ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 February 2018, ৩ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৮ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

লিউকোরিয়া সমস্যা

ঘটনা- ১: কিছু দিন আগে বছর চল্লিশের এক ভদ্রমহিলা আমার চেম্বারে এলেন তার কিশোরী মেয়েকে সাথে নিয়ে। মিষ্টি মেয়েটির চোখে মুখে ভয় ও কৌতূহল। পরিচয়পর্ব শেষে জানালেন সমস্যাটা মেয়ের। লজ্জিত মুখে মেয়েটি জানালো তার অতিরিক্ত সাদাস্রাবের সমস্যা। মায়ের ভয় বেশি স্রাবের সাথে মেয়ের শক্তিও কমে যাচ্ছে ও মেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ঘটনা- ২: নববিবাহিত দম্পতি এলো তাদের সমস্যা নিয়ে। এই মুহূর্তে তারা সন্তান ধারণ করবে না। তাই খাবার বড়ি বা পিল সেবন করছে। কিন্তু সমস্যা একটাই- এতে অতিরিক্ত ধাতু বা সাদাস্রাব নির্গত হচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের প্রতিদিনের প্র্যাকটিসে এই জাতীয় সমস্যার রোগীর চিকিৎসা করি। এখন আমরা একটু আলোচনা করি, আসলে এই সাদাস্রাব কী এবং কখন আমরা এটাকে স্বাভাবিক ও কখন অস্বাভাবিক বলি ও চিকিৎসা করি। প্রচলিত ভাষায় অতিরিক্ত সাদাস্রাব নির্গত হওয়াকে লিউকোরিয়া বলা হয়। প্রথমেই বলে নেই যে মেয়েদের জননেন্দ্রিয়ে স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য যোনিপথে তরলজাতীয় পদার্থ নির্গত হয় যা হবে মাঝে মাঝে ঘন ও পিচ্ছিল আবার কখনো কখনো পাতলা। এটা নির্ভর করে মাসিক বা ঋতুচক্রের দিবস অনুযায়ী এবং মেয়েদের অতি প্রয়োজনীয় হরমোন এস্ট্রোজেনের প্রভাবে। এস্ট্রোজেনকে বলা হয় Female Hormone অথবা মেয়েলি হরমোন, কারণ অতি প্রয়োজনীয় এই হরমোনই একজন মেয়ের সমস্ত মেয়েলি স্বভাব এবং সৌন্দর্যের উৎস বা কারণ। জীবনের কিছু কিছু সময় এই হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায় যেমন কৈশোরে যখন একটি শিশু ক্রমান্বয়ে কৈশোর ও পরিপূর্ণ যুবতী হয়ে ওঠে অথবা গর্ভকালে যখন শরীরের অভ্যন্তরে নতুন প্রাণের সঞ্চারণের জন্য প্রচুর পরিবর্তন সাধিত হয়। সর্বোপরি ঙঈচ বা খাবার বড়িতে থাকে এই প্রয়োজনীয় এস্ট্রোজেন হরমোন। তাই উল্লিখিত এই সমস্যার কারণে মেয়েদের প্রচুর সাদাস্রাব নির্গত হয়ে থাকে যা সম্পূর্ণভাবেই স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় ঘটনা। কিন্তু তারপরেও কথা থেকে যায় যে, কেমন হবে এই স্বাভাবিক স্রাবের প্রকৃতি। এটা হবে অবশ্যই দুর্গন্ধমুক্ত, জ্বালাহীন ও চুলকানিমুক্ত। এবার আসি অস্বাভাবিক স্রাবের কারণ ও প্রকৃতি সম্পর্কে। যখন স্বাভাবিক স্রাবের প্রকৃতি পরিবর্তন হয় এবং এর সাথে অন্যান্য উপসর্গ দেখা যায় তখনই ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত কারণ এর থেকে অনেক অসুখ এমন কি জরায়ুমুখে ক্যান্সারের মতো অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। নিম্নবর্ণিত উপসর্গ দেখা গেলে বিলম্ব না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। হঠাৎ করে স্বাভাবিক স্রাবের সাথে জরায়ুর মুখে জ্বালাপোড়া বা চুলকানি হলে। স্রাবের সাথে রক্ত গেলে। দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব নির্গত হলে। দইয়ের মতো ঘন অথবা শেওলা রঙের স্রাব গেলে। উপর্যুক্ত যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে মহিলা রোগ বিশেষজ্ঞের উপদেশ ও চিকিৎসা নেয়া উচিত। আমরা রোগীর রোগের ইতিহাস, রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করে থাকি। কিছু পরীক্ষা প্রত্যেক নারীরই করা প্রয়োজন, যেমন: VIA Test. এই পরীক্ষায় জরায়ুর মুখ একটি দ্রবণ দিয়ে (৫ শতাংশ acetic acid) খালি চোখে পরীক্ষা করা হয়। যদি সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক কিছু দেখা যায় তাহলে রোগীর আরো উচ্চতর পরীক্ষা Colposcopy করা হয় যা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে করা হয় এবং প্রয়োজন হলে Biopsy করে খুব তাড়াতাড়ি অতি প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার বা ক্যান্সার পূর্ববর্তী অসুখ নির্ণয় করা সম্ভব। অতিরিক্ত সাদাস্রাব বা স্বাভাবিক স্রাবের সাথে জ্বালাপোড়া বা চুলকানি দেখা দিলে ছত্রাক বা Trichomoniasis-জাতীয় প্রদাহ দ্বারা আক্রান্ত হয় যা অতি সহজেই ওষুধের মাধ্যমে নিরাময় করা সম্ভব। আবার হঠাৎ করে স্রাবের সাথে রক্ত গেলে অথবা অনিয়মিত রক্তস্রাব বা মিলনের পরে রক্ত গেলে অনতিবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন কারণ এটা জরায়ুর মুখে চড়ষুঢ় বা জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে যা প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় করা গেলে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। সুস্থ, স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবন সবারই কাম্য। অসুস্থতা যতই কঠিন হোকনা কেন, সেটা যদি প্রাথমিক নিরাময়যোগ্য অবস্থায় নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা দেয়া হয় তাহলে অবশ্যই রোগী ও তার পরিবার সবার জন্যই মঙ্গলজনক এবং রোগহীন সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের সহায়ক।
-প্রফেসর ডা: নূর সাঈদা
প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।
চেম্বার: ইব্নে সিনা ডি ল্যাব অ্যান্ড কন্সালটেশন সেন্টার, বাড়ি ৪৭, রোড ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ