ঢাকা, রোববার 25 February 2018, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৪, ৮ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সেদিনের বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে আজও নানা সন্দেহ ॥ ৯ বছরেও বিতর্কের অবসান ঘটেনি

* তিন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি
তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি-বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) বিদ্রোহের ৯ ম বার্ষিকী আজ রোববার । ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর-এর বিপথগামী সদস্যরা কিছু দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে পিলখানায় নারকীয় তান্ডব চালায়। ওই দুদিনে বাহিনীর তখনকার মহাপরিচালকসহ (ডিজি) বিদ্রোহীরা ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা এবং নারী ও শিশুসহ আরও ১৭ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
শুধু বাংলাদেশ নয় , বিশ্বের ইতিহাসের এমন নিষ্ঠুর-জঘন্যতম হত্যাকান্ডের নয় বছর পরেও , যখন এই ঘটনার তদন্ত হয়েছে, বিচার হয়েছে, তখনো এ দেশের মানুষের মন থেকে সন্দেহ দূর হয়নি। তিনটি তদন্ত,নিম্ম আদালতে চার হাজারেরও বেশি বিডিআর সৈন্যের কারাদন্ড এবং দেড়'শর বেশি মৃত্যুদন্ডও বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারেনি।
পিলখানা হত্যাকান্ডের পর বাহিনীর আইনে বিদ্রোহের বিচার করে অনেককেই বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ১৫২ জনকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া ছাড়াও আরও ৪২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। পরে গত বছরের (২০১৭) ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে আপিলের রায়ে ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রাখা হয়। ৮ জনের মৃত্যুদন্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও চারজনকে খালাস দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ পাওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখা হয়। হাইকোর্টে আপিল চলার সময়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় দুজনের মৃত্যু হয়। খালাস পান ১২ জন আসামি। নিম্ন আদালতে খালাস পাওয়া ৬৯ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ যে আপিল করেছিল, তার মধ্যে ৩১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। এছাড়া, সাত বছর করে চারজনকে কারাদন্ড এবং ৩৪ জনের খালাসের রায় বহাল রাখা হয়। এ মামলার সাড়ে ৮০০ আসামির মধ্যে আরও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দিয়েছিলেন জজ আদালত। এর মধ্যে ১৮২ জনকে ১০ বছরের কারাদন্ড, আটজনকে সাত বছরের কারাদন্ড, চারজনকে তিন বছরের কারাদন্ড এবং ২৯ জনকে খালাস দেন হাইকোর্ট।
বিভাগীয় মামলায় চাকরিচ্যূতসহ সাজা দেওয়া হয় আরও অনেককে। ২০০৯ সালের নির্মম এ হত্যাকান্ডের পর পুরো বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তবে বাহিনীর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কলঙ্কিত সেই ইতিহাস ও ক্ষত ভুলে ঘুরে দাঁড়ানোর নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে এখনও। বিদ্রোহীদের হাতে নিহতদের স্মরণে প্রতি বছর ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিজিবি , সেনাবাহিনী , বিভিন্ন রাজনৈতিক দল , সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
বিডিআর বিদ্রোহের ওই ঘটনার তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের তিনটি তদন্ত কমিটি  হয়েছিল। সাবেক সচিব মোঃ. আনিসুজ্জামানকে প্রধান করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি বিদ্রোহের জন্য বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যা চিহ্নিত করেছিল। একই সঙ্গে কমিটি ঘটনার পেছনের কারণ বা নেপথ্যের কারণ তদন্তের সুপারিশ করেছিল। সেনাবাহিনীও একটি তদন্ত করেছে,যদিও তাদের কোন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
আর পিলখানায় ঘটে যাওয়া দু‘দিনের ঘটনার পর হত্যা মামলা এবং বিস্ফোরক মামলা তদন্ত করেছে সিআইডি পুলিশ। বিদ্রোহের ঘটনায় বাহিনীটির নিজস্ব আইনে চার হাজারের বেশি জওয়ানের সাজা হয়েছে। আর হত্যা মামলায় ফৌজদারি আইনে ৮০০জনের মতো জওয়ানের সাজা হয়েছে, যেটির রায়ও দিয়েছে উচ্চ আদালত । কোন মামলায় এত সংখ্যক আসামীর সাজা বাংলাদেশে আগে কখনো হয়নি। এরপরেও অনেকে এখনো সন্দেহ প্রকাশ করেন।
এর কারণ বলা যেতে পারে যে, সাবেক সচিব মোঃ. আনিসুজ্জামানের প্রতিবেদনের কিছু অংশ শুধুমাত্র প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্তের পুরো বিষয়টি প্রকাশ পায়নি। ফলে আগে থেকেই যে নানান প্রশ্ন উঠেছে বা রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক  হয়েছে, তার একটা প্রভাব রয়েই গেছে। ফলে সন্দেহ বা প্রশ্ন রয়েই গেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
এ ছাড়া , বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদরদপ্তরে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের নয় বছর পরও ঘটনার মূল কারণ সম্পর্কে অনেকের মনে সন্দেহ রয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর-এর সৈন্যদের নানা ক্ষোভের কারণে বিদ্রোহ হলেও ঘটনা দ্রুত ব্যাপক হত্যাকান্ডে পরিণত হয়। সৈন্যদের ক্ষোভ কীভাবে হত্যাকান্ডে পরিণত হলো, তার কোন সদুত্তর না পেয়ে অনেকেই মনে করেন ওই বিদ্রোহ ছিল একটি ষড়যন্ত্রের অংশ।
কারণ হিসেবে বিশ্লেষকদের অভিমত , ওই বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। পরবর্তীতে অন্তত ৫০জন প্রাক্তন বিডিআর সদস্য সেনাবাহিনীর হেফাজতে মারা যান। কিন্তু কোন কারণই সন্দেহের বাইরে থেকেছে বলে তারা মনে করেন না । তাদের মতে , যে কারণেই ওই বিদ্রোহের ঘটনা তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে সত্যমিথ্যা যাই হোক , আপাতত: বিতর্কের অবসান ঘটাতে তা সহায়ক হতো।
 সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান , বিদ্রোহের খবর পেয়ে তারা প্রথমে পিলখানার গেটের সামনে যান। তখন বাইরে থেকে শুধু গুলির শব্দ শুনছিলেন। হত্যাকান্ড এবং নৃশংসতা নিয়ে বিদ্রোহের প্রথমদিনে তারা কোন ধারণা পাচ্ছিলেন না। দ্বিতীয় দিনে যখন জওয়ানরা আটকে রাখা সেনা কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে দেয়, তাতে হত্যাকান্ড এবং নৃশংসতার বিষয়টি প্রকাশ পেতে থাকে। যখন একের পর এক মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, তখনি এই ঘটনার ভয়াবহতা টের পাওয়া যায় এবং এর উদ্দেশ্য নিয়েও নানারকম প্রশ্ন দেখা দেয়।
যদিও বিদ্রোহের শুরুতে জওয়ানরা সেনাবাহিনী থেকে আসা তাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শ্লোগান তুলেছিল, বাহিনীটি পরিচালিত ডালভাত কর্মসূচীতে দুর্নীতির অভিযোগও তারা তোলেন। কিন্তু ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪জনকে হত্যার ঘটনা যখন বেরিয়ে আসে, তখন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রথমে প্রশ্ন তোলেন। তারা মনে করেন, এটা নিছক বিদ্রোহ ছিল না, এর পেছনে ষড়যন্ত্র ছিল।
রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এসেছে। আওয়ামী লীগ বলেছে, তারা ক্ষমতা আসার মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটে। তাদের সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র থেকেই এমন ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে বিদ্রোহ দমনে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করায় বিরোধী দল বিএনপি শুরুতেই প্রশ্ন তুলেছিল। তাদের অনেকে সে সময় এই ঘটনার জন্য প্রতিবেশী ভারতের দিকেও আঙ্গুল তুলেছিলেন।
বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দেয়া বক্তব্য অভিযোগ করে আসছিলেন,এটির পেছনে একটি ষড়যন্ত্র ছিল। ফলে এই ঘটনার নেপথ্যের কারণ নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের দেয়া রায়ের সাথে বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, আইনের শাসন অমান্য করে, বিডিআর জাওয়ানেরা ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীর ৫৭ জন মেধাবী কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেন। এটি ছিল রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্টের চক্রান্ত। তিনি বলেন বিদ্রোহের মূল উদ্দেশ্য ছিল, “নবনির্বাচিত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে অস্থিতিশীল করা”, “দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করা” ও “জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত করা”।

কর্মসূচি
পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে শহীদ ব্যক্তিদের স্মরণে আজ রোববার শাহাদাতবার্ষিকী পালন করবে বিজিবি। দিনের কর্মসূচিতে রয়েছে, পিলখানাসহ বিজিবি’র সব রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় বাদ ফজর খতমে কোরআন, বিজিবির সব মসজিদে এবং বিওপি পর্যায়ে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সকাল ৯টায় বনানীর সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক (একসঙ্গে) শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
পরদিন সোমবার  বাদ আসর পিলখানার বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদ ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এছাড়া, স্বরাষ্ট্র সচিব, বিজিবি মহাপরিচালক, শহীদ ব্যক্তিদের নিকটাত্মীয়রা, পিলখানায় কর্মরত সব কর্মকর্তা, জুনিয়র কর্মকর্তা, অন্যান্য পদবির সৈনিক ও বেসামরিক কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করবেন।

সামরিক কবরস্থানে শ্রদ্ধা জানাবে বিএনপি
পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে আজ নিহত সেনা কর্মকর্তাদের কবরে শ্রদ্ধা জানাবে বিএনপি। কারাগারে থাকা চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দলের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল সকালে বনানীর সামরিক কবরস্থানে যাবে। গতকাল শনিবার বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবীর খান  তথ্য জানান।
শায়রুল কবীর খান জানান, প্রতিনিধি দলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ