েছেন, তার ভিত্তিতেই মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে নিউইয়র্কে এই মামলা করা হবে। মামলার বাদী হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ও সুইফট কর্তৃপক্ষও থাকবে।
রাজী হাসান বলেন, ফিলিপাইনে যাওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে ছয় কোটি ৭০ লাখ বেরিয়ে কোথায় গেছে তার ধারণা পাওয়া গেলেও প্রায় দেড় কোটি ডলারের বিষয়ে কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। আরসিবিসির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এর সঙ্গে জড়িত এবং ব্যাংকেরও দায় রয়েছে। এ কারণেই আমরা আরসিবিসির কাছ থেকে অর্থ ফেরত আনতে ফৌজদারি মামলা করতে যাচ্ছি।
অবশ্য মামলা করার আগে আরসিবিসি কোনো প্রস্তাব নিয়ে এলে বাংলাদেশ তা ভেবে দেখবে বলে জানান ডেপুটি গবর্নর।
শুরুটা ২০১৬-এর ফেব্রুয়ারিতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিস্টেম হ্যাক করে ফেডারেল রিজার্ভের মাধ্যমে ৩৫টি ভুয়া বার্তায় ১০১ মিলিয়ন ডলারের প্রদান আদেশ দেয় হ্যাকাররা। ফেডারেল রিজার্ভ তা গ্রহণ করে তিনটি রিটেইল একাউন্টের মাধ্যমে পাঠায় শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপিনে। এর মধ্যে পাঁচটি ম্যাসেজে আট কোটি ১০ লাখ ডলার যায় ফিলিপাইনের আরসিবিসিতে। আর আরেক আদেশে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয় ২০ লাখ ডলার। চারটি নাম সর্বস্ব একাউন্টে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০ মিলিয়ন জমা হয় জেসি ক্রিস্টোফারের একাউন্টে। সেখান থেকে ২৩ মিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেয়া হয় অন্যত্র। আর বাকি অর্থ ফিলরেম থেকে পেসোতে ভাঙিয়ে নেয়া হয় উইকাং জু, ইস্টার্ন হাওয়াই এবং সোলায়ার ক্যাসিনোতে। অর্থাৎ পাচারের এই ঘটনা প্রমাণ হওয়ার পরও, বাংলাদেশের পক্ষে এখনো অবস্থান জোরালো হয়নি আরসিবিসির। কিন্তু কেনো?
শ্রীলঙ্কায় পাঠানো অর্থ ওই একাউন্টে জমা হওয়া পর্যন্ত আটকানো গেলেও ফিলিপাইনের ব্যাংকে যাওয়া অর্থের বেশির ভাগটাই স্থানীয় মুদ্রার বদলে জুয়ার টেবিল ঘুরে চলে যায় নাগালের বাইরে।
রিজাল ব্যাংকের একটি শাখা হয়ে বেরিয়ে যাওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে এক ক্যাসিনো মালিকের ফেরত দেয়া দেড় কোটি ডলার বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দিয়েছে ফিলিপাইন। এ ঘটনায় রিজাল ব্যাংককে ২০ কোটি ডলার জরিমানাও করেছে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঢাকায় মামলা করা হয়। বর্তমানে গৃহীত কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিগগিরই রিজার্ভ হতে চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হবে বলে রাজী হাসান জানান।
চুরি হওয়া ৮১০ কোটি টাকা ফেরত আনতে এখনও আইনি জটিলতায় আটকে আছে। টাকা ফেরত আনতে ফেডারেল ব্যাংক এবং ফিলিপাইন সহায়তা না করায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশ। ফেডারেল ব্যাংক সহায়তা না করলে মামলা করতে পারবে না বাংলাদেশ। মোটা জরিমানা, ব্যবসায়িক ক্ষতি কিংবা দেশে বিদেশে সুনাম নষ্ট হওয়ার পরও বাংলাদেশের চুরি যাওয়া রিজার্ভের টাকা ফেরত দিতে এখনো গড়িমসি করছে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক।
ফলে, অনিশ্চিত হয়ে আছে সে দেশে খোয়া যাওয়া ৬৫ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার বিষয়টি। ফিলিপাইনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ মনে করেন, এমন কার্যক্রমের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়বে আরসিবিসি।
এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচিত ফিলিপিন। দেশটির সিনেট থেকে আদালত, সবখানেই মত ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু তারপরও, রিজাল ব্যাংকের বিরুদ্ধে নেয়া ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ ছিল কেবল জরিমানাতেই। চাপ তৈরি করা যায়নি, পুরো টাকা বাংলাদেশকে ফেরত দিতে। আর পাচার হওয়া অর্থ কোথায়, কিভাবে আছে তা জানা গেলেও, বছরখানেক পর ফেরত আনা গেছে মাত্র ১৫ মিলিয়ন ডলারের মতো।
এমন বাস্তবতায় আবারো নতুন করে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। আভাস দেয়া হয়েছে আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলা করারও। এই বিষয়ে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংককে এই মামলায় যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সূত্র জানায়, যদি ফেডারেল স্বীকার করে তাদের ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরি হয়েছে তাহলে কেবল মামলা করতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য প্রথম বিবৃতি দিয়ে তাদের স্বীকার করতে হবে। তা না হলে মামলা করতে পারবে না বাংলাদেশ। কারণ ফেডারেল ব্যাংক বলছে নিয়ম মেনেই তারা টাকা ছাড় করছে। এখানে কোন চুরির ঘটনা ঘটেনি। হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে বৈধ নিয়মেই টাকা উত্তোলন করেছে। এজন্য তারা কাউকে দায়ী করতে পারবে না।
তাছাড়া এ ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পরে ফেডারেল ব্যাংক একাধিকবার বিবৃতি দিয়েছিল যে, তাদের ব্যাংক থেকে কোন টাকা চুরি হয়নি। কিংবা কোন হ্যাকিং-এর ঘটনা ঘটেনি। তাহলে কিভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক মামলা করবে। এজন্য ফেডারেল ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই সহায়তা এখনও পাওয়া যায়নি।
এত কিছুর পরেও কি বাংলাদেশ চুরি হওয়া রিজার্ভ ফিরে পাবে? নাকি আইনি জটিলতায় আটকে যাবে চুরি যাওয়া অর্থ। এ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় টাকা ফেরত পেতে হলে সময় লাগবে ১৫-২০ বছর। এত দীর্ঘ সময় মামলা পরিচালনায় ব্যয় হবে চুরি হওয়ার টাকার চেয়ে বেশি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশে নিযুক্ত পিলিপাইনের সাবেক রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ বলেন, আমাদের কাছে সব ধরনের প্রমাণ হয়েছে। এই ঘটনায় আরসিবিসি জড়িত। তারা কিভাবে ভুয়া ৬টি একাউন্টের অনুমোদন দেয়। তাদের মাধ্যমেই এই টাকা চুরি হয়েছে। ফেডারেল ব্যাংক সহায়তা করলে এই মামলায় অবশ্যই বাংলাদেশ বিজয়ী হবে। তবে ফেডারেল ব্যাংক সহায়তা না করলে এ টাকা ফেরত আনা কঠিন হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ