ঢাকা, বৃহস্পতিবার 22 February 2018, ১০ ফাল্গুন ১৪২৪, ৫ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চবি আবাসিক হলে তল্লাশি ২ আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০ রামদা উদ্ধার

 

চট্টগ্রাম অফিস : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরের অব্যাহতি দাবি করে ছাত্রলীগের একাংশ গত মঙ্গলবার  অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচীর নামে ব্যাপক তান্ডব চালানোর পর গতকাল বুধবার সকাল ১১টার দিকে অবরোধ স্থগিত করেছে। অবরোধকারী ছাত্রলীগের একাংশের নেতা চবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আলমগীর টিপু জানায়,  আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তিনটি দাবি দিয়েছিলাম। এর মধ্যে দুটি পূরণ করেছে। বাকিটা পূরণে আশ্বাস দিয়েছে। তাই অবরোধ স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে চবিতে অবরোধকারী ছাত্রলীগের একাংশের নেতাকর্মীরা মংগলবার সারাদিন ক্যাম্পাসে যানবাহন ভাঙগচুর,প্রক্টর অফিসে হামলা ভাঙগচুর এবং পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তারা সাংবাদিকদের যানবাহনে হামলা ভাঙগচুরও করেছে। শাটল ট্রেনের হুইস পাইপ কেটে এবং পরিবহন দপ্তরে শিক্ষকদের যানবাহনেও হামলা করে। তাদের তান্ডবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতংক ও ভীতি ছড়িয়ে পরে। বিপুল পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

চবি সূত্র জানায়,সোমবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে  ছাত্রলীগের দুগ্রুপের কয়েকদফা সংঘর্ষের পর দিবাগত মধ্যরাতে চবি প্রশাসন পুলিশকে নিয়ে শাহ আমানত হল, সোহরওয়ার্দী হল,শাহজালাল হলে অভিযান চালায়। এ সময় পুলিশ শাহজালাল হল থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুটি এলজি বন্দুক ও সোহরাওয়ার্দী হল থেকে কয়েক বস্তা রামদা ও পাথর উদ্ধার করে। এ সময় কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে হাটহাজারী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মহসিন মিয়া  বলেন, সংঘর্ষ থামাতে হলে অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছে। এ সময় বেশ কয়েকজন আটক হয়েছে। হাটহাজারী থানার ওসি বেলাল উদ্দিন বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আটক করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোঃ আলী আজগর চৌধুরী  বলেন, অভিযানে শাহজালাল হল থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুটি আগ্নেয়াস্ত্র (এলজি) ও সোহরাওয়াদী হল থেকে দেশী অস্ত্র পাওয়া গেছে। ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা থামাতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এদিকে আবাসিক হলে পুলিশী তল্লাশি ও নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের প্রতিবাদ এবং প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরীর পদত্যাগ দাবিতে মংগলবার ভোর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক  দেয় চবি ছাত্রলীগের একাংশ। তারা  নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী বলে পরিচিত। তারা মংগলবার সকাল ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেল স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা শাটল ট্রেনের হুইস পাইপ কেটে দেয় । ফলে সকাল ৯টা পর্যন্ত কোনো শাটল বিশ্ববিদ্যালয় রুটে চলাচল করতে পারেনি। ষোলশহর স্টেশন থেকে অনেক শিক্ষার্থী ফিরে যায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অচল হয়ে পড়ে। এতে শত শত শিক্ষার্থী ভোগান্তিতে পড়ে। এর আগে মঙ্গলবার সকালে বটতলী স্টেশন থেকে ক্যাম্পাসগামী শাটল ট্রেন এবং শহর থেকে ক্যাম্পাসমুখী শিক্ষক বাস ছাড়তে বাধা দেওয়া হয়। ষোলশহর স্টেশনের স্টেশন মাস্টার শাহাব উদ্দিন বলেন, সকালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাটল ট্রেনটি আসেনি। তাই এখান থেকে ৯টা পর্যন্ত শাটল ট্রেন চলাচল করতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টেশনে শাটলের হুইস পাইপ কেটে দিয়েছে। 

মংগলবার অবরোধকারীদের নেতা  বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আলমগীর টিপু বলেন, মধ্যরাতে ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই তার অব্যাহতি চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দিয়েছি।

চবি সূত্র জানায়, অবরোধকারীরা মংগলবার দুপুর ১২ টার কিছু পরে চবির মূল ফটক বন্ধ করে অবস্থান নেয়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিপুল পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অবরোধকারীরা সরে যাওয়ার পর মূল ফটকের তালা খুলে দেওয়া হয়। বেলা একটার দিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মশিউদ্দৌলা রেজা সাংবাদিকদের বলেন, গত রাতে দুই হলে তল্লাশি চালিয়ে আট-দশটা রামদা ও দুটি আগ্নেয়াস্ত্র পাই। এরই প্রেক্ষিতে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র মূল ফটক অবরোধ করে। পরে আমরা তাদের উঠে যেতে অনুরোধ করি। তারপরও সরে না গেলে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে বাকি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে।

এদিকে দুপুরে আবার ছাত্রলীগ প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করে তার অফিস কক্ষে তালা লাগাতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। এসময় পুলিশের সাথে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এসময় ৬ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। পুলিশের লাঠিচার্জে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জে রিয়াজ মুন্না নামে এক সাংবাদিক আহত হয়েছেন। বর্তমানে তাকে চবি মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়। 

জানা গেছে,ক্ষুব্ধ হয়ে অবরোধকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তরে থাকা অন্তত ১৩টি শিক্ষক বাস ও মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে। পুলিশের এ্যাকশনে  ছত্রভঙ্গ হয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান  নেয়। ক্যাম্পাসে বিপুল পুলিশ মোতায়েন আছে। তারা  সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে  পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সময়  টেলিভিশনের সাংবাদিকদের উপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ কর্মীরা।পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হয়ে ১০/১২জনের একটি বিক্ষুদ্ধ গ্রুপ প্রক্টর অফিসে অবস্থানরত গণমাধ্যম কর্মীদের উপর হামলা চালায়। এসময় তারা গণমাধ্যম কর্মীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে যমুনা  টেলিভিশনের রিপোর্টার আরিফুর রহমান সবুজ, সময়  টেলিভিশনের রিপোর্টার পার্থ প্রতীম বিশ্বাস, যমুনা টেলিভিশনের ক্যামেরা পার্সন নাছিরুল হক, সময় টিভি’র ক্যামেরা পার্সন আতিক আহত হন। এদিকে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে) সাধারণ সম্পাদক হাসান  ফেরদৌস এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন,তৎক্ষণিক ভাবে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রক্টর এবং  মেয়রের সাথে কথা বলা হয়েছে। 

চবি শিক্ষক সমিতির উদ্বেগ- এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, নিন্দা ও  ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চবি শিক্ষক সমিতি। গত মঙ্গলবার বিকেলে সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মিহির কুমার রায় ও সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মুয়াজ্জম  হোসেন স্বাক্ষরিত এক  যৌথ বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানানো হয়।

চবিতে সাংবাদিকদের উপর হামলা, গাড়ি ভাংচুর আজ বৃহস্পতিবার প্রতিবাদ সমাবেশ: তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি--চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের হামলার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় প্রেসক্লাব চত্বরে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন-সিইউজের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করবে।  মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টিভি ইউনিটের সভা থেকে সিইউজে এই কর্মসূচি ঘোষণা করে। সভায় সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতাকে দায়ী করা হয়। এ সময় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ভিসির ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই তদন্ত কমিটি গঠন করে হামলার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি হামলার ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আহবান জানানো হয়। একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবরোধ আহবানকারী ছাত্রলীগ  নেতা দাবীদার আলমগীর টিপুসহ যারা সাংবাদিকদের উপর হামলা করেছে তাদেরকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারসহ তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। 

সিইউজে টিভি ইউনিট প্রধান অনিন্দ্য টিটো’র সভাপতিত্বে ডেপুটি ইউনিট প্রধান মাসুদুল হকের সঞ্চালনায় জরুরি সভায় বক্তব্য রাখেন সিইউজের সভাপতি নাজিমুদ্দীন শ্যামল, বিএফইউজের সহ সভাপতি শহীদ উল আলম, সিইউজের সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস, সাবেক সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, বিএফইউজের যুগ্ম মহাসচিব তপন চক্রবর্তী প্রমুখ। সভায় ঘটনার বর্ণনা দেন হামলার শিকার হওয়া সাংবাদিকরা।

অবরোধকারীদের দাবি ,রাতে হলে তল্লাশির নামে পুলিশ নিরীহ শিক্ষার্থীদের লাঠিচার্জ করে এবং তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে।সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে প্রক্টর ব্যর্থ হয়েছেন। তাই উনার পদত্যাগ দাবি করে আমার অবরোধের ডাক দিয়েছি। চলতি মাসে একাধিকবার পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে। এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমরা প্রক্টরের পদত্যাগ চাই।

এর আগে সোমবার বিকেলে ছাত্রলীগের দুগ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের এক নায়েকসহ পাঁচজন আহত হন। এ ছাড়াও ছাত্রলীগের চবি শাখার বিভিন্ন  গ্রুপ প্রায় সময় আধিপত্য বিস্তার,কথাকাটাকাটি,তুচ্ছ বিষয়,সিনিয়র জুনিয়র বিষয়ে সংঘর্ষ মারামারিতে লিপ্ত হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ