ঢাকা, সোমবার 26 February 2018, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৪, ৯ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নকলায় কৃষক প্রিয় হয়ে ওঠছে বোরো ধানের আদর্শ বীজতলা তৈরি পদ্ধতি

শেরপুর : শেরপুরের নকলা উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের প্রযুক্তিগত সহায়তায় বোরো ধানের কমিউনিটি বা আদর্শ বীজতলা -সংগ্রাম

দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলেছে। এর অংশ হিসেবে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বোরো ধানের কমিউনিটি বা আদর্শ বীজতলা তৈরি পদ্ধতি চালু করেছে। এ পদ্ধতিতে কম খরচে বেশি ফসল উৎপন্ন করা যায়। তাই শেরপুরের নকলা উপজেলায় কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে বোরো ধানের বীজতলা তৈরির এই পদ্ধতি।
চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলার অন্তত শতাধিক একর জমিতে আদর্শ পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি হচ্ছে। এ জন্য কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ প্রযুক্তিগত সহায়তার সঙ্গে কৃষকদের বিনা মূল্যে কৃষি উপকরণও প্রদান করছে। এতে কৃষকেরা ধান উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং অধিক ফসল উৎপন্নের আশা করছেন।
নকলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১২ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের ৬ হাজার ৪৭৫ হেক্টর, উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের ৬ হাজার ১৯৫ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ৮০ হেক্টর জমি রয়েছে। চলতি মৌসুমে এই আবাদের জন্য ৮০৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ন্যাশনাল এগ্রিকালচার টেকনোলজি প্রোগ্রামের (এনএটিপি) আওতায় ২৫টি প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে সাড়ে তিন একর জমিতে আদর্শ পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করা হচ্ছে। এ জন্য কৃষি বিভাগ কৃষকদের মধ্যে বিনা মূল্যে ৫৮০ কেজি বীজধানসহ সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণ করেছে। 
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, কমিউনিটি বা আদর্শ বীজতলা তৈরির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি কয়েকটি সারিতে (লাইন) ভাগ করে নেওয়া হয়। এরপর সেই সারিগুলোতে বীজধান ফেলতে হয়। এই পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করলে বীজধান, সার, সেচ ও সময়সহ খরচ অনেক কম লাগে। কোন চারা নষ্ট হয় না এবং ফলন ভালো পাওয়া যায়। অধিকন্তু প্রচণ্ড শীতেও বীজতলা ‘কোল্ড ইনজুরিতে’ আক্রান্ত হয় না। ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে এ বীজতলা পদ্ধতিতে উৎপন্ন চারা খেতে রোপণ করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর আদর্শ পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য  ইতোমধ্যে কয়েক স্থানে মাঠ দিবসও করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি আরো বলেন, আদর্শ পদ্ধতিতে বীজতলা করলে প্রতি শতাংশ জমিতে আড়াই কেজি বীজধান লাগে। কিন্তু সনাতন পদ্ধতিতে বীজতলা করলে প্রতি শতাংশ জমিতে ৪ থেকে ৫ কেজি বীজধান লাগে। এতে ধানবীজও সাশ্রয় হয়। এ পদ্ধতিতে বীজতলার পরিচর্যার কাজও সহজে করা যায়।
সরেজমিনে নকলা উপজেলার চরকৈয়া, কুর্শাবাদাগৈড়, পাইস্কা ও ভূরদী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এসব এলাকার কৃষকেরা বোরো ধান উৎপাদনের জন্য প্রায় অর্ধশত একর জমিতে আদর্শ পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করেছেন। দৃষ্টি নন্দন এসব খেত দেখে মনে হয়, খোলা আকাশের নিচে ধান খেতগুলো সবুজ গালিচা দিয়ে ঢাকা রয়েছে। এ সময় চরকৈয়া গ্রামের কৃষক ফরিদুল ইসলাম বলেন, এবার তিনি ৪ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করবেন। এ জন্য ২৫ শতাংশ জমিতে আদর্শ বীজতলা পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করছেন। এর মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁর ১৩ শতাংশ জমিতে বিআর-২৯ জাতের ধানের প্রদর্শনী প্লট করা হয়েছে। আর তিনি নিজে ১২ শতাংশ জমিতে সুপার হাইব্রিড জাতের ধানের বীজতলা তৈরি করেছেন। এসব জমিতে উৎপাদিত বীজতলা দিয়ে তাঁর নিজের ৪ একর জমিতে বোরো আবাদ করবেন। আর বাড়তি বীজতলা অন্য কৃষকের নিকট বিক্রি করবেন।
কৃষক ফরিদুল আরো বলেন, এক একর জমিতে ধান আবাদের জন্য কমিউনিটি পদ্ধতিতে ৮ থেকে ১০ কেজি ধানের বীজতলা লাগে। কিন্তু সনাতন পদ্ধতিতে একই পরিমাণ জমিতে আবাদ করতে ১০ কেজি থেকে ১২ কেজি ধানের বীজতলা লাগে। তাই কমিউনিটি বা আদর্শ বীজতলা পদ্ধতিতে খরচ কম হয়। আর ধান উৎপাদনও বেশি হবে বলে আশা করা যায়।
উপজেলার চরকৈয়া গ্রামের কৃষাণি ইয়াছমিন, আঁখি, ছাহেরা, মালেছা; কুর্শাবাদাগৈড় গ্রামের কৃষক লিয়াকত আলী; ভূরদী গ্রামের কৃষক ছায়েদুল, হেলাল, কামাল, কমল ও ইসমাইল হোসেন প্রায় অভিন্ন ভাষায় বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শক্রমে তাঁরা আদর্শ পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করেছেন। এতে আগের বছরের তুলনায় তাঁদের খরচ কম হয়েছে। বীজতলার মানও বেশ ভাল হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, শেরপুরের উপ-পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, গত ২ থেকে ৩ বছর ধরে শেরপুরে স্বল্প পরিসরে আদর্শ বীজতলা পদ্ধতিতে চারা করা হচ্ছে। এতে কৃষকেরা উপকৃত হওয়ায় এ পদ্ধতি কৃষকদের মধ্যে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আশা করা যায়, খুব শীঘ্রই পুরো জেলার কৃষকেরা এ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করবেন। ফলে ধান আবাদে খরচ কমবে এবং ফসল উৎপাদনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ