ঢাকা, বুধবার 14 February 2018, ২ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৭ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সায়েন্স বিষয়ক কিছু ঘটনা

জাফর ইকবাল : আমাদের মাঝ থেকে আরও একটি বছর পার হয়ে গেল। গত একটি বছরজুড়ে কত ঘটনাই না ঘটেছে। অনেক ঘটনা এতটাই আমাদের অবাক করে যে, সেগুলো অনেকদিন মনে থাকে। বিশেষ করে সেগুলো যদি মেডিকেল সায়েন্স বিষয়ক হয় তাহলে তো কথাই নেই। ২০১৭ সালের অদ্ভুত কিছু ঘটনা নিয়ে এবারের আলোচনা।
চোখের ভেতর বুলেট ও ২৭ কন্টাক্ট লেন্স: ৪৫ বছর বয়স্ক একজনকে লক্ষ্য করে ০.২২ ক্যালিবার পিস্তল দিয়ে গুলি করা হলে বুলেটটি কাঠের দরজা ভেদ করে তার আই সকেটে আশ্রয় নেয়। চিকিৎসকরা বুলেট গেঁথে যাওয়া আই সকেটের স্ট্রাইকিং ইমেজ ক্যাপচার করেন। বুলেট লোকটির মাথার খুলিতে ফ্র্যাকচার করতে পারেনি। লোকটিকে যখন ইমার্জেন্সি রুমে আনা হয়, তার তীব্র ব্যথা হচ্ছিল। তার চোখের কোণে ক্ষত এবং পাতায় অশ্রুনালীতে ড্যামেজ ছিল। বুলেট অপসারণ করতে এবং অশ্রুনালীর ড্যামেজ সারিয়ে তুলতে তাকে দ্রুত সার্জারি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সবাই যখন আশঙ্কা করছিল লোকটি চিরদিনের মতো অন্ধ হয়ে যাবে; সেই আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণ করে লোকটি স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর জেএএমএ অফথ্যালমোলজিতে এই প্রতিবেদন প্রথম প্রকাশিত হয়। এরপর এই ঘটনা দ্রুত ভাইরাল হয়ে ওঠে।
আরেকটি ঘটনা এ বছর আলোচনায় ছিল। ইংল্যান্ডে ৬৭ বছর বয়স্কা এক বৃদ্ধার চোখে ২৭টি কন্টাক্ট লেন্স পাওয়া গেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। চিকিৎসকরা  তার উপরের চোখের পাতার নিচে অপরিচিত ‘নীলাভ’ অবজেক্ট দেখে বিস্মিত হন। তারা সার্জারি শুরু করলে দেখতে পান নীলাভ অবজেক্টটি ১৭টি কন্টাক্ট লেন্স দিয়ে সজ্জিত। এখানেই বিস্ময়ের শেষ নয়, চিকিৎসকরা তার একই চোখে আরো ১০টি কন্টাক্ট লেন্স আবিষ্কার করেন। বৃদ্ধা চিকিৎসকদের বলেছিলেন, তিনি চোখে অস্বস্তিবোধ করেন। চিকিৎসকরা মনে করেছিলেন, এটি চোখের শুষ্কতা বা বার্ধক্যের কারণে হতে পারে। কিন্তু সার্জারি শুরু করার পর তাদের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ঘটনাটি ২০১৭ সালের ৫ জুলাই দ্য বিএমজে জার্নালে প্রকাশিত হয়।
কয়েন জমিয়ে বিএমডব্লিউ ক্রয়: কয়েন জমিয়ে সেই টাকা দিয়ে বিএমডব্লিউ কিনেছেন চীনের এক ব্যবসায়ী। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের বরাত দিয়ে ডেইলি মেইল জানিয়েছে, গেল কয়েক বছর ধরে ওই ব্যবসায়ী চীনা মুদ্রা ইয়ান কয়েন জমা করেন। এরপর কয়েনগুলো বাক্সবন্দী করে সোজা চলে যান দোকানে। কিনে ফেলেন ৪৫ হাজার পাউন্ডের একটি ব্র্যান্ড নিউ বিএমডব্লিউ। চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের দোকানের সেলস ম্যানেজার মি. জু বলেন, ‘তিনি পাইকারী ব্যবসায়ী। গাড়িটি ক্রয়ের পর প্রথম কিস্তির অর্থ কয়েনে পরিশোধ করবেন বলে আমাদের খুব জোরাজুরি করেন। তাও আবার প্রতিটা ৫ ইয়ানের কয়েন। তবে এ কথা ঠিক তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই কয়েনগুলো জমা করেছেন। সব মিলে ৭০ হাজার ইয়ান হবে। গাড়ির প্রথম কিস্তি ৭ হাজার ৯৫৪ পাউন্ড শেষমেশ এই কয়েন দিয়েই শোধ করেছেন তিনি। ১০টি বাক্সের মধ্যে থাকা কয়েনগুলো ওই ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন দোকানের বেশ কয়েকজন কর্মচারী। আনার পর সেগুলো দোকানের মেঝেতে ঢালা হয়। সেলস ম্যানদের একটা গ্রুপ কয়েনগুলো কয়েক ঘণ্টায় গুনে শেষ করেন।
নাকের ভেতর চুম্বক : ম্যাগনেট বা চুম্বক শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ খেলনা হতে পারে। ১১ বছর বয়সের সাইপ্রাসের কথা চিন্তা করুন, সে চুম্বকের বোতাম নিয়ে খেলছিল। এ সময় অসাবধানতাবশত সমতল ও গোলাকার দুটি চুম্বকের বোতাম তার নাকে ঢুকে যায়। নাকের প্রতি ফুটোয় একটি করে চুম্বক ঢুকে যাওয়ায় বেচারা ভীষণ বিপদের সম্মুখীন হয়। এ ঘটনায় দুটি চুম্বকের বোতাম পরস্পরকে আকর্ষণ করতে থাকে এবং নাসারন্ধ্রের প্রাচীর ন্যাজাল সেপ্টামে চাপ দিতে থাকে। ফলে এক পর্যায়ে ছেলেটির নাক দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে এবং শ্বাস প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। তাকে দ্রুত ইমার্জেন্সি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। চুম্বকের বোতাম অপসারণ এবং নাকের ক্ষতিগ্রস্ত জায়গার চিকিৎসা করতে তার সার্জারির প্রয়োজন হয়। এই প্রতিবেদনটি গত জুলাই মাসে দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত হয়। এরপর ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে।
চোখের ভেতর ট্যাটু: ক্যাট গ্যালিঙ্গার নামে ২৪ বছর বয়সি এক মডেল আই বলে ট্যাটু করার পর মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আই বলে ট্যাটু করার এই পদ্ধতি অনিরাপদ। ক্যাট গ্যালিঙ্গারের চোখের সাদা অংশে পার্পল ট্যাটু ইনক ইনজেক্ট করা হয় এবং এ চর্চা ‘স্ক্লেরা ট্যাটুয়িং’ নামে পরিচিত। কিন্তু তিনি এরপর ঝাপসা দৃষ্টি, চোখ ব্যথা, চোখ ফোলা এবং চোখ থেকে পানি ঝরার মতো মারাত্মক উপসর্গের সম্মুখীন হন। গ্যালিঙ্গারের ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা যায়, চোখের ব্যথা উপশম করতে তাকে অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েডসহ কিছু ওষুধ সেবন করতে হয় এবং পরবর্তী সময়ে বাধ্য হয়ে তাকে সার্জারির চাকুর নিচে চোখ রাখতে হয়।
 তিনি জানান, সার্জারির পর শেষ পর্যন্ত তার চোখ ভালো হয়ে যায় এবং পূর্বের তুলনায় কম ব্যথা অনুভব করেন। কিন্তু ট্যাটু নিয়ে তারপরও বছরজুড়ে কম আলোচনা হয়নি। এ বছর শেষের দিকে ফ্লোরিডার একজন লোকের অস্বাভাবিক ট্যাটু নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। লোকটিকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয় এবং তার বুকে ‘জ্ঞান ফিরিয়ে আনবেন না’ লেখা ট্যাটু ছিল।
এরপরই চিকিৎসকরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। তারা বুঝতে পারছিলেন না, এ অবস্থায় রোগীর জ্ঞান ফিরিয়ে আনা ঠিক হবে কিনা? একদল মনে করেন, রোগীর অনুমতি ছাড়া কাজটি করা ঠিক হবে না। যেহেতু তার শরীরে এরকম কথা লেখা আছে। অন্য দলের ভাষ্য তাদের অবশ্যই যে কোনো উপায়ে রোগীর সংজ্ঞা ফিরিয়ে আনা উচিত। একজন মেডিকেল নৈতিকতা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের এ সময় রোগীর ট্যাটুকে সম্মান জানাতে উপদেশ দেন।
পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, লোকটি আসলেই ফ্লোরিডা ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ থেকে অফিসিয়াল ‘জ্ঞান ফিরিয়ে আনবেন না’ অর্ডার নিয়েছিল। খুব দ্রুত তার অবস্থার অবনতি হয় এবং কোনোরকম লাইফ-সাপোর্ট মেথড ছাড়া ইচ্ছানুসারে তিনি মারা যান। দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে গত ৩০ নভেম্বরে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্কের ঝড় ওঠে।
পাকস্থলীতে একশর বেশি লোহা: ফ্রান্সের ৫২ বছর বয়স্ক একজন পুরুষের পাকস্থলীতে ১০০টিরও বেশি লোহা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে পেরেক, ছুরি, স্ক্রু ড্রাইভারের মাথা, লোহার তার, কাঁটাচামচ এবং কিছু কয়েন। লোকটি পাঁচ বছর বিভিন্ন উপসর্গ (যেমন- পেটব্যথা, বমিবমি ভাব এবং রক্তবমি) নিয়ে পাঁচবার ইমার্জেন্সি রুমে গিয়েছিল।
এসব লোহা অপসারণ করতে ডাক্তারদের প্রতিবারই অপারেশন করতে হয়েছে। পুঞ্জীভূত লোহার স্তূপ এত বড় ছিল যে, লোকটির পাকস্থলী খালি হতো না কখনও।
লোকটির মধ্যে সাইকোসিস নির্ণীত হয়েছে। সাইকোসিস একটি মানসিক রোগ।
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বাস্তবতা বুঝতে পারে না।
পাকস্থলীতে ১০০টিরও বেশি মেটাল পাওয়া লোকটির সার্জারি শেষে তাকে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারীদের কাছে রেফার করা হয়। এ ঘটনাটি ২০১৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিএমজে কেস রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ