ঢাকা, শনিবার 17 February 2018, ৫ ফাল্গুন ১৪২৪, ৩০ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিশুশিক্ষার সমস্যা ও আমাদের করণীয়

আখতার হামিদ খান : বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিশুকেন্দ্রিক বিষয়গুলো আলোচনার শীর্ষে এসেছে। এর মূলে কাজ করেছে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এর স্পর্শকাতর এবং জীবনঘনিষ্ঠ নীতিমালা। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর জন্য যত্ন ও সহায়তার প্রতি বিশেষ প্রাপ্যতার কথা বলা হয়েছে। বিশ্বের যে ২২টি দেশ প্রথমে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুসমর্থন করেছিলো, বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। ১৯৯১ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের জন্য এই সনদের বাস্তবায়ন অবশ্য করণীয় হয়েছে। সে দিক থেকে বিচার করলে আমাদের কাছে প্রায় এক যুগ ধরেই শিশু অধিকার তথা সিআরসি কর্মসূচী পেয়েছে ব্যাপক হারে। দেশব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে আমরা লাগসই কিছু স্লোগানও তৈরি করেছি। তার মধ্যে যাবতীয় শিশুর প্রতি সার্বিকভাবে ইতিবাচক মনোভঙ্গি সৃষ্টি এবং শিশুর স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার অনুকূলে সক্রিয় কাজের বিষয়গুলোর সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। বর্তমান নিবন্ধে যথাক্রমে শিশু শিক্ষার সমস্যা এবং আমাদের করণীয় তথা সমাধান-এর উপরই আলোকপাত করা হবে। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় শিশু শিক্ষার সমস্যা সম্বন্ধে আলোচনার সময় আমরা কোন স্তরের শিশুর কথা বলতে চাই। আজকাল আমরা শিশু শিক্ষার সমস্যা বলতে প্রাথমিক স্তরের কথাই সাধারণত বোঝাতে চাই। অর্থাৎ ৬/৭ থেকে ১১/১২ বছর বয়সী শিশুর শিক্ষাকে সামনে রাখি। জাতীয় শিক্ষা নীতিতে এই স্তরের উল্লেখ আছে। সমস্যা, উন্নয়ন, গবেষণা, মূল্যায়ন ইত্যাদির অবকাশও আছে এই পর্যায়ের নীতিতে। কিন্তু প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়টা এখনও জাতীয় শিক্ষানীতির আওতায় আসেনি। কিছু বেসরকারী সমাজ সেবা সংগঠন দেশে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমে অবদান রাখছে। তাদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে এখন হাজার হাজার প্রাক প্রাথমিক তথা কেজি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে পড়ালেখা করছে লাখ লাখ শিশু। কারণ চাহিদা আছে। কিন্তু তারা কেমন স্কুল ভবনে পড়ছে, কি রকম বইপত্র পড়ছে, কার কাছে পড়ছে এবং কোন পদ্ধতিতে পড়ালেখা শিখছে, তার কোনো পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। তা সত্ত্বেও আমরা দেখি, কেজি স্কুলগুলোর একাধিক সমিতি গঠিত হয়েছে। বার্ষিক সম্মেলন, সমিতির নির্বাচন, পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষা ইত্যাদি চালিয়ে যাচ্ছে। শিশু শিক্ষার ঐ বিশাল রাজ্যে কেজি শিক্ষকরাই বইপত্র লিখছেন, ছাপাচ্ছেন এবং বিক্রি করছেন। শিশু রাজ্যের ঐ বিদ্যা বাণিজ্যের উপর জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। শিশু পর্বের শিক্ষা কার্যক্রমের এই অবস্থা নিয়ে আমরা সবাই এখন ভাবছি। সবার মনে একই প্রশ্ন, পরিবার ও জাতীয় জীবনের পরম সম্পদরূপী শিশুদের জন্য উন্নত এবং বিজ্ঞানসম্মত সুষম শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায় কিভাবে?
দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির জন্য ডিগ্রিধারী মায়েরা এখন কর্মজীবী (কিছু সংখ্যক ভাগ্যবান ছাড়া)। তাই বাচ্চার বয়স আড়াই বছর হলেই তারা ভালো একটা কেজি স্কুলের সন্ধান করেন। এই ভালোর সংজ্ঞা কি বা মায়েদের প্রত্যাশা কি সে ব্যাপারে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি। ফলে যেটুকু তথ্য পেয়েছি তা হলো, বাচ্চাটাকে নিশিন্তে রাখা যায় এমন একটি জায়গা তাঁরা চান। পাশাপাশি কিছু হালকা শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলে আরো ভালো হয়। সেজন্য অর্থ ব্যয় করতে তাদের আপত্তি নেই। এই চাহিদার ভিত্তিতে প্রতিবছর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে নতুন নতুন স্কুল। নতুন তাদের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু মায়েদের চাকরি তো আট ঘণ্টা, আর বাচ্চাদের স্কুল তিন বা তার চেয়ে কিছু কম, বেশি সময়ের জন্য। সুতরাং ভালো কেজি স্কুলে দিয়েও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
অন্যদিকে ‘সবার আগে শিশু’ বলার সময় আমরা ধর্ম-বর্ণ গোত্র, ধনী দরিদ্র, সুবিধাপ্রাপ্ত এবং সুবিধা বঞ্চিত সব শিশুকেই গণ্য করতে চাই। চাই তাদের জন্য শিক্ষার জগত প্রসারিত করতে। মধ্যবিত্ত পরিবারে সাধারণত দশ থেকে বারো বছরের কাজের লোক থাকে। তা সে মেয়ে বা ছেলে যাই হোক, তাদের জন্যও সৃষ্টি করতে হবে শিক্ষার সুযোগ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই সমস্যার কথা নিয়েও ভেবেছেন। তাই মমতার সঙ্গে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, প্রতিটি শিক্ষিত লোক যেনো অন্ততপক্ষে একজন মানুষকে সাক্ষর এবং শিক্ষিত করে তোলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৩ সালকে ‘সুশিক্ষা বছর’ ঘোষণা করেছেন। সুশিক্ষা শব্দটি অর্থসহ। শিশু শিক্ষাকে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অপরিহার্য উপাদান হিসেবেই ভাবতে হবে। তাই শুধু শিক্ষা নয়, শিক্ষাকে হতে হবে সুশিক্ষা। এক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন অপরিহার্য। বর্তমানে আমাদের দেশে বাংলা মাধ্যম এবং ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল আছে। ভাষিক ভিন্নতা ছাড়াও আঙ্গিকের দিক থেকে শিশু শিক্ষার প্রকারভেদে মৌলিক পার্থক্য আছে। যেমন: প্লে গ্রুপ থেকে কেজি পর্যন্ত, এই কেজি পর্ব কোথাও কোথাও দুই বছর মেয়াদী। যেমন- কেজি ওয়ান এবং কেজি টু। এদের বয়স ৩+ থেকে ৬+ হয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেজি পর্ব শেষ করে স্ট্যান্ডার্ড ওয়ান থেকে ও-লেভেল এবং এ-লেভেল পর্যন্ত পড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয় পর্যায়ক্রমে। তেখন সাইনবোর্ড লেখা হয়, ‘কেজি থেকে ও-লেভেল এবং এ-লেভেল পর্যন্ত পড়ানো হয়। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, কেজি পর্বের আগে প্লে গ্রুপ এবং নার্সারি পর্বের শিশু শিক্ষা কোথায় সমাপ্ত হচ্ছে? শিশু শিক্ষার বিভাজনই বা কেমন? শূন্য থেকে পাঁচ বছরকে ধরা হচ্ছে শিশু প্রারম্ভিক বিকাশকাল। এই বয়সকে যদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাপর্বে গণ্য করা হয় তাহলে হারিয়ে যাচ্ছে একটি বছর। কারণ ৬+ থেকে শুরু হয় ক্লাস ওয়ান। অর্থাৎ শিশু শিক্ষার আঙ্গিক দাঁড়াচ্ছে:
ক. প্লে গ্রুপ এবং নার্সারি। এদের বয়স ৩+ এবং ৪+;
খ. প্লে গ্রুপ এবং কেজি। এদের বয়স ৩+ থেকে ৫/৬+;
গ. প্লে গ্রুপ থেকে ও-লেভেল। এদের বয়স ৩+ থেকে ১৬/১৭+;
ঘ. প্লে গ্রুপ থেকে এ-লেভেল। এদের বয়স ৩+ থেকে ১৮/১৯+;
এবার প্রশ্ন দাঁড়ায় মূলত দুটি শিশুরা ৩+ বয়সে কি শেখে এবং শিক্ষকরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কি না? ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীদের কাছ থেকে শোনা তথ্যের সূত্র থেকে বলছি, ৩+ বয়সের শিশুরা খেলা এবং সুকুমার বৃত্তির বিকাশ তথা নাচ, গান, ছড়া, অঙ্কন ইত্যাদি বিষয় যতোটা শেখে তার চেয়ে বেশি পড়ে নানা রকম রীতিবদ্ধ পাঠ। তা সেটা মুখে মুখে হোক কিংবা ছবির বই দেখেই হোক। ওদের সংখ্যা গুনতে শেখানো হয়। কিছু কিছু লেখা এবং আঁকি বুকিও শেখানো হয়। ঐ বয়সের শিশুদের বাড়ির কাজও দেয়া হয়।
নার্সারির শিশুরা রীতিমতো কয়েকটা বই পড়ে। অক্ষর লেখা শুরু হয়ে যায়। বাড়ির কাজ তো থাকেই। ব্যাগ ভরে যায় বই খাতা, রং পেন্সিলের বক্স, টিভিন বক্স, পানির বোতল ইত্যাদি সামগ্রীতে। আর কেজি ওয়ানে তো আরও আনুষ্ঠানিক পড়ালেখা। এই বয়সের শিশুরা বানান, শব্দ এবং বাক্য পড়েও লেখে। শেখে রাইমস বা ছড়া। আর পরীক্ষা তো প্রথম থেকেই আছে। উঠতি-মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মা মহাব্যস্ত শিশুর লেখাপড়া নিয়ে। কেউ কেউ গৃহশিক্ষক রেখে দেন। বর্তমানের কেজি স্কুলগুলোতে সাধারণত খেলাধুলার জায়গা থাকে না। বাড়ি এসেও খেলার সুযোগ নেই। বাড়ির কাজ করতে হবে। বাড়ি এসেও খেলার সুযোগ নেই। বাড়ির কাজ করতে হবে। আর সন্ধ্যেবেলার পড়া হলো শিশুকে ভালো ছাত্র/ছাত্রী হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু পড়ালেখার এ জবরদস্তিতে শিশুর শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে সে কথাটা কেউ-ই ভাবছি না। একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পূর্বশর্ত যে আনন্দময় সুষম শিক্ষা পরিবেশ সেটাও থাকছে উপেক্ষিত। এরকমভাবে বেড়ে উঠা শিশুরা হৃত শৈশব আর কোনোদিন ফিরে পায় না। লেখাপড়ার চাপ সহ্য করে যারা এগিয়ে যেতে পারে, তাদের ভাগ্যে শেখা না হোক, ডিগ্রি অর্জিত হয় আর যারা পড়ার চাপ বহন করতে পারে না তারা ঝরে যায়। শিশু শিক্ষা স্তরের এই ঝরে পড়া বা ড্রপ-আউট শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় নতুন চিন্তা। কিভাবে ড্রপ-আউটদের আবার পাঠের জগতে আনা যায় তা নিয়ে গবেষণালব্ধ পদক্ষেপও নেয়া হয়। কিন্তু সহজ, আনন্দপূর্ণ, সুষম এবং বয়সের অনুপাতে পর্যায়ক্রমিক বা গ্রেডেড পাঠ তৈরির গুরুত্ব নিয়ে আমরা ভাবতে পারি না কি? বাংলা প্রথম পাঠ গ্রন্থের অন্তর্গত মাত্র দুটি সমস্যার কথা উল্লেখ করা যায়।
প্রথম; বাংলা স্বরবর্ণের তালিকায় ‘ঋ’- বর্ণ/অক্ষর থাকবে কিনা, তা এখনও ঠিক করতে পারি নি। অথচ এন.সি.টি.বি কর্তৃক প্রকাশিত নবন-দশম শ্রেণীর বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থের বর্ণ প্রকরণ এলাকায় এক জায়গায় তারকা চিহ্ন দিয়ে বলা হয়েছে যে ঋ-কে এখন আর স্বরবর্ণরূপে গণ্য করা যায় না।
বিজ্ঞানসম্মত এই সিদ্ধান্ত কি তবে শুধু নবম-দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্যই প্রযোজ্য? শিশু বয়সের শিক্ষা যেনোতেনো প্রকারে সেরে পরবর্তী পর্যায়ে প্রকৃত তথ্য দেয়ার যুক্তি কি গ্রহণযোগ্য? নিশ্চয় নয়। তাহলে তো প্রথমেই শিশুকে জানতে হবে যে ঋ স্বরবর্ণ নয় এবং কেনো নয়।
দ্বিতীয়; বাংলা প্রথম পাঠ গ্রন্থে ব্যঞ্জনবর্ণের তালিকায় ‘ক্ষ’ বর্ণ/ অক্ষরই নেই। কঠিন বলেই হয়তো শেখানো হচ্ছে না। কিন্তু বাচ্চারা তো শিক্ষা, শিক্ষক, রক্ষা, পরীক্ষা, ইত্যাদি শব্দগুলো শিখছে এবং উচ্চারণ করছে। তাই যৌগিক বর্ণ ‘ক্ষ’ (ক+ষ, যার উচ্চারণ ক্ষ, বাংলায় ক্খ) কঠিন মনে হলেও বাচ্চাদের শেখাতে হবে ধৈর্য ধরে। নইলে পরবর্তী পর্যায়ে শিশুদের মধ্যে ব্যঞ্জনবর্ণের সংখ্যা নিয়ে। বিভ্রান্তি থেকে যেতে পারে বৈকি! এ ব্যাপারেও তো সিদ্ধান্ত চাই। সম্প্রতি প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকের ভার্ষিক জটিলতা সম্পর্কিত এক গবেষণায় জানা গেছে যে প্রাথমিক স্তরের বইগুলোর ভাষা শিশুদের জন্য কঠিন। বিষয়বস্তুও বয়স অনুপাতে কঠিন এবং কিছুটা অপ্রয়োজনীয়। কারণ, মাধ্যমিক পর্যায়ে ঐ বিষয়গুলো শিশুরা আবার পড়ে। তো ছোটোবেলায় কষ্ট দেয়ার প্রয়োজন কি? এক্ষেত্রে সমস্যা দুটি। প্রথম, ভাষার জটিলতা, দ্বিতীয়, বিষয়বস্তুর বয়সানুগ বিন্যাস। পাঠ্যপুস্তকের প্রধান আকর্ষণই তো ভাষা এবং বিষয়বস্তু। গ্রন্থের গুণগত মানেরও নিয়ামক ঐ দুটি। প্রশ্ন হলো, যে উপাদান ব্যবহার করে মানসম্পদ গড়ে তোলা হবে, সেই উপাদান যেনো যথার্থ এবং মজবুত হয়, সে ব্যাপারে প্রথমেই দৃষ্টি দেয়া অত্যাবর্শকীয় কাজ নয় কি? আর শুধু দৃষ্টি দেয়া হয়, সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে কাজও করতে হবে। আমরা সেদিকে কতোদূর অগ্রসর হতে পেরেছি? দেশে তো যোগ্য মানুষও আছেন। জনপ্রিয়তা কিংবা বাণিজ্যের জন্য নয়, খুঁজে খুঁজে যোগ্য মানুষদের কাজে লাগাতে হবে শিশু শিক্ষা তথা দেশের স্বার্থে। বর্তমানে শিক্ষার গুণগত মানের উৎকর্ষ নিয়ে আমরা ভাবছি এবং কথাবার্তা বলছি। তাই মৌলিক কাজে হাত দিতেই হবে। বিকল্প নেই। শিশু শিক্ষা স্তরে বিদেশী ভাষা শেখার প্রসঙ্গ এখন তুঙ্গে। প্রথমেই আসে ইংরেজি ভাষার কথা। এক্ষেত্রেও শিশুর উপযোগী বই চাই। চাই ভাষা এবং বিষয়বস্তু বিন্যাসের আকর্ষণীয় সমন্বয়। সে দিকের মান নিয়ন্ত্রণেই বা আমরা কতোটুকু ভূমিকা পালন করতে পারছি? কেজি স্কুলের বইগুলো হাতে তুলে নিলেই সেটা বোঝা যায়? শিশু শিক্ষা রাজ্যের জন্য ইংরেজি বই, ইংরেজি গ্রামার তথা ফাংশনাল ইংলিশ ইত্যাদি বই যারা লিখছেন তাদের গুণগত মান নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু উত্তর দেয়ার মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না।
শিশু শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক অনুসঙ্গ হলো শিক্ষক। শিক্ষক কিভাবে ছাত্রছাত্রীদের পাঠ-উম্মুখ করে তুলবেন, সেটা জানতে হবে। অর্থাৎ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক চাই। শিশু মনস্তত্ব বুঝে চলার জ্ঞান তার থাকতেই হবে। শেখাটা এমন ব্যাপার যে সেটা খাওয়ানো যায় না। জোর করে চাপিয়ে দেয়াও সঠিক নয়। শিক্ষার বিষয়গুলো শিশুদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে হয়। এই কাজ নি:সন্দেহে কঠিন। এসব ক্ষেত্রে মন, মেধা, ধৈর্য ও শ্রম বিনিয়োগ করতেই কঠিন। এসব ক্ষেত্রে মন, মেধা, ধৈর্য ও শ্রম বিনিয়োগ করতেই হবে গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে। কথাগুলো কেতাবি জ্ঞানের মাধ্যমে তাত্ত্বিকভাবে জানলেই চলবে না, চাই প্রায়োগিক বাস্তবতা। শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে শিশু মনস্তত্ত্বের জ্ঞান এবং তার প্রায়োগিক দক্ষতার বড়োই অভাব দেখা যায়। নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপচার নিয়ে একটা নতুন কেজি স্কুল বা প্রাথমিক স্কুলের প্রতিষ্ঠা তাই আমাদের আশান্বিত করে তোলে। হেরিটেড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্ষেত্রে তাই আমরা খুবই আশাবাদী। দীপাবলির আয়োজনে যেমন একটি একটি করে প্রদীপ জ্বলে, তেমনি একটি আলোকিত স্কুলের বাস্তবতা থেকে সৃষ্টি হোক আলোকিত স্কুলের দীপাবলি। অভিভাবক এবং সমাজবাসী হিসেবে এটাই আমরা চাইবো।
প্রশ্ন হলো, সমাজ তথা কমিউনিটির চাওয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সমাজবাসীর সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। আমাদের জানা মতে কেজি স্কুলগুলো সবই বেসরকারী।
আর প্রাথমিক স্কুলগুলোর অর্ধেকের বেশিই চলছে বেসরকারী উদ্যোগ এবং ব্যবস্থাপনায়। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি দিয়েই স্কুলের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হয়। আর সেই ফিস বা টাকা তো অভিভাবক তথা সমাজবাসীর। তাই স্কুলে কি পড়া হচ্ছে, কে বা কারা শিক্ষক তাদের যোগ্যতা এবং মানবসম্পদ গড়ে তোলার ব্যাপারে সচেতনতা, দক্ষতা এবং মমতা আছে কি না, ইত্যাদি ব্যাপারে অভিভাবকদের সজাগ থাকতে হবে। কিন্তু কার্যত আমরা তেমনটা দেখতে পাই না। স্কুলের উন্নয়নে হয়তো কখনো কোনো বিত্তবান এগিয়ে আসেন। সেটা ভালো কথা। তবে তার পরিমাণ বা স্কুলের সংখ্যার সঙ্গে অনুপাতের হার কতো, তা আমরা জানি না। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি সব স্কুলেই আছে। এই কমিটি সাধারণত স্কুলের কার্যক্রম যাকে ‘রানিং কন্ডিশন’ বলা যেতে পারে, সে দিকটার প্রতি নজর দেন। স্কুলের সার্বিক প্রমোশনাল কাজে কমিটির সদস্যরা তেমন নিষ্ঠ কি না, জানি না। বর্তমানে আমাদের চারপাশে বহু কেজি স্কুল। আর অধিকাংশ স্কুলের পরিসর অল্প। শিশুদের খেলার জায়গা নেই। সহ পাঠক্রমিক শিক্ষার বিষয় বা ব্যবস্থাও তেমন নেই। শিশুর সুকুমার বৃত্তিগুলো বিকাশের জন্য যে সযত্ন লালন প্রয়োজন, সে ক্ষেত্রেও বিশাল ঘাটতি। এখন ভাবতে হবে, এতো সব সমস্যার মোকাবেলা করা যায় কিভাবে? বিশেষ করে এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে শিশু শিক্ষার ব্যাপারে যেসব সমস্যার উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো নিয়েই যদি ভাবতে এবং তার প্রতিকার করতে চাই, তাহলেও পর্যাপ্ত কাজ। যেমন:
১. শিশু শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করা, বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের,
২. কোন বয়সে শিশুরা কি এবং কতোটা শিখবে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের সংখ্যাসহ তা নির্ধারণ করা,
৩. বইপত্র লেখার জন্য বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানো,
৪. বইপত্রের ভাষিক এবং স্তরানুগ মান নিশ্চত করা,
৫. প্রচুর শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা (যারা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করবেন, তাদেরকেই বেছে     নিতে হবে),
৬. শিক্ষকদের ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণের বিষয়কে আবশ্যিক করা,
৭. সহ পাঠক্রমিক শিক্ষার মধ্যে গান, নাচ, ছবি আঁকা, আবৃত্তি, উচ্চারণ, খেলাধুলা (ইনডোর ও আউটডোর দুটোই) ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখা,
৮. স্কুল ভবনের জন্য ন্যূনতম কাঠামোর বাধ্যবাধকতা রাখা,
৯. অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা এবং তাদের কাছে স্কুলের জবাবদিহিতা রাখা ইত্যাদি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশু শিক্ষাকে যদি অর্থবহ করে তোলা যায়, শিশুর বৃদ্ধি ও ক্রমবিকাশের প্রাথমিক পর্যায়েই যদি তাদেরকে পাঠউন্মুখ করে তোলা যায়, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ের সমস্যার অনেকগুলোই দেখা যাবে না। নকল সমস্যাও দূর হয়ে যাবে, কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। শিশু শিক্ষার সমস্যাগুলো আমরা চিহ্নিত করতে পারি। পারি না তার প্রতিকার করতে। কিন্তু এই অপারগতাকে স্বীকারোক্তির মাধ্যমে উচ্চারণ করে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় আর নেই।
সভা-সেমিনার করে আর চর্বিত চর্বন নয়, এবার সরজমিনে কাজে নামতে হবে। সব সমস্যার সমাধান একদিনে হবে না, একথাও সত্য। তাই পরিকল্পনার মাধ্যমে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এক এক করে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে হবে। আর কাজের মানুষ আশেপাশেই থাকে। তাদেরকে কাজে লাগানো হোক। ওরা আবার কিছুটা প্রচারবিমুখ। তবে সব সময়ই কাজের লোকদের খুঁজে বের করার জন্য সদিচ্ছ্য এবং সময়ের প্রয়োজন হয়। আমাদের প্রত্যাশা, সেই পথ পদ্ধতি ধরেই কাজ শুরু হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ