ঢাকা, শনিবার 17 February 2018, ৫ ফাল্গুন ১৪২৪, ৩০ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনা শিশু পরিবার ও ছোট মনি নিবাসে পিতৃ-মাতৃ স্নেহে বেড়ে উঠছে শতাধিক শিশু

 

খুলনা অফিস : পিতৃ ও মাতৃ স্নেহে খুলনা শিশু পরিবার (বালক) ও ছোট মনি নিবাসে শতাধিক শিশু বেড়ে উঠছে। ইতোমধ্যে শিশু পরিবারের অনেক শিশু লেখাপড়া ও হস্তশিল্পে শিক্ষা লাভ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক এবং খেলাধুলা প্রতিযোগিতায় এই সদনের শিশুরা ২০১৫ ও ২০১৭ সালে ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন এবং ২০১৫ সালে ২২টি ইভেন্টের মধ্যে ২১টিতে জয় লাভ করা গৌরব অর্জন করেছে। পড়াশুনাতেও অনেক শিক্ষার্থী মেধার স্বাক্ষর রাখছে। কিন্তু শিক্ষা ও খেলাধুলা বাবদ স্বল্প অর্থ বারাদ্দ থাকায় সম্ভাবনাময় এই শিশুদের সার্বিক অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া এতিম ও অসহায় শিশুদের পিতৃ-মাতৃ স্নেহে বড় করে তোলা ও কারিগরি শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৭৪ সালের ২২ আগস্ট খুলনা মহানগরীর মহেশ্বরপাশার মানিকতলায় প্রায় তিন দশমিক ৪৯ একর জায়গার ওপর সরকার খুলনা শিশু পরিবার (বালক) ও ছোট মনি নিবাস প্রতিষ্ঠা করে। ছোট মনি নিবাসে শূন্য (০) থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১০০ কন্যা শিশু এবং ৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ১০০ বালক শিশুর জন্য খুলনা শিশু পরিবারে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বর্তমানে ছোট মনি নিবাসে ২৫ জন কন্যা শিশু ও শিশু পরিবারে ৭১ জনসহ ৯৬ জন শিশু রয়েছে।

সূত্র মতে, পিতৃ-মাতৃহীন অসহায় এ সব শিশুদের শিশু পরিবার ও ছোট মনি নিবাসে পিতা-মাতার  স্নেহে ও সরকারি খরচে লালন-পালন করা হয়। এ সব শিশুদের সরকারি খরচে ইন্টারমিডিয়েট ও চার বছরের ডিপ্লোমা করানো হয়। তবে মেধাবী হলে সেই সব শিশুদের মাস্টার্স পর্যন্ত পড়ানো হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি এই সদনের শিশুরা পিছিয়ে নেই। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক এবং খেলাধুলা প্রতিযোগিতায় ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন এবং ২০১৫ সালে ২২টি ইভেন্টের মধ্যে ২১টিতে জয় লাভ করে। কিন্তু খেলাধুলা ও শিক্ষাখাতে জনপ্রতি মাসিক মাত্র ২৫৫ টাকা বারাদ্দ থাকায় এই সম্ভাবনাময় শিশুদের সার্বিক অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। খাবারের বরাদ্দও খুবই সিমীত। জনপ্রতি মাসিক বরাদ্দ মাত্র ২৬০০ টাকা। এর মধ্যে দুই হাজার টাকা খাবার বাবদ’ এবং বাকি ৬০০ টাকার মধ্যে ১৬৫ টাকা শিক্ষা, ৯০ টাকা খেলাধুলার সামগ্রী ক্রয়, প্রশিক্ষণ ৫০ টাকা, চিকিৎসা ৬০, প্রসাধনী ৭০ টাকা এবং সাধারণ পোশাক-পরিচ্ছদ ১৬৫ টাকাসহ বিবিধ খাতে খরচ করা হয়। এত স্বল্প বাজেটে শিশুদের সুন্দরভাবে লালন পালন অনেক কষ্টসাধ্য বলে জানান সহকারী শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। মাত্র দুইজন শিক্ষক দিয়েই চলে ভেতরের পাঠদান। অথচ এখানের শিশুদের মধ্যে প্রাইমারিতে ২৯ জন, হাইস্কুলে ২৪ জন, কারিগরি শিক্ষায় ১১ জন, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পাঁচ জন, কৃষি ইনস্টিটিউটে একজন এবং ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে একজন অধ্যায়ন করছে।

এদিকে, পিতৃ-মাতৃহীন এতিম শিশুরা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও তাদের জন্য থাকার সুব্যবস্থা নেই। পুরাতন ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়ায় সেখানে নতুন ভবন তৈরি করা হয়েছে। তবে এখনো সেখানে শিশুদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়নি। বর্তমানে শিশু পরিবারের অফিস ভবনের স্যাঁতসেঁতে একটি রুমে গাদাগাদি করে ২০-২৫ জন বালক শিশুকে রাখা হয়েছে। বর্তমানে নতুন একটি ডরমেটরি ভবন নির্মাণ করা হলেও এখনও গণপূর্ত বিভাগ থেকে তা শিশুসদনকে হস্তান্তর করা হয়নি।

সূত্র মতে, ১৪ ফেব্রুয়ারি ডরমেটরি ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার কথা থাকলেও সেটিও করা হয়নি। কবে নাগাদ ডরমেটরি ভবনটি ব্যবহার করা যাবে তাও জানেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। 

এ ব্যাপারে শিশু পরিবারের একজন সহকারী শিক্ষক বলেন, গত বুধবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর ডরমেটরি ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার কথা থাকলেও তিনি আসেননি। ফলে ডরমেটরি ভবনটি ব্যবহার করা ঝুলে গেল।

সূত্র জানায়, শিশু পরিবার (বালক) ও ছোট মনি নিবাসে জনবল সংকট রয়েছে। এ দু’টি প্রতিষ্ঠানে উপ-তত্ত্বাবধায়কসহ ৩৫টি পদ থাকলেও খালি রয়েছে ১৪টি পদ। উপ-তত্ত্বাবধায়কসহ মাত্র ২০ জন দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠান দু’টির কার্যক্রম। এছাড়া অফিসে দুইজন এমএলএসএস থাকলেও নেই কোন দারোয়ান বা নাইট গার্ড। বয়স্ক এম,এল,এস,এসই দারোয়ান এবং নাইট গার্ডের কাজ করেন। কোন স্থায়ী চিকিৎসক ছাড়াই চলছে নিবাসটি। কুয়েটের নিযুক্ত ডাক্তার এস এম আরিফ ইফতেখারকে দিয়েই চলে এখানের চিকিৎসা। কোন বাচ্চা অসুস্থ হলে ডাক্তারকে কল করে ডেকে আনতে হয়।

এখানে শতাধিক শিশু বসবাস করলেও তাদের খাবার রান্নার জন্যও নেই আলাদা কোনো রান্নাঘর। জেলা প্রসাশকের সহায়তায় টিন উপরে এবং পাশে দিয়ে খোলা জায়গায় কোন রকমভাবেই তৈরি করা হয়েছে একটি রান্নাঘর। ঝড়-বৃষ্টির সময় তা দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। ফলে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়ে যায়। সুমন, আরেফিন ও লিটন নামে তিনজন শিশু জানায়, এখানে খাবারের মান খারাপ না। শিক্ষকরাও তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন। তারা বলেন, শিশু সদনে তারা ভালোই আছে।

অফিস কর্মকর্তা বীজন কৃষ্ণ শিকদার বলেন, কোর্টের হুকুমে অনেক সময় পথশিশু, নেশায় আসক্ত এবং সাজাপ্রাপ্ত শিশুদেরও এখানে নিয়ে আসা হয়। ফলে ভালো চরিত্রের শিশুরাও এদের দারা প্রভাবিত হয়। তিনি বলেন, অনেকে নেশার অথবা নগদ টাকা আয়ে অভ্যস্ত থাকার জন্যই এখান থেকে পালায়। এদের অধিকাংশই স্কুলে বা কলেজে যাওযার পথে পালিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে উপ-তত্ত্বাবধায়ক আফরোজা সুলতানা বলেন, জনবল সংকট ছাড়াও শিশু সদনটিতে পানি নিষ্কাশণের ব্যবস্থা ব্যবস্থা খুবই খারাপ। বর্ষাকালে এখানে হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে যায়। এর মধ্যে বাচ্চাদের নিয়ে থাকা, খাওয়া এবং স্কুল করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ