ঢাকা, সোমবার 26 February 2018, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৪, ৯ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এক হাতেই রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন

শারীরিক প্রতিবন্ধী আমবাজ আলী এক হাতে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছে -সংগ্রাম

শেরপুরের সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের তারাগড় বালুয়াকান্দা গ্রামের মৃত করমতুল্লাহর ছেলে আমবাজ আলী একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাঁর বয়স এখন ৫০ বছর। ৩৫ বছর আগে কিশোর বয়সে একটি বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় হারিয়েছিলেন বাম হাত। কিন্তু এ জন্য দমে যাননি তিনি। জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য তিনি এখন শেরপুর জেলা শহরে এক হাতে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতিবন্ধী ভাতার একটি কার্ডের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করলেও তা পাননি। শেরপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় যাত্রী নিয়ে এক হাতে রিকশা চালাতে দেখা যায় আমবাজ আলীকে। এ সময় রিকশা থামিয়ে কীভাবে পঙ্গু হলেন আমবাজ, জানতে চাইলে সে কাহিনী বলেন এ প্রতিনিধির কাছে।  আমবাজ বলেন, তাঁরা ৫ ভাই ও ১ বোন। তাঁর বাবা দিনমজুর ছিলেন। সামান্য আয় দিয়ে বাবা সংসার চালাতে পারতেন না। তাই লেখাপড়া করতে পারেননি, এমনকি স্বাক্ষর জ্ঞানও তাঁর নেই। তাই মাত্র ১৫ বছর বয়সে এক আত্মীয় তাঁকে সিলেটে নিয়ে যান। সেখানে বেঁচে থাকার জন্য এক বাড়িতে দিনমজুরের কাজ নেন আমবাজ। ওই বাড়িতে গাছ কাটার সময় আকস্মিকভাবে তিনি বিদ্যুতায়িত হন। এতে তাঁর বাম হাত সম্পূর্ণ ঝলসে যায়। এরপর দীর্ঘদিন সিলেটের একটি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলে। ওই বাড়ির মালিকই চিকিৎসার খরচ দেন। ওই সময় প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর বাম হাতটি সম্পূর্ণ কেটে ফেলা হয়। বাম হাত হারিয়ে আমবাজ হয়ে যান পঙ্গু। এরপর কিশোর আমবাজ চলে আসেন শেরপুর সদরের তারাগড় বালুয়াকান্দা গ্রামের বাড়িতে। বাড়িতে এসে কয়েক বছর বিশ্রামে থাকেন তিনি। ২৫ বছর বয়সে আমবাজ বিয়ে করেন প্রতিবেশী এক দিনমজুরের মেয়েকে। এরপর জীবিকার তাগিদে ভাড়া নিয়ে রিকশা চালাতে শুরু করেন তিনি। প্রথম প্রথম এক হাত দিয়ে রিকশা চালাতে কষ্ট হতো। যাত্রীরাও তাঁর রিকশায় ওঠতে ভয় পেতেন। কিন্তু আস্তে আস্তে রিকশা চালানোয় তাঁর হাত পাকা হয়ে ওঠে। এখন এক হাত অর্থাৎ শুধু ডান হাতেই তিনি দক্ষতার সঙ্গে রিকশা চালাতে পারেন। প্রায় প্রতিদিনই তারাগড় বালুয়াকান্দা গ্রামের বাড়ি থেকে শেরপুর শহরে এসে দিনভর রিকশা চালান। শরীর খারাপ থাকলে রিকশা চালান না। আমবাজের ঘরে তিন মেয়ে জন্ম নিয়েছে। কোন ছেলে নেই। এতে তাঁর দুঃখ নেই। বড় মেয়ে আনোয়ারা বেগমকে ১৭ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ে ও মেয়ের জামাই গাইবান্ধার একটি তৈরি পোষাক কারখানায় শ্রমিকের কাজ করেন। মেজ মেয়ে আকাশী বেগম স্থানীয় বালুয়াকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে আর ছোট মেয়ে বাতাসী বেগম একই স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। আমবাজের ইচ্ছে এই দুই মেয়েকে লেখাপড়া করানোর। যাতে তারা বড় হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারে। আমবাজ বলেন, ‘সারাদিন রিকশা চালায়া আয় হয় ২৫০ থাইক্যা ৩০০ টাকা। কিন্তু এই আয় দিয়া সংসার চলে না। আগে প্যাডেল মাইরা রিকশা চালাইতাম। কিন্তু ওই রিকশায় অহন বেশি যাত্রী উঠবার চায় না। তাই আমার সামান্য ৫ কাঠা (২০ শতাংশ) জমি বন্ধক রাইখ্যা ৮০ হাজার টাকা ঋণ করছি। এই টাকা দিয়া ব্যাটারিচালিত একটা রিকশা কিনছি। এতে শরীরের ওপর কিছুটা চাপ কমছে। কিন্তু আয় বেশি বাড়ে নাই। পঙ্গু হইলেও জীবনতো চালান লাগবো। তাই রিকশার চাকা ঘুরাইয়াই জীবন চালাইতাছি। আমবাজ বলেন, সরকার প্রতিবন্ধীদের অনেক সুবিধা দেয়, ভাতা দেয়। তিনি প্রতিবন্ধী ভাতার একটি কার্ডের জন্য স্থানীয় ইউপি মেম্বারের কাছে বেশ কয়েক বার গিয়েছেন। কিন্তু আজো কোন কার্ড পাননি। একটি কার্ড পেলে তাঁর সংসার চালানো ও মেয়েদের লেখাপড়া করানোয় অনেক সুবিধা হবে বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শেরপুর সদরের পাকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হায়দার আলী বলেন, আমবাজ আলীর শারীরিক প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি তিনি জানেন না। তাঁর কাছে আমবাজ কখনো আসেননি বা প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডের জন্য আবেদন করেননি। তবে আবেদন করলে অবশ্যই তাঁকে একটি কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ