ঢাকা, শুক্রবার 16 February 2018, ৪ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৯ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন

প্রায় প্রতিদিনের সংবাদপত্রে একটি খবর সকলের চোখে পড়ছে। বলা যায়, এটি এখন সাধারণ খবর। সরকারের মন্ত্রী, আমলা, আইন-শৃংখলা বাহিনীর কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি সবাই একযোগে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জোরালো ভাষায় কথা বলছেন, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের এ বক্তব্য ও আহ্বান সংবাদপত্রগুলোতে গুরুত্ব সহকারে ছাপা হচ্ছে। বলাবাহুল্য, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের হুমকির বাইরে নেই আমাদের বাংলাদেশও। বিশ্বের তাবৎ দেশ জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের হুমকির মধ্যে আছে। আমাদের দেশে ইতিপূর্বে বেশ কিছু জঙ্গি বা সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। এতে অনেকে নিহত ও আহত হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা, তা মোকাবিলায় আহ্বান জানানো কিংবা অভিযান, ধর-পাকড় চালানো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশ ও জাতির জন্য এর চেয়েও ভয়ংকর হুমকি যে সর্বনাশা মাদক, তা নিয়ে সরকারি মহলে খুব একটা কথা শোনা যায় না। মাদক সন্ত্রাস মোকাবিলায় এগিয়ে আসার সে রকম জোরালো আহ্বান জানানো হয় না। আর আইন-শৃংখলা বাহিনীর অভিযান-আটক তো হয় না বললেই চলে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কেন এই অমনোযোগ-অবহেলা এর কোনো সদুত্তর নেই। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা প্রায় সময়েই এই মর্মে আশ্বাস প্রদান করেন যে, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, বহু জঙ্গিবাদী-সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ দমনে অভিযান অব্যাহত আছে এবং এর উৎসাদন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাদের এসব কথাবার্তায় আমরা আশ্বস্ত বোধ করতে পারি। তবে আমরা অত্যন্ত বিচলিত ও উদ্বিগ্ন সর্বনাশা মাদকের আগ্রাসন ও বিস্তার নিয়ে। কিছুদিন আগে সরকারের সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জঙ্গিবাদের চেয়ে মাদক আরো ভয়ংকর। তার এ কথার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্নের কোনো অবকাশ নেই।

জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যক্তি বা পরিবার। সমাজে ভীতি-শংকাও বাড়ে। কিন্তু মাদক ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে রীতিমতো বিপর্যস্ত ও ধ্বংস করে দিচ্ছে। জাতি বিনাশী সর্বনাশা মাদকের আগ্রাসন ও বিস্তার সর্বগ্রাসী রূপ পরিগ্রহ করছে। সমাজের এমন কোনো শ্রেণী বা স্তর নেই যেখানে মাদক ঘাঁটি  গেড়ে না বসেছে। রাজধানী ঢাকা মহানগর থেকে সকল জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রাম, হাট-বাজার, ওষুধের দোকান, মুদি দোকান ও টং দোকান পর্যন্ত সর্বত্র মাদকের ছড়াছড়ি। কর্ম, পেশা, বয়স নির্বিশেষে মানুষ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে কিশোর-তরুণরাই বেশি সংখ্যায় মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। শহরের বিত্তবানের ইংরেজী মাধ্যমে পড়ুয়া সন্তান থেকে গ্রামের হতদরিদ্রের বেকার-বখাটে সন্তান পর্যন্ত মাদকাসক্তিতে আক্রান্ত। কেনা জানেন, আমাদের শিশু-কিশোর-তরুণরাই জাতির ভবিষ্যৎ। একদিন তারাই দেশ ও জাতির নেতৃত্ব দেবে। আজ মাদক আগ্রাসনে তারাই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরচেয়ে মর্মান্তিক, বেদনাদায়ক ও উদ্বেগজনক আর কিছু হতে পারে না। মাদকের কারণে সমাজে খুন, ধর্ষণ, অনিরাপত্তা, বিশৃংখলা ও নানা ধরনের অপরাধের বিস্তার ঘটছে। মাদকের কারণে শহর-গ্রাম সর্বত্রই খুনোখুনি, পারিবারিক অশান্তি, বিচ্ছেদ-বিপর্যয় যে কত ঘটছে, তার কোনো সীমা-সংখ্যা নেই। মাদকের জন্য টাকা জোগাড় করতে গিয়ে মাদকাসক্তরা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানিসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যে করছে না।  প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এর মধ্যে বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের দেয়া এ তথ্য থেকে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কতটা বিপর্যয়কর ও নাজুক হয়ে পড়েছে। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা মাদকাসক্তদের সংখ্যা বিশেষত, শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আরো অনেক বেশিই হবে। বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বংশধররা সবার চোখের সামনে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

জাতি বিনাশী মাদকের সহজলভ্যতা মাদকাসক্তদের সংখ্যা বৃদ্ধির একমাত্র কারণ। রাজধানী থেকে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম, যেখানেই হাত বাড়ানো যায়, সেখানেই কোনো না কোনো মাদক পাওয়া যায়। আমাদের সীমান্তের ওপারে ভারত ও মিয়ানমার (বার্মা) থেকে গাঁজা, ফেন্সিডিল, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সামগ্রী বানের পানির মতো দেশে ঢুকছে। সুনিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক মাদক চোরাকারবারী চক্র ও তাদের এদেশীয় প্রভাবশালী এজেন্ট-গডফাদাররা সবকিছু ম্যানেজ করে মাদক সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে ডিলারদের হাতে। ডিলাররা পৌঁছে দিচ্ছে আসক্তদের হাতে হাতে। আমরা এর আগেও বহুবার বহুভাবে বলেছি, এখন আবারো বলছি যে, জাতি বিনাশী মাদকের অবাধে অনুপ্রবেশ, চলাচল কেনাবেচা ও সেবন রোধ করা ছাড়া এর দৌরাত্ম্য ও আগ্রাসন থেকে মুক্তি লাভের সহজ কোনো পথ নেই। অবাধে মাদকের রাস্তা খোলা রেখে যদি বলা হয়, কেউ মাদক সেবন করবে না, আদৌ সেটা কাজে আসবে কী? অতএব, মাদক চোরাচালান ডেড স্টপ করতে হবে, চোরাচালানি চক্রের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে হবে এবং যত প্রভাবশালীই হোক না কেন এর মূল হোতাদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ গুরু দায়িত্ব নিতে হবে সীমান্তে বিজিবি ও সাগরে কোস্ট গার্ড এবং দেশের অভ্যন্তরে পুলিশ-র‌্যাব ও গোয়েন্দা বাহিনীকে। সীমান্ত ও সাগর পথে মাদক আসতে না পারলে এবং দেশের অভ্যন্তরে মাদকের চলাচল- কেনাবেচা বন্ধ করতে পারলেই তার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া অবশ্যই পাওয়া যাবে। আর মাদকের বিরুদ্ধে, মাদক কারবারী, মাদক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযান চালাতে পারলেই কেবল মাদক নির্মূল সহজ হয়ে যাবে। দুঃখজনক হলেও আমাদের বলতে হচ্ছে, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার দৈন্যদশা উদ্বেগজনক পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে। বেশীরভাগ কিশোর ও তরুণ মাদক সেবনে কোনো নৈতিক ও আত্মিক বাধা অনুভব করে না। শিক্ষা ব্যবস্থায় ও পরিবারে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলে এমন হওয়ার কথা নয়। কাজেই, দেশব্যাপী মাদকবিরোধী ব্যাপক প্রচারণা, মাদকের বহুমুখী প্রতিক্রিয়া ও ক্ষতি সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই দেশ ও জাতির সম্পদ হিসেবে কিশোর-তরুণদের সুরক্ষা করা হবে বলেই আমরা আশাবাদী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ