ঢাকা, সোমবার 19 February 2018, ৭ ফাল্গুন ১৪২৪, ২ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রসঙ্গ নারীর ক্ষমতায়ন

আশিকুল হামিদ : বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে নারীর ক্ষমতায়ন একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বলা বাহুল্য, এর পেছনে রয়েছে আওয়ামী  লীগ সরকারের উদ্যোগ এবং ভূমিকা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু নন, অনির্বাচিত জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধী দলের নেত্রী রওশন এরশাদ এবং মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর মতো আরো অনেক নারীই পরিচিতি ও প্রাধান্য অর্জন করেছেন। ওদিকে রয়েছেন তিন বারের প্রধানমন্ত্রী এবং ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তাদের কারণে সব মিলিয়েই দেশের রাজনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছেন। প্রশ্ন, সংশয় কিংবা আপত্তি কিন্তু নারীদের এই প্রাধান্যের জন্য ওঠেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এর কারণ সৃষ্টি করেছে সরকার। গত ২৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যাপারে সংবিধানে নতুন করে সংশোধনী আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা অপরিবর্তিত তথা ৫০ রাখা হলেও এর মেয়াদ করা হবে ২৫ বছর। এজন্য সংসদের পরবর্তী অধিবেশনেই সংবিধানে সংশোধনী আনা হবে। এটা হবে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনী। সরকারের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই বর্তমান নিবন্ধ পরিকল্পিত হয়েছে।
সিদ্ধান্তটি সম্পর্কে আলোচনায় যাওয়ার আগে এ সংক্রান্ত ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার। কিছুটা বয়স্ক পাঠক যারা তাদের নিশ্চয়ই এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের কথা মনে পড়বে। ১৯৮০-র দশকে পর্যায়ক্রমিক সে আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোট এবং এককভাবে তৎপর জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশে তখন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল তো ছিলই না, এত বেশি দৈনিকও ছিল না। সে সময় প্রধান ভূমিকা পালন করেছে ‘বিচিত্রা’ ও ‘যায়যায়দিন’সহ কয়েকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। এসবের মধ্যে উপস্থাপনায় আধুনিকতা ও রিপোর্টিংয়ে বৈচিত্র্যের জন্য ‘যায়যায়দিন’ বেশি পঠিত হতো। পত্রিকাটি শুধু সরকারের বিরুদ্ধে নয়, জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধেও সরাসরি লিখতো।
এভাবে লিখতে লিখতেই একবার ‘৩০ সেট অলংকার’ শিরোনামে এক কাভার স্টোরি করেছিল ‘যায়যায়দিন’। এতে বিষয়বস্তু হিসেবে আনা হয়েছিল জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের ৩০ জন এমপিকে। এদের বলা হতো ‘মহিলা এমপি’। জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাটি শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সালের সংবিধানে। তিনশ’ আসনের সংসদে ১৫টি আসনকে নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার বিধান ছিল ওই সংবিধানে। বিধানটি করা হয়েছিল ১০ বছরের জন্য। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে আসন সংখ্যা দ্বিগুণ অর্থাৎ ৩০ করা হয়। মেয়াদও ১৫ বছর বাড়ানো হয়। এসব ‘মহিলা এমপি’কে নির্বাচিত করতেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসা এমপিরা। কিন্তু সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী পৃথকভাবে ভোটের আয়োজন কখনো করা হয়নি। তেমন সুযোগই আসলে ছিল না। বিষয়টি শুরু থেকেই ক্ষমতাসীন দলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকতো সে দলের মনোনীত নারীরাই কেবল ‘মহিলা এমপি’ হওয়ার সুযোগ পেতেন। এখনো সে ব্যবস্থাই চলছে। সে কারণে ১৯৮৬ সালের সংসদে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি মনোনীত ৩০ জন ‘মহিলা এমপি’ ছিলেন।
কিন্তু নামে এমপি হলেও যেহেতু জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেননি সেহেতু দেশ ও জনগণের প্রতিও তারা কোনো দায়দায়িত্ব বোধ পালন করেননি। জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতারও কোনো বিধান ছিল না। মনোনয়ন পাওয়ার জন্য যেমন সংসদে ভূমিকা পালনের আগ্রহী তেমনি তারা সব সময় ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করতেন। কথা উঠেছিল বিশেষ করে ব্যক্তি এরশাদের কারণে। নারীদের ব্যাপারে এরশাদের আগ্রহের বিষয়ে সে সময় তো বটেই, পরবর্তীকালেও রসাত্মক অনেক গল্প ও কাহিনী শোনা যেতো। একই কারণে ১৯৮৬-র সংসদে যে ‘মহিলা এমপি’রা ছিলেন তাদের নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা চলতো। ব্যঙ্গ-তামাশাও প্রকাশ্যেই করা হতো।
সে সবের ভিত্তিতেই সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’ তার কাভার স্টোরির শিরোনাম করেছিল ‘৩০ সেট অলংকার’। রিপোর্টের মূলকথায় ‘যায়যায়দিন’ লিখেছিল, এই ৩০ জন নারী আসলে এমপি নন, তাদের প্রত্যেকে এক-এক সেট ‘অলংকার’! কোনো ভূমিকা পালনের ধারেকাছে না গিয়ে ‘অলংকার’ হিসেবে তারা সংসদের শোভা বর্ধন করে চলেছেন মাত্র। সাজগোছ করে বসে থাকা এবং এরশাদ ও তার সরকারের সমর্থনে টেবিল চাপড়ানো ছাড়া তাদের কোনো কাজই ছিল না। জেনারেল এরশাদের মনোনীত ‘মহিলা এমপি’দের ‘৩০ সেট অলংকার’ বলার ঔদ্ধত্য দেখানোর জন্য খেসারতও দিতে হয়েছিল ‘যায়যায়দিন’কে। সাপ্তাহিকটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ হয়েছিল। অতি চতুর ও সতর্ক সম্পাদক শফিক রেহমান অবশ্য আগেই লন্ডন চলে যাওয়ায় গ্রেফতার এড়াতে পেরেছিলেন। তিনি আসলে কেটে পড়েছিলেনÑ পালিয়ে বেঁচেছিলেন।
এতদিন পর ‘৩০ সেট অলংকার’ প্রসঙ্গ টেনে আনায় পাঠকরা অবাক হতে পারেন। কিন্তু এর পেছনেও বিশেষ কারণ রয়েছে। বর্তমান পর্যায়ে কথা উঠেছে এজন্য যে, শুরুতে ১০ বছরের জন্য করা হলেও সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের বিধানটি এখনো বহাল রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সময়ে সময়ে বিধানটির মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। ১৯৭২ সালে ১৫ জন এবং ১৯৭৮ সালে ৩০ জন করা হলেও সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। যেমন ২০০৪ সালে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের সময় সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে একদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়, অন্যদিকে সময়সীমা করা হয় ১০ বছর। সে অনুযায়ী ২০১৪ সালে ব্যবস্থাটির অবসান ঘটার কথা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে আবারও সংবিধানে সংশোধনী আনা হয় এবং ২০১১ সালের ৩ জুলাই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। সংবিধানের ৬৫ (৩) অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী বর্তমান দশম সংসদের অবসান ঘটার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারির পর সংরক্ষিত নারী আসনের বিধানটিও আর কার্যকর থাকবে না। এমন অবস্থার মুখোমুখি এসেই আওয়ামী লীগ সরকার আবারও সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
নারীদের কথিত ‘ক্ষমতায়ন’ বা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার ব্যাপারে কারো ভিন্নমত না থাকলেও আপত্তি ও কথা উঠেছে আসলে এর পদ্ধতি প্রসঙ্গে। কারণ, ‘মহিলা এমপি’দের নির্বাচিত করার পন্থাটিই গণতন্ত্রসম্মত নয়। এই প্রক্রিয়ায় জনগণের তথা সাধারণ ভোটারদের কোনো ভূমিকাই থাকে না। ‘মহিলা এমপি’রা আসলে মনোননীত হন এবং এ ব্যাপারেও প্রধান ভূমিকা থাকে ক্ষমতাসীন দলের। তাছাড়া ‘মহিলা এমপি’দের জন্য কোনো নির্বাচনী এলাকাও নির্দিষ্ট করা নেই, যেমনটি রয়েছে সাধারণ এমপিদের জন্য। জনগণের ভোটে নির্বাচিত তিনশ’ এমপির নির্বাচনী এলাকার জনগণ যে কোনো সমস্যায় বা প্রয়োজনে নিজ নিজ এলাকার এমপিদের কাছে যাওয়ার এবং গিয়ে সমাধান চাওয়ার সুযোগ ও অধিকার ভোগ করেন। তারা গিয়েও থাকেন। অন্যদিকে ‘মহিলা এমপি’দের কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা না থাকায় জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়দায়িত্ব থাকে না। তারা ব্যস্ত থাকেন শুধু ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। সংসদে বসে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনে টেবিল চাপড়ানোর জন্য। ঘটনাক্রমে মাঝে-মধ্যে বক্তব্য রাখলেও সেসবও তারা রাখেন সরকারের পক্ষেই। নিজেদের পদ বহাল রাখার বাইরে আর কোনো কারণে তাদের কোনো চেষ্টা চালাতেও দেখা যায় না।
এসব কারণেই নারীদের জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষিত রাখার বিধানটির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছে। এমনকি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের মতো ‘নাম করা’ অনেক নারী নেত্রীকেও সম্প্রতি সোচ্চার হয়ে উঠতে দেখা গেছে। বলা হচ্ছে, নারীদের ‘ক্ষমতায়ন’ সত্যি উদ্দেশ্য হলে সংরক্ষণের বিধানটিই তুলে দেয়া উচিত। তেমন অবস্থায় রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকান্ডে সক্রিয় নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসতে পারবেন। এটাই হতে পারে নারীদের ‘ক্ষমতায়ন’ এবং জাতীয় জীবনে ভূমিকা পালন করতে দেয়ার প্রধান পন্থা।
হঠাৎ করে তেমন আয়োজন না করা গেলে এমন বিধান করা দরকার, যার মাধ্যমে নারীদের জন্য পঞ্চাশটি পৃথক নির্বাচনী এলাকা সৃষ্টি করা হবে। এসব আসনে কেবল নারীরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। ভোটও দেবেন শুধু নারী ভোটাররা। তেমন অবস্থায় নারীদের মর্যাদা অনেক বেড়ে যাবে এবং কারো পক্ষে মহিলা এমপিদের অন্তত ‘৫০ সেট অলংকার’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ থাকবে না। বলা দরকার, ‘সুশীলা’ নামে পরিচিত নারী নেত্রীসহ দেশের সচেতন সকল মহলও সম্প্রতি এই দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বিষয়টি নিয়ে সরকার তথা ক্ষমতাসীন দলের এখনই উদ্যোগ নেয়া উচিত। পরিকল্পিত সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই সরকারের উচিত নারীদের জন্য পৃথক নির্বাচনের বিধান তৈরি করা। এভাবেই নারীদের সত্যিকারের ‘ক্ষমতায়ন’ সম্ভব। একই সঙ্গে সম্ভব নারীদের মর্যাদা বাড়ানোও। না হলে যতো বেশি সংখ্যক আসনই তাদের জন্য বরাদ্দ করা হোক না কেন, নারীরা ‘অবলা’ই থেকে যাবেন। বলা হবে, তারা আসলে ক্ষমতাসীনদের ‘দয়া-দাক্ষিণ্যে’ সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন! এজন্যই মহিলা এমপিদের ব্যাপারে সংবিধানে সংশোধনী আনার আগে সকল রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি নারী আন্দোলনের নেত্রীদের সঙ্গেও সরকারের উচিত মত বিনিময় করা এবং সকলের অভিমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া। আমরাও নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে। কিন্তু সে পন্থা হওয়া উচিত মর্যাদাপূর্ণ ও গণতন্ত্রসম্মত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ