ঢাকা, মঙ্গলবার 20 February 2018, ৮ ফাল্গুন ১৪২৪, ৩ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সরকারি প্রস্তাবের উপেক্ষা কি বেগম জিয়ার কারাবন্দিত্ব প্রলম্বিত করবে?

আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি এই কলামটি যখন লিখছি তখন পর্যন্ত বেগম জিয়ার মামলার রায়ের সার্টিফাইড কপি পাওয়া যায়নি। এই কপিটি না পাওয়ায় নি¤œ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল এবং তার জামিন আবেদনও করা যায়নি। রায়ের সার্টিফাইড কপিটি পাওয়ার কথা ছিল গত ১১ ফেব্রুয়ারি কিন্তু তা হয়নি। আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রায়ের এই কপি সরবরাহে ব্যর্থ হওয়ায় বিভিন্ন প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই সরকারকে দোষারোপ করছেন। বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জামিন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার জন্যই এখানে তারা গড়িমসি করছেন। ইতোমধ্যে একটি অনলাইন পত্রিকা খবর দিয়েছে যে, একটি এজেন্সির লোক নাজিম উদ্দিন রোডের জেলখানায় গিয়ে বেগম জিয়ার সাথে দেখা করেছেন এবং শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাজি হবার জন্য তার কাছে সরকারি প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছেন। এই খবরের সত্যাসত্য নির্ণয় করা খুবই কঠিন। বেগম জিয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ছয়টি শর্ত আরোপ করেছেন। তার মধ্যে রয়েছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান। অর্থাৎ দলীয় কোন সরকারের অধীনে নয়। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলে তা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হবে না। বেগম জিয়াকে রাজি করানো মানে ২০ দলীয় জোটকে রাজি করানো। তাও আবার খাঁচায় আবদ্ধ করে। আওয়ামী লীগ সরকার এখানে যে প্রতাপের পরিচয় দিয়েছেন তা অনন্য।
বেগম জিয়া প্রস্তাবটি নাকচ করেছেন বলে খবরে বলা হয়েছে। পাঠকদের হয়তো মনে আছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের টাইম সাময়িকী ২০১১ সালের ৫ আগস্ট তার অনলাইন সংস্করণে বিশ্বের ১২ জন প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের তালিকায় বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ৭ম স্থান প্রদান করেছিল। টাইমের রিপোর্টটিতে শেখ হাসিনার সংগ্রামী ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের একটি বিবরণ বিধৃত হয়েছিল এবং এতে ২০০৯ সালে তার দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হবার বিষয়টি উল্লেখ করে তাকে বিশ্বের সপ্তম প্রভাবশালী নারী নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ঐ সময়ে এই স্তম্ভে মন্তব্য করতে গিয়ে আমি বলেছিলাম যে, অন্যতম পরাক্রমশালী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে টাইম কর্তৃক শেখ হাসিনাকে অভিধা প্রদানের মধ্যে যথার্থতা ছিল। ২০০৭-০৮ সালের জিরো অবস্থান থেকে শেখ হাসিনা নিজেকে হিরো অবস্থানে নিয়ে গেছেন। এটি তার ও তার দলের বিরাট একটি সাফল্য। এই কাজটি করতে গিয়ে তিনি প্রভাবশালী শক্তিসমূহের উপর প্রভাব খাটিয়েছেন না আধিপত্যবাদের শর্ত মেনে নিয়েছেন তা প্রথম প্রথম কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলেও এখন পরিষ্কার হয়ে উঠছে। তার ক্ষমতায় আসার দু’মাসের মাথায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সীমান্ত প্রহরী ও আধাসামরিক বাহিনী বিডিআরের উপর নৃশংস হামলা হয়। হামলাকারীরা আমাদের সিনিয়র ও মধ্যসোপানের চৌকষ ও প্রতিভাবান অর্ধশতেরও বেশি সেনাকর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই হত্যাযজ্ঞের সাথে জড়িত প্রকৃত কুশিলবদের খুঁজে বের করে শাস্তি প্রদানের জাতীয় দাবি এবং সেনাবাহিনী ও তার সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির বৃহত্তর তদন্তের সুপারিশকে উপেক্ষা করে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তিনি পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন এবং বিচারানুষ্ঠান সম্পন্ন করেছেন। ষড়যন্ত্র ও তার অনুঘটকদের বিষয়টি দিনের আলোর মত পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ ও চাপের কাছে মাথানত করেননি। সাহসিকতার সাথে নিজ দলের নেতাকর্মীদের রক্ষা করেছেন এবং বিরোধী দলের একজন সাবেক এমপির উপর নদী পারাপারে সহযোগিতা করার দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে তার সরকার তাকে শাস্তি দিতেও  ভোলেনি।
গত ৯ বছরের শাসনামলে তিনি তার প্রতাপ ও প্রভাব নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন, কখনো পেছনে তাকাননি, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোন বাধাই মানেননি। তিনি তার লক্ষ্য অনুযায়ী তার পিতা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বিচার করেছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পুনঃতদন্ত করে সম্পূরক চার্জশিটের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের আসামী করে বিচার সম্পন্ন করেছেন। খুন, দুর্নীতিসহ তার নিজের বিরুদ্ধে দায়ের করা ও বিচারাধীন ১৫টি মামলাসহ দলীয় নেতাকর্মীদের প্রায় ১০ সহ¯্রাধিক মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মামলা অব্যাহত রেখে তাদের দুর্নীতিবাজ ও নিজেদের সাধু প্রমাণই নয় শুধু বিরোধী দলসমূহের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তার সরকার মামলার পর মামলা দিয়ে তাদের কোনঠাসা করতে সমর্থ হয়েছেন। তার দল ও সরকারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তিনি ও তার সরকার অত্যন্ত অপমানজনকভাবে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছেন। বিশদলীয় জোটের অন্যতম প্রধান শরিক বাংলা দেশ জামায়াতে ইসলামীকে বাগে আনতে না পেরে দলটিকে প্রথমে ভাঙ্গার অপচেষ্টা করেছেন, পরে জোট থেকে আলাদা করার ফন্দি ফিকির আঁটা হয়েছে। কিন্তু তাতেও ব্যর্থ হয়ে দলটির উপর ক্র্যাক ডাউন হয়েছে। সারা দেশে জামায়াতের নেতা কর্মীরা সরকারের জুলুমের শিকার। গণতন্ত্র চর্চায় ৭৭ বছর ধরে নিয়োজিত একটি প্রাচীন দলকে শেখ হাসিনার সরকার জুলুমের শিকার বানিয়েছেন। দলটির আমীর প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা মতিয়ুর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জনাব আবদুল কাদের মোল্লা ও জনাব কামারুজ্জামান এবং নির্বাহী সদস্য জনাব মীর কাশেম আলীকে বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দলটির অন্যতম নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুস সোবহান ও আরেক সহকারী সেক্রেটারি জিনারেল জনাব আজাহারুল ইসলাম যুদ্ধাপরাধের  মামলায় ফাঁসির আদেশ পেয়েছেন। এছাড়াও জামায়াতের সাবেক আমীর বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম নেতা খ্যাতনামা ইসলামী চিন্তাবিদ ৯০ বয়সী অধ্যাপক গোলাম আজমকে যুদ্ধাপরাদের জন্য গঠিত টাইব্যুনাল মিথ্যা মামলায় ৯১ বছরের জেল দেয়া হয়। জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাগারেই তিনি শাহাদাৎ বরণ করেছেন। একইভাবে দলটির সিনিয়ার নায়েবে আমীর মাওলানা একেএম ইউসুফ কারারুদ্ধ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন। সরকার এই বিচার প্রক্রিয়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোনও নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি। তাদের আইনজীবী নিয়োগে যেমন বাঁধা দেয়া হয়েছে তেমনি তাদের মুক্তির লক্ষ্যে আয়োজিত মিটিং মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশের উপর দেশব্যাপী পুলিশী হামলা এবং দলীয় কর্মীদের উপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। বাক ও সমাবেশের স্বাধীনতাসহ মানুষের মৌলিক অধিকার এখন ভূলুণ্ঠিত। বিরোধী দলের সমর্থক গণমাধ্যমগুলোও সরকার ও সরকারি দলের নির্যাতনের শিকার। জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক আমার দেশ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জামায়াত সমর্থিত পত্রিকা দৈনিক সংয়গ্রামের তিনটি বাণিজ্যিক ভবন সরকারি দলের অঙ্গ-সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের চিহ্নিত কয়েকজন নেতাকর্মী দখল করে আছেন। থানায় তাদের বিরুদ্ধে জিডি নেয়া হয় না পুলিশ তাদের  বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় না। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ পুলিশের আইজির কাছে আবেদন করে কোনও ফল হচ্ছে না।
জামায়াত বিএনপি’র নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এখন চার লক্ষাধিক মামলা রয়েছে এবং এতে আসামীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ। বিরোধী দলসমূহের এমন কোন নেতা ও সক্রিয় কর্মী নেই যার বিরুদ্ধে মামলা নেই। বৃটিশ আমল থেকে এ পর্যন্ত এত দুর্দন্ত প্রতাপে কোনও শাসক দেশ শাসন করেছেন বলে মনে হয় না। দেশে মানবাধিকার বলতে এখন কিছু নেই। বিচারিক ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনে মৃত্যু, পুলিশের উসকানিতে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলোর বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ করতে পারছে না। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিলে তাদের নেতাকর্মীদের ধর পাকড় শুরু হয় এবং শত শত পুলিশ মোতায়েন করে ঘরবাড়ি ও অফিসের মধ্যে তাদের আটক করে রাখা হয়। মানুষের জীবন ও সম্পত্তির কোনও নিরাপত্তা নেই। দেশের সর্বত্র নৈরাজ্য চলছে, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে। মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে প্রহসন করে বিনা ভোটে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছেন এবং বিরোধী দল দমনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং দলীয় নেতাদের নমিনেশান পেপার দাখিল না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে তাকে নিরুদ্দেশ করে দেয়া হয়। গোপন স্থানে নিয়ে তাকে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে বশে আনা হয়। পরে দেখা যায় তিনি ও তার দল বিনা ভোটেই নির্বাচিত হয়ে গেছেন এবং এরশাদ হয়েছেন শেখ হাসিনার বিশেষ দূত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের এখন পোয়া বারো। তারা বিরোধী দলগুলোকে র‌্যাব-পুলিশ দিয়ে দমন করে, বাড়িতে ও অলিতে গলিতে পলায়নরত ৬ কোটি পাঠিয়ে নিজেরা ভোট ভিক্ষা করছেন। উপনিবেশিক ও পরাধীন শাসনামলের কথা আমরা বলি। যারা ঐ আমল দেখেছেন তারা কি কখনো এই অবস্থা দেখেছেন? সরকার প্রধান পরম পরাক্রমশালী ও প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী না হলে দেশের এই অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব ও ক্ষমতাকে যেভাবে ব্যবহার করছেন তার নজির ইতিহাসে খুব কমই পাওয়া যায়। আওয়ামী লীগ এখন ব্যক্তি কেন্দ্রিক ও প্রতিহিংসা পরায়ণ বিষাক্ত রাজনীতির অনুঘটকে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়। এই বিষক্রিয়ার অংশ হিসেবে বেগম জিয়া এখন জেলে। জামায়াতের আমীর ও সেক্রেটারি জেনারেলসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বিনা দোষে জেলে। দু’টি বৃহৎ ও সক্রিয় দলকে শৃঙ্খলিত করে আওয়ামী লীগ তৃতীয়বার ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে ক্ষমতায় আসতে চান। দেশের মানুষ আওয়ামী লীগের এই অভিলাস কি পূরণ হতে দিবেন?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ