ঢাকা, রোববার 25 February 2018, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৪, ৮ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে দেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে

* সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনও আলামতও দেখা যাচ্ছে না -আমির খসরু
* প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে -ব্যারিস্টার মঈনুল
* ভারত চায় না আমাদের দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্রের চর্চা হোক -ডা. জাফরুল্লাহ
স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকা ফোরাম আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে জনগণকে এর জন্য ভুক্তভোগী হতে হবে। আর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে দেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে দ্য ঢাকা ফোরাম আয়োজিত ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও গণতন্ত্র’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে মন্তব্য করে তারা বলেন, সরকার অব্যাহতভাবে ক্ষমতায় থাকার জন্য রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেন, আজ দেশে অনেক অর্জনের কথা বলা হচ্ছে, এটা ধোঁকাবাজি। যে জাতির সরকার গঠনের অধিকার থাকে না, সে জাতি গোলাম। আমাদের বড় ব্যর্থতা, আমাদের দেশে সরকার আছে কিন্তু জনগণ ভোট দিতে পারছে না। আমাদের দাবির ভিত্তি কী? জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতার সুযোগ থাকতে হবে।
ব্যারিস্টার মঈনুল বলেন, আমার খুব কষ্ট হয় যারা দেশ শাসন করছে, তারা মনে করে না আমাদের-আপনাদের মতো মানুষের প্রয়োজন আছে। সবাইকে বোকা মনে করা এটা তো একটা লজ্জার কথা। আমাদের মতো শিক্ষিত মানুষদের গাধার সঙ্গেও তুলনা করা হয়। স্যুট-টাই পরি, কিন্তু লজ্জায় গামছা পরতে ইচ্ছা করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা আরও বলেন, যেখানে জনগণের ভোটের অধিকার থাকে না সেখানে চাটুকারিতা থাকে, দুর্নীতি থাকে। নির্বাচনে চুরি বা দুর্নীতিই সব দুর্নীতির জন্মদাতা। আজ বাংলাদেশে দুইটি শ্রেণির মানুষ আছে— চাটুকার-দুর্নীতিপরায়ণদের একটি শ্রেণি আর বাকি নাগরিকদের একটি শ্রেণি।
ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেন, আমরা এমন একটি পদ্ধতি চাই, যার মাধ্যমে জনগণের সংসদ গঠিত হবে। কিন্তু এখনকার সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত না। এটা জনগণের সরকার না। কেউ কেউ সমর্থন করলেও জনগণের বড় একটি অংশ এই সরকারকে সমর্থন করছে না। আমরা চাচ্ছি চেক অ্যান্ড ব্যালান্স, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার। অথচ দেশে ভয়ভীতি আর হতাশার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। এটাই বাস্তবতা।
 সিনিয়র এই আইনজীবী বলেন, প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। দেশে গণতন্ত্র ও নির্বাচন না থাকলে চাটুকারদের বিজয় হয়। বর্তমান অবস্থায় সুশীল সমাজের কিছু করার সুযোগ আছে বলে তিনি মনে করেন না। কারণ সবাই ভয়ভীতি আতঙ্কের মধ্যে আছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, এখন যে প্রস্তুতি ও পরিবেশ, তাতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনও আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেয়া ও নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয় আমলে নেয়া হচ্ছে না। একদল নির্বাচনী প্রচার শুরু করে দিয়েছে, আরেক দল বন্দী। কিন্তু এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন (ইসি) অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য  কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। ইসির  কোনও তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন করা। এ জন্য যা যা দরকার, তা তাদের করতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।
ভারতীয় সেনাপ্রধানের বক্তব্যের বিষয়ে হাফিজউদ্দিন বলেন, এখন পর্যন্ত তার বক্তব্যের  কোনও প্রতিবাদ হয়নি, এটা দুঃখজনক। কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশ কী ভারতের স্বায়ত্তশাসিত অংশ হয়ে যাবে নাকি।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব তাদের সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হবে। এটা তার সাংবিধানিক দায়িত্ব। এই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করার জন্য যা যা লাগে করবে। যদি সরকারের  কোনও আইন পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে তারা সেটি প্রস্তাব করবে, এ ব্যাপারে চাপ দিবে। এটি আমরা তাদের কাছে চাই।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, গণতন্ত্র ও নির্বাচন ফলপ্রসূ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর যে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন, তা তারা রাখছে না। ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও হয়েছিল সংবিধানের কথা বলে।  কোনও দল নিজেদের দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেনি। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারা ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়।
গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমাদের প্রথম অন্তরায় ভারত, দ্বিতীয় অন্তরায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। দেশে যে ক’টি নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হয়েছে, প্রতিটি নির্বাচনেই বিরোধী দল জয় পেয়েছে। ভারতের কথা এজন্য বলছি যে ভারত তার নিজের স্বার্থেই চায় না, আমাদের দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্রের চর্চা হোক।
দেশের দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা না হলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না, উল্লেখ করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সুশীল সমাজকে গাধা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য তিনি সমর্থন করেন। কারণ, সুশীল সমাজের পদলেহনের যে মনোবৃত্তি, তাতে এটাই তাদের প্রাপ্য সম্মান।
ড. জাফরুল্লাহ আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়াটা ভালো কাজ। কিন্তু তাদের নিজ দেশে ফেরত যেতে হবে। আমরা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে কূটনৈতিকভাবে ব্যার্থতার পরিচয় দিয়েছি। পৃথিবী যখন রোহিঙ্গাদের সমস্যায় এগিয়ে এসেছিল, তখন আমরা নিশ্চুপ ছিলাম। বাংলাদেশ আসলেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে চায় কি না, এখন সেটাই আসল প্রশ্ন। কারণ, তাদের স্থায়ীভাবে ভাসানচরে রাখার চেষ্টা হচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ২০১৮ সালে নির্বাচন হবে। এটা যে সমঝোতার ভিত্তিতে হবে, এর কোনও আশা নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। নির্বাচনের পরদিন ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সেটি ছিল সংবিধান রক্ষার নির্বাচন, আরেকটি নির্বাচন হবে। কিন্তু সেই নির্বাচন আর আমরা দেখিনি। তাই ২০১৮ সালের নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি ধারণা করছি, দেশের ৬০ শতাংশ ভোট ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে পড়বে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আশা অনেকটা নিভে গেছে। ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন হবে না, তা বিশ্বাস করার মতো উপাদান কমই আছে।  কোনও দলের জন্য নয়, দেশের স্বার্থে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন জরুরি। না হলে দেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কাছে কোনও প্রত্যাশা নেই। সুষ্ঠু নির্বাচনেরও কোনও আলামতও দেখা যাচ্ছে না। ক্ষমতাসীনরা রাষ্ট্রীয় খরচে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন কি তাদের কোনও বার্তা দিয়েছে? এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন চুপ কেন? তাদের ভূমিকা কী? তাদের কাছ থেকে কোনও পদক্ষেপ আসবে, এমন বিশ্বাস নেই। এ অবস্থায় আমাদের হয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে হবে, না হলে যারা ক্ষমতা দখল করে আছে তাদের রোধ করতে হবে। এসব ব্যাপারে আমাদের কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার, তা বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের অনেক অর্জনের কথা বলা হয়েছে। এসব অর্জন ব্যর্থ হবে যদি আমরা গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারি। আমাদের দুর্বল হয়ে পড়া শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যাংক খাতগুলোর সঙ্গে সুশাসনও দুর্বল হয়ে পড়লে জনগণকে ভুক্তভোগী হতে হবে। সাবেক এই গভর্ণর বলেন, ঋণ কেলেঙ্কারি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দেয়া কোনও কঠিন কাজ না, অভাব কেবল সদিচ্ছার। এই শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেই ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা কমে আসবে।
বিশিষ্ট রাষ্ট্র বিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, গণতন্ত্রের দুর্বলতার বড় কারণ নাগরিক সমাজের দুর্বলতা। জনগণ বুঝতে পারে নির্বাচন প্রহসন হবে। জনমত সংগঠিত করার দায়িত্ব নাগরিক সমাজের। তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাবে। যারা দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, তারা কীভাবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। তিনি রাজনৈতিক দলের ছায়ার বাইরে নাগরিক সমাজের একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম গঠন করার পরামর্শ দেন।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আলম, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ