ঢাকা, শনিবার 24 February 2018, ১২ ফাল্গুন ১৪২৪, ৭ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলা ভাষার উন্নয়নে সরকার কতটুকু আন্তরিক?

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : লেখক, গবেষক ও ভাষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেছেন, সময় এসেছে বাংলা নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করার। তিনি বলেছেন, শিক্ষার উন্নয়ন ঘটছে। সব কিছুরই উন্নয়ন হচ্ছে। বাংলা ভাষার উন্নয়নে কী হলো? কি করার কথা, আর কি করছি আমরা? বাংলা নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন। বুধবার রাজধানীর উত্তরায় ৪নং সেক্টরের খেলার মাঠে অমর একুশের ওপর আলোচনা রাখতে গিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করেন। ড. আনিসুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা নিয়ে নানা আলোচনা হয়। এ দিন এলেই আবেগ দেখা দেয় মানুষে মানুষে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে এমন আবেগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু আমরা আসলে ভাষার উন্নয়নে কতটুকু অবদান রাখতে পারছি। তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম জাতিকে পরিচালিত করবে আগমীতে। আমরা তাদের নিজ ভাষার কতটুকু শেখাতে পারছি। আমরা নিজেরা কতটুকু শিখতে পারছি।
ভাষাজ্ঞান নিয়ে তো হতাশাই প্রকাশ করতে হয়। নিজেকে প্রশ্ন করুন বাংলা ভাষার উন্নয়নে আপনি কতটুকু আন্তরিক?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, একুশের পথ বেয়ে একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করলেও বাংলাকে আমরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। বুধবার বিকেলে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারির লক্ষ্য কী, অর্জনের পথ কোন দিকে’ শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। আরেক ভাষাবিদ অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন,
উচ্চআদালতে রায় প্রদানের ক্ষেত্রে এখনও বাংলাকে প্রধান মাধ্যম ভাবা হয় না, তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় একটি শ্রেণির কাছে ভাষা হিসেবে বাংলা থাকে উপেক্ষিত। এ অবস্থার মূলে রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক সংকট।
দেশের এ ভাষাবিদদের ন্যায় বাংলা ভাষা নিয়ে এমন জিজ্ঞাসা সবার। ২১ ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা বাংলা ভাষা নিয়ে রীতিমত গবেষণায় লিপ্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু এই দিবসটির আগে কিংবা পরে এ নিয়ে আর আলোচনা হয়না। ফেব্রুয়ারি মাস এলে পুরো বাংলাদেশ যেন নড়েচড়ে ওঠে। চারিদিকে মহা ধুমধামে প্রস্তুতি চলে একুশ উদযাপনে। এর সাথে যখন ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্বব্যাপী “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” উদ্যাপন অন্তর্ভূক্ত হয়, তখন একুশের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে, শিক্ষাঙ্গনে, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাড়া পড়ে যায় একুশ উদযাপনে। উঠতি কবিরা, তরুণ শিল্পীরা ও প্রকাশকরা নতুন নতুন কবিতার বই, গল্পের বই ও উপন্যাস প্রকাশের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। ঢাকায় বাংলা একাডেমির উদ্যোগে আয়োজিত ঐতিহাসিক একুশের গ্রন্থমেলা শুধু নয়, বিভাগীয় শহর এমন কি জেলা-উপজেলা পর্যায়েও একুশকে কেন্দ্র করে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু একমাসেই যেন সব আয়োজন শেষ। এরপর আর ভাষা নিয়ে আলোচনা হয়না।
অনেকেই বলছে, বাংলা আর বাংলায় নেই। বাংলা হয়ে গেছে বাংলিশ। আমাদের আমলারা, আমাদের শিক্ষকগণ, আমাদের শিল্পি-কলাকুশলিরা ইংরেজি ছাড়া দু’টি বাক্যও বলতে পারেন না শুদ্ধ বাংলায়। আর তরুণ প্রজন্ম তো কি বলে তারা নিজেরাই জানেনা। এফএম রেডিও অথবা ফেইসবুক ও টুইটার নিয়ে যারা আছে তারা তো ভিনগ্রহের বাসিন্দা হয়ে গেছে। তাদের বলা, কলা ও চলা একেবারে বেসামাল। এই প্রজন্মের কাছে আমাদের মা হয়ে গেছেন মাম্মি, বাবা হয়ে গেছেন ডেডি, খালা, ফুফু ও চাচী হয়ে গেছেন আন্টি। আর মামা-চাচা-ফুফাদের চৌদ্দগোষ্ঠী আংকেল। চাচাতো মামাতো ফুফাতো খালাতো সব কাজিন। আমরা কি আমাদের মাঝে আছি? এভাবে না বললে নাকি জাতে ওঠা যায় না! একটা মহা ধ্বংসাত্মক সাংস্কৃতিক ঝড় আমাদের বাঙালি মুসলমানদের উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যার ভয়াবহ তান্ডবে আমরা একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। আমরা বুঝেও এর কোন প্রতিকারের ব্যবস্থা নিচ্ছি না।
বাংলা ভাষা এখনো উপেক্ষিতই রয়ে গেল। ভাষা নিয়ে আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত আছেই। আমাদের এবারের সংগ্রাম হচ্ছে মাতৃভাষাকে আপন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে বাংলাভাষাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া। এবং সর্বোপরি বাংলাভাষাকে নানান বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করা। তাহলেই আমরা একুশে শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখাতে পারব।
আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার চেয়েছিলাম। এ অধিকার রক্ষার আন্দোলনে  অবিস্মরণীয় সৈনিক ছিলেন ভাষাযোদ্ধা অধ্যাপক গোলাম আযম। ভাষা আন্দোলনের লড়াইয়ে প্রথম কাতারের-ই একজন মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তার ঐতিহাসিক অমর কীর্তি ও অবদান। দেশে, জাতি আজকের এই দিনে তার ঐতিহাসিক অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে। আগামী দিনের নতুন প্রজন্ম দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতার অধিকার আদায়ে ভাষা সৈনিকদের আন্দোলন সংগ্রাম থেকে প্রেরণা লাভ করবে। কোন কালো কালিমা তাদের সোনালী অক্ষরে লেখা এ অবদানকে ম্লান করতে পারবে না।৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়ে পাকিস্তান সরকার দ্বারা কারা নির্যাতিত হন। এই মহান নেতা ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। শেখ মুজিব কর্তৃক ’৬৬ সালের ছয় দফা দাবি তৈরিতে অংশ নেয়া ২১ সদস্যের অন্যতম।
১৯৫৪ সালে যোগদান করেন জামায়াতে ইসলামীতে এবং প্রত্যক্ষভাবে শুরু করেন রাজনৈতিক জীবন। পাকিস্তানে ১৯৫৫ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। শুধুমাত্র ইসলামী দল করার কারণেই তাকে নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে।
প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্বের ১৯০টি দেশে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের ৩০ কোটিরও বেশি লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। এ বিশাল অর্জন একান্ত-ই আমাদের।
এই বিরল সম্মানের সেনানায়ক ভাষা সৈনিকরা। তাদের রক্তের লাল কাপড়ে মোড়ানো একুশ-ই ফেব্রুয়ারি। তাদের আন্দোলন সংগ্রামের নিরন্তন লড়াইয়ে পাওয়া আমার মায়ের ভাষা বাংলা। ত্যাগের রক্তিম শিখরে লেখা আমাদের গৌরব উজ্জ্বল দিশা ৫২। জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তিতো সেই ভাষা আন্দোলনই।
সেই সাহস থেকেই প্রজ্বলিত স্বাধীনতার বিজয় ও স্বাধীন বাংলাদেশ। জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তান, বীর সেনানী শহীদদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও রক্তিম সালাম। কিন্তু যাদের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই মুখের ভাষা, সেই সব ভাষা শহীদরা আজ অনেকেই উপেক্ষিত, বঞ্চিত। আসলে আমরা কি পেরেছি ভাষা সৈনিকদের যথাযোগ্য মর্যাদা ও সম্মানে ভূষিত করতে?
ই-মেইল: jafar224cu@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ