ঢাকা, বৃহস্পতিবার 22 February 2018, ১০ ফাল্গুন ১৪২৪, ৫ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ঘুষ বাণিজ্য

এক শ্রেণির পুলিশ সদস্যের ঘুষ-দুর্নীতির কারণে বহু বছর ধরেই দেশে ঘুষ ও পুলিশ শব্দ দুটি প্রায় সমার্থক হয়ে পড়েছে। বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক শুধু নয়, লজ্জাকরও বটে। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, পুলিশের ঘুষসহ নানামুখী অপরাধ সম্পর্কিত অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না বললেই চলে। এর ফলে একদিকে পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে বেড়ে চলেছে ঘুষের খাত বা ক্ষেত্র। এখন আর এমন কোনো ক্ষেত্রের কথা বলা যাবে না, যেখানে পুলিশকে ঘুষ না দিয়ে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় কোনো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। শুনতে ও ভাবতে খারাপ এমনকি লজ্জা লাগলেও বর্তমান বাংলাদেশে এটাই কঠিন সত্য। 

এ বিষয়ে সর্বশেষ কিছু তথ্য জানা গেছে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক বিশেষ রিপোর্টে। আগেরদিন পুলিশ সদর দফতরের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত অপরাধ বিষয়ক ত্রৈমাসিক সভায় পুলিশ কর্মকর্তারা যেসব বক্তব্য রেখেছেন সেগুলোর ভিত্তিতে রচিত রিপোর্টটিতে জানানো হয়েছে, মূলত পুলিশের ঘুষ-দুর্নীতির কারণেই দেশে মাদক ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। শুধু মাদক ব্যবসা নয়, পুলিশ বাহিনীতে নতুন লোকবল নিয়োগ, পদায়ন ও বদলির মতো বিষয়গুলোতেও ঘুষের লেনদেন হচ্ছে। এসব ঘুষের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তারা তো বটেই, রাজনৈতিক নেতারাও জড়িত রয়েছেন। নতুন আইজিপির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় একাধিক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেছেন, শোনা যায়, কাক নাকি কাকের মাংস খায় না। অন্যদিকে পুলিশেরই এক শ্রেণির লোকজন পুলিশের মাংস খাচ্ছে। নিজেদের অবস্থানগত সুবিধাকে ব্যবহার করে তারা পুলিশ হয়েও অন্য পুলিশের মাংস খাচ্ছে। অর্থাৎ পুলিশই পুলিশের কাছে ঘুষ খাচ্ছে। অবস্থা এমন হলে মাদক ব্যবসা বন্ধ করাসহ অপরাধ প্রতিহত করা সম্ভব হবে না বলেও অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে। 

অপরাধ বিষয়ক ত্রৈমাসিক সভায় কয়েকজন কর্মকর্তা আরো অনেক তথ্যই প্রকাশ করেছেন, যেগুলোর মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ঘুষের বাণিজ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেছে। যেমন কোনো কোনো থানায় ওসি বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে বদলি হতে এবং যোগ দিতে হলে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। শুধু ওসিকে নয়, কয়েক লাখের অংকে টাকা গুনতে হয় এমনকি এসআই এবং এএসআইদেরও। এত বিপুল পরিমাণ টাকা ঘুষ দিতে হয় বলেই এসব কর্মকর্তার পক্ষে ঘুষ খাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। কারণ, তাকে ঘুষের টাকা ওঠাতে হয়। জেলা পর্যায়ের পুলিশ প্রধান থেকে মেট্রোপলিটন এলাকার পুলিশ কমিশনার এবং ডিআইজিরাও ঘুষের বিনিময়ে নিযুক্তি দিচ্ছেন। পদোন্নতি ও পদায়নের জন্য ঘুষ খাচ্ছেন। আক্ষেপ প্রকাশ করতে গিয়ে কর্মকর্তারা প্রশ্ন করেছেন, উচ্চপদস্থরাই যদি ঘুষ খান এবং ওসি থেকে শুরু করে এসআই ও এএসআইসহ সকলকেই যদি ঘুষের বিনিময়ে নিযুক্তি ও পদোন্নতি পেতে হয় তাহলে মাদকের ব্যবসা বন্ধ করাসহ অপরাধ প্রতিরোধ ও নির্মূল করার কাজে ইচ্ছা বা আগ্রহ আসবে কিভাবে? 

প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, পুলিশের অপরাধ বিষয়ক ওই ত্রৈমাসিক সভায় উপস্থিত আইজি ড. জাবেদ পাটোয়ারী নাকি কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, জুনিয়র তথা নি¤œপদস্থদের কাছে লজ্জিত ও অসম্মানিত হতে না চাইলে সকলের উচিত অবিলম্বে নিজেদের সংশোধন করা। না হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে পুলিশের নতুন আইজি আরো বলেছেন, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্যের ব্যক্তিগত অপরাধের দায়ভার পুলিশ বাহিনী বা প্রতিষ্ঠান বহন করবে না। কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে এবং তদন্তে সে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে বা তাদের ছাড় দেয়া হবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন নতুন আইজিপি। আশা প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, অচিরেই পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ঘুষ খাওয়া বন্ধ হবে এবং নিজেরা দুর্নীতিমুক্ত হয়ে সকলে মাদক ব্যবসাসহ অপরাধ বন্ধের ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠবেন।  

বলার অপেক্ষা রাখে না, পুলিশ নিজেই অন্য পুলিশের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করেÑ এমন তথ্য সকল বিচারেই অত্যন্ত আপত্তিকর এবং অগ্রহণযোগ্য। অপরাধ বিষয়ক ত্রৈমাসিক সভায় কয়েকজন কর্মকর্তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবরে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। ওই কর্মকর্তারা বলেছেন এবং একথা সত্যও যে, পদ-পদোন্নতি ও বদলির জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘুষ দিতে হয় বলেই সংশ্লিষ্টরা ঘুষের অর্থ ওঠানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারাও উল্টো ঘুষই খেতে থাকেন। আর সে কারণেই শুধু মাদকের ব্যবসা নয়, কোনো অপরাধই বন্ধ বা নির্মূল করা সম্ভব হয় না। বাস্তবে হচ্ছেও না। এর সঙ্গে আবার রাজনৈতিক নেতাদের জড়িত থাকার তথ্যও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। এই নেতারা ঠিক কোন দলের হতে পারেন সে বিষয়ে নিশ্চয়ই কথা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। 

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত বিলম্ব না করে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ঘুষ খাওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। এ ব্যাপারে সেই সব কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারেÑ যারা এখনো নিজেদের সততা বজায় রেখেছেন এবং যারা মনে করেন, কাক যেমন কাকের মাংস খায় না, পুলিশেরও তেমনি উচিত অন্য পুলিশের কাছ থেকে ঘুষ না খাওয়া। আমাদের বিশ্বাস, নতুন আইজির নেতৃত্বে সুচিন্তিত পরিকরকল্পনার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া গেলে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ঘুষ-দুর্নীতির অবসান ঘটবে স্বল্প সময়ের মধ্যে। বলা দরকার, কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধেও, যারা পুলিশের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ