ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 February 2018, ৩ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফুটবলে আরামবাগের জয়গান

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : এক শিরোপা দিয়েই নতুনভাবে নিজেদের জানান দিয়েছে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ। এর আগে বেশ কয়েকবার ফাইনালে খেললেও শিরোপা জেতা সম্ভব হয়নি। হয়েছে এবার। ক্লান্ত আর পরিশ্রান্ত দল নিয়েও পেয়েছেন সাফল্য। ২০১৬ ফেডারেশন কাপ ফাইনাল। তারুণ্যের আগুন জ্বেলেও শেষ পর্যন্ত পারল না আরামবাগ। লি টাকের একটা গোলই পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল সেদিন। আবু সুফিয়ান সুফিল, জাফর ইকবাল, মোঃ আবদুল্লাহরা সামর্থ্যরে শেষ বিন্দু দিয়ে লড়েও ইংলিশ ওই ফরোয়ার্ডের মুহূর্তের সৃষ্টিশীলতায় হার মেনেছিল। দুই বছর পর প্রায় একই মঞ্চে তারুণ্যের জয়গান গাওয়া আরামবাগ। প্রতিপক্ষে ঢাকা আবাহনীর বদলে চট্টগ্রাম আবাহনী। এবার আর স্বপ্নভঙ্গ নয়। যে দাপটে তারা ফাইনালে উঠে এসেছিল, তেমনি দাপুটে জয়ে জিতল শিরোপা।
ছোট্ট ক্লাবটির ৬০ বছরের ইতিহাসে এলো সবচেয়ে বড় অর্জন। সেই ফেডারেশন কাপের ফাইনালে খেলা সুফিল এদিনও ছিলেন, এদিন তো তাঁর বাহুতে অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড। কিভাবে সম্ভব হলো এবার? আরামবাগের তরুণ অধিনায়কের কণ্ঠে মিশে সেরার গর্ব, ‘অনেক কারণেই এবার আমরা সাফল্য পেয়েছি। ২০১৬ সালের ফেডারেশন কাপে বিদেশি খেলোয়াড়রাও ছিল। আরামবাগের চেয়ে অনেক ভালো মানের বিদেশি ছিল আবাহনীতে। এবার সেই পার্থক্য না থাকায় আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম স্থানীয়দের মাঝে নিজেদের সেরা প্রমাণ করার। স্বাধীনতা কাপের প্রতিটি ম্যাচে আমরা সেটি করে দেখিয়েছি, ফাইনালেই শুধু নয়।’ ফাইনালের আগে কোচ মারুফুল হক বলেছিলেন, ‘আমার খেলোয়াড়রা ম্যাচে ১৩-১৪ কিলোমিটার দৌড়াতে পারেন। অফুরন্ত দম। এটাই আমাদের অ্যাডভান্টেজ।’ মাঠেও দেখা গেছে তারুণ্যের এই গতিতেই পেছনে ফেলে দিয়েছে তারা চট্টগ্রাম আবাহনীর জাতীয় দলে খেলা ফুটবলারদের। ফুটবলে গত কয়েক বছর ধরেই তারুণ্যের জয়গান।
 যে জাতীয় দল ভুটানের কাছে হারের লজ্জা ‘উপহার’ দিয়েছিল, তাদের সঙ্গে মেলানো যায়নি অনূর্ধ্ব সাফে যে দলটি খেলেছে কিংবা অনূর্ধ্ব-১৮ সাফ, অনূর্ধ্ব-১৯ এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপ বাছাই যাঁরা খেলে এসেছে তাঁদের। সেই সুফিল, জুয়েল, আরিফ, রকিরাই তো আরামবাগের শক্তি। নতুনের জয়গান তাদের মিথ্যা হয়নি। ফাইনালের গোলদাতা আরিফ বাফুফের ফুটবল একাডেমি, অনূর্ধ্ব-১৯ দল হয়ে চট্টগ্রাম আবাহনীতে নাম লিখিয়েছিলেন, কিন্তু খেলার সুযোগ হয়নি। মধ্যবর্তী দলবদলে আরামবাগে পা রেখেই তিনি দেখিয়েছেন তারুণ্যের শক্তি। সাইফুল বারী টিটু অনূর্ধ্ব-১৮ ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের তারকা জাফরকেও সেভাবে ব্যবহার করেননি লিগে। নতুন মৌসুমে এই তরুণ নিয়মিত খেলার সুযোগের খোঁজে। ২০১৬ সালের ফেডারেশন কাপে জাফর, সুফিল, আবদুল্লাহই ছিলেন সাইফুল বারী টিটুর বাজির ঘোড়া। দল বদলে তিনি চট্টগ্রাম আবাহনীতে যান সেসময়কার সেরা দুজন আবদুল্লাহ আর জাফরকে সঙ্গী করে। সুফিল তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, ‘গতি আর শক্তিতে ও সম্ভাবনাময়, তবে খেলোয়াড়ি মাথাটা ওর কম।’
লিগে শিরোপা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বারী বরখাস্ত হয়েছেন চট্টগ্রামের দল থেকে। আরামবাগে রয়ে যাওয়া সুফিলই মৌসুম শেষে অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের তমকা পাচ্ছেন। খেলোয়াড়ি মেধা নিয়ে বারীর যে দ্বিধা ছিল এই মৌসুমে সে জায়গাটাতেই দেখা গেছে সুফিল সবচেয়ে আলোকিত। আরামবাগে থেকে যাওয়া তারকা হিসেবে জুয়েল, বাপ্পী, আরিফ, রকিদের মতো নতুনদের সঙ্গে খেলেছেন তিনি দায়িত্ব নিয়ে। দলটির ক্ষুরধার আক্রমণভাগের নাটাইটা ছিল তাঁর হাতেই, তাঁকে ঘিরেই বিকশিত আরিফ, জুয়েলরা। সুফিলের নিজের এমন বদলের পেছনে জেদ আর চ্যালেঞ্জ জয়ের তাড়না, ‘জাফর, আবদুল্লাহ যখন বড় দলে চলে গেল, জাতীয় দলেও ডাক পেল, তখন আমার সামনে একটাই পথ খোলা ছিল আরামবাগে থেকেই এর জবাব দেওয়া। সেই চেষ্টাই আমি করে গেছি।
অনূর্ধ্ব-১৮ ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে সফল দুটি টুর্নামেন্ট খেলে এসেও আমার মাথায় ছিল আমার ক্লাব। স্বাধীনতা কাপের পর এখন মনে হচ্ছে আমি আমার চ্যালেঞ্জটা জিততে পারছি।’ মামুনুল, জাহিদ, জামাল, হেমন্তরা যখন ঝিমুচ্ছেন, জাতীয় দল আর ক্লাবের জার্সি গায়ে তখন এই তরুণরা দিচ্ছেন রণহুঙ্কার। গত কয়েক বছরে বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের সাফল্যের সঙ্গে আরামবাগের এই ইতিহাস গড়া এক সুতায় গাঁথা, এমনটা এখন বলাই যায়। জাতীয় দলের নতুন কোচ অ্যান্ড্রু অর্ডের দলে তার প্রতিফলনও আছে। তারুণ্যে আস্থা রেখেছেন তিনি।
এ বছর সাফে তাই নতুন বাংলাদেশকেও দেখা যেতে পারে। এশিয়ান গেমসেও তো যাচ্ছেন এই তরুণরা। মেয়েদের দল বাদ দিয়ে কাজী সালাউদ্দিনও বাজি ধরেছেন এই তারুণ্যে। এই প্রথম দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কোনো শিরোপা জিতল তারা। বয়সভিত্তিক প্রকল্পের সুফল বেশ ভালভাবেই পাচ্ছে আরামবাগ। দেশের অন্যান্য শীর্ষ ক্লাব কোনোটিরই বয়সভিত্তিক দল নেই, অথচ আরামবাগের আছে। দেশের ফুটবলের চিরকালীন মাঝারি সারির দল আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ। কিন্তু এই দলটিই ইদানীং লজ্জা দিচ্ছে ‘ঐতিহ্যবাহী’ শীর্ষ শক্তিগুলোকে। আবাহনী লিমিটেড, মোহামেডান স্পোর্টিং, শেখ জামাল ধানমন্ডি, শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র কিংবা ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো ক্লাবগুলোকে টপকে স্বাধীনতা কাপ ফুটবলের শিরোপা জেতার জন্য নয়, ৬২ বছরের পুরোনো আরামবাগ লজ্জা দিচ্ছে দেশের ফুটবলের এই চরম দুঃসময়ে চিরাচরিত প্রথার বাইরে অবস্থান করেই। একটা মাঝারি সারির দল চিরায়ত প্রথার বাইরে এমন কীই–বা করে বসল, যা লজ্জা দিচ্ছে বড় ক্লাবগুলোকে! আরামবাগ একাধিক বয়সভিত্তিক দল বানিয়েছে, যার সুফল মিলতে শুরু করেছে। বড় শক্তিগুলোকে টপকে স্বাধীনতা কাপ জয় তো তারই সুফল। আখেরে যেটি বড় ভূমিকা রাখবে দেশের ফুটবলে এই ‘তারকা-সংকটে’র সময় ভালো ফুটবলারের জোগান দিয়ে। স্বাধীনতা কাপে আরামবাগ হারিয়েছে আবাহনী লিমিটেড, শেখ জামাল ধানমন্ডি ও চট্টগ্রাম আবাহনীকে। হাল আমলে এই তিনটি দলই সবচেয়ে শক্তিশালী। জাতীয় দলের বেশির ভাগ ফুটবলারই খেলেন এই তিন ক্লাবে। আবাহনীকে কোয়ার্টার ফাইনালে আর শেখ জামালকে সেমিফাইনালে হারানোর পরই আরামবাগকে নিয়ে আলাদা করে আলোচনা শুরু হয়েছিল ফুটবল মহলে। ফাইনালে চট্টগ্রাম আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচটি দেখে বোঝা গেল এই আলোচনার কারণটা কী। আরামবাগ বেশ কয়েকজন তরুণ ফুটবলারের আবির্ভাব ঘটিয়েছে, যাদের সম্মিলিত নৈপুণ্যই শিরোপা এনে দিয়েছে এ দলকে।
 মোহাম্মদ জুয়েল, আরিফ, সুফিলদের মতো তরুণেরা কিন্তু আরামবাগের বয়সভিত্তিক প্রকল্পেরই অংশ। আবাহনী-মোহামেডানের মতো বড় ক্লাবগুলোকে দিয়ে এখনো বয়সভিত্তিক দল তৈরি করাতে পারেনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। দেশের ফুটবলের এই সংকটের সময় ক্লাবের বয়সভিত্তিক দল যে জরুরি, সেটা ফুটবলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই অনুধাবন করতে পারলেও ক্লাবগুলো কেন যেন এ ব্যাপারটায় একেবারেই উদাসীন। আরামবাগ বিড়ালের গলায় ঘণ্টিটা বেঁধেছে, এটা প্রশংসা পেতেই পারে। বয়সভিত্তিক দল বানিয়ে খেলোয়াড় তৈরি ও পরিচর্যা করার বিকল্প নেই। এটাই এখন দেশের সকল ক্লাবের পাথেয় হওয়া উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ