ঢাকা, বুধবার 14 February 2018, ২ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৭ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চাল ও পেঁয়াজের পর এবার লাগামহীন তেলের বাজার

এইচ এম আকতার : চাল এবং পেয়াজের পর এবার লাগামহীন বাড়ছে সয়াবিন তেলের দাম। কোন কারণ ছাড়াই ৬ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি কেজি ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতি থাকলেও সরবরাহের অজুহাতে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। বাজার মনিটরিং না থাকায় এমনটি সম্ভব হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভোক্তারা। মাত্র ৩ দিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে প্রতি মণে এই পণ্যের দাম ২০০ টাকা থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আগে প্রতি মণ সয়াবিন তেলের পাইকারি মূল্য ছিল ৩১৫০ থেকে ৩১৬০ টাকা। বর্তমানে মানভেদে খোলা সয়াবিন তেল মণপ্রতি ৩ হাজার ৩৫০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৩৬০ টাকার মধ্য বিক্রি হচ্ছে। এই হিসাবে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ৬ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। আর খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে  এক’শ টাকায়। আর কেজিতে ১ টাকা হারে বেড়েছে সুপার পাম অয়েলের দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আবারো কমবে এই পণ্যের দাম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৮ লাখ টন। এর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন মাত্র ৪ লাখ টন।
শীত মৌসুমের শুরু থেকে ঢাকার বেগম বাজারে পাইকারি বাজারে সয়াবিনসহ সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে শুরু করেছিল। বর্তমানে সয়াবিন তেলের দামে এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরো তেজি হয়েছে। দুই মাসের ব্যবধানে দুদফায় পণ্যটির দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৪ টাকা বেড়েছে। শীতকালে পাম অয়েলের ব্যবহার কমে যাওয়ার জের ধরে সয়াবিন তেলের চাহিদা বেড়েছে। সে তুলনায় সরবরাহ খুব একটা বাড়েনি। এ কারণে পণ্যটির দাম বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
তারা বলছেন,শীতকালে পাম তেলের দাম বাড়ে। কিন্তু এখন কি কারণে তেলের দাম বাড়ছে তা আমাদের জানা নেই। তবে আমদানিকারকরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ খুবই কম। আর এ কারণে তেলের দাম বাড়ছে। তবে এ দাম স্থায়ী হবে না।
নিতাইগঞ্জের পাইকারি বাজারে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, প্রতি কেজি সিটি সয়াবিন তেল ৯০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। এক মাস আগেও পণ্যটির দাম ছিল কেজিপ্রতি ৮৪ টাকা। আর নবেম্বরের শুরুতে প্রতি কেজি সিটি সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছিল ৮২ টাকায়। সে হিসাবে দুই মাসের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে কেজিতে ৮ টাকা। শীত মৌসুমে ব্যবহার কমলেও সুপার কোয়ালিটি পাম অয়েলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে। গতকাল স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি সুপার কোয়ালিটি পাম অয়েল বিক্রি হয় ৮০ টাকায়। এক মাস আগেও পণ্যটির দাম ছিল কেজিপ্রতি ৭৭ টাকা। আর নবেম্বরের শুরুতে প্রতি কেজি সুপার কোয়ালিটি পাম অয়েল বিক্রি হয়েছিল ৭৩ টাকায়। সে হিসাবে দুই মাসের ব্যবধানে পণ্যটির দাম কেজিতে ৭ টাকা বেড়েছে। তবে সাধারণ মানের পাম অয়েলের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। এদিন পণ্যটি কেজিপ্রতি ৭০ টাকায় বিক্রি হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, শীতকালে পাম অয়েল জমাট বেঁধে যায়। এ কারণে প্রতি বছরই শীতকালে ক্রেতারা পণ্যটি কিনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। পণ্যটির বেচাকেনা কমতে শুরু করে। এবারো শীত শুরুর পর থেকে পাম অয়েলের বেচাকেনায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে সাধারণ মানের পাম অয়েলের বেচাকেনা। তবে চাহিদা যেই পরিমাণে কমেছে, তার চেয়েও বেশি কমেছে পণ্যটির আমদানি ও সরবরাহ। এ কারণে সাধারণ মানের পাম অয়েলের দাম স্থির থাকলেও সুপার কোয়ালিটি পাম অয়েলের দামে তেজিভাব বজায় রয়েছে। বেড়েছে সয়াবিন তেলের দামও।
নিতাইগঞ্জের ভোজ্যতেল বিক্রিকারী প্রতিষ্ঠান গোপীনাথ ভা-ারের স্বত্বাধিকারী নারায়ণচন্দ্র সাহা জানান, বিগত ছয় মাস ধরে সয়াবিন তেলের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। সে সময় প্রতি কেজি সয়াবিন তেল ৬৮-৭০ টাকার আশপাশে বিক্রি হয়েছিল। বাজারে বেচাকেনাও ছিল তুলনামূলক কম। তবে গত বছরের নবেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে পণ্যটির দাম বাড়তে শুরু করে। বদলে যায় বাজার পরিস্থিতি। এরপর দুই দফায় প্রতি কেজি সয়াবিন তেলের দাম সর্বোচ্চ ৬ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে পণ্যটি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৮৮ থেকে ৯০ টাকায়।
বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড অয়েল মার্চেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি শংকর সাহা বলেন, পাম অয়েলের চাহিদা কমলে ক্রেতারা বিকল্প পণ্য হিসেবে সয়াবিন তেল বেশি কেনেন। এর প্রভাব পড়েছে পণ্যটির বাজারে। সয়াবিন তেলের চাহিদা বাড়লেও সে তুলনায় সরবরাহ বাড়েনি। এ কারণে পণ্যটির বাজার পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরো তেজি হয়েছে। শীত শেষে চাহিদা কমে এলে সয়াবিন তেলের দামও তুলনামূলক কমতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৮৫-৮৮ টাকায়। আর প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১০৪-১০৯ টাকায়। ২০১৬-১৭ সালের একই সময়ে পণ্যটির দাম ছিল লিটারপ্রতি ৯৮-১০২ টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে লিটারে সর্বোচ্চ ৯ টাকা। গত এক মাসে প্রতি লিটার পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৭০-৭২ টাকায়। পাইকারি বাজারে এসব ভোজ্যতেলের দাম ছিল আরো কম। সে হিসাবে নিতাইগঞ্জের পাইকারি বাজারে এ সময় সয়াবিন তেল ও সুপার কোয়ালিটি পাম অয়েল বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো পণ্যের দামই বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কমছে না। অথচ বিশ্ববাজারে বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই দেশীয় বাজারে বেড়ে যায়। আর সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও ভালোভাবে মনিটরিং করছে না বলে তাদের অভিযোগ। সপ্তাহখানেক ধরে বাজারে বর্ধিত দামের তেল বিক্রি শুরু হচ্ছে। এদিকে বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দাম কমেছে। তবে দাম কমার সুবিধা পাচ্ছেন না ক্রেতারা। অন্যদিকে খুচরা বাজারে খোলা ও বোতলজাত সব ধরনের তেল আগের মতো চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে।
 বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে বাজারে এক লিটার বোতলজাত তেলের দাম রাখা হচ্ছে ১১২ টাকা। আর দুই লিটার বোতলজাত তেলের দাম রাখা হচ্ছে ২১০ টাকা। বাজারে রূপচাঁদা ৫ লিটারের বোতলের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৫৩০ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা বাড়িয়ে ৫৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তীর ব্র্যান্ডের ৫ লিটারের বোতলে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৫৩০ টাকা নির্ধারণ হয়, যা আগে ছিল ৫২০ টাকা। এছাড়া এক লিটারের বোতলের দাম বাড়িয়ে তীর ১০৭ টাকা ও রূপচাঁদা ১১২ টাকা নির্ধারণ করেছে। বাজারে অন্য ব্র্যান্ডের তেলগুলোর দামও বাড়াচ্ছে।
বিভিন্ন বাজার ঘুরে দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুচরা ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। সয়াবিন তেলের পাইকারি বাজারের সঙ্গে খুচরা বাজারে দামের ব্যবধান ৮ থেকে ১০ টাকা। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। পাইকারি দরের চেয়ে লিটারে ১১ থেকে ১৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। খুচরায় পাম তেল ৭৩ থেকে ৭৫ টাকা ও সুপার পাম তেল ৭৫ থেকে ৭৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, দেশে গত এক বছরের ব্যবধানে বোতলজাত তেলের দাম বেড়েছে ১৭ শতাংশ। সয়াবিন তেল (লুজ) এক বছরে প্রতি লিটারে বেড়েছে ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সয়াবিন (বোতল) ৫ লিটার বেড়েছে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। সয়াবিন (বোতল) ১ লিটার বেড়েছে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। ১২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ ছাড়া পাম অয়েল (লুজ) এক বছরে বেড়েছে ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। পাম অয়েল (সুপার) ১ লিটার বেড়েছে ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এদিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে গড়ে ৩ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমেছে। গত বছর ডিসেম্বরে বিশ্ব বাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিনের মূল্য ছিল ৮০০ ডলার। চার মাসের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম কমেছে ৯০ ডলার। কিন্তু দেশের বাজারে উল্টো দাম বেড়েছে।
জানা গেছে, দেশে তেলের দাম বৃদ্ধির আগে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনকে অবগত করার নিয়ম রয়েছে। প্রতিবারের ন্যায় এবারেও তাদের বিষয়টি অবগত করা হয়েছে বলে কমিশনের একটা সূত্র জানিয়েছে। তবে সে বিষয়ে অনুমোদনের পূর্বেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে ইচ্ছেমতো কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে দাম বাড়াচ্ছে।
কাওরান বাজারের মুদি দোকানি হাবিব বলেন, প্রথমে বাজারে দাম বাড়িয়ে তেল ছাড়তে শুরু করে রূপচাঁঁদা। এরপর তীরের বাড়তি দামের তেল আসছে কয়েক দিন ধরে। বিক্রয় প্রতিনিধিরা আমাদের এমনটাই বলছে। আরেক বিক্রেতা বলেন, রূপচাঁদার ৫ লিটারের বোতল কোম্পানিগুলো আমাদের কাছে দাম রাখত ৫১০ টাকা। এখন রাখছে ৫১৫ টাকা। তারা বোতলের গায়ের দাম ৫৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৪০ করে দিয়েছে।
তেল পরিশোধন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তেলের দাম বাড়াচ্ছেন। দেশের বোতলজাত সয়াবিন তেলের ৯০ শতাংশ বাজার সিটি, মেঘনা ও বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের নিয়ন্ত্রণে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ