ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 February 2018, ৩ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

লাগামহীন তেল ও চালের বাজার

ধমক দেয়ার এবং লম্বা আশ্বাস শোনানোর বাইরে মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে চালের তো বটেই সম্প্রতি লাফিয়ে বেড়েছে এমনকি ভোজ্য তেলের দামও। গত বছর বন্যা ও বৃষ্টির সময় চালের দাম সেই যে বাড়তে শুরু করেছিল তার আর কমে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ৭০/৭৫ টাকা দরের সরু বা চিকন চালের কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। প্রতি কেজি মোটা চালের দামও এখনো ৪৬ টাকার নিচে নেমে আসেনি। ওদিকে বিগত কয়েকদিনে হঠাৎ বেড়ে গেছে সয়াবিন এবং পাম অয়েলের দাম। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত দুটি পৃথক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, খোলা বাজারে প্রতি লিটার ভোজ্য তেলের দাম গড়ে ১০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতলজাত সয়াবিনের জন্য বোতলের গায়ে মুদ্রিত মূল্যের ওপর নতুন দাম হাতে লিখে বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা। জানতে চাওয়া হলে তারা কোম্পানির দিকে আঙুল ওঠাচ্ছে। জানাচ্ছে, সব কোম্পানিই নাকি প্রতি লিটারে ১০/১২ টাকা করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির কথাটা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ- টিসিবিও স্বীকার না করে পারেনি। টিসিবি জানিয়েছে, প্রতি লিটারে তিন দশমিক ৬৬ শতাংশ হিসেবে বোতলজাত পাঁচ লিটারে সয়াবিনের দাম বেড়েছে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ পর্যন্ত। পাম অয়েলের মূল্য বৃদ্ধির হার ছয় দশমিক ৭৭ শতাংশ। অথচ এই সময়ে কোনোটিরই দাম বেড়ে যাওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, শীতের সময় পাম অয়েল জমে যায় বলে ব্যবসায়ীরা বিক্রির জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। ফলে শীতের ঠিক পরপর পাম অয়েলের দাম বাড়তে পারে না। অতীতেও কখনো বাড়েনি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের দামও কমেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম ছিল আটশ’ মার্কিন ডলার। চার মাসের ব্যবধানে প্রতি টনে কমেছে ৯০ ডলার। সে অনুযায়ী দেশের বাজারেও সয়াবিনের দাম কমে আসার কথা। সেটা নিয়মও। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টো ব্যাপার। প্রতি লিটারের জন্য বরং ১০ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায় করা হচ্ছে। টিসিবি তো বটেই, সরকারের ট্যারিফ কমিশনকেও বিষয়টি নিয়ে নড়াচড়া করতে দেখা যাচ্ছে না।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এভাবে ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর কার্যক্রম সকল বিচারে অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষকে অসহায় অবস্থায় পড়তে হয়েছে। কারণ, পরিসংখ্যানে জানা গেছে, দাম বেড়ে আসছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই। প্রসঙ্গক্রমে গত বছরের বন্যা ও অতি বৃষ্টির পর লাফিয়ে বেড়ে যাওয়া চালের দামের কথা স্মরণ করতেই হবে। সে সময় সরকার যদি সময় থাকতে আমদানি শুল্ক কমানোর মতো পদক্ষেপ নিত তাহলে হয়তো চালের দাম বাড়তে পারতো না। অন্যদিকে সরকার এমন এক সময়ে শুল্ক হার ২৮ শতাংশ থেকে দুই শতাংশে নামিয়ে এনেছিল, যে সময়ের মধ্যে একদিকে টাউট ব্যবসায়ীরা জনগণকে যথেচ্ছভাবে লুণ্ঠন করেছিল, অন্যদিকে দেশে চালের মজুদ একেবারে তলানিতে নেমে এসেছিল। অথচ সময় থাকতে শুল্ক হার কমানো হলে সৎ আমদানিকারকরা উৎসাহিত হতেন এবং চালের আমদানি অনেক বেড়ে যেতো। এর ফলে টাউট ও অসৎ ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারতো না। কিন্তু বিলম্বিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার বাস্তবে গণবিরোধী ব্যবসায়ী নামধারীদের জন্যই সুযোগের সৃষ্টি করেছিল।
ভীতি ও আশংকার কারণ হলো, ওই সময়ের মতো বর্তমানে চলমান ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যেও সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সততার সঙ্গে তৎপর হতে এবং সুফলপ্রসূ কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। কোনো কোনো উপলক্ষে কথিত ‘অসৎ ব্যবসায়ীদের’ হুমকি দিয়ে বেড়ানো হলেও ব্যবসায়ী নামধারীরা এসব হুমকিকে সামান্য পাত্তা পর্যন্ত দিচ্ছে না। এজন্যই আমনের ভরা মওসুমেও মানুকে ৪৬ টাকা কেজি দরে মোটা চাল কিনতে হচ্ছে, দাম বেড়ে চলেছে ভোজ্য তেলসহ সকল পণ্যের। এমন অবস্থায় ভুক্তভোগী মানুষ না ভেবে পারছে না যে, কথিত ‘অসৎ ব্যবসায়ীদের’ সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের অতি চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে বলেই কোনো ধমকে কান দিচ্ছে না তারা। আর অতি চমৎকার সম্পর্কের পেছনে যে চাঁদা ও কমিশনই প্রধান নির্ধারকের ভূমিকা রাখে সে কথাটাও কাউকে বুঝিয়ে বলতে হচ্ছে না। এজন্যই সকল পণ্যের দাম চলে যাচ্ছে মানুষের নাগালের অনেক বাইরে। মানুষ না বলে পারছে না যে, পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে কোনো সফলতাই দেখাতে পারেনি সরকার। সুচিন্তিত ঔদাসীন্যের আড়ালে সরকারের প্রশ্রয় বরং ব্যবসায়ী নামধারীদের বেপরোয়া করে তুলেছে। যার ফলে চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে দাম বাড়লেও মানুষকে বাজারে যেতেই হচ্ছে। কারণ, তিন বেলা না হোক, দু’বেলা তো খেতে হবে। স্ত্রী-সন্তানদের মুখেও খাবার তুলে দিতে হবে। সুতরাং বেশি দাম দেয়ার সাধ্য না থাকলেও বাজারে না গিয়ে পারছে না তারা।
আমরা মনে করি, সব মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভীতিকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। একই কারণে লোক দেখানোর জন্য ঘটনাক্রমিক হুমকি উচ্চারণের পরিবর্তে সরকারের উচিত কঠোরতার সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা এবং পণ্যের মূল্য কমিয়ে আনা। চাল, চিনি, সয়াবিন ও আটার মতো জরুরি পণ্যগুলো ওএমএস-এর মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা নিলেও মানুষের উপকার হতে পারে। বলা দরকার, মনিটরিং করে যথেচ্ছভাবে দাম বাড়ানোর কার্যক্রমকে প্রতিহত না করা গেলে চাল ও তেলসহ সকল পণ্যের দাম আরো বাড়তেই থাকবে এবং সরকারের কথিত ‘কঠোর নজরদারি’র কোনো সুফলই মানুষ ভোগ করতে পারবে না। অমন অবস্থার দায়ও সরকারের ওপরই চাপবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ