ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 February 2018, ৩ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জাতীয় দলের কেন এই ব্যর্থতা?

নাজমুল ইসলাম জুয়েল : হঠাৎই যেন অন্য এক বাংলাদেশের দেখা মিলেছে। চনমনে, ফুরফুরে সেই অবস্থা যেন হঠাৎই উধাও হয়ে গেছে। সাফল্যের বিপরীতে আচমকাই ব্যর্থতার আকাশে বাতাসে অবস্থান করছে লাল সবুজ প্রতিনিধিরা। কিন্তু হঠাৎই কেন এই ছন্দপতন। নিজভুমে অপ্রতিরোধ্য দলটি এখন নিজেদের হারিয়ে খুজছে। দলেল আপদকালীন দায়িত্বে থাকা জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন যেন এককাঠি এগিয়ে গিয়ে দলের ব্যর্থতার কারণ শুনিয়েছেন। কিন্তু এসবের মধ্যে আবার চলে এসেছে অন্য প্রসঙ্গও। শ্রীলঙ্কার কাছে টেস্ট সিরিজে হারের পর সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে, সংবাদ মাধ্যমে যেভাবে টাইগারদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠায় ভীষণ ক্ষুদ্ধ হয়েছেন টাইগারদের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সুজন। তার মতে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জায়গাটা নোংরা হয়ে গেছে। এর পেছনে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে মিডিয়া। তাই এই সিরিজ শেষেই দায়িত্ব ছাড়তে চাইছেন সুজন। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় ত্রিদেশীয় নিদাহাস ট্রফিতে তার দায়িত্ব পালনের সম্ভাবনা থাকলেও নিজেই তা উড়িয়ে দিয়েছেন, ‘আমি অনেক বিষয়েই আসলে খাপ খাইয়ে নিতে পারছিনা। খারাপ ফলের দায় আমি নিতেই পারি। আমাদের পরিকল্পনায় ভুল থাকতে পারে, আরও কিছু থাকতে পারে। কিন্তু আরও অনেক ঘটনা তো মিডিয়ায় আসে। আমার ওপরও অনেক দায় আসে। এটা আমি বোর্ডকে বলবো। ব্যক্তিগতভাবে আমি একটুও আগ্রহী নই দায়িত্ব চালিয়ে যেতে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সঙ্গে আমার কাজ করতে ইচ্ছেই করছে না। নোংরা লাগছে জায়গাটা।’ মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম প্রাঙ্গনে দেশের মিডিয়াকেও একহাত নিলেন টাইগারদের সাবেক এই ম্যানেজার। মিডিয়ার জন্যই নাকি জায়গাটি নোংরা হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নয়নে মিডিয়াকে অন্যতম প্রধান অন্তরায় বলেও উল্লেখ করলেন তিনি। ক্ষোভ নিয়ে বলে যান, ‘কি আর বলব, আসলেই বলার কিছু নেই। আপনারাও জানেন, আমরাও জানি। নোংরা বলতে গেলে মিডিয়ায় যেভাবে বলা হয়, আমাদের ক্রিকেটের একটা বড় অন্তরায় মিডিয়াও। আমরা এত ‘ফিশি’ হয়ে যাচ্ছি আস্তে আস্তে, মিডিয়ার কারণে আমাদের ক্রিকেট আটকে  আছে কিনা, সেটাও একটা প্রশ্ন এখন আমার কাছে।’
যদিও এসব বিষয় নিয়ে সেখানে উপস্থিত সংবাদকর্মীরা সেভাবে তার কাছ থেকে নতুন করে কিছু জানতে চায়নি। মিরপুরে মাত্র আড়াই দিনের মাথায় শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। বলতে গেলে, লঙ্কান স্পিনারদের সামনে টাইগারদের অসহায় আত্মসমর্পণেই পরাজিত হয় বাংলাদেশ। প্রসঙ্গ আসে তার দলের দায়িত্ব নেয়ার বিষয়ে। টাইগারদের সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের চলে যাওয়ার পর কোনো কোচ নিয়োগ দেয়নি বিসিবি। দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে মূলত কোচের দায়িত্বই পালন করে আসছেন বাংলাদেশের জাতীয় দলের সাবেক এ অধিনায়ক। কোচ হিসেবে আবার দায়িত্ব নেয়ার প্রসঙ্গ আসতেই ৪৬ বছর বয়সী সুজনের সরাসরি উত্তর, ‘সত্যি কথা বলতে কি, পার্সোনালি আমি আর আগ্রহী না। আমার আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গেই কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। আমার আসলে নোংরা লাগছে সত্যি কথা বলতে গেলে ওইভাবে।
এত বছর বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে কাজ করছি, বাংলাদেশের উন্নতির জন্যই কাজ করছি। এখানে আমার কোন স্বার্থ নাই। আমি আর আগ্রহী না।’ ঢাকা টেস্টে শ্রীলঙ্কার কাছে মাত্র আড়াই দিনে ২১৫ রানের বিশাল ব্যবধানে হারের পরই আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে। কেন এভাবে হারলো- এর চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সবচেয়ে বেশি সরব সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, টুইটারে ব্যবচ্ছেদটা এমনভাবে হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশের এই পরাজয়ের জন্য টিম ম্যানেজমেন্টই যেন পুরোপুরি দায়ী। মিডিয়ায়ও আসছে নানা ব্যাখ্যা। যার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্টকে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার আক্রমণের তিরটা সবচেয়ে বেশি গিয়ে আঘাত হানছে দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজনকে।
মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ার আক্রমণে জর্জরিত টেকনিক্যাল ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজন এবার নিজের সব ক্ষোভ উগড়ে দিলেন মিডিয়ার ওপর। মিডিয়ার ওপর এতটা ক্ষুব্ধ হলেন যে তিনি বলেই বসলেন, ‘মিডিয়ার কারণে আমাদের ক্রিকেট আটকে আছে কি না সেটাও দেখতে হবে।’ সোশ্যাল মিডিয়ার আক্রমণে আহত বাঘের মত হয়ে গেলেন যেন সুজন। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, নোংরা বলতে আসলে কোনটা বোঝাচ্ছেন? জবাবে মিডিয়ার দিকেই ইঙ্গিত দিলেন তিনি। মিডিয়ায় দলের বাজে পারফরম্যান্স নিয়ে যা লেখা হয়েছে তাতে তিনি খুব বিরক্ত। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপরও রাগ রয়েছে তার। নোংরা বলতে কী বোঝাচ্ছেন এর জবাবে তিনি বলেন, ‘সবকিছুই। আমার কথা হচ্ছে সব কিছুই। এটা আসলে বলার কিছু নাই। আপনারাও জানেন, আমরাও জানি। নোংরা বলতে গেলে, মিডিয়াতে যেভাবে লেখা হয়। আমাদের ক্রিকেটের বড় অন্তরায় হচ্ছে, মিডিয়ারও একটা ব্যাপার আছে যে আমরা এত ফিশি হয়ে যাচ্ছি। এখন মিডিয়া ফিশি। মিডিয়ার কারণে আমাদের ক্রিকেট আটকে আছে কি না সেটাও দেখতে হবে।
এটা তো বেশি মিডিয়াতে এখন।’ বাক্যটা শেষ করলেন না খালেদ মাহমুদ। পরক্ষণেই নিজের দিকে কথাটাকে টেনে নিয়ে মিডিয়াকে কিছু উপদেশও দিলেন। জানালেন একজন খেলোয়াড় কিভাবে তৈরি হয় সেই প্রক্রিয়ার কথাও। সুজন বলেন, ‘আসলে বেসিক ফিল আমার, ক্রিকেট আমরা এতবছর ধরে খেলছি। এখন এত গসিপিং হয়। মিডিয়াতে ভাল খারাপ সবই হবে; কিন্তু কিছু কিছু জিনিস নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেটের জন্য খুব কঠিন। একটি ছেলেকে তুলে নিয়ে আসা এত সহজ না। একটা ডেভেলপমেন্ট থেকে শুরু করে তাকে তৈরি করে তোলা অনেক কঠিন। কোচ কাজ করে, নাইনটিন দল, এইচপি অনেক কিছু। এই কথাগুলো যদি ঠিক না হয় তাহলে আমার মনে হয় না বাংলাদেশের ক্রিকেট অনেক দূর যাবে।’ প্রশ্ন আসলো, আর যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী নন বলেছেন, মিডিয়ার উপর রাগ করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? জবাবে আরও আবেগি হয়ে ওঠেন খালেদ মাহমুদ সুজন।
জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট খেলে এবং ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার পর এমন শুনতে হবে, তা তিনি কল্পনাও হয়তো করতে পারছেন না। বিশেষ করে তার নিজের নিবেদন নিয়ে কথা উঠলে সেটা খারাপই লাগে। সুজন বলেন, ‘আমি তো গড না। আমি তো খালেদ মাহমুদ সুজন। আমি খুবই সামান্য একটা মানুষ। আমি মনে করি আমার সামর্থ্য, আমি এখানে দাঁড়িয়ে কাজ করেছি মানুষ স্বীকার করুক না করুক- আমি এটা ভালোবাসি। আমি যখন শুরু করছি আপনারা হয়ত তখন খুব ছোট। জানেন না, হয়ত জানার কথাও না। আমি যখন শুরু করি ১২-১৩ বছর বয়সে। অন্য কিছু নিয়ে কথা বললে আমার মেজাজ খারাপ হতে পারে। টেকনিক্যাল হয়ত খারাপ হতে পারি; কিন্তু অন্য বিষয় নিয়ে যখন কথা বলে, তখন এটা আমাকে খুবই আহত করে।’ চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৩ বল খেলে ৯ রান করে ম্যাচ বাঁচানোর ক্ষেত্রে দারুণ অবদান রাখার পরও মোসাদ্দেককে বসিয়ে রেখে ঢাকায় সাব্বিরকে খেলানোর ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুঞ্জন উঠেছে- এটা খালেদ মাহমুদ সুজনের কারণেই হয়েছে। সুজন আবাহনীর কোচ। এ কারণে মোসাদ্দেক যেন প্রিমিয়ার লিগে আবাহনীর হয়ে খেলতে পারে, সে জন্য ঢাকা টেস্টের দলে রাখা হয়নি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সরাসরি যখন সুজনকে এভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, তখন বিষয়টা তার জন্য খারাপ লাগারই। তিনি এরই প্রতিবাদ করে কথা বললেন। সুজন বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে গেলে যখন আসে যে, আমি আবাহনীর হেড কোচ। আমি মোসাদ্দেককে খেলাইনি এ কারণে যে, আবাহনীতে খেলার জন্য। যখন ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট নিয়ে কথা বলে তখনই এটা খুবই আহত করে। আমি মনে করি না, বাংলাদেশের থেকে আবাহনী বা অন্য কিছু আমাকে টাচ্ করতে পারে। জীবনেও ছুঁতে পারবে না, ছুঁতে পারেওনি। এ গুলা নিয়ে যখন কথা বলা হয়, তখন আহত হই খুব’।
তবে সুজনের কথায় একটা বিষয় পরিস্কার, দলের ভেতরে কিছু একটা ঝামেলা হচ্ছে। কোচ হয়তো খেলোয়াড়দের ঠিকভাবে মোটিভেট করতে পারছেননা। সে কারণেই খেলোয়াড়দের সীমাবদ্ধ নিয়ে তুলেছেন প্রশ্ন। এসব বিষয় নিয়ে বোর্ডের দ্রুতই ভাবা উচিৎ। পাশাপাশি একজন ভালমানের বিদেশী প্রধান কোচ নিয়োগ দেওয়ার সময় এসেছে। তাহলে হয়তো ফিরতে পারে পুরনো রূপ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ