ঢাকা, শুক্রবার 16 February 2018, ৪ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৯ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বইমেলা প্রাণের মেলা

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বঙ্গভাষা কবিতাটি কমবেশি আমরা সবাই জানি। কবিতাটি কেনো, কী কারণে রচিত হয়েছিলো তাও আমাদের উপলব্ধির বাইরে না। নিজ দেশ, নিজ ভাষাকে তুচ্ছজ্ঞান করে যখন কবি (মধুসূদন) বিদেশী হয়ে উঠতে চাইলেন এবং তাদের থেকে যখন কাক্সিক্ষত সমাদর পেলেন না। অবজ্ঞা-অবহেলার শিকার হয়ে এক পর্যায়ে ব্যথিত মনে লিখে ফেললেন-‘ হে বঙ্গ, ভা-ারে তব বিবিধ রতন;/ তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,/ পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ/ পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।” 

কবির এ আকুতি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় দেশ-মাটি-ভাষাকে অবজ্ঞা করে কেউ বড় হতে পারে না। সর্বোপরি নিজ দেশ, নিজ ভাষাই যে প্রাণের স্বর্গ, মায়ার সমস্ত আধার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ সংখ্যায় আমরা আরো ৫জন লেখককে  হাজির করলাম আপনাদের সামনে। অশেষ ধন্যবাদ লেখক ও আপনাদের, যারা এ আয়োজনের সাথে রয়েছেন। Ñরেদওয়ানুল হক

 

বইমেলাতে এসে বই কিনুন সেই সাথে নজরুল সম্পর্কিত বইও কিনুন

-----------------------শফি চাকলাদার

 

১. নতুন বই প্রকাশের নিশ্চয়ই আনন্দের। আপনার অনুভূতি প্রকাশ করুন।

উত্তর : অবশ্যই আনন্দের। তবে আমার সে বই হতে হবে ভালো কোনো বিষয়ের।

২. পাঠক সৃষ্টিতে বইমেলার ভূমিকা কী?

উত্তর:   বই মেলার ভূমিকা সব সময়ই গুরুত্ব বহন করে। এই গুরুত্ব বহনের দায়িত্বও অনেক। অসংখ্য বই স্টল সাজানো হয় প্রতি বছর। মানসম্পন্ন বই সে সমূদয় স্টলে আছে কিনা। বই পড়ার একটা নেশা আছে। সেই নেশাকে ভালো বইয়ের দ্বারা ভরিয়ে তোলার দায়িত্ব এই ‘বইমেলার’। বইমেলার আয়োজন অবশ্যই অত্যন্ত ভালো কাজ এবং সেই ভালো কাজটাকে পর্যবেক্ষণে রাখারও দরকার আছে। তবেই পাঠক তৈরি হবে।

৩. এই মেলায় আপনার কয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে?

উত্তর : এখনো হয়নি। তবে বইমেলার শেষ নাগাদ আসতে পারে। গবেষণা গ্রন্থ নজরুলের উপর ‘নজরুল পরিসংখ্যান’। পরিসংখ্যানকে কেন্দ্র করে নজরুলের এখনো কোনো গ্রন্থ নেই। আশা করি এই গ্রন্থটি সেই অপূর্ণতাকে পূর্ণ করতে সহায়ক হবে।

৪. বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের কেমন শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত?

উত্তর: অবশ্যই গভীর শ্রদ্ধাবোধ থাকা দরকার। এটাও লক্ষ্য রাখা দরকার যে, সেই গভীরতার গভীরতা কতটুকু। বাংলা ভাষাকে জনে জনে সেই গভীরতায় আনতে হলে এই কাজগুলোতে হাত দেয়া প্রয়োজন। ১) ‘বইমেলা’ ফেব্রুয়ারিতে নয় পুরো ফাল্গুন মাসব্যাপি প্রবর্তন ২) শহীদ দিবস ২১ শে ফেব্রুয়ারি অবলিগ ০৮ ফাল্গুন নয়, হতে হবে ০৮ ফাল্গুন অবলিগ ২১ ফেব্রুয়ারি ৩) সমগ্র দেশে চাকুরীজীবীদের বেতন ইংরেজি মাসের শুরুতে নয়, বাংলা মাসের শুরুতে হওয়া প্রয়োজন। বাংলা একাডেমিরই এটা প্রবর্তনে উদ্যোগ নেয়া দরকার। ৪) বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত বাংলা সনের প্রবর্তন এরশাদ সরকারের আমলে গৃহীত হয়, সেটা বাতিল করে প্রচলিত যে সনটি গ্রামে-গঞ্জে এখনো চলে আসছে সেটাকেই পুনর্বহাল করা হোক। ৫) বাংলা একাডেমির মরণোত্তর পুরস্কারও বন্ধ হওয়া দরকার। যাকে পুরস্কৃত করা হলো সে তো এই সম্মাননা-মর্যাদা তিনিতো উপভোগ করতে পারলেন না। উপভোগ করল তার পরিবার এবং ভক্তরা। জীবদ্দশায় মূল্যায়ন করতে কি অসুবিধা ছিল কিংবা মৃত্যুর পর সে অসুবিধাই বা দূর হল কি করে? আরও উল্লেখ্য আমরা বিদেশীদের দ্বারা রবীন্দ্রনাথের কবিতা বলাতে শেখাই/প্রচার করি। নজরুল থেকে কেন নয়? অর্থাৎ যাতে কবি বাংলাদেশের নজরুল অথচ তুলে ধরি অন্যকে। এ ধরনের মানষিকতা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে কলুষিত করে। তাই আমাদের সাংস্কৃতিক আদর্শ গড়ে ওঠেনি।আমি মনে করি, এসব বিষয়ে দৃষ্টি দিলে বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে। দুঃখ হয়, আজও উৎসব-অনুষ্ঠানের দাওয়াতপত্র লেখা হয় ইংরেজিতে। ভোজসভায় তরকারিকে বলা হয় কারী, ভাত হয়ে যায় রাইস, চামিচ হয় স্পুন, সম্বোধন করা হয় আঙ্কেল/আন্টি। শৌচাগার-গোসলখানা হয় ফ্রেশরুম-টয়লেট। যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক তাদের দ্বারাই এসব ‘ভেজাল’ এর সৃষ্টির কারণ। বাংলা একাডেমিরই দায়িত্ব এসব অনুসন্ধান করে প্রতিকার করা। তবেই শ্রদ্ধাবোধ বিষয়টির উন্নয়ন হবে।

৫. বইমেলার পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

উত্তর : আমি নজরুল গবেষক। সেই হিসেবে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলছি এবং দুঃখ প্রকাশ করছি যে, ‘বাংলাদেশের জাতীয় কবি সম্পর্কে আমাদের পাঠকবর্গ আজও তেমন ওয়াকিবহাল নয়। এটা আফসোসের বৈকি। বইমেলাতে এসে বই কিনুন সেই সাথে নজরুল সম্পর্কিত বইও কিনুন।

 

 

বই পাঠ ছাড়া জ্ঞানী হওয়া যায় না। সঠিক জ্ঞান একমাত্র

বই দিতে পারে      -সোলায়মান আহসান

 

১. নতুন বই প্রকাশের নিশ্চয়ই আনন্দের। আপনার অনুভূতি প্রকাশ করুন।

উত্তর : ১৯৮৫ তে প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের মত আনন্দ এখন আর জাগে না সত্যি। তবে নতুন গ্রন্থ প্রকাশের আনন্দটা কম না। আমরা এমন এক ধারার লেখক যেখানে আমাদের গ্রন্থ প্রকাশে সাধারণত প্রকাশক পাওয়া দুষ্কর। এরপরও কোন প্রকাশক আমাদের গ্রন্থ প্রকাশ করেন। আনন্দটা যে কারণে বেশি হয়। মনে হয় সারা বছর পাতার পর পাতা যা লিখেছি তা বুঝি সার্থক হলো। পত্র-পত্রিকায় লেখা হিসেবে পাঠকের কাছে পৌঁছানো, মূল্যায়ন পাওয়া সম্ভব নয়। এজন্য গ্রন্থ প্রকাশের পর এতো ভালো লাগা অনুভূতি জাগে!

২. পাঠক সৃষ্টিতে বইমেলার ভূমিকা কী?

উত্তর: আমাদের দেশের বাঙলা একাডেমী কর্তৃক আয়োজিত একুশে  বইমেলা একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আজকাল অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃকও বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। তবে বাঙলা একাডেমীর আয়োজনটি পেয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা। তাই, প্রকাশক লেখক পাঠকদের দৃষ্টি থাকে ওই মেলা কেন্দ্রিক। বই প্রকাশ করাও আজকাল ওই মেলাকে সামনে রেখে পরিকল্পনা সাজানো হয়। এটা একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এতে প্রকাশক লেখক উভয়ই উপকৃত হচ্ছে। পাঠকও তার পাঠ-তৃষ্ণা মেটাতে পারেন মেলায় এসে পছন্দনীয় গ্রন্থ সংগ্রহ করে। তাই, নিঃসন্দেহে বইমেলা ভূমিকা রাখছে আমাদের জাতীয় মেধা বিকাশে।

৩. এই মেলায় আপনার কয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে?

উত্তর : দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি নানা দুর্বিপাকে পরে আমার কয়েকটি বই প্রকাশের দ্বারপ্রান্তে এসেও আলোর মুখ দেখতে পারছে না। অন্তত বইমেলার প্রান্তরে পৌঁছাতে পারছি না। নিজের পারিবারিক  ঝামেলায় পড়ে প্রকাশককে সময় মত পা-ুলিপি সরবরাহ করতে না পারা মূলত এই আটকে যাবার কারণ। এছাড়া প্রচ্ছদ আকা ইলাস্ট্রেশন ইত্যাদি করাতে উপযুক্ত শিল্পীর হাত খালি না পাওয়াও আরেকটি কারণ। তারপরও আশা ছাড়িনি। মেলার শেষান্তে আশির দশক নামে সনেট সংকলনটি এসে যেতে পারে।

৪. বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের কেমন শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত?

উত্তর: ভাষার জন্য জীবন দান করার গৌরবময় ইতিহাস আমাদের। ভাষার কারণে একটি আলাদা মানচিত্র জন্ম দিতে পারার কৃতিত্বও আমাদের। বাঙলা ভাষায় কথা বলার মানুষের সংখ্যা শুধু আমাদের দেশেই বেশি নয় ভাষাচর্চার দিক থেকেও আমরা অগ্রসর বেশি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বাঙলা  ভাষা চর্চা ও বিকাশের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে কাজ করা উচিত তা করছে না।  এতে ভাষা বিকাশে অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাঙালি মুসলমানদের নিজস্ব ইতিহাস ঐতিহ্যকে পূর্বাপর ধারা মেনে আমাদের সাহিত্য চর্চা করা উচিত। তাহলে বাঙলা ভাষার উন্নতি হবে। ভাষাও খুঁজে পাবে নিজস্ব পথ। আজকাল কিছু লেখক প্রকাশক প্রতিষ্ঠানকে পশ্চিম বঙ্গের রীতি অনুসরণ করে ভাষা ও বানান পরিবর্তন করতে দেখি। এটা আমাদের পরিহার করা উচিত।

৫. বইমেলার পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

উত্তর :  নিঃসন্দেহে পাঠক সমাজ সকল কর্মকান্ডের মূল। অর্থাৎ আমরা যারা লিখছি, প্রকাশকরা প্রকাশ করছেন গ্রন্থ এবং মেলার মাধ্যমে তা হাটে তুলে ধরছেন কর্তৃপক্ষ- এসবের সাফল্য নির্ভর করছে পাঠকের কেনার ওপর।

পাঠকরা ভিড় করছেন মেলায়, কিনছেনও প্রিয় লেখকের বই- সবকিছু উৎসাহব্যাঞ্জক তবে আমরা চাইবো আরো বেশি পাঠক, আরো বেশি বই কেনার ভীড়। যদিও ইন্টারনেটের পৃথিবীতে নাকি পাঠক সংকুচিত হতে যাচ্ছে। 

ফেরাতে হলে এক্ষেত্রে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ মূলত বই পাঠ ছাড়া জ্ঞানী হওয়া যায় না। সঠিক জ্ঞান একমাত্র বই দিতে পারে। তাই, পাঠক, বইয়ের সাথে সম্পর্ক বাড়ান। আপনার পৃথিবী প্রজ্ঞাময় সুন্দর হয়ে উঠবে!

 

ভাষা আল্লাহর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। বাংলাভাষার প্রতি

আমাদের সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা জানাতে হবে

-------------------------হাসান আলীম

 

১. নতুন বই প্রকাশের নিশ্চয়ই আনন্দের। আপনার অনুভূতি প্রকাশ করুন।

উত্তর :নতুন বই প্রকাশের খবর পুত্র/কন্যা জন্মগ্রহণের রোমাঞ্চকর প্রিয় খবরের মতো- যা কেবল হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়। আমার প্রথম বই বেরিয়েছিল ১৯৮৩ সালে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন অনার্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। সেটি ছিল শ্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু কাব্যগ্রন্থ। 

২. পাঠক সৃষ্টিতে বইমেলার ভূমিকা কী?

উত্তর: পাঠক সৃষ্টিতে বইমেলার ভূমিকা অনন্য। আমাদের বইমেলা মাসব্যাপী হয়ে থাকে। এ মেলায় মাসভর প্রচুর পাঠক, বইপ্রেমী, সাহিত্যপ্রেমী লোকেরা মেলা প্রাঙ্গণে স্টলে স্টলে ঘুরে প্রিয় বই সংগ্রহ করে। ডিজিটাল যুগে ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া যে পরিমাণ লোকে পাঠ বিমুখ, তারাও ঘুরেফিরে আসে বইমেলার আনন্দময় ভুবনে। বই পড়ে বার বার যখন তখন। পড়ে পড়ে বইকে সাহিত্যকে ভালবাসে, দেশকে ভালবাসে।

৩. এই মেলায় আপনার কয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে?

উত্তর : এবারের বইমেলায় আমার ২টি গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। একটি শিশুকিশোর ছড়া কবিতার বই “ছোট্ট পাখি চন্দনা”। বইমেলার লিটল ম্যগ চত্বরে ৭নং স্টলে পাওয়া যান্থে। অন্যটি ছন্দের উপরে গবেষণা গ্রš’ ছন্দ বিজ্ঞান ও অলঙ্কার এর দ্বিতীয় সংস্করণ। এটি  সোহরাওয়ারদি উদ্যানে ৩৪৫ নং স্টলে পাওয়া যাচ্ছে।

৪. বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের কেমন শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত?

উত্তর:বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, মুখের ভাষা, লেখার ভাষা। এ ভাষাতেই আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ সব কিছু প্রকাশ করতে হয়। ভাষা আল¬াহ্র পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। আমরা বাঙ্গালী, বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বেশী শ্রদ্ধা জানাতে হবে। এ ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছে, শহীদ হয়েছে। স্বাধীন দেশে আজও সর্বক্ষেত্রে বাংলা চালু হয়নি। উ”চ-আদালতে এখনো ইংরেজিতে রায় দেওয়া হয়। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

৫. বইমেলার পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

উত্তর :

বইমেলায় যান। দেখেশুনে ভাল বই সংগ্রহ করুন, পাঠ করুন, সমৃদ্ধ হন। বই কিনে কেউ দেউলিয়া 

হয় না।

 

ভালো বই-ই টিকে থাকবে; অতএব হতাশ হবার কোনো কারণ নেই

---------------------ড. আশরাফ পিন্টু

 

১. নতুন বই প্রকাশের নিশ্চয়ই আনন্দের। আপনার অনুভূতি প্রকাশ করুন।

উত্তর : নতুন বই প্রকাশের খবর আমার কাছে সন্তানের বাবা হওয়ার মতোই আনন্দের। আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্প থেকে। বইটির নাম ‘‘হিগিন বিগিন’’; এটি ছিল একটি শিশুতোষ ছড়াগ্রš’। তো সে আনন্দ ছিল প্রথম সন্তানের জনকের মতোই হৃদপূর্ণ আনন্দ। এ পর্যন্ত আমার ২২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যখন কোনো নতুন বই প্রকাশিত হয় তখন প্রতিটি বইয়ের ক্ষেত্রে একই রকমের আনন্দ অনুভব করিÑ কখনো আনন্দের কমতি হয় না; ওই একাধিক সন্তানের জনকের মতোই সে ভালোবাসার কোনো কমতি নেই, হেরফের নেই।

২. পাঠক সৃষ্টিতে বইমেলার ভূমিকা কী?

উত্তর: পাঠক সৃষ্টিতে বইমেলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতি বছর মেলাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য বই বের হচ্ছে; বিক্রিও হচ্ছে।  অনেকে বলেন, অনলাইন-ইন্টারনেট-ফেসবুকের যুগে কেউ বই পড়ে না। কিš‘ এ ব্যাপারে আমি ভিন্নমত পোষণ করছি। প্রতি মেলায় দেখা যায় কোটি কোটি টাকার বই বিক্রয় হয়; পাঠক না পড়লে এ বইগুলো যায় কোথায়? তারা কিনছেই বা কি কারণে? এ ছাড়া মেলাও বর্তমানে রাজধানী কেন্দ্রিক নেই; দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের পাবনাতে তো রাজধানী ঢাকার সাথে পাল্লা দিয়ে পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে মেলা চলে। তবে এটাও ঠিক যে মেলাকে কেন্দ্র করে প্রচুর বই বের হলেও এর মধ্যে অনেক অলেখকদের নি¤œমানের বইও রয়েছে। এসব বই কিছু কিছু বিক্রয় হলেও তা কালগর্ভে একসময় তলিয়ে যাবে। ভালো বই-ই টিকে থাকবে; অতএব হতাশার হবার কোনো কারণ নেই।

৩. এই মেলায় আপনার কয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে?

উত্তর : এবার আমার সর্বো”চ সংখ্যক (৫টি) বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি বই হাতে পেয়েছি। এগুলো হলো : “পাবনা জেলার গ্রাম-মহল্লার নামকরণের ইতিহাস”; গবেষণাধর্মী এই বইটি বের করেছে গতিধারা। দ্বিতীয়টি হলোÑ রহস্য-উপন্যাস ‘‘ছদ্মবেশী শয়তান”; বের করেছে অন্যধারা এবং তৃতীয়টি হলোÑকিশোর ভৌতিক গল্প “অদ্ভুত যত ভূত’’Ñ এটিও বের করেছে অন্যধারা। বাকী দুটি বই এখনো হাতে পাই নি। এর মধ্যে একটি “বাংলাদেশের প্রবাদে সমাজজীবন” বের করছে গতিধারা। এটি আমার পি-এইচ.ডি থিসিস। দ্বিতীয়টিও প্রবাদের উপরে, নামÑ ‘‘সাহিত্যিক প্রবাদে সমাজ’’। বইটি বের করছে দেশজ প্রকাশনী। উল্লেখ্য যে, এই বইটি গবেষণা-প্রবন্ধ সাহিত্যে দেশজ জাতীয় পা-ুলিপি প্রতিযোগিতা-২০১৭-তে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

৪. বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের কেমন শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত?

উত্তর: এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলা ভাষার প্রতি প্রতিটি বাঙালির কমবেশি শ্রদ্ধাবোধ আছে। এবং প্রতিটি লেখকেরও অকশ্যই শ্রদ্ধাবোধ আছে. নইলে প্রকৃত লেখক হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। এই শ্রদ্ধাবোধ থেকেই আমাদের সকলকে শুদ্ধ বানান ও বাক্য লিখতে সচেতন হতে হবে। আর এ ব্যাপারে লেখকদের দায়িত্ব আরো বেশি। তাদেরকে বাংলা ভাষায় আরো কালজয়ী বা বিশ্বমানের গ্রন্থ রচনা করে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব-দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। 

৫. বইমেলার পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

উত্তর : বইমেলা প্রচুর লোকের সমাগম হয় তবে সবাই বই কেনে না। বেড়ানো বা আড্ডা দেবার উদ্দেশ্যে অনেকে মেলায় আসেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলবÑ বইমেলায় ঢুকলেই যেন তারা অন্তত একটি করে বই কেনে এবং ঐ কেনা বইটিই নিয়েই যেন আড্ডা হয়। আর হ্যাঁ, এই বইগুলো যেন অবশ্যই মানসম্মত হয়Ñ হোক না সে নতুন লেখকের বই। তাহলেই আমাদের বইমেলা সার্থকতা অর্জন করবে।

 

নতুন বই মানেই নতুন অধ্যায়ের নির্মাণ, নতুন স্বপ্নের ঘ্রাণ, আনন্দের ঝর্নাধারা

--------------ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

 

১.নতুন বই প্রকাশের খবর নিশ্চয় আনন্দের। আপনার অনভূতি প্রকাশ করুন।

উত্তর: লেখক মানেই তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের মানুষ। নতুন কিছু করার আকাঙ্খায় তিনি সামনের দিকে এগিয়ে যান। যে কোন লেখা প্রকাশিত হলেই একজন লেখক কিছুটা আত্মপ্রশান্তি ফিরে পান। সেটা হতে পারে ছড়া-কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ কিংবা যে কোন ধরনের লেখা। এগুলো যখন বই আকারে প্রকাশিত হয় তখন তার আনন্দটা অন্যরকম। একজন গর্ভবতী মা তাঁর সদ্যপ্রসূত সন্তানের মুখ দেখে যেমন তৃপ্তি পান তেমনি মজার অনুভূতি নতুন বই প্রকাশের মধ্যে। আমার নতুন বই মানেই নতুন অধ্যায়ের নির্মাণ, নতুন স্বপ্নের ঘ্রাণ, আনন্দের ঝর্নাধারা। 

২. পাঠক সৃষ্টিতে বইমেলার ভূমিকা কি?

উত্তর: একুশে গ্রš’মেলা শুধু বইমেলা নয়; এটা এখন বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। ফেব্রুয়ারি এলেই গাঁও-গেরামের বইপ্রিয় মানুষরাও একটিবার হলেও ঢাকা আসতে চায় মেলা উপভোগ করার জন্যে। এখানে নানা ধরনের দর্শক আসেন। কেউ কেউ মজা করে প্রায় প্রতিদিন একবার মেলা প্রাঙ্গণে আসেন আড্ডা দিতে। আর এক শ্রেণির দর্শক যারা মেলায় যান পরিবারসহ। হয়তো পাঁচজনে মিলে তিনটা বই কিনে ফিরে আসেন। দেখা হয় নতুন নতুন বই, মিলিত হয় লেখকের সাথে। অনেকে লেখকের হাত থেকে অটোগ্রাফসহ বই কিনতেও পছন্দ করেন। কারো কারো কাছে ফেব্রুয়ারি মাস মানেই বইউৎসবের মাস। সারাদেশে বইমেলা হচ্ছে। সারাদেশের মানুষ নতুন নতুন বই দেখছে। আর যাই হোক, মেলায় এসে দেখতে দেখতে দু’চারটা বই হাতে উঠলেই তো   সার্থকতা। তাই বইমেলাকে ছড়িয়ে দেয়া দরকার। বিজয়ের বইমেলা, একুশের বইমেলা, স্বাধীনতার বইমেলাÑ এভাবে বইমেলাকে উৎসবে পরিণত করা দরকার।

৩. এই মেলায় আপনার কয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে?

উত্তর: এ মেলায় আমার তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে বর্তমান সময়ের অত্যন্ত আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস বিষয়ক একটি গবেষণাগ্রন্থ ‘রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ’। ৩১২ পৃষ্ঠার এ বইটি আমার দীর্ঘ কুড়ি বছরের গবেষণার ফসল। গ্রš’টি রোহিঙ্গা সমস্যাকেন্দ্রিক একটি নির্ভরযোগ্যগ্রন্থ বলতে পারি। এ গ্রন্থ পাঠের মধ্যদিয়ে পাঠক রোহিঙ্গা সমস্যার উৎপত্তি, বিস্তার, গণহত্যার ভয়াবহতা, বাংলাদেশের দৃষ্টিভংগী ও সমস্যা সমাধানের নানা দিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত জানার সুযোগ পাবেন। একুশে গ্রš’মেলায় পরিলেখ প্রকাশনীর ১৬৭ নাম্বার স্টলে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ ‘জলজ রাজার দেশে’ পাওয়া যাচ্ছে গ্রন্থকুটির প্রকাশনীর স্টলে এবং ছড়াগ্রন্থ ‘ফেসবুকীয় স্বপ্নমুকুল’ দু’চার দিনের মধ্যেই মেলায় আসবে বলে আশা করছি।

৪. বাংলাভাষার প্রতি আমাদের কেমন শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত?

 উত্তর: বাংলা আমাদের প্রাণের ভাষা। এ ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেই আমরা রক্ত দিয়েছি। ভাষার জন্য রক্তদান পৃথিবীর অন্যতম নজির বৈকি। যিনি জীবনকে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন দেশ-মাটি ও মানুষকে তার কাছে বাংলাভাষা সর্বোচ্ছ শ্রদ্ধার বিষয়। এ ভাষার উন্নয়ন ও বিস্তারে আমাদের আরো বেশি আন্তরিক হওয়া উচিত।

৫. বইমেলা পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

উত্তর: বই আমাদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। নিজেদেরকে চেনা এবং আগামী প্রজন্মকে সঠিক বিশ্বাসে সুস্থ-সুন্দরভাবে গড়তে হলে বইয়ের কোন বিকল্প নেই। আকাশ সংস্কৃতির চর্তুমুখী হামলা, বিশেষ করে হিন্দিফিল্ম-অশ্লীল নাচগান এবং সর্বনাশা গেমস ও কার্টুনের হাত থেকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে বাঁচাতে চাইলে  বই এবং সুন্দর বই পড়ার কোন বিকল্প নেই। তাই বলা যায়- ঘুরে ফিরে লাভ নেই ভালো বই পড়ি/হৈ চৈ ছেড়ে দিয়ে সুস্থ জীবন গড়ি।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ