ঢাকা, মঙ্গলবার 13 February 2018, ১ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৬ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মানবাধিকার প্রসঙ্গ

বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুস সালাম : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, আলহামদুলিল্লাহ, মাননীয় আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মহাসচিব, ঢাকা মহানগর, মানবাধিকার সংস্থার সভাপতি, মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব ও মনোনীত সদস্যবৃন্দ, থানা পর্যায়ের আহ্বায়কবৃন্দ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ ও সম্মানীত অতিথিবৃন্দ আসসালামু আলাইকুম।
১৯৪৫ সালের ২৪ শে অক্টোবর জাতিসংঘ (United Nations Organization Called U.N.O) নামক আন্তর্জাতিক সংস্থার আত্মপ্রকাশ হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তিবর্গ: যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন ও ফ্রান্স জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা। ১৯৪৫ সালের জন্মলগ্নে জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫১, বর্তমানে দুনিয়ার প্রায় সব স্বাধীন রাষ্ট্র এর সদস্য সংখ্যা ১৯৩। ১৯৭৪ সনে ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬নং সদস্যপদ লাভ করে। ২৫ শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১ম এশীয় নেতা হিসেবে জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ প্রদান করে এক ইতিহাস রচনা করে।
১৪৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর The Universal Declaration of Human Rights was adopted by the UN General Assembly- সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ গৃহীত হয়। আজ আমরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের ৭০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান পালন করছি। ১৯৪৮ সালে আমেরিকার মেয়েরা সম্পত্তি ভোগের অধিকার পায়, অথচ ১৫০০ বৎসর আগে আল কুরআনের ৩নং সূরা নিসা বিশেষ করে মহিলাদের নামে সূরা নাযিল হয় এবং মহিলাদের সম্পত্তি ভোগের অধিকার ও অংশ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়।
The Constitution of the People’s Republic of Bangladesh provides for fundamental rights in Part III Article 26 to Article 47A.
The basic principle underlying a declration of fundamental right in a constitution is that it must be capable of being enforced against all organs of the state.
Article 3 lays down the basic rules which States are required to respect when confronted with armed groups on their territory. In internal armed conflicts, however human rights law and international humantrial law apply concurrently.
Human rights law and humanitrain law remains as destrinct branches of public international law.
The U.N Charter of Human Rights declares that all men are equal before law and they are entitled to equal protection of law. This rights were is the basic right of an man.
The rights to life, liberty and security contained in article-3 of the U.N Charter of human rights were propounded by Islam some 1500 years back.
Right to property of an individual in general and of an orphan in particular is sacred trust in Islam.
The human race is still today confronting innumerable suffering due to violation of human rights in different parts of the world.
মানবাধিকার সম্পর্কে ইসলামিক বিধান:
সূরা আম্বিয়া আয়াত ১০৭ : ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আল’আমিন অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা রাসূল (সা.)কে বলেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ব জগতের প্রতি কেবল রহমত/আশির্বাদ রূপে প্রেরণ করেছি। তাফসিরে বর্ণিত- রাসূল (সা.)কে কেবল মুসলিমদের জন্য আশির্বাদ স্বরূপ প্রেরণ করেন নাই; অমুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টানসহ সমগ্র মানবজাতির জন্য, জ্বীন জাতি, পশু-পাখি, জীব-জন্তু, গাছ-পালা, নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত সকল সৃষ্টবস্তুর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছে। হাদিস বোখারি শরীফ- খায়রুন্নাছে মানয়েনফাউন্নাসে- অর্থ: যে মানুষের কল্যাণ করে, সেবা করে সেই সর্বোত্তম ব্যক্তি। এখানে মুসলিম মোত্তাকি বলা হয়নি, মানুষ বলা হয়েছে মুসলিম-অমুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টানসহ সব মানুষের সেবার কথা বলা হয়েছে।
মহানবী (সা.) আরবের মদিনায় দুনিয়ার সর্বপ্রথম কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করেন এবং সব ধর্মের মানুষের সমঅধিকার স্বীকৃত হয় এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, পৃ-৪, তারিখ : ০২/১২/২০১৭।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবাধিকার : ইসলামের দৃষ্টিতে মানবাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, এতিম, বিধবা, চাকর-চাকরানী, মুসলিম-অমুসলিম সকল মানুষের অধিকার ইসলামে স্পষ্টভাবে বলে দেয়া আছে। এ সকলের নির্ধারিত অধিকার প্রদান করাকে ইসলাম অবশ্য কর্তব্য বলে ঘোষণা করেছে। ইসলাম বলে, মানুষের অধিকার হরণ বা নষ্ট করা হলে নিজের নেক আমল বরবাদ হয়ে যায়। যতক্ষণ সে ক্ষমা না করে দেবে, ততক্ষণ অপরের অধিকার নষ্ট করার অপরাধের ক্ষমা পাওয়া যাবে না।
ইসলাম ঘোষণা করে, গোটা মানব জাতি এক আল্লাহর সৃষ্টি। এক পিতামাতার সন্তান। একই বংশের ধারার উত্তরাধিকারী। ইসলাম বলেন, সকল মানুষের জীবন, সম্পদ এবং ইজ্জ-আভ্রু সমান। ন্যায় ও ইনসাফে সমান অধিকারী। ইসলামের শিক্ষা হলো, সব মানুষের সেবা করা উচিত।
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না তারা তাঁর অনুগ্রহসমূহের সঠিক ব্যবহারও জানে না। ফলে তাদের ইহকাল ও পরকাল দুটোই শাস্তি রূপ পরিগ্রহ করে।
দ্বীন সম্পর্কে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গভীর এবং সবচেয়ে মজবুত সম্পর্ক। এ সম্পর্ক জানের দুশমনকেও প্রাণের বন্ধু ও প্রিয়তম ভাই বানিয়ে দেয়। কুরআন ঘোষণা করেছে:
‘তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর। তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্রু। অতএব তিনি তোমাদের মন জুড়ে দিয়েছেন আর তারই অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে।’ (সূরা আল ইমরান : ১০৩)
ইসলাম উন্নত নৈতিক চরিত্রের শিক্ষা দেয়। সৎ চরিত্রের জন্য অসীম পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। অসৎ নৈতিক চরিত্রের জন্য ইহ ও পরকালীন অশুভ পরিণতির দুঃসংবাদের ঘোষণা দেয়। নৈতিক আদর্শকে রাজনীতি, অর্থনীতিসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরিচালিকা শক্তি বলে ঘোষণা দেয়। জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগকে উন্নত নৈতিক চরিত্রের রঙে রঙিন করাবার ব্যবস্থা করে। নৈতিক মূল্যবোধ নিজ সত্বা, আত্মীয়-স্বজন, জাতি ও দেশসহ সকল কিছুর ঊর্ধ্বে বলে ঘোষণা করে। সর্বোপরি, সুকৃতির বিস্তার ও দুষ্কৃতির বিনাশকেই সে মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করে:‘এরা হলো সেসব লোক, যাদেরকে আমরা পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেবে, সুকৃতির নির্দেশ দেবে এবং দুষ্কৃতি থেকে নিষেধ করবে। (আল হজ্জ : ৪১)
পারস্পরিক অধিকার প্রযোজ্য হবার এবং প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে মুসলমান হবার শর্ত নেই। প্রতিটি মানুষ, মানুষ হিসেবে সুবিচার, দয়া এবং উত্তম ব্যবহার লাভের অধিকারী। প্রত্যেক অসহায় দরিদ্র ব্যক্তি অসহায় দরিদ্র হিসেবে আমাদের সহানুভূতি লাভের অধিকারী। প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের উপর আমাদের প্রত্যেক প্রতিবেশীর অধিকার বর্তায়। আমাদের উপর প্রত্যেক আত্মীয়ের অধিকার বর্তায়, চাই সে মুসলিম হোক, কিংবা অমুসলিম। কুরআন বলেছে: ‘যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমার সাথে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের বাড়ি থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের সাথে কল্যাণকর ও সুবিচারপূর্ণ ব্যবহার করতে আল্লাহ নিষেধ করেন না। অবশ্যই আল্লাহ সুবিচারকদের পছন্দ করেন। যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের নিষেধ করেছেন। এই লোকদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করে তারা যালিম।’ (সূরা- মুমতাহিনা: আয়াত: ৮-৯)
আল্লাহ্তা’আলা যুলুম এবং বাড়াবাড়ি ছন্দ করেন না, তা কোন মুসলিম হউক কিংবা অমুসলিম। একথাও বুঝা গেল যে, অমুসলিম যদি মুসলিমের উপর বাড়াবাড়ি করে তবে সমপরিমাণের প্রতিশোধ নেবার পরিবর্তে ক্ষমা করে দেয়া উত্তম। এই কথাটি বিভিন্ন সূরায় বলা হয়েছে। সূরা শুরা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। আর মক্কী জীবন ছিল দাওয়াতী অধ্যায়। তাই উক্ত আয়াতগুলোতে যে হেদায়াত দেয়া হয়েছে, সেটাকে ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াতী অধ্যায়ের হেদায়াত বলা যেতে পারে। মদিনায় গিয়ে ক্ষমা লাভের পর কাফের মুশরিকদের যুদ্ধের মোকাবিলায় যুদ্ধই করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে :
‘যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছে, তাদেরও অনুমতি দেয়া হয়েছে। কারণ তাদের উপর যুলুম করা হয়েছে। অবশ্যই আল্লা তাদের সাহায্য করতে সক্ষম।’ (সূরা আল হজ্জ: ৩৯)।
মজলুমের যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলেও এক্ষেত্রে তাদেরকে সীমা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং আল্লাহ্র ভয় করতে বলা হয়েছে:
‘আল্লাহ্র পথে সেইসব লোকদের সাথে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। তবে সীমালঙ্ঘন করো না। কারণ আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আল বাকারা-১৯০)।
এর দু’তিন আয়াত পরেই বলা হয়েছে :
‘কাজেই যারা তোমাদের হাত তোলে, তোমরাও তাদের উপর হাত তোল ততটুকু যতটুকু তারা তোলে। আল্লাহকে ভয় করবে। মনে রেখ আল্লাহ তাদের সাথেই আছেন, যারা সীমা লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকে।’ (সূরা আল বাকারা: ১৯৪)।
অর্থ: প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষেত্রেও আল্লাহ্কে ভয় করতে হবে বাড়াবাড়ি করা যাবে না।
এখানে কয়েকটি কথা মনে রাখা দরকার। তাহলো, এই যে, প্রতিশোধ নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে, এ অনুমতি ও বিধান কেবল অমুসলিমদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। কোন মুসলমান যদি অপর মুসলমানের প্রতি জুলুম ও বাড়াবাড়ি করে, তবে তার ক্ষেত্রেও এ অনুমতি এবং এ বিধান প্রযোজ্য। মজলুম জালিম থেকে সমপরিমাণ প্রতিশোধ নিতে পারে, তবে ক্ষমা করে দেয়াই উত্তম।’
সূরা আল-মায়িদা ও আল-বাকারার মতই এটি মাদানী সূরা। এই সূরায় অমুসলিম শত্রুদের প্রসঙ্গে নি¤েœাক্ত হিদায়াত দেয়া হয়েছে:
‘কোন বিশেষ দলের শত্রুরা তোমাদেরকে যেন এতটা উত্তেজিত করে দেয় (যার ফলে) তোমরা ইনসাফ ত্যাগ বস। ন্যায়বিচার কর। এটাই তাকওয়ার সাথে গভীর সামঞ্জস্যশীল, আল্লাহ ভয় করে কাজ কর। তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। (সূরা আল মায়িদা, আয়াত-৮)। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ