ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 February 2018, ৩ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্বল্পতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কৌশল না নেয়ায় বছরে ক্ষতি প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা

কামাল উদ্দিন সুমন : ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা অলস রেখে বার বার গ্রাহকের পকেট কাটছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বর্তমান সরকারের আমলে ৮ দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচেছ  সরকারের এ সংস্থাটি। অথচ জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়নোর কোন সুযোগ নেই। বরং বিদ্যুতের দাম আরো কমানো যায়। এনিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ক্যাব।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের এমন অভিমতের সত্যতা মিলেছে বিদ্যুৎ বিভাগের এক পর্যালোচনায়। ঐ পর্যালোচনায় বলা হয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় সাত হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা অলস রেখে দিয়েছে। বিনিয়োগ না করে এ থেকে দুই থেকে তিন শতাংশ হারে সুদ নিচ্ছে।
 মোট সাত হাজার ৭৩৪ কোটি টাকার মধ্যে ঢাকার পিডিবি সদস্য (অর্থ পরিদফতর)-এর অধীনে পাঁচ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা। বাকি অর্থ বিভিন্ন বিতরণ অঞ্চলের অধীনে ব্যাংক হিসেবে জমা আছে। তবে পিডিবি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এই অর্থ জমা রাখা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, প্রতি মাসে পিডিবির রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা থেকে দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা। আর প্রতিমাসে খরচ দুই হাজার ৪৫০ থেকে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এতে প্রতিমাসে পিডিবির ঘাটতি থাকে ৩৫০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি টাকা। সাধারণত পিডিবি তিন মাসের পরিচলন খরচ জমা রাখে। তিন মাসে প্রয়োজন হয় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, পিডিবির প্রায় সব অর্থই স্বল্প মেয়াদে জমা রাখা। ব্যাংক ভেদে এমন আমানতের ওপর সুদের হার আড়াই থেকে তিন শতাংশ। জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পিডিবির কাছে এ বিষয়ে জবাব চায় বিদ্যুৎ বিভাগ। এবিষয়ে সংস্থার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ কিছু জানেন না বলে বৈঠকে জানান। এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের পরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, সরকারের উচিত পিডিবিকে ব্যবসায় করার জন্য হিসাব পরিষ্কার রাখা।
অভিযোগ রয়েছে, এমন সব ব্যাংকে এসব টাকা রাখা হয়েছে যাদের সঙ্গে বছরের পর বছর কোনও লেনদেনও করা হয়না।
এদিকে ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে পিডিবির লোকসানের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। চলতি বছর  সরকারের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে পিডিবি।
 তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহম্মদ বলেন, এভাবে ব্যংকে টাকা ফেলে রাখাটা উদ্দেশ্যমূলক। একদিকে পিডিবি বিদ্যুৎতের দাম বাড়ানোর সময় বারবার বলছে তারা লোকসান দিচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে ব্যাংকে পড়ে আছে অলস টাকা। এই টাকা পিডিবি যদি খরচ করতো তাহলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজনই পড়তো না। এক দিকে তারা বেশি সুদে ঋণ নিয়ে প্রকল্প করছে অন্যদিকে কম সুদে নিজেরদের টাকা ফেলে রেখেছে। এভাবে টাকা ফেলে না রেখে সুষ্ঠুভাবে  বিনিয়োগ করলে লোকসান কম হতো। বিদ্যুতের দাম কমে আসতো।
গত বছরের নবেম্বরে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী নেতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতার মুখে গ্রাহক পর্যায়ে ফের বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সরকার। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বিইআরসি। ডিসেম্বর থেকে নতুন এ হার কার্যকর হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অষ্টম দফায় বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম।
দাম বাড়ানোর কারণে বিদ্যমান ৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ৬ টাকা ৮৫ পয়সায় দাঁড়াবে। তবে গ্রাহক শ্রেণী এবং ধাপভেদে এ দাম সাড়ে ৩ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।
অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান বাস্তবতায়ও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ থেকে ৬ পয়সা কমানো সম্ভব ছিল। উল্টো বিইআরসি ৫.৩ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে। কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বেশি দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। সরকারের নীতি অনুযায়ী মেরিট অর্ডার ডেসপাচ পরিচালিত হচ্ছে না। স্বল্পতম ব্যয়ে উৎপাদন কৌশল গ্রহণ না করায় ভোক্তারা বছরে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির শিকার হচ্ছে। সরকার কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল গ্রহণ না করে বেশি দামে উৎপাদন করে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে চলছে। এটি অন্যায্য ও অন্যায়।
ক্যাব বলছে, বিদ্যুতের দাম কমাতে ১৫ দফা মানতে হবে । এগুলো হলো তরল জ্বালানির দাম সমন্বয় না করায় এর জন্য যে উৎপাদন খরচ বেড়েছে তা সমন্বয়  না করা, দ্রুতভাড়া বিদ্যুতের স্থির খরচ যৌক্তিক নয় বলে এটাও সমন্বয় না করা,  বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলের অর্থে কম খরচের বিদ্যুৎ  কেন্দ্র স্থাপন করা, বিদ্যুৎ  জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইন বাতিল করা, ক্যাব এর দেয়া বিদ্যুতের দাম কমানোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা, বিদ্যুৎ কোম্পানিতে সক্ষমতাভিত্তিক বেতন চালু করা, অপচয় কমাতে হবে, কম খরচের বিদ্যুৎ বেশি উৎপাদন করতে হবে।
ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণে বিদ্যুতে অযৌক্তিক খরচ হচ্ছে, যার পুরোটাই বহন করে ভোক্তারা। বিআরইসি ইচ্ছেমতো-যা খুশি তা করছে। কিন্তু তারা তা করতে পারে না।বিইআরসি ভোক্তা ও উৎপাদকদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সমন্বয় করবে। তাদের একটি রেগুলেশন আছে- কীভাবে মূল্য নির্ধারিত হবে। কিন্তু সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম ঠিক করতে গণশুনাতিতে ভোক্তারা যে যুক্তি-তর্ক, তথ্য প্রমাণ দিয়েছে তা উপেক্ষিত হয়েছে।তিনি বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন ও বিতরণে ঘাটতি যৌক্তিক গণ্য করে বিআরইসি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করে অথচ ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা অলস পড়ে থাকে কিন্তু বিনিয়োগ করে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ