ঢাকা, বুধবার 14 February 2018, ২ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৭ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রসঙ্গে

শিক্ষামন্ত্রীর ধমক ও হুমকিসহ সরকারের কঠোর মনোভাব এবং ধরপাকড়ের ব্যাপক অভিযান সত্ত্বেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের কর্মকান্ডকে প্রতিহত করা যাচ্ছে না। রাজধানী ও বড় বড় নগরীর পাশাপাশি বরং গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের মোবাইলে মোবাইলে ছড়িয়ে পড়ছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র। বাংলা, ইংরেজি, ধর্ম ও অংকের পর সবশেষে গতকাল মঙ্গলবার ফাঁস হয়েছে পদার্থ বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র।
এ সংক্রান্ত বিস্ময়কর একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক সংগ্রামের অনলাইন সংস্করণে। এবারের ঘটনাস্থল চট্টগ্রাম। খবরে জানানো হয়েছে, পরীক্ষা শুরু হওয়ার এক ঘণ্টা আগে বন্দরনগরীর ওয়াসা মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চালানোর সময় অন্তত ৫০ জন পরীক্ষার্থীর কাছে প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে। তারা চট্টগ্রাম আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থী। তাদের প্রত্যেকের মোবাইলে ছিল একই প্রশ্নপত্র। বড় কথা, সেগুলো পরীক্ষার হলে দেয়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। অর্থাৎ আসলেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। মোবাইল থেকে প্রশ্নপত্র ফেলে দিয়ে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দিলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। কিন্তু তা সত্ত্বেও পরীক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন ভীতি-আতংক ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর সর্বাত্মক অভিযানের মধ্যেও চট্টগ্রামের ঘটনাটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনুসন্ধানে দেখা যাবে, পদার্থ বিজ্ঞানের একই প্রশ্নপত্র দেশের আরো অনেক স্থানেই ফাঁস হয়েছে। সে কারণে ধরে নেয়া যায়, পরবর্তী সকল পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হবে এবং ফাঁস হতেই থাকবে। এর অর্থ, সরকার আসলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কর্মকান্ড প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা উদ্বিগ্ন সরকারের এই ব্যর্থতার কারণে। কেননা, শিক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু করে সকল পর্যায় থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রচারণা চালানো হয়েছিল। কোচিং সেন্টার এবং ইন্টারনেট বন্ধ করার মতো ব্যবস্থাও কম নেয়া হয়নি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই সুফল দেয়নি। সরকারের বিরুদ্ধে বরং মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো বাস্তবতা বিবর্জিত ব্যবস্থা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সরকার লক্ষ্য করেনি যে, কোচিং সেন্টারে শুধু এসএসসি পরীক্ষার্থীরা যায় না, অন্য ক্লাসগুলোর শিক্ষাথীরাও কোচিং নিয়ে থাকে। ফলে কোচিং সেন্টার বন্ধ করায় বিভিন্ন ক্লাসের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষকদের বিষয়টি। কারণ, কোচিং সেন্টারগুলোতে কয়েক হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক শিক্ষককতা করেন। বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিপুল সংখ্যক যুবকের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে। তারা এবং তাদের সঙ্গে কোচিং সেন্টারের মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ইন্টারনেট সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। কারণ, সরকারের মনোভাবে মনে হয়েছে যেন ইন্টারনেট শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের কাজেই ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে সত্য হলো, ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমদানি-রফতানিসহ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আরো অনেক ধরনের কার্যক্রম চালানো হয়। গণমাধ্যমগুলো তো বটেই, সরকার নিজেও তার সকল প্রয়োজনে ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার মাধ্যমে সরকার প্রকৃতপক্ষে মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলারই হাস্যকর এবং ক্ষতিকর পদক্ষেপ নিয়েছিল। সেটাও যে ব্যর্থ হয়েছে তার প্রমাণ শুধু চট্টগ্রামে নয়, সারাদেশেই পাওয়া গেছে। পাওয়া যাচ্ছেও।
বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে বহুবার বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, লোক দেখানো এবং ক্ষতিকর হিসেবে প্রমাণিত কোনো ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিয়ে গভীর চিন্তা ও অনুসন্ধান করা। পদক্ষেপও নিতে হবে এমনভাবে, যাতে ফাঁসের কর্মকান্ডে জড়িত মূল ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়। দুঃখ ও উদ্বেগের কারণ হলো, এ ব্যাপারেও সরকার জাতিকে নিরাশই করেছে। যেমন প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে অনুসন্ধান করার এবং ব্যবস্থা নেয়ার উদ্দেশ্যে একজন সচিবকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হলেও সাতটি বিষয়ে পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরও ওই কমিটিকে কোনো সভা করতে দেখা যায়নি। গত সোমবার পর্যন্ত কমিটি প্রধান নাকি এ সংক্রান্ত সরকারি আদেশও পাননি।
অমন একটি কমিটিকে দিয়ে যে কোনো সুফল পাওয়া যাবে নাÑ সে কথা ধরেই নেয়া যায়। এর মধ্য দিয়েও সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে উল্টো জিজ্ঞাসা ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। বলা হচ্ছে, সরকার আন্তরিক হলে গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই কমিটি তার কার্যক্রম শুরু করতো। এতে হয়তো কিছুটা হলেও সুফল পাওয়া যেতো। অন্তত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা কমে আসতো। অন্যদিকে কমিটির কোনো সভা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। হবেই বা কিভাবে? কমিটির যিনি প্রধান তিনি তো এমনকি সরকারি আদেশই পাননি!
আমরা মনে করি, এতটা দায়সারাভাবে আর যা-ই হোক, প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিহত করা সম্ভব নয়। সরকারের উচিত, বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের রহস্য অনুসন্ধান করা। একটা বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে। সেটা হলো, এই সরকারের আমলে এসে এইভাবে প্রশ্ন ফাঁসের মহামারী সৃষ্টি হলো কেন? দলপনা, দলীয় লোকজন, বিচার থেকে রক্ষা ও সার্বিক দুর্নীতিই এই অবস্থার জন্য দায়ী নয়?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ