ঢাকা, শুক্রবার 23 February 2018, ১১ ফাল্গুন ১৪২৪, ৬ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিমান বন্দরের নিরাপত্তা

 

বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, কথিত সন্ত্রাসী বা সাধারণ মানুষের জন্য নয়, এমন অবস্থার পেছনে ভূমিকা রাখছে পুলিশ ও কাস্টমসসহ সরকারের বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার লোকজন। তারা শুধু হজরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের স্পর্শকাতর ও নিষিদ্ধ এলাকাগুলোতেই যাতায়াত করছে না, কেউ কেউ এমনকি উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত বিমানের ভেতরেও ঢুকে পড়ছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এ রকম এক ঘটনায় পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টর তার মামীকে নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে দেয়ার জন্য নিজেই বিমানের ভেতরে গিয়েছিলেন। বিমানটি সে সময় উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বিমানের দরজাও বন্ধ করা হয়েছিল। ঠিক তখনই ওই সাব-ইন্সপেক্টরের বেআইনি উপস্থিতি সম্পর্কে জানাজানি হয়। তাকে নামিয়ে দেয়ার জন্য বিমানের উড্ডয়নে আধ ঘণ্টার বেশি বিলম্ব হয়ে যায়। আইন লংঘন করে বিমানের ভেতরে উঠে যাওয়ার এবং উড্ডয়নে বিলম্ব ঘটানোর অপরাধে পুলিশের ওই সাব-ইন্সপেক্টরকে গ্রেফতার করা কিংবা কোনো শাস্তি দেয়া হয়েছে কি না সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। অথচ দুটিই গুরুতর অপরাধ। 

এদিকে দ্বিতীয় আরেক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে। এবারের ঘটনার নায়িকা কাস্টমসের একজন নারী কর্মকর্তা। প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, নিজের ছেলেকে অস্ট্রেলিয়াগামী একটি বিমানে উঠিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ওই নারী কর্মকর্তা দুই ধাপের নিরাপত্তা পার হয়ে বোর্ডিং ব্রিজ এলাকায় ঢুকে পড়েন। বিমান বন্দরে দায়িত্ব পালনরত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়াগামী ছেলের চেক-ইন ও ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর ওই নারী কর্মকর্তা প্রথমে হোল্ডিং লাউঞ্জ এলাকায় চলে যান, যেখানে বিমানে ওঠানোর জন্য যাত্রীদের বসিয়ে রাখা হয়। কিন্তু নিজে যাত্রী না হওয়া সত্ত্বেও ওই নারী কর্মকর্তা শুধু হোল্ডিং লাউঞ্জে গিয়েই সময় কাটাননি, বিমানে ওঠার পরবর্তী ধাপ বোর্ডিং ব্রিজেও উঠে পড়েছিলেন। অথচ বিমানে ওঠার জন্য টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত এই বোর্ডিং ব্রিজে কেবল যাত্রীরাই উঠতে পারেন। অন্যদিকে কাস্টমসের ওই নারী কর্মকর্তা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে উঠেছিলেন। নিরাপত্তার এ ধাপটিতে এসেই ধরা পড়েছিলেন নারী কর্মকর্তা। নিরাপত্তা রক্ষীরা তাকে নামিয়ে দেয় এবং বিমান বন্দর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। এরপর বিমান বন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট ওই নারী কর্মকর্তাকে ১০ হাজার টাকার অর্থদন্ড দেন। জরিমানার টাকা পরিশোধ করে তিনি ছাড়া পেয়েছেন।

প্রকাশিত খবরে প্রসঙ্গক্রমে জানানো হয়েছে, ওই নারী কর্মকর্তা অন্য একটি বড় ধরনের অপরাধও করেছেন। এরই মধ্যে অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে গেলেও তিনি এখনো তার ডি পাস বা কর্তব্যকালীন পরিচয়পত্র অফিসে জমা দেননি। সে পাসটি দেখিয়েই তিনি বিমান বন্দরের স্পর্শকাতর ও নিষিদ্ধ সকল এলাকায় ঢুকেছিলেন। অথচ আইন হচ্ছে, যত বড় পদের কর্মকর্তাই হোন না কেন, অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেককে তার ডি পাস যার যার বিভাগ বা অফিসে জমা দিতে হবে। কিন্তু ওই নারী কর্মকর্তা একদিকে নিজের ডি পাস জমা দেননি, অন্যদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ডি পাস দেখিয়েই বিমান বন্দরের বিভিন্ন এলাকায় ঢুকেছেন এবং যাতায়াত করেছেন। তিনি এমনকি বোর্ডিং ব্রিজেও ঢুকে পড়েছিলেন, যেখানে যাত্রী ছাড়া অন্য কারো যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। 

প্রকাশিত খবরে দু’জন মাত্র ব্যক্তি সম্পর্কে জানানো হলেও হজরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। বিশেষ করে সোনা চোরাচালান এবং সোনা আটকের ঘটনার আগে-পরে বিমান বন্দরে দায়িত্ব পালনরত অনেকের ব্যাপারেই জানাজানি হয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে দু’-চারজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও অধিকাংশই থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। একই কারণে একদিকে বেআইনি কর্মকা- বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। আমরা উদ্বিগ্ন এজন্য যে, মূলত দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং ২০১৬ সালে ব্রিটেন বাংলাদেশ থেকে সরাসরি পরিবহন করা পণ্য নেয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। বাংলাদেশের পণ্যের ক্ষেত্রে আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় দেশগুলো বলেছিল, এসব পণ্য প্রথমে তৃতীয় কোনো দেশের বিমান বন্দরে নামাতে হবে। সেখানে নিরাপত্তা বিষয়ক পরীক্ষার পর বিপদজনক বা ঝুঁকিপূর্ণ নয় মর্মে সার্টিফিকেট দেয়া হলেই কেবল বাংলাদেশী পণ্যকে ওইসব দেশের বিমান বন্দরে প্রবেশ করতে দেয়া হবে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে। দেশের রফতানি আয়ও অনেক কমে গেছে। 

এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিটেন তার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আশা করা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোও পর্যায়ক্রমে তাদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে। অন্যদিকে ঠিক এমন এক সম্ভাবনাময় সময়ে এসেই হজরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, কয়েকজন মাত্র ব্যক্তির কারণে বাংলাদেশকে নিষেধাজ্ঞার কবলে ফেলার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। এজন্যই আইন লংঘন করার দায়ে অভিযুক্ত পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর এবং কাস্টমসের নারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। একই সঙ্গে দরকার অন্য সকল অপরাধীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া। আমরা চাই, বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে যেন কোনো দেশই প্রশ্ন ওঠাতে এবং সংশয় প্রকাশ করতে না পারে, সে উদ্দেশ্যে সরকারকে বিমান বন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো কঠোর করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ